বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম:
বাদলা রাতে চাঁদ উঠেছে কৃষ্ণ মেঘের কোলে
বাদলা রাতে চাঁদ উঠেছে কৃষ্ণ মেঘের কোলে রে।
ব্রজ পুরে তমাল-ডালের ঝুলনাতে দোলে রে॥
নীল চাঁদ আর সোনার চাঁদে
বাঁধা বন-মালার ফাঁদে রে
এই চাঁদ হেসে আরেক চাঁদের অঙ্গে পড়ে ঢ’লে রে॥
যুগল শশী হেরি গোপী কহে, বাদলা রাতই ভালো রে,
গোকুল এলো ব্রজে নেমে ধরা হল আলো রে।
দেব-দেবীরা চরণ-তলে
বৃষ্টি হয়ে পড়ে গ’লে রে,
বেদ-গাথা সব নূপুর হয়ে রুনুঝুনু বোলে রে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে বর্ষার এক মনোরম রজনীতে রাধা-কৃষ্ণের যুগল-মিলনের অলৌকিক সৌন্দর্য, প্রেমের ঐশ্বর্য এবং ভক্তিরস এক অপূর্ব কাব্যিক রূপে
উপস্থাপিত হয়েছে।
বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন রাতে কৃষ্ণবর্ণ মেঘের কোলে চাঁদ উদিত হয়েছে। কবি এই প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ব্রজধামে রাধা-কৃষ্ণের ঝুলনলীলার সঙ্গে একাত্ম করেছেন। তমাল গাছের ডালে ঝুলনায় যুগলবন্দী রাধা ও কৃষ্ণ দোল খাচ্ছেন। এখানে কৃষ্ণকে নীল চাঁদ এবং রাধাকে সোনার চাঁদ বলে কল্পনা করা হয়েছে। বনফুলের মালা যেন তাদের প্রেমের বন্ধন। আনন্দে ও প্রেমাবেগে তাঁরা এমনভাবে একে অপরের সান্নিধ্যে মগ্ন যে, মনে হয় এক চাঁদ অপর চাঁদের বুকে ঢলে পড়েছে। এই চিত্র যুগলপ্রেমের নিবিড়তা, মাধুর্য এবং আত্মিক ঐক্যের প্রতীক।
এই অপূর্ব যুগলরূপ দর্শন করে গোপীরা বলেন, এমন বাদল-রাতই শ্রেষ্ঠ। কারণ এই রাতেই যেন স্বর্গীয় গোকুল ব্রজভূমিতে নেমে এসেছে এবং সমগ্র পৃথিবী প্রেম, আনন্দ ও ঐশী জ্যোতিতে আলোকিত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির অন্ধকারও তখন আর অন্ধকার থাকে না; বরং ঈশ্বরীয় প্রেমের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
কবি আরও কল্পনা করেছেন, রাধা-কৃষ্ণের চরণে দেব-দেবীরাও শ্রদ্ধাভরে নত হয়ে বৃষ্টিধারার মতো ঝরে পড়ছেন।
তাঁদের বন্দনায় সমগ্র সৃষ্টি অংশগ্রহণ করছে। এমনকি বেদের স্তোত্রসমূহও যেন নূপুরে রূপান্তরিত হয়ে রুনুঝুনু ধ্বনিতে যুগলচরণের মহিমা গেয়ে চলেছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, প্রেমময় এই যুগলরূপ কেবল মানবহৃদয়কেই নয়, দেবলোক, প্রকৃতি এবং সমগ্র বিশ্বজগতকেও আনন্দ ও ভক্তিতে উদ্বেলিত করে।
সমগ্র গানে বর্ষার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, রাধা-কৃষ্ণের ঝুলনলীলা, যুগলপ্রেমের মাধুর্য এবং ভক্তির সর্বজনীন মাহাত্ম্য একাকার হয়ে গেছে। এখানে বাদল-রাত্রি শুধু একটি ঋতুচিত্র নয়; এটি ঈশ্বরপ্রেম, সৌন্দর্য, মিলন এবং চিরন্তন আনন্দের প্রতীক।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ আগষ্ট খ্রিষ্টাব্দ
(মঙ্গলবার, ১২ ভাদ্র ১৩৪৬) কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত হয়েছিলে জগৎ ঘটকের
রচিত 'ঝুলন'
নামক গীতি-আলেখ্য। এই গীতি-আলেখ্যে নজরুলের রচিত এই গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল।
এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ২ মাস।
-
গ্রন্থ:
নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২০২২। তাল: দ্রুত দাদরা। পৃষ্ঠা: ৬০৮]
- বেতার: 'ঝুলন'
(গীতি-আলেখ্য)। রচয়িতা জগৎঘটক। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। [২৯ আগষ্ট ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ (মঙ্গলবার, ১২ ভাদ্র ১৩৪৬)।
সান্ধ্য অধিবেশন।
৭.০০-৭.৫৯ মিনিট।
সূত্র:
- বেতার জগৎ: ১০ম বর্ষ ১৬শ সংখ্যার [পৃষ্ঠা:
৬৩৭]
- The Indian Listener. Vol.
IV No 16 Page 1183
- রেকর্ড: এইচএমভি [জুলাই ১৯৪০ (আষাঢ়-শ্রাবণ)। এন ১৭৪৮২। শিল্পী: ইলা ঘোষ ও সনীল
ঘোষ। সুর নিতাই ঘটক]
- পত্রিকা:
- সঙ্গীতবিজ্ঞান প্রবেশিকা [অগ্রহায়ণ ১৩৪৬ (নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৩৯)। কথা:
কাজী নজরুল ইসলাম। সুর
নিতাই ঘটক। স্বরলিপি: কুমারী ইলা ঘোষ। *এই গানখানি
কুমারী ইলা ঘোষ ও সুনীল ঘোষ 'হিজ মাস্টার্স্ ভয়েস্' রেকর্ডে গাহিয়াছেন।
পৃষ্ঠা ৪১৭-৪২০] [নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দু ধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণ-লীলা।
প্রণয়
- সুরাঙ্গ: ঝুলন-গীতি
- তাল:
দাদরা (দ্রুত)
- গ্রহস্বর: র