বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
বর্ণচোরা ঠাকুর এলো রসের নদীয়ায়
বর্ণচোরা ঠাকুর এলো রসের নদীয়ায়
তোরা দেখ্বি যদি আয়
তারে কেউ বলে শ্রীমতী রাধা কেউ বলে সে শ্যামরায়॥
কেউ বলে তার সোনার অঙ্গে
রাধা-কৃষ্ণ খেলেন রঙ্গে ;
ওগো কেউ বলে তায় গৌর-হরি কেউ অবতার বলে তায়॥
তার ভক্ত তারে ষড়ভুজ শ্রী নারায়ণ বলে,
কেউ দেখেছে শ্রীবাসের ঘরে কেউ বা নীলাচলে।
দুই হাতে তার ধনুর্বাণ ঠিক
যেন শ্রীরাম,
দুই হাতে তার মোহন বাঁশি
যেন রাধা-শ্যাম,
আর দু'হাতে দণ্ড ঝুলি নবীন
সন্ন্যাসীরই প্রায়॥
-
ভাবসন্ধান:এই গানে শ্রীচৈতন্যদেবের বহুমাত্রিক ঐশ্বরিক রূপ, তাঁর রাধাকৃষ্ণময় সত্তা এবং ভক্তসমাজে তাঁর অবতারত্বের বিশ্বাস অত্যন্ত কাব্যময়ভাবে প্রকাশিত হয়েছে। কবি তাঁকে
'বর্ণচোরা ঠাকুর' বলে অভিহিত করেছেন। কারণ কৃষ্ণের শ্যামবর্ণ যেন গোপন হয়ে রাধার গৌরবর্ণ ধারণ করে তিনি নদীয়ায় আবির্ভূত হয়েছেন। বৈষ্ণব তত্ত্বে শ্রীচৈতন্যকে রাধার প্রেম ও ভাব এবং কৃষ্ণের স্বরূপের যুগল প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়; এই গান সেই তত্ত্বেরই কাব্যিক রূপায়ণ।
গানের শুরুতেই কবি সকলকে আহ্বান জানিয়েছেন 'এসো, নদীয়ার রসপূর্ণ ভূমিতে আবির্ভূত এই আশ্চর্য ঠাকুরকে দেখে যাও। তাঁকে কেউ রাধা বলে, কেউ কৃষ্ণ বলে। অর্থাৎ তাঁর মধ্যে রাধার প্রেম, অনুভূতি ও গৌরবর্ণ যেমন বিদ্যমান, তেমনি কৃষ্ণের পরম ঈশ্বরত্ব ও লীলামাধুর্যও একাকার হয়ে প্রকাশিত হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, কেউ মনে করেন তাঁর সোনালি দেহে রাধা ও কৃষ্ণ একত্রে মিলিত হয়ে এক নতুন রূপ ধারণ করেছেন। আবার কেউ তাঁকে
'গৌরহরি' নামে অভিহিত করেন, কেউ তাঁকে ঈশ্বরের অবতার বলে মানেন। এখানে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, শ্রীচৈতন্যের প্রকৃত পরিচয় একক কোনো পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; ভক্তেরা নিজেদের উপলব্ধি ও ভক্তিভাব অনুযায়ী তাঁর মধ্যে বিভিন্ন ঐশ্বরিক রূপ প্রত্যক্ষ করেছেন।
এরপর কবি শ্রীচৈতন্যের ষড়ভুজরূপের বর্ণনা দিয়েছেন, যা গৌড়ীয় বৈষ্ণবধর্মে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভক্তদের বিশ্বাস, শ্রীচৈতন্য কখনও কখনও ছয়ভুজবিশিষ্ট এক অলৌকিক রূপে আবির্ভূত হতেন। সেই রূপের দুই হাতে শ্রীরামের ধনুক ও বাণ, দুই হাতে শ্রীকৃষ্ণের মোহন বাঁশি এবং অপর দুই হাতে নবীন সন্ন্যাসীর দণ্ড ও ঝুলি শোভা পেত। এই প্রতীকগুলোর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, শ্রীরাম, শ্রীকৃষ্ণ এবং শ্রীচৈতন্য- এই তিন লীলার অন্তর্নিহিত পরমসত্তা এক ও অভিন্ন।
গানে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কেউ এই অলৌকিক ষড়ভুজরূপ শ্রীবাস পণ্ডিতের গৃহে প্রত্যক্ষ করেছেন, আবার কেউ নীলাচল পুরীতে। এই উল্লেখ বৈষ্ণব সাহিত্যে বর্ণিত শ্রীচৈতন্যের অলৌকিক লীলার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে এবং তাঁর ঈশ্বরীয় মহিমার প্রতি ভক্তদের অকুণ্ঠ বিশ্বাসকে প্রকাশ করে।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের
ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম
রেকর্ড প্রকাশ করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২) -এর ১৯৭ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৬২।
- একশো গানের নজরুল স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড, (হরফ প্রকাশনী, পৌষ ১৪০৬। জানুয়ারি ২০০০) -এর ১৮ সংখ্যক গান (সুরান্তর)। পৃষ্ঠা: ৪৫-৪৮।
- নজরুল সুরলিপি, দশম খণ্ড, (নজরুল একাডেমী, ডিসেম্বর ১৯৮৬) -এর ৩য় গান। পৃষ্ঠা: ৬-৯।
- নজরুল-সুর-সঞ্চয়ন (২য় খণ্ড) -বল রে জবা বল (ডি.এম.লাইব্রেরী, শ্রাবণ ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) -এর ২৫ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৯০-৯৪।
- নজরুল গীতি, অখণ্ড (আব্দুল আজীজ আল-আমান, সম্পাদিত)। [হরফ প্রকাশনী, মাঘ ১৪১০। জানুয়ারি ২০০৪]। ভক্তিগীতি। গান-১৬১৮। পৃষ্ঠা: ৪২৪।
- রেকর্ড:
- এইচএমভি [ডিসেম্বর ১৯৩৭ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪) নং- এন.
১৭০০৩.। শিল্পী: লতিকা মিত্র। সুর: সত্যেন চক্রবর্তী।
- কলম্বিয়া [জানুয়ারি ১৯৫০ (পৌষ-মাঘ ১৩৫৬)।
রেকর্ড নং- জি.ই. ৭৬২৯.। শিল্পী:
উত্তরা দেবী। সুর:
নিতাই ঘটক।]
- বেতার:
শ্রীশ্রী চৈতন্য-লীলা কীর্তন। [৫ মার্চ ১৯৩৯ (রবিবার ২১ ফাল্গুন
১৩৪৫)]
- সূত্র
- বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা: ১৭৯
- The Indian-listener Vol
IV, No.5. p. 357
- সুরকার:
- কাজী নজরুল ইসলাম।
[নজরুল-সুর-সঞ্চয়ন
(২য় খণ্ড) -বল রে জবা বল (ডি.এম.লাইব্রেরী, শ্রাবণ
১৩৮৩ বঙ্গাব্দ) -এর ২৫ সংখ্যক গান।
পৃষ্ঠা: ৯০-৯৪।]
- সত্যেন
চক্রবর্তী। [এইচ.এম.ভি.,
এন. ১৭০০৩.। শিল্পী-লতিকা মিত্র।]
- নিতাই
ঘটক। [কলম্বিয়া. জি.ই.
৭৬২৯.। শিল্পী-উত্তরা দেবী।]
- স্বরলিপিকার :
- ড. ব্রহ্মমোহন ঠাকুর।
[একশো গানের নজরুল স্বরলিপি,
একাদশ খণ্ড, (হরফ প্রকাশনী, পৌষ ১৪০৬। জানুয়ারি ২০০০) -এর
১৮ সংখ্যক গান (সুরান্তর)। পৃষ্ঠা: ৪৫-৪৮।]
- রশিদুন নবী। [নজরুল সুরলিপি,
দশম খণ্ড, (নজরুল একাডেমী, ডিসেম্বর ১৯৮৬) -এর ৩য় গান।
পৃষ্ঠা: ৬-৯।]
- ড. রশিদুন্ নবী। নজরুল -সংগীত স্বরলিপি। নজরুল
ইন্সটিটিউট। ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪২৩/জুন ২০১৬। গান সংখ্যা ১৮। পৃষ্ঠা: ৩১-৩৬
[নমুনা]
-
আহসান মুর্শেদ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি, চুয়ান্নতম খণ্ড, কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, আশ্বিন ১৪২৮।
সেপ্টেম্বর ২০২১] গান সংখ্যা ১২। পৃষ্ঠা: ৬২-৬৪ [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু। বৈষ্ণব। শ্রীচৈতন্য।
বন্দনা
- সুরাঙ্গ: ভজন
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: স