বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: ব্রজ-দুলাল ঘন শ্যাম মোর হৃদে
ব্রজ-দুলাল ঘন শ্যাম
মোর হৃদে কর বিহার হে॥
নব অনুরাগের জ্বালায়ে বাতি
অঙ্গে অঙ্গে রাখি তব শেজ পাতি'
গাঁথি অশ্রু-মোতিহার হে॥
আরতি-প্রদীপ আঁখিতে জ্বালায়ে রাখি
পথ-পানে চাহি বার বার হে॥
নিবেদন করি নাথ তব চরণে
নিত্য পূজা-উপচার হে
বিরহ-গন্ধ-ধূপ বেদনা-চন্দন
পূজাঞ্জলি আঁখি-ধার হে
দেবতা এসো, খোল দ্বার হে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে শ্রীকৃষ্ণকে হৃদয়ের অন্তঃপুরে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য এক প্রেমাতুর ভক্তের নিবেদন, বিরহ, উপাসনা ও আত্মসমর্পণের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন। এখানে ভক্তের হৃদয়ই মন্দির, আর তাঁর প্রেম, অশ্রু ও বেদনাই পূজার উপকরণ।
গানের শুরুতেই ভক্ত কৃষ্ণকে ব্রজের আদরের দুলাল ঘনশ্যাম বলে সম্বোধন করে প্রার্থনা করেন—তিনি যেন তাঁর হৃদয়ে এসে চিরস্থায়ীভাবে বিহার করেন। অর্থাৎ ভক্তের একমাত্র আকাঙ্ক্ষা, তাঁর অন্তর যেন কৃষ্ণের নিত্য আবাসে পরিণত হয়।
এরপর তিনি বলেন, নব অনুরাগের প্রদীপ জ্বালিয়ে তিনি কৃষ্ণের জন্য নিজের সমগ্র সত্তাকে শয্যারূপে প্রস্তুত করেছেন। এখানে বাহ্যিক শয্যা নয়, প্রেমপূর্ণ হৃদয়ই
কৃষ্ণেরই বিশ্রামের স্থান। আবার তিনি অশ্রুকে মুক্তোর মালা করে কৃষ্ণের জন্য গেঁথেছেন। অর্থাৎ তাঁর চোখের জল দুঃখের প্রকাশমাত্র নয়; সেটিই ভক্তির অমূল্য উপহার।
গানটির পরবর্তী অংশে ভক্ত জানান যে, তিনি নিজের চোখেই আরতির প্রদীপ জ্বালিয়ে পথের দিকে চেয়ে আছেন। তাঁর দৃষ্টি সর্বদা কৃষ্ণের আগমনের প্রতীক্ষায় নিবদ্ধ। এটি সেই ভক্তের চিত্র, যিনি প্রতিটি মুহূর্তে প্রভুর দর্শনের আশায় ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করেন।
এরপর ভক্ত প্রতিদিন কৃষ্ণের চরণে নিজের হৃদয়ের সমস্ত অনুভূতি নিবেদন করেন। কিন্তু তাঁর পূজার উপচার অন্যদের মতো নয়। বিরহের গন্ধই তাঁর ধূপ, বেদনাই তাঁর চন্দন, আর অশ্রুধারাই তাঁর পুষ্পাঞ্জলি। অর্থাৎ তিনি কোনো বাহ্যিক উপকরণ দিয়ে নয়, নিজের প্রেম, দুঃখ, বিরহ ও অশ্রু দিয়েই ঈশ্বরের পূজা করেন। এই ভাবটি বৈষ্ণব ভক্তিধারার একটি গভীর তত্ত্ব—অন্তরের প্রেমই সর্বশ্রেষ্ঠ পূজাসামগ্রী।
গানের শেষ পঙ্ক্তিতে তিনি আন্তরিক আহ্বান জানান—'দেবতা এসো, খোল দ্বার হে।' এখানে দ্বার বলতে কেবল মন্দিরের দ্বার নয়; ভক্তের হৃদয়ের অন্তরাল, যেখানে তিনি
কৃষ্ণকে আহ্বান জানিয়ে মিলনের আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছেন। তাঁর বিশ্বাস, প্রভুর আগমনে বিরহের অবসান ঘটবে এবং হৃদয় পূর্ণতা লাভ করবে।
অতএব, এই গানে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি ভক্তের অন্তরঙ্গ প্রেম, বিরহের সাধনা, অশ্রুসিক্ত উপাসনা এবং সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের এক অপূর্ব কাব্যিক প্রকাশ ঘটেছে।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের
আগষ্ট (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৪) মাসে এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি গানটির প্রথম রেকর্ড
প্রকাশ করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৮ বৎসর
২ মাস।
- রেকর্ড:
এইচএমভি [আগষ্ট ১৯৩৭ (শ্রাবণ-ভাদ্র ১৩৪৪)। এন ৯৯৩০। শিল্পী: বীণাপাণি। সুর: হিমাংশু দত্ত। রাগ: গান্ধারী]
- বেতার:
- একক অনুষ্ঠান। অণিমা মুখোপাধ্যায় কলকাতা বেতার কেন্দ্র। [৪ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ (সোমবার, ১৮ ভাদ্র
১৩৪৬)] সান্ধ্য অনুষ্ঠান। ৭.৪৫। এই অনুষ্ঠানের অপর একটি গান ছিল- স্বপন যখন
ভাঙবে তোমার [তথ্য]
- সূত্র: বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ। ১৭শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৬৬৫।
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
সুধীন দাশ।
[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি, ত্রয়োদশ খণ্ড।
প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট । জ্যৈষ্ঠ ১৪০১/মে ১৯৯৪। ২১ সংখ্যক গান]
[নমুনা]
- সুরকার: হিমাংশু দত্ত
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। কৃষ্ণ। আত্মনিবেদন
- সুরাঙ্গ: ভজন