বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: আহ্মদের ঐ মিমের পর্দা উঠিয়ে দেখ্ মন
আহ্মদের ঐ মিমের পর্দা উঠিয়ে দেখ্ মন।
(আহা) আহাদ সেথা বিরাজ করেন হেরে গুণীজন॥
যে চিন্তে পারে রয় না ঘরে হয় সে উদাসী,
সে সকল ত্যজে ভজে শুধু নবীজীর চরণ॥
ঐ রূপ দেখে পাগল হ’ল মনসুর হল্লাজ,
সে ‘আনল্ হক’ 'আনল্ হক্' ব’লে ত্যজিল জীবন॥
তুই খোদ্কে যদি চিন্তে পারিস্ চিন্বি খোদাকে,
তুই দেখ্রে তাই তোরই চোখে সেই নূরী রওশন॥
- ভাবসন্ধান: এই গানের ভিতর দিয়ে কবি সুফি মতাদর্শের আলোকে আল্লাহর
সান্নিধ্য বা দর্শন পাওয়ার দুটি ইঙ্গিত দিয়েছেন। এর একটি হলো- ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহম্মদ (সাঃ)-কে
মুর্শিদের স্থানে বসিয়ে, তাঁর ধ্যানের মধ্য দিয়ে আল্লাহর দর্শন লাভ করা।
দ্বিতীয় পথ আত্মদর্শনের পথ ধরে- আল্লাহকে দর্শন করা সম্ভব।
ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক হজরত মুহম্মদ (সাঃ)-এর অপর নাম আহ্মদ।
এই নামের অর্থ হলো- সর্বাপেক্ষা প্রশংসিত ব্যক্তি। আবার আরবী বর্ণমালায় লিখিত
এই নামের মিম বর্ণ বাদ দিলে হয়- আহাদ। এর অর্থ অদ্বিতীয় সত্তা। অর্থাৎ আল্লাহ।
এই গানে আহ্মদ নামের ভিতরেই রয়েছে এক এবং অদ্বিতীয় আল্লাহের মহিমা। যেন এই নামের মাঝেই মিমের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে আছেন আল্লাহ।যিনি নবিজির স্বরূপ বুঝতে পারেন, তিনি আল্লাহর পথে গৃহত্যগী উদাসী হয়ে যান, তিনি সকল
কিছু ত্যাগ করে মুরশিদরূপী নবির কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। এই সমর্পণের
ভিতরেই রয়েছে আল্লাহকে পাওয়ার পথ।
স্রষ্টার রূপের দর্শন পেয়েছিলেন সুফি সাধক
মনসুর আল-হাল্লাজ। তিনি বাহ্যজ্ঞানহীন হয়ে ধ্যনের ভিতর দিয়ে আল্লার অংশভাগী হয়েছিলেন।
তিনি নিজের মধ্যেই আল্লাহর দর্শন পেয়েছিলেন। ধ্যানের গভীর স্তর থেকে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন 'আনাল হক' (আমিই সত্য)। মূলত পরম সত্যের অধিকারী
একমাত্র আল্লাহ। কোনো ব্যক্তি যখন নিজেকে 'আনাল হক' নামে পরিচয় দেন- তখন
তিনি
প্রথাগত ইসলামি ধর্মদর্শনে হয়ে যান শিরকের অপরাধে অপরাধী। কারণ শিরক হলো আল্লাহ ব্যতীত
নিজেকে বা অন্য কাউকে উপাস্য হিসেবে নির্ধারিত করা বা তার উপাসনা করা। তৎকালীন
শরিয়ত পন্থীরা তার 'আনাল হক' উক্তির যথার্থতা বুঝতে না পেরে- তাঁকে
মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।
এই গানের শেষের দুটি পঙ্ক্তিতে কবি সুফিবাদী দর্শনের পথে আত্মদর্শনের মধ্য
আল্লাহকে চেনার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। এই মতে মানব দেহে অবস্থিত রুহকে (পরমাত্মা)
চিনতে পারলে, স্রষ্টাকে চেনা যায়। এখানে খোদ্ হলো- নিজের আত্মা অর্থাৎ স্বয়ং।
তাই যিনি খোদ্কে চিনতে পারেন, তিনিই খোদাকে চিনতে পারবেন। যখন কেউ নিজের
চোখে নিজেকে (পরমাত্মাকে) দেখার সৌভাগ্য লাভ করেন, তখন তিনি নিজেই আল্লার
জ্যোতির্ময় রূপের ঔজ্জ্বল্য দেখতে পাবেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের মে (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ্
১৩৩৯) মাসে, এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। এই
সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩২ বৎসর ১১ মাস।
- গ্রন্থ:
-
জুলফিকার
- প্রথম সংস্করণ [১৫ অক্টোবর ১৯৩২
(শনিবার ২৯ আশ্বিন ১৩৩৯)। পিলু-খাম্বাজ-সাদ্রা] ।
- নজরুল রচনাবলী, জন্মশতবর্ষ সংস্করণ। চতুর্থ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৪, মে ২০০৭, জুলফিকার।
১৫ সংখ্যক গান। পিলু খাম্বাজ-সাদ্রা। পৃষ্ঠা: ৩০০]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, [নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি ২০১২। ৯১০ সংখ্যক গান। রাগ: পিলু-খাম্বাজ, তাল: ঝাঁপতাল। পৃষ্ঠা: ২৮০-২৮১]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [মে ১৯৩২ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ্ ১৩৩৯)]। এন ৪১৯৮। শিল্পী: ফক্রে আলম
কাওয়ালী
- সঙ্গীতবিষয়ক তথ্যাবলি:
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
-
আহসান মুর্শেদ[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি,
তেত্রিশতম খণ্ড,
(নজরুল ইন্সটিটিউট, আষাঢ় ১৪১৭। জুন ২০১০)। ২ সংখ্যক গান।
রেকর্ডে ফক্রে আলম কাওয়াল-এর গাওয়া সুরানুসারে
স্বরলিপি করা হয়েছে। পৃষ্ঠা: ৪-৮।]
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মদর্শন। ইসলাম। সুফিদর্শন। আল্লাহর দর্শন
- সুরাঙ্গ: রাগাশ্রয়ী, সাদ্রা।
- রাগ: পিলু-খাম্বাজ
- তাল: ঝাঁপতাল
- গ্রহস্বর: রা