বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
হেরেমের বন্দিনী কাঁদিয়া ডাকে
হেরেমের বন্দিনী কাঁদিয়া ডাকে তুমি শুনিতে কি পাও?
আখেরি নবী প্রিয় আল-আরবি বারেক ফিরে চাও॥
পিঁজরার পাখি সম অন্ধকারায়
বন্ধ থাকি' এ জীবন কেটে' যায়;
কাঁদে প্রাণ ছুটে যেতে তব মদিনায়
মরণের এই জিঞ্জির খুলে' দাও॥
ফতেমার মেয়েদের হেরি' আঁখি-নীর
বেহেশ্তে কেমন আছ তুমি থির!
যেতে নারি মস্জিদে শুনিয়া আজান,
বাহিরে ওয়াজ হয়, ঘরে কাঁদে প্রাণ
ঝুটা এই বোরখার হোক অবসান
-
আঁধার হেরেমে আশা-আলোক দেখাও॥
- ভাবসন্ধান: গানটি একদিকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি এক বন্দিনী নারীর গভীর প্রেম ও আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ, অন্যদিকে নারীর স্বাধীনতা, ধর্মীয় অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার জন্য একটি শক্তিশালী আবেদন। কবি দেখিয়েছেন- ধর্মের নামে নারীর ওপর আরোপিত অমানবিক বন্দিত্ব প্রকৃত ইসলামী মানবিকতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই
'আশা-আলোক' বলতে এখানে কেবল ব্যক্তিগত মুক্তি নয়, নারীর শিক্ষা, ধর্মীয় অংশগ্রহণ, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক মুক্তির প্রত্যাশাকেও বোঝানো হয়েছে।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি একজন হেরেমের অন্তরালে আবদ্ধ নারীর কণ্ঠে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে মুক্তির আকুল আবেদন জানিয়েছেন। এখানে
'হেরেম' কেবল একটি স্থান নয়; এটি নারীর সামাজিক বন্দিত্ব, অন্ধকার ও স্বাধীনতাহীনতার প্রতীক। তাই গানটির নবীপ্রেমের পাশাপাশি নারীমুক্তির আকাঙ্ক্ষাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গানের শুরুতে হেরেমের বন্দিনী নারী কাঁদতে কাঁদতে মহানবী (সা.)-কে প্রশ্ন করছে—তাঁর এই কান্না কি নবীজীর কর্ণে পৌঁছায়? তিনি
'আখেরি নবী', 'প্রিয় আল-আরবি'; তাই তাঁর কাছেই এই অসহায় নারী ন্যায়, দয়া ও মুক্তির আশ্রয় চাইছে।
'বারেক ফিরে চাও' অর্থাৎ একবার তাঁর দিকে ফিরে তাকিয়ে এই বন্দিনীর দুর্দশা উপলব্ধি করার আকুল প্রার্থনা।
গানটির পরবর্তী অংশে নারী নিজের জীবনকে 'পিঞ্জরার পাখি'-র সঙ্গে তুলনা করেছে। পাখি যেমন খাঁচায় বন্দী থেকে মুক্ত আকাশে উড়তে পারে না, তেমনি সে অন্ধকারে আবদ্ধ জীবন কাটাচ্ছে। তার প্রাণ ছুটে যেতে চায় মদিনায়- অর্থাৎ মহানবীর সান্নিধ্য, পবিত্রতা ও মুক্তির পরিবেশে যেতে চায়। তাই সে মরণের শৃঙ্খল নয়, বরং জীবনের
'জিঞ্জির' খুলে দেওয়ার আবেদন জানায়। এখানে 'জিঞ্জির' নারীর সামাজিক ও মানসিক বন্দিত্বের প্রতীক।
গানে 'ফতেমার মেয়েদের' শব্দটি উল্লেখ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। হজরত ফাতিমা (রা.)-এর কন্যাদের- অর্থাৎ নবী পরিবারের নারীদের—স্মরণ করে কবি বোঝাতে চান যে ইসলামের প্রাথমিক যুগের নারীরা ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে সক্রিয় উপস্থিতি রেখেছিলেন। বন্দিনী নারী তাঁদের স্মরণ করে প্রশ্ন করে—তাঁদের চোখের জল কি নবীজীর কাছে পৌঁছেছে? তিনি যেন পরকালে তাঁদের কষ্টের কথা জানতে পারেন।
এরপর আসে গানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য। নারী বলে, আজানের ধ্বনি শুনেও সে মসজিদে যেতে পারে না। বাইরে ধর্মীয় আলোচনা (ওয়াজ) হচ্ছে, অথচ ঘরের ভেতরে তার প্রাণ কাঁদছে। অর্থাৎ ধর্মীয় জীবনের যে অধিকার ও আধ্যাত্মিক অংশগ্রহণ পুরুষের জন্য উন্মুক্ত, সামাজিক বিধিনিষেধের কারণে নারী তার থেকে বঞ্চিত। এখানে কবি ধর্মের মূল শিক্ষা এবং সমাজে প্রচলিত নারীবন্দিত্বের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেছেন।
'ঝুটা এই বোরখার হোক অবসান' পঙ্ক্তিতে কবি বিশেষভাবে প্রচলিত, নারীর স্বাধীনতা ও ধর্মীয় অংশগ্রহণকে বাধাগ্রস্তকারী কৃত্রিম আবরণ ও প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছেন।
'বোরখা' এখানে কেবল পোশাকের অর্থে নয়; মূলত এমন এক সামাজিক আবরণ ও বন্দিত্বের প্রতীক, যা নারীকে শিক্ষা, ইবাদত, সমাজ ও বাইরের জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। কবির কামনা- এই অন্ধকার হেরেমে যেন আশার আলো প্রবেশ করে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩)
মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ২৯৯ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৬ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪৩)। এন ৯৭৯৩। শিল্পী:
রৌশন আরা বেগম। সুর: কমল দাশগুপ্ত]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- সুরকার:
কমল দাশগুপ্ত।
- পর্যায়
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। নাত-এ-রসুল। প্রার্থনা। নারীমুক্তি
- সুরাঙ্গ: কাওয়ালি
- রাগ: মিশ্র (কাফি-জয়জয়ন্তী)
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: সা