বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম: সাহারাতে ফুট্ল রে রঙিন গুলে লালা
সাহারাতে ফুট্ল রে রঙিন গুলে লালা
সেই ফুলেরি খোশ্বুতে আজ দুনিয়া মাতোয়ালা॥
সে ফুল নিয়ে কাড়াকাড়ি চাঁদ-সুরুজ গ্রহ-তারায়
ঝুঁকে প'ড়ে চুমে সে ফুল নীল গগন নিরালা॥
সেই ফুলেরি রওশনিতে আরশ কুর্সি রওশন্
সেই ফুলেরি রঙ লেগে আজ ত্রিভুবন উজালা॥
চাহে সে ফুল জ্বীন ও ইন্সান্ হুরপরী ফেরেশ্তায়
ফকির দরবেশ বাদশা চাহে করিতে গলার মালা (তারে)॥
চেনে রসিক ভ্রমর, বুলবুল সেই ফুলের ঠিকানা
কেউ বলে হযরত মোহাম্মদ (বলে) কেউ বা কমলিওয়ালা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে মরুভূমিতে প্রস্ফুটিত এক অতুলনীয় ফুলের প্রতীকে চিত্রিত করা হয়েছে, যার সৌরভ, আলো ও সৌন্দর্যে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ধন্য হয়েছে। তাঁর প্রতি সর্বজনীন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং তাঁর আদর্শের বিশ্বজনীন কল্যাণকর প্রভাবই এই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কবি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে একটি রক্তিম প্রস্ফুটিত ফুল–এর রূপকে চিত্রিত করেছেন। এই ফুল সাধারণ ফুল নয়; এটি মানবজাতির জন্য আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ রহমত, সৌন্দর্য, প্রেম, শান্তি ও হেদায়েতের প্রতীক। পুরো গানটি রূপক ও অতিশয়োক্তির অলংকারে সমৃদ্ধ একটি নাত, যেখানে নবীপ্রেম কাব্যিক ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে।
গানের শুরুতে কবি বলেন, সাহারা মরুভূমিতে এক অপূর্ব রক্তিম ফুল (গুলে লালা) ফুটেছে। এখানে সেই ফুল মহানবী (সা.)-এর প্রতীক। তাঁর আবির্ভাবের ফলে যে আধ্যাত্মিক সুবাস ও কল্যাণ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে, তাতে সমগ্র দুনিয়া মুগ্ধ ও মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে। যে মরুভূমি একসময় অজ্ঞতা ও নৈতিক শূন্যতার প্রতীক ছিল, সেখান থেকেই মানবতার জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ আলোর উৎসের উদ্ভব হয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি অতিশয়োক্তির মাধ্যমে বলেন, এই ফুলের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের প্রতি চাঁদ, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্রও আকৃষ্ট। তারা যেন নত হয়ে সেই ফুলকে চুম্বন করতে চায়। এর দ্বারা বোঝানো হয়েছে যে, মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা সমগ্র সৃষ্টিজগতের কাছে অতুলনীয়। এটি কোনো বাস্তব দৃশ্যের বর্ণনা নয়; বরং তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশের কাব্যিক রীতি।
এরপর কবি বলেন, এই ফুলের আলোয় আরশ ও কুরসি পর্যন্ত আলোকিত হয়ে উঠেছে এবং তার রঙে সমগ্র ত্রিভুবন উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা, চরিত্র ও আদর্শ কেবল পৃথিবীর মানুষের জন্য নয়; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য কল্যাণ, আলো ও রহমতের উৎস।
গানটির শেষাংশে কবি দেখান যে, জিন, মানুষ, হুর, ফেরেশতা—সবাই এই ফুলকে লাভ করতে চায়। ফকির, দরবেশ থেকে শুরু করে বাদশাহ পর্যন্ত সকলেই তাঁকে হৃদয়ের অলংকার করে রাখতে চায়। কিন্তু এই ফুলের প্রকৃত ঠিকানা কেবল রসিক ভ্রমর ও বুলবুল—অর্থাৎ প্রকৃত প্রেমিক ও অনুরাগীরাই জানে। কেউ তাঁকে হযরত মুহাম্মদ (সা.) নামে ডাকেন, আবার কেউ ভালোবেসে ‘কমলিওয়ালা’ (যিনি কমলি বা চাদর পরিধান করতেন) নামে স্মরণ করেন। এখানে কবি নবীর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও ভক্তির বহুমাত্রিক প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের
১৫ অক্টোবর (শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯), 'জুলফিকার'
নামক গীতি-গ্রন্থে
গানটি প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৩ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- জুলফিকার
- প্রথম সংস্করণ। ১৫ অক্টোবর ১৯৩২
(শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)। ৯ম গান।
পাহাড়ী-কার্ফা
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭, জুলফিকার।
৯ সংখ্যক গান। পাহাড়ী-কার্ফা। পৃষ্ঠা: ২৯৫-২৯৬।
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ১৭৫৭]
- রেকর্ড: টুইন। মে ১৯৩৪ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪১)। এফটি ৩২১৭। শিল্পী আব্বাস উদ্দীন
[নমুনা]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
সুধীন দাশ।
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি তৃতীয় খণ্ড
[নজরুল ইন্সটিটিউট প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ।
নজরুল ইন্সটিটিউট। বৈশাখ ১৪০২। এপ্রিল ১৯৯৬।)। পৃষ্ঠা
৫৬-৫৯]
[নমুনা]
- সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলামী গান। নাত-এ-রসুল
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: গ