বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
পথে কি দেখলে যেতে আমার গৌর দেবতার
পথে কি দেখলে যেতে আমার গৌর দেবতারে।
যা’রে কোল যায় না দেওয়া, কোল দেয় সে ডেকে তারে॥
নবীন সন্ন্যাসী সে রূপে তার পাগল করে
আঁখির ঝিনুকে তা’র অবিরল মুক্তা ঝরে।
কেঁদে সে কৃষ্ণের প্রেম ভিক্ষা মাগে দ্বারে দ্বারে॥
জগতের জগাই-মাধাই মগ্ন যারা পাপের পাঁকে
সকলের পাপ নিয়ে সে সোনার গৌর-অঙ্গে মাখে।
উদার বক্ষে তাহার ঠাঁই দেয় সকল জাতে
দেখেছ প্রেমের ঠাকুর সচল জগন্নাথে?
একবার বললে হরি যায় নিয়ে সে ভবপারে॥
-
ভাবসন্ধান: এটি নজরুলের রচিত 'শ্রীশ্রী চৈতন্য-লীলা কীর্তন' পালার গান।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে চৈতন্য মহাপ্রভু স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ, যিনি
রাধা-র প্রেম ও ভাব গ্রহণ করে
গৌরাঙ্গ রূপে অবতীর্ণ হয়েছেন। তাঁদের মতে তিনি কেবল বিষ্ণুর অবতার নন, বরং
রাধাকৃষ্ণের যুগলস্বরূপ। এই গানে চৈতন্য মহাপ্রভু-এর অসীম প্রেম, করুণা, সর্বজনীন মানবতা এবং নামসংকীর্তনের মাধ্যমে জীবের মুক্তিদানের আদর্শ চিত্রিত হয়েছে। কবি তাঁকে এমন এক প্রেমময় অবতাররূপে উপস্থাপন করেছেন, যিনি জাতি, বর্ণ, ধর্ম বা পাপ-পুণ্যের কোনো ভেদ না করে সকল মানুষকে
ঐশ্বরিকপ্রেমের আহ্বান জানান।
গানের শুরুতে কবি গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর অপরূপ সন্ন্যাসী-রূপের কথা বলেছেন। তাঁর রূপ, ব্যক্তিত্ব ও প্রেমময় আচরণ মানুষকে মোহিত করে। যাঁদের সমাজ বা আপনজন আপন করে নেয় না, তাঁদেরও তিনি সস্নেহে নিজের কোলে টেনে নেন। তাঁর চোখ থেকে অবিরাম অশ্রুধারা ঝরে, কারণ তিনি শ্রীকৃষ্ণপ্রেমে নিমগ্ন এবং সেই প্রেমই তিনি মানুষের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে বেড়ান। এখানে ‘প্রেম ভিক্ষা’ বলতে মানুষের হৃদয়ে ঈশ্বরপ্রেম জাগিয়ে তোলার আকুল প্রয়াসকে বোঝানো হয়েছে।
গানের পরবর্তী অংশর দেখিয়েছেন যে, পাপে নিমজ্জিত মানুষকেও চৈতন্যদেব ঘৃণা করেন না। বরং তিনি তাদের পাপ নিজের ওপর গ্রহণ করে তাদের পবিত্র করার চেষ্টা করেন। জগাই-মাধাই-এর উল্লেখের মাধ্যমে সেই ঐতিহাসিক ঘটনার ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে চরম পথভ্রষ্ট ও পাপাচারী ব্যক্তিরাও মহাপ্রভুর করুণা ও নামসংকীর্তনের প্রভাবে অনুতপ্ত হয়ে ভক্তির পথে ফিরে এসেছিল। অর্থাৎ, তাঁর কাছে এমন কোনো পাপী নেই, যার মুক্তি অসম্ভব।
এরপর কবি তাঁর সর্বজনীন মানবতাবাদের কথা তুলে ধরেছেন। গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর উদার হৃদয়ে সকল জাতি, বর্ণ ও শ্রেণির মানুষের সমান স্থান। তিনি মানুষের মধ্যে কোনো উচ্চ-নীচ বা অস্পৃশ্যতার ভেদ মানেন না; তাঁর কাছে একমাত্র পরিচয় হলো—সবাই পরমেশ্বরের সন্তান। এই আদর্শের মধ্য দিয়ে তিনি প্রেম, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
গানের শেষাংশে তাঁকে 'প্রেমের ঠাকুর সচল জগন্নাথ' বলা হয়েছে। অর্থাৎ, তিনি যেন চলমান জগন্নাথ
(বিষ্ণুর একটি রূপ)—জীবন্ত প্রেম ও করুণার মূর্তি। তাঁর মুখে একবার আন্তরিকভাবে 'হরি'
(বিষ্ণু) নাম উচ্চারণ করলেই তিনি ভক্তকে সংসাররূপী ভবসাগর পার করে মুক্তির পথে নিয়ে যান। এখানে ‘হরি’ নাম কেবল একটি শব্দ নয়; এটি
বিষ্ণুর প্রতি প্রেম, তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ এবং মানবমুক্তির চিরন্তন মন্ত্রের প্রতীক।
সব মিলিয়ে, এই গানে চৈতন্য মহাপ্রভুকে কৃষ্ণপ্রেমের জীবন্ত প্রতিমূর্তি, সর্বজনীন মানবপ্রেমের প্রচারক, পতিতপাবন করুণাময় মহাপুরুষ এবং নামসংকীর্তনের মাধ্যমে জীবের মুক্তিদাতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর জীবন ও আদর্শ মানুষকে প্রেম, সাম্য, ক্ষমা, ভক্তি ও মানবকল্যাণের পথে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান জানায়।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২]। গান
সংখ্যা ১৯৮৬। পৃষ্ঠা: ৫৯৭
- রেকর্ড:
এইচএমভি [ডিসেম্বর ১৯৩৭ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৪৪)[। এন ১৭০০৩। শিল্পী:
লতিকা মিত্র
- বেতার: শ্রীশ্রী চৈতন্য-লীলা কীর্তন। [৫ মার্চ ১৯৩৯ (রবিবার ২১ ফাল্গুন
১৩৪৫)]
- সূত্র
- বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ ৫ম সংখ্যা পৃষ্ঠা: ১৭৯
- The Indian-listener Vol
IV, No.5. p. 357
- সুরকার: সত্যেন চক্রবর্তী
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
আহসান মুর্শেদ
[নজরুল
সঙ্গীত স্বরলিপি সাতচল্লিশতম খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। ফাল্গুন ১৪২৫/ফেব্রুয়ারি
২০১৯] পৃষ্ঠা: ৬৩-৬৫ [নমুনা]
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। শ্রীচৈতন্য। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: কীর্তনাঙ্গ
- তাল:
তালফেরতা [দাদরা-কাহারবা]
- গ্রহস্বর: নর্স