বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: হৃদি-পদ্মে চরণ রাখো বাঁকা ঘনশ্যাম
‘ধ্রুব’ (ধ্রুব ও নারদের গান)।
নারদ : হৃদি-পদ্মে চরণ রাখো বাঁকা ঘনশ্যাম।
ধ্রুব : বাঁকা শিখী-পাখা নয়ন বাঁকা বঙ্কিম ঠাম॥
নারদ : তুমি দাঁড়ায়ো ত্রিভঙ্গে!
ধ্রুক : অধরে মুরলী ধরি দাঁড়ালো ত্রিভঙ্গে॥
নারদ : সোনার গোধূলি যেন নিবিড় সুনীল নভে
পীতধড়া প’রো কালো অঙ্গে (হরি হে)
ধ্রুব : নীল কপোত সম চরণ দুটি
নেচে যাক অপরূপ ভঙ্গে (হরি রে)
উভয়ে : যেন নূপুর বাজে
হরি সেই পায়ে যেন নূপুর বাজে।
বনে নয় শ্যাম মনোমাঝে যেন নূপুর বাজে।
ঐ চরণে জড়ায়ে পরান আমার
(যেন) মঞ্জির হয়ে বাজে॥
-
ভাবসন্ধান: ‘ধ্রুব’ নাটকের এই গানে নারদ ও ধ্রুবের কণ্ঠে শ্রীকৃষ্ণের অপরূপ মূর্তির ধ্যান ও বন্দনা প্রকাশ পেয়েছে। গানটির মধ্যে কৃষ্ণের রূপ, ভঙ্গি, পোশাক ও বাঁশির সুরের এক মনোহর কল্পচিত্র ফুটে উঠেছে।
নারদ প্রথমে কৃষ্ণকে হৃদয়ের পদ্মে তাঁর চরণ স্থাপন করার আহ্বান জানাচ্ছেন। তাঁর কল্পনায় কৃষ্ণের গায়ের রং ঘনশ্যামের মতো নিবিড় নীল, আর তাঁর দেহভঙ্গি বাঁকা ও মনোহর। মাথায় রয়েছে বাঁকা শিখীপাখা এবং চোখে সেই চিরচেনা বাঁকা চাহনি।
ধ্রুব সেই রূপকল্পকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে—কৃষ্ণ ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন, অর্থাৎ তাঁর দেহ তিন স্থানে বাঁকানো। অধরে বাঁশি, আর সেই বাঁশির সুরে তাঁর সমগ্র রূপ যেন আরও মাধুর্যময় হয়ে উঠেছে।
এরপর কৃষ্ণের পীতবসন ও শ্যামবর্ণ দেহের বৈপরীত্য অত্যন্ত সুন্দর উপমায় প্রকাশ করা হয়েছে। সোনালি গোধূলির আলো যেমন গভীর নীল আকাশের মধ্যে মিশে যায়, তেমনি কৃষ্ণের শ্যাম দেহের ওপর পীতবসন অপরূপ সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে।
তাঁর পদযুগল নীল কপোতের মতো কোমল ও সুন্দর; নৃত্যের ভঙ্গিতে সেই চরণদুটি যখন নড়ে ওঠে, তখন যেন নূপুরের মধুর ধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
শেষে নারদ ও ধ্রুবের সম্মিলিত কণ্ঠে কৃষ্ণের বাহ্যিক রূপ থেকে অন্তরের কৃষ্ণে উত্তরণ ঘটে। তাঁকে শুধু বৃন্দাবনের বনে নয়, নিজের মনোমাঝে অনুভব করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশিত হয়। ভক্তের পরম আকাঙ্ক্ষা—কৃষ্ণের চরণে নিজের জীবন ও প্রাণকে এমনভাবে সমর্পণ করা, যেন সে নিজেই কৃষ্ণের পায়ের নূপুর হয়ে তাঁর সঙ্গে চিরকাল বাজতে পারে।
গানটির মূল বিষয় হলো কৃষ্ণের রূপমাধুর্য ও ভক্তের আত্মসমর্পণ। কৃষ্ণের শ্যামবর্ণ দেহ, পীতবসন, শিখীপাখা, ত্রিভঙ্গ ভঙ্গি, বাঁশি ও নূপুরের ধ্বনির মধ্য দিয়ে তাঁর অপরূপ সৌন্দর্যের চিত্র আঁকা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই রূপদর্শনের আকাঙ্ক্ষা পরিণত হয়েছে হৃদয়ের অন্তঃস্থলে কৃষ্ণকে ধারণ এবং তাঁর চরণে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণের আকাঙ্ক্ষায়।
-
রচনাকাল ও স্থান:
১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ১লা জানুয়ারি ‘ধ্রুব’ নামক
চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। এই চলচ্চিত্রে গানটি ব্যবহৃত হয়েছিল।
এই সময়
নজরুলের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৭ মাস ।
-
গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
২১৩৮। ‘ধ্রুব’ (ধ্রুব ও নারদের গান)। পৃষ্ঠা: ৬৪৪]
-
নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি,
আটচল্লিশতম খণ্ড। স্বরলিপিকার: ইদ্রিস আলী। [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট,
কার্তিক ১৪২৬। নভেম্বর ২০১৯। পৃষ্ঠা: ৯৫-৯৯] [নমুনা]
-
চলচ্চিত্র:
ধ্রুব। ক্রাউন টকি হাউস।
১ জানুয়ারি ১৯৩৪ (সোমবার, ১৭ পৌষ ১৩৪০)
।
নারদ ও ধ্রুবের গান। নারদের কণ্ঠে গান গেয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম ও
ধ্রুব চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছিলেন মাস্টার প্রবোধ]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- ইদ্রিস আলী। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ
মুক্তি-প্রাপ্ত
ধ্রুব চলচ্চিত্রে গীত গানের [ শিল্পী: কাজী নজরুল ইসলাম ও
মাস্টার প্রবোধ] সুরানুসারে-কৃত স্বরলিপিটি নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি
আটচল্লিশতম
খণ্ডে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। [নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন ধর্ম, বৈষ্ণব,
কৃষ্ণ-বন্দনা। চলচ্চিত্রের গান।
- সুরাঙ্গ:
কীর্তনাঙ্গ