বিষয়:
নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
তুমি যদি রাধা হতে শ্যাম
তুমি যদি রাধা হতে শ্যাম,
আমারি মতন দিবস-নিশি জপিতে শ্যাম-নাম॥
কৃষ্ণ-কলঙ্কেরি জ্বালা, মনে হ'ত
মালতীর মালা
চাহিয়া কৃষ্ণ-প্রেম জনমে জনমে আসিতে ব্রজধাম॥
কত অকরুণ তব বাঁশরির সুর
তুমি হইলে শ্রীমতী ব্রজ-কুলবতী বুঝিতে নিঠুর।
তুমি যে-কাঁদনে কাঁদায়েছ মোরে
আমি কাঁদাতাম তেমনি ক'রে
বুঝিতে, কেমন লাগে এই গুরু-গঞ্জনা
এ প্রাণ-পোড়ানি অবিরাম॥
- পাঠভেদ: পাঠভেদ পাওয়া যায় নি। তবে গ্রন্থভেদে গানটির আ-কার, ই-কার,
উদ্ধৃতি চিহ্ন ('), দাড়ি (।), কমা (,) ইত্যাদির পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
- ভাবসন্ধান: এই গানে ভক্ত হৃদয়ের গভীর বিরহ, অভিমান ও প্রেমের এক
অপূর্ব প্রকাশ ঘটেছে। এখানে প্রেমিক-ভক্ত শ্রীকৃষ্ণের প্রতি এক ধরনের মধুর
অভিযোগের সুরে নিজের অন্তরের যন্ত্রণা ব্যক্ত করেছেন।
গানের সূচনাতেই কবি এক কল্পনাশ্রয়ী তুলনীয় দুরাশায় চিত্র তুলে ধরে বলেছেন- যদি
শ্যাম নিজেই রাধার অবস্থানে থাকতেন, তবে তিনিও ভক্তের মতো দিনরাত 'শ্যাম-নাম'
জপ করতেন। রাধা যে কৃষ্ণবিরহের দহন অনুভব করছেন, তা শ্যাম নিজে অনুভব করলে তবেই
তার পক্ষে বেদনার গভীর উপলব্ধি করা সম্ভব হতো।
হয়তো কৃষ্ণ-কলঙ্কেরি জ্বালা, মনে হ'ত মালতীর মালা। কবির কাছে দুঃখ, অপবাদ বা
কষ্ট কোনো বোঝা নয়; বরং তা প্রিয়জনের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে আনন্দদায়ক হয়ে ওঠে।
কৃষ্ণের জন্য যে দুঃখ, সেটিও তাঁর কাছে অলংকারস্বরূপ।
এরপর কবি বলেন, কৃষ্ণের বাঁশরির সুর কতটা নিষ্ঠুর—কারণ তা হৃদয়ে বিরহের আগুন
জ্বালায়। কিন্তু যদি শ্যাম নিজেই রাধার রূপ ধারণ করে ব্রজের কুলবতী হতেন, তবে
তিনি বুঝতে পারতেন এই সুরের বেদনাময় প্রভাব। এখানে প্রেমের মধ্যে লুকানো আক্ষেপ
ও অভিমান অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
শেষাংশে ভক্ত এক গভীর আবেগে বলেন—যে কান্নায় কৃষ্ণ তাঁকে কাঁদিয়েছেন, সুযোগ
পেলে তিনিও কৃষ্ণকে তেমনি কাঁদাতেন। মূলত এই বিরহযন্ত্রণা কতটা তীব্র ও অসহনীয়,
তা বুঝনোর চেষ্টা করা হয়েছে। রাধার গুরু-গঞ্জনা ও 'প্রাণ-পোড়ানি অবিরাম' বেদনার
মধ্যে সরব হয়ে উঠেছে- এক অন্তহীন দহন ও মানসিক বেদনার্ত চিত্র ।
সার্বিকভাবে, এই গানটি ভক্তি ও প্রেমের এমন এক অবস্থাকে তুলে ধরে, যেখানে
বিরহ, অভিমান ও ভালোবাসা একাকার হয়ে গেছে। এখানে দুঃখই প্রেমের গভীরতা প্রকাশের
প্রধান মাধ্যম, এবং সেই দুঃখের মধ্য দিয়েই ভক্ত তাঁর প্রিয়তম শ্যামের সঙ্গে
একাত্মতা অনুভব করেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা
যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে (আশ্বিন- ১৩৪৬) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি
গানটির প্রথম রেকর্ড প্রকাশ করে। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৪ মাস।
- খ. প্রকাশ ও গ্রন্থভুক্তি:
- গ্রন্থ:
- অগ্রন্থিত গান
- নজরুল-রচনাবলী দশম খণ্ড[নজরুল জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। বাংলা
একাডেমী, জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬। মে ২০০৯। ৩৩৪ সংখ্যক গান পৃষ্ঠা ৩৭৪]
- একশো গানের নজরুল স্বরলিপি
- চতুর্থ খণ্ড। সংশোধিত সংস্করণ, পুনর্মুদ্রণ [হরফ প্রকাশনী।
১৬ই পৌষ ১৪০৬। ১লা জানুয়ারী ২০০০। ২১ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা
২৭০-২৭২]
- নজরুল গীতি, অখণ্ড
- প্রথম সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ
প্রকাশনী। ৬ আশ্বিন ১৩৮৫। ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭৮]
- দ্বিতীয় সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ
প্রকাশনী। ১ শ্রাবণ ১৩৮৮। ১৭ জুলাই ১৯৮১]
- তৃতীয় সংস্করণ [ব্রহ্মমোহন ঠাকুর সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী।
৮ মাঘ ১৪১০। ২৩ জানুয়ারি ২০০৪। ভক্তিগীতি। ১৪৬৭ সংখ্যক গান।
পৃষ্ঠা ৩৮৩]
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [ রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল
ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮।
৬৬। পৃষ্ঠা ২১]
- নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি
- তৃতীয় খণ্ড।প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ [কবি নজরুল
ইন্সটিটিউট। বৈশাখ ১৪০২। এপ্রিল ১৯৯৬। ১৬ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা
৮০-৮২]
- নজরুল স্বরলিপি
- ত্রয়োদশ খণ্ড। প্রথম প্রকাশ [শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ১৪ মাঘ ১৪১১। ২৮ জানুয়ারি ২০০৫। >৯৯
সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ১৬৭-১৬৮]
- শ্রেষ্ঠ নজরুল স্বরলিপি
- আব্দুল আযীয আল-আমান সম্পাদিত [হরফ প্রকাশনী।
Deluxe Edition : July
2011 ২৩৮ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ৬০৩-৬০৫]
- সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি
- পঞ্চম খণ্ড। প্রথম প্রকাশ [ কাজী সব্যসাচী, কল্যাণী কাজী
সম্পাদিত। সাহিত্যম। ৯৩ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ১৭৯-১৮১]
- রেকর্ড: এইচএমভি। অক্টোবর ১৯৩৯ (আশ্বিন- ১৩৪৬)। এন ১৭৩৬৩। শিল্পী:
যূথিকা রায়।
[শ্রবণ নমুনা]
[তথ্যসূত্র: নজরুল সঙ্গীত নির্দেশিকা , ব্রহ্মমোহন ঠাকুর (নজরুল
ইন্সটিটিউট, ঢাকা। প্রথম সংস্করণ। ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪১৬। ২৫ মে ২০০৯)। ১২৩১ সংখ্যক
গান। পৃষ্ঠা ৩৩৭] নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, তৃতীয় খণ্ড(নজরুল ইন্সটিটিউট)। পৃষ্ঠা
৮০]
- গ. সঙ্গীত বিষয়ক তথ্যাবলী:
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি
-
সুধীন দাশ
।
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি তৃতীয়
খণ্ড। প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ
[নজরুল ইন্সটিটিউট। বৈশাখ ১৪০২। এপ্রিল ১৯৯৬। পৃষ্ঠা ৮০-৮২]
[নমুনা]
- শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। [নজরুল স্বরলিপি, ত্রয়োদশ
খণ্ড। হরফ প্রকাশনী]
- কাজী অনিরুদ্ধ। [সুনির্বাচিত নজরুল গীতির স্বরলিপি,
পঞ্চম খণ্ড। সাহিত্যম্
- নিতাই ঘটক। [শ্রেষ্ঠ নজরুল স্বরলিপি, হরফ প্রকাশনী ।
Deluxe Edition]
- অনির্দিষ্ট (কাজী অনিরুদ্ধ, নিতাই ঘটক)। [একশো গানের নজরুল
স্বরলিপি, চতুর্থ খণ্ড। হরফ প্রকাশনী]
- সুরকার:
কাজী নজরুল ইসলাম। [ নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, তৃতীয় খণ্ড(কবি নজরুল ইন্সটিটিউট)। পৃষ্ঠা ৮০]
শিল্পী: কুমারী যূথিকা রায়। নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি, তৃতীয়
খণ্ড(কবি নজরুল ইন্সটিটিউট)। পৃষ্ঠা ৮০]
- সুরান্তর: দু'টি গ্রন্থে, অন্তর্ভুক্ত গানটির সুর ও বাণী
বিন্যাসে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
- সুধীন দাশ (নজরুল সঙ্গীত স্বরলিপি, তৃতীয় খণ্ড, কবি নজরুল
ইন্সটিটিউট)। গানটি চতুর্থ মাত্রা থেকে শুরু। গানের প্রথম শব্দ গ্রহণ
করা হয়েছে 'তুমি'র 'তু' থেকে।
- নিতাই ঘটক (শ্রেষ্ঠ নজরুল স্বরলিপি, হরফ প্রকাশনী)। গানটি
সপ্তম মাত্রা থেকে শুরু। গানের প্রথম শব্দ গ্রহণ করা হয়েছে 'যদি'র 'য'
থেকে।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ:
ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণবসঙ্গীত। রাধা। অভিমান
- সুরাঙ্গ: ভজন।
- রাগ: গানটিতে রাগের কোনো উল্লেখ নেই।
- তাল:
কাহারবা
- গ্রহস্বর: ধা।
[নজরুল-সংগীত সংগ্রহ (রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট)।
পৃষ্ঠা ২১]