বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম:
কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে
কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে আস্লে প্রাতে পুষ্প-চোর।
ডাকছে পাখি, 'বৌ গো জাগো' আর ঘুমায়ো না, রাত্রি ভোর॥
যুঁই-কুঁড়িরা চোখ মেলে চায় চুম্কুড়ি দেয় মৌমাছি
শাপলা-বনে চাঁদ ডুবে যায় ম্লান চোখে হায় চায় চকোর॥
ঘোম্টা ঠেলি' কয় চামেলি গোল ক'রো না গুল্-ডাকাত,
ঢুলছে নয়ন, দুলছে গলায় বেল-টগরের ছিন্ন ডোর॥
গুন্গুনিয়ে মোর আঙিনায় কোন্ সতীনের গাইছ গুন্
কার মালঞ্চে ফুল ফোটায়ে হুল ফোটালে বক্ষে মোর॥
-
ভাবসন্ধান: নজরুলের গজল সুরাঙ্গের এই গানে সুফিদর্শনের
নিগূঢ় রহস্যময়তায় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে- মনে হয় যেন
শৃঙ্গার রসে সিক্ত কোনো ঈর্ষান্বিত নারীর গান। মূলত সুফি দর্শনে পার্থিব
সংসার-মোহকে কবি নারীর প্রতীকে উপস্থাপন করেছেন। যেন সাধক পথিকের সংসারী
স্ত্রীর সতীন হলো- তাঁর পরম স্রষ্টার প্রেম মহিমা।
স্রষ্টার সাধনায় মগ্ন ঘর বিবাগী সুফি-সাধককে সংসার-যাত্রায় নানারূপ বিরূপ যাতনা
ভোগ করতে হয়। ভোগবাদী সংসার চায় পার্থিব সুখভোগে জীবন অতিবাহিত করুক সাধক। আর
সাধক ভাবেন খোদার প্রেমেরই তাঁর জীবন অতিবাহিত হোক।
তাই সারারাত ধরে খোদার প্রেম নিমগ্ন থেকে যখন- সাধক ফিরে আসেন, তখনই সংসারী
সপত্নী তাঁকে ভর্ৎসনার সূরে বলে- 'কার নিকুঞ্জে রাত কাটায়ে আস্লে
প্রাতে পুষ্প-চোর '। এই ভর্ৎসনায় নেই কঠোর
পরুষবাক্যের আঘাত, রয়েছে সংসারের অভিমানী পাখি র,
'বৌ গো জাগো' ধ্বনিতে রাত্রির শেষের প্রহর ঘোষণা। এই ঘোষণায়
রয়েছে সাধন ধ্যানে মগ্ন সাধকের ধ্যানপুষ্পের চোরের আগমন বার্তা। ঘুমন্ত
সংসারকেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে ঘুম থেকে জেগে ওঠার আহবানে।
সংসারের নানা প্রলোভনের যুঁই-কুঁড়িরা চোখ মেলে চায় ।
সাধকের লোভী মন দেখে সেখানে সংসারের লোভ লালসার মধুপায়ী মৌমাছিদের। রাত্রি সাধনা
যেন মোহনীয় চন্দ্রিমার জ্যোৎস্নার মিলিয়ে যায়। অতৃপ্ত সাধনা চাতকের মতো আশাহীন
হয়ে মিলিয়ে যায় তার সাথে। তাই হাহাকার ওঠে সাধনপুষ্পরূপী শাপলাবনে, প্রেম পিয়াসী
চাকরের চিত্তলোকে।
পার্থিব জগতের চামেলি প্রস্পুটিত হয়ে রাতের সাধন-গোলাপের সাধক-ডাকাতের সাথে
সংঘাত। তাই ভোরের চামেলী তাঁকে সহজে মেনে নিতে পারে না। রাত্রি জাগরণ এবং খোদার
প্রেমের নেশায় এই পুষ্পচোরের নয়ন দোলে, দোলে পার্থিব জগতের বেল-টগরের
মোহছিন্নতার মালা। সংসারের জগতে
এসেও তাঁর ঈশ্বর-প্রেমের রেশ চলে যায় না। সংসারের সপত্নীর অঙ্গনে গাওয়া
সাধকের সে যেন সুর মনে হয়- সাধন-সতীনের সুর। তার মনে ঈর্ষা জাগে। মনে হয় সাধক
তাঁর খোদার মালঞ্চে প্রেম-ফুল ফুটিয়ে- সংসারের সপত্নীর বক্ষে যেন হুল
ফোটাচ্ছে।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। উল্লেখ্য, সওগাত পত্রিকার 'জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৪ বঙ্গাব্দ' সংখ্যায় গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। ধারণা করা হয়, নজরুল এই গানটি রচনা করেছিলেন ১৩৩৪ বঙ্গাব্দের বৈশাখ মাসে।
এই সূত্রে বলা যায়, এটি নজরুল ইসলামের ২৭ বৎসর অতিক্রান্ত বয়সের শেষাংশে
রচিত গান।
উল্লেখ্য, পত্রিকায় গানটির পাদটীকায় লেখা ছিল- 'উর্দু গজল 'নাজ্ ভি হোতা রহে হোতি রহে বেদাদ্ ভি'-এর
সুর।
- পত্রিকা:
সওগাত। জ্যৈষ্ঠ ১৩৩৪ (মে-জুন-১৯২৭)
- গ্রন্থ:
-
বুলবুল
- দ্বিতীয় সংস্করণ [ চৈত্র ১৩৩৫ । গান ৪৩। গারা-ভৈরবী-কাহারবা]
- নজরুল-রচনাবলী, দ্বিতীয় খণ্ড [বাংলা একাডেমী, ফাল্গুন ১৪১৩। ফেব্রুয়ারি ২০০৭। বুলবুল। গান ৪৩। গারা-ভৈরবী-কাহারবা। পৃষ্ঠা: ১৮২-৮৩]
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট,
মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৩০ ৮]
- রেকর্ড:
এইচএমভি। আগষ্ট ১৯৩২ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৩৯)।
শিল্পী: মিস হরিমতী। এন. ৭০১৪।
[শ্রবণ
নমুনা]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর।
[নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, একাদশ খণ্ড (নজরুল ইনস্টিটিউট জুন ১৯৯৭)]
ষষ্ঠ গান
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধ্মসঙ্গীত। ইসলাম ধর্ম। সুফিবাদ।
সাধনা
- সুরাঙ্গ:
গজল
- রাগ: গারা-ভৈরবী
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: র্সা