বিষয় : নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: মা মেয়েতে খেল্ব পুতুল আয় মা আমার
মা মেয়েতে খেল্ব পুতুল আয় মা আমার
খেলাঘরে।
আমি মা হয়ে মা শিখিয়ে দেব পুতুল খেলে কেমন করে॥
কাঙাল অবোধ করবি যারে বুকের কাছে রাখিস্ তারে
(মা)
[নইলে কে তার দুখ ভোলাবে
যারে রত্ন মানিক দিবি না মা, উচিত সে তার মাকে
পাবে]
আবার কেউ বা ভীষণ দামাল হবে কেউ থাকবে গৃহ কোণে
প’ড়ে॥
মৃত্যু সেথায় থাকবে না মা থাকবে লুকোচুরি খেলা
রাত্রি বেলায় কাঁদিয়ে যাবে আসবে ফিরে সকাল বেলা।
কাঁদিয়ে খোকায়, ভয় দেখিয়ে, ভয় ভোলাবি আদর দিয়ে
(মা)
[বেশি তারে কাঁদাস না মা, মা ছেড়ে সে পালিয়ৈ
যাবে]
সে খেলে যখন শ্রান্ত হবে ঘুম পাড়াবি বক্ষে ধ’রে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানটির অন্তর্নিহিত ভাব অত্যন্ত স্নেহময় ও গভীর। এখানে ভক্ত নিজেকে দেবীমায়ের কন্যারূপে কল্পনা করেছেন এবং মাকে আহ্বান করেছেন—এসো, আমরা মা-মেয়ে মিলে পুতুল খেলি। কিন্তু এই বাহ্যত সরল পুতুলখেলার মধ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টি, জীবন, মৃত্যু, দুঃখ, বিচ্ছেদ এবং পরম মাতৃস্নেহের গভীর দার্শনিক ব্যঞ্জনা।
'আমি মা হয়ে মা শিখিয়ে দেব পুতুল খেলে কেমন করে' -এই পঙ্ক্তিটি গানটির সবচেয়ে অভিনব ভাবের প্রকাশ। সন্তান এখানে নিজেই মায়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায় এবং মাকে শেখাতে চায়—কীভাবে সন্তানকে নিয়ে খেলতে হয়।
এর মধ্যে রয়েছে এক ধরনের স্নেহপূর্ণ অভিমান। ভক্ত যেন মাকে বলছেন- তুমি আমাদের সৃষ্টি করেছ, জীবন নামের খেলায় পাঠিয়েছ; কিন্তু আমরা যে তোমার সন্তান, আমাদের দুঃখ, কান্না ও ভয়ের কথাও তোমাকে মনে রাখতে হবে। তাই সন্তান এবার মাকে শেখাতে চায় মায়ের মতো করে ভালোবাসতে।
'কাঙাল অবোধ করবি যারে, বুকের কাছে রাখিস্ তারে' -মা যদি কাউকে দরিদ্র, অসহায় ও অবোধ করে পৃথিবীতে পাঠান, তবে তাকে বিশেষ স্নেহে আশ্রয় দেওয়াও তাঁর কর্তব্য।
এখানে একটি গভীর মানবিক আবেদন রয়েছে। পৃথিবীতে সকল মানুষ সমান সুখ বা সম্পদ নিয়ে জন্মায় না। কেউ পায় রত্ন-মানিক, কেউ পায় অভাব ও দুঃখ। কিন্তু যে বঞ্চিত, তার জন্য মাতৃস্নেহের প্রয়োজন আরও বেশি।
একানে কবি যেন বলতে চেয়েছেন- 'যাকে তুমি পার্থিব ঐশ্বর্য দাওনি, তাকে অন্তত তোমার স্নেহের অধিকার থেকে বঞ্চিত কোরো না।'
মানুষের বৈচিত্র্যও মায়ের খেলাঘরের অংশ
কেউ ভীষণ দামাল, আবার কেউ নীরব হয়ে ঘরের কোণে পড়ে থাকে। মানুষের স্বভাব, জীবনযাত্রা ও ভাগ্যের এই বৈচিত্র্যকে কবি মায়ের খেলাঘরের পুতুলদের মতো দেখেছেন।
কিন্তু সব সন্তানই মায়ের সন্তান। দামাল শিশুকেও যেমন মা ভালোবাসেন, তেমনি শান্ত ও নিঃসঙ্গ শিশুকেও তাঁর স্নেহ দিতে হয়। অর্থাৎ মায়ের ভালোবাসা কোনো বিশেষ
কোনো সন্তানের জন্য নয়- সকলের জন্য সমান আশ্রয়।
কবি মনে করেন- মৃত্যু আসলে লুকোচুরি খেলা। এই ভাবনা থেকে বলেছেন- 'মৃত্যু সেথায় থাকবে না মা, থাকবে লুকোচুরি খেলা।' কবি মৃত্যুকে চূড়ান্ত বিচ্ছেদ হিসেবে দেখতে চান না। তাঁর কল্পনায় মৃত্যু হলো মায়ের খেলাঘরের লুকোচুরি খেলা। কেউ কিছুক্ষণের জন্য চোখের আড়ালে চলে যায়, যেমন রাত্রি আসে; কিন্তু আবার সে ফিরে আসে, যেমন সকাল ফিরে আসে।
'রাত্রি বেলায় কাঁদিয়ে যাবে, আসবে ফিরে সকাল বেলা'। রাত্রি ও সকাল এখানে বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের প্রতীক। মৃত্যুর অন্ধকারও তাই কবির কাছে চিরস্থায়ী নয়; মাতৃসত্তার মধ্যে জীবন এক অবিরাম আগমন-প্রস্থানের খেলা।
কবি দেবীকে দেখেছেন শাসন ও স্নেহের সমন্বিত রূপে। কাঁদিয়ে খোকায়, ভয় দেখিয়ে, ভয় ভোলাবি আদর দিয়ে'-
এই পঙ্গক্তির মাধ্যমে কবি বলতে চেয়েছেন- মা সন্তানকে কখনো শাসন করেন, কখনো ভয় দেখান; কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ভয় দূর করেন নিজের আদর দিয়ে।
এখানে দেবীর কঠোর ও কোমল- এই দুই রূপের সমন্বয় ঘটেছে। মা জীবনে দুঃখ দেন, পরীক্ষা নেন, কখনো ভয়ের মুখোমুখি দাঁড় করান; কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য সন্তানকে পরিত্যাগ করা নয়। শেষ পর্যন্ত তিনি আবার স্নেহের আশ্রয়ে ফিরিয়ে নেন।
তাই তাই ভক্তের স্নেহভরা অনুরোধ- 'বেশি তারে কাঁদাস না মা, মা ছেড়ে সে পালিয়ে যাবে।'
এ যেন সন্তানের পক্ষ থেকে মায়ের কাছে এক মধুর অভিযোগ। জীবনের দুঃখ যেন এত বেশি না হয় যে সন্তান মায়ের ওপরই অভিমান করে বসে।
যাপিত জীবনের ক্লান্ততে অবসন্ন দশায় কবি জীবনের শেষ আশ্রয়
চেয়েছেন। 'সে খেলে যখন শ্রান্ত হবে, ঘুম পাড়াবি বক্ষে ধ'রে।' এই বিশ্বজীবন পরম মাতৃশক্তির এক খেলাঘর, যেখানে মানুষ তাঁর সৃষ্ট সন্তান ও খেলনার মতো নানা সুখ-দুঃখের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। কিন্তু এই খেলায় মা যেন তাঁর সন্তানদের কথা ভুলে না যান। যাকে দুঃখ দিয়েছেন তাকে স্নেহ দিন, যাকে ভয় দেখিয়েছেন তাকে আদরে ভয় ভুলিয়ে দিন, আর জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত সন্তানকে শেষ পর্যন্ত নিজের বক্ষে আশ্রয় দিন।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৩৪৮ বঙ্গাব্দের বৈশাখ (এপ্রিল-মে ১৯৪১) মাসে
ভারতবর্ষ
পত্রিকায় গানটি জগৎ
ঘটক-কৃত স্বরলিপি-সহ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল।
এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪১ বৎসর
১১ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইন্সটিটিউট। ফেব্রুয়ারি ২০১২)। ২০৬৫ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা:
৬২২।
- পত্রিকা:
-
ভারতবর্ষ। [বৈশাখ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ
(এপ্রিল-মে ১৯৪১)।
কথা: নজরুল ইসলাম। সুর: নিতাই ঘটক। স্বরলিপি কুমারী বিজলী ধর।
শ্যামা-সঙ্গীত-দাদরা। পৃষ্ঠা: ৬০১-৬০৩]
[নমুনা]
- রেকর্ড:
কলম্বিয়া [সেপ্টেম্বর
১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দ
(ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৫০)]। জিই ২৬০৫। শিল্পী:
উত্তরা দেবী। সুর নিতাই ঘটক
- সুরকার:
নিতাই ঘটক
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা।
মাতৃরূপা।
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর:
- গা [কুমারী বিজলী ধর-কৃত স্বরলিপি]
- স
া [আহসান মুর্শেদ-কৃত
স্বরলিপি]