বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
জয় মহাকালী, জয় মধু-কৈটভ বিনাশিনী
জয় মহাকালী, জয় মধু-কৈটভ বিনাশিনী।
জয় যোগনিদ্রা জয় মহামায়া ধর্ম প্রদায়িনী॥
ভয়াতুর ব্রহ্মা অসুর-আশঙ্কায়
বিষ্ণু নিদ্রাতুর তোমার মায়ায়,
রাজসিক সাত্ত্বিক দুই মহাদেবতায়
রক্ষা কর মা তুমি মহাভয় হারিণী॥
নীল জ্যোতির্ময়ী অসীম তিমির-কুন্তলা মা গো,
আসন্ন প্রলয়-পয়োধির উর্ধ্বে দেখা দাও, জাগো!
দশ পায়ে দশ দিকে আঘাত হানো,
দশ হাতে দশবিধ আযুধ আনো,
দশ মুখকমলে অভয়বাণী
শোনাও আর্তজনে বিপদ-বারিণী॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটিতে আদ্যা মহাশক্তিকে বিশ্বসংহারিণী ও বিশ্বরক্ষাকর্ত্রী রূপে
উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি একই সাথে অসুরবিনাশিনী মহাকালী এবং সৃষ্টির
মোহমায়া-রূপিণী মহামায়া। মধু-কৈটভ নামক অসুরদ্বয়ের বিনাশকারিণী মহাকালী এবং
সৃষ্টিজগতের মোহ ও বিধানের অধিষ্ঠাত্রী, ধর্মপ্রদায়িনী বিশ্বনিয়ন্ত্রিণী
নিদ্রাশক্তি মহামায়ার জয়ধ্বনি দিয়ে গানটির অবতারণা করা হয়েছে।
সৃষ্টির আদিতে ইনি প্রলয়
সমুদ্রে ভাসমান অবস্থায় যোগনিদ্রায় দশায় শায়িত ছিলেন।
এই সময়
ব্রহ্মার
সৃষ্টি হয়/। এই সময় তাঁর কর্ণমল থেকে
মধু ও কৈটভ [ মধুকৈটভ]
নামক দুই দৈত্য আবির্ভূত হয়ে ব্রহ্মাকে হত্যা
করতে উদ্যত হয়। এই সময়
ব্রহ্মা ইনি
যোগনিদ্রারূপী মহামায়া
(দুর্গা)
বন্দনা করেন।
মহামায়া বিষ্ণুর দেহের বিভিন্ন অংশ থেকে বিচ্ছুরিত হয়ে নিজেকে ব্রহ্মার সামনে
নিজেক প্রকাশ করেন। পরে ব্রহ্মাকে অভয় দান করে অন্তর্হিত হলে- বিষ্ণু
নিদ্রা থেকে জেগে উঠে দৈত্যদের আক্রমণ করেন। মহামায়ার এই মহাভয় হারিণী
মহিমাকে
উপস্থাপন করা হয়েছে এই গানে।
এই গানে মহাকালীর রূপ বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি নীল জ্যোতির্ময়ী, অসীম তিমির-কুন্তলা
(ঘন কালো কেশধারিণী)। যখন প্রলয়ের মহাসমুদ্র ঘনিয়ে আসে, তখন তার ঊর্ধ্বে তিনি
প্রকাশিত হয়ে বিশ্বকে রক্ষা করেন তিনি। তিনি দশ পায়ে দশ দিকে আঘাত হেনে অশুভ শক্তিকে দমন করো।
দুর্গার মানবীয় রূপে দুটি পা। এটি তাঁর লৌকিক বা নররূপ। এটি বাস্তব দেহবর্ণনা নয়।
দেবীসত্ত্বার বহুরূকে দেবীর দশ হাতের সাথে মিলিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে প্রতীকী ভাষায়।
ভারতীয় দর্শনে দশ দিক—পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ, চার উপদিক, ঊর্ধ্ব ও অধঃ। “দশ পা” বাস্তব শারীরিক সংখ্যা নয়; এটি দেবীর সর্বব্যাপিতা, সর্বদিক-নিয়ন্ত্রণ ও অসীম কর্মশক্তির প্রতীকী কাব্যরূপ।
অন্যদিকে দুর্গা দশ হাতে দশ প্রকার অস্ত্র ধারণ করে ধর্মরক্ষা করো।
একই সাথে কবি দেবীকে তাঁরদশ হাতে আযুথ (শুদ্ধ রূপ: আয়ুধ শব্দের অর্থ হলো অস্ত্র, যুদ্ধের উপকরণ, বা সংহার ও রক্ষার সামগ্রী)
নিয়ে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য আহ্বান করেছেন। এখানে দেবী দুর্গা-র “দশ হাত” কোনো শারীরিক সংখ্যা নয়; এটি তাঁর বহুমুখী শক্তি, কর্মক্ষমতা ও সর্বদিক-নিয়ন্ত্রণের প্রতীক। শাস্ত্র ও কাব্যে এই রূপের মাধ্যমে বোঝানো হয়—একই সঙ্গে বহু দায়িত্ব পালন ও বহু শক্তির প্রকাশ।
গানএর এই অংশে তাঁর দশ মুখ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। সংসারের বহুবিধ অভায়বাণী
ও জ্ঞান প্রকাশের প্রতীক হিসেবে। যেন সে বাণী থেকে আর্তজনেরা পান অভয় হওয়ার
বার্তা।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের
২৭ জানুয়ারি (বৃহস্পতিবার
১৩ মাঘ ১৩৪৪), কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত 'দেবস্তুতি' আলেখ্যের সাথে এই গানটি
প্রচারিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৮ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
১৮৯০। পৃষ্ঠা: ৫৭০।
- দেবীস্তুতি। [নজরুল রচনাবলী জন্মশধবর্ষ সংস্করণ। বাংলা
একাডেমী ঢাকা। অষ্টম খণ্ড (১২ ভাদ্র ১৩১৫, ২৭শে আগষ্ট ২০০৮)। মহাকালী। পৃষ্ঠা: ২৪৬]
- পত্রিকা: বেতার জগৎ
[১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮
খ্রিষ্টাব্দ (রবিবার, ২ মাঘ ১৩৪৪)]। 'আমাদের কথা' বিভাগে।
[সূত্র:
বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও
পৃষ্ঠা:৪৫।
- বেতার:
- দেবীস্তুতি
- প্রথম প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৭ জানুয়ারি ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার
১৩ মাঘ ১৩৪৪)। শিল্পী: ইলা ঘোষ
[সূত্র:
- বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও
পৃষ্ঠা:৪৫।
The Indian listener. Vol III. No II, (7th January, 1938) Page
121
দ্বিতীয় প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৫ জুলাই ১৯৩৯ (মঙ্গলবার, ৯
শ্রাবণ ১৩৪৬)।
[সূত্র: বেতার জগৎ-পত্রিকার ৯ম বর্ষ ১২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা ৫৩৩]
স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম, শাক্ত। দুর্গা-বন্দনা।
- সুরাঙ্গ:
ধ্রুপদাঙ্গ