ভাষাংশ | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর | রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনাসংগ্রহের সূচি


কড়ি ও কোমল
 

অক্ষমতা | জাগিবার চেষ্টা | কবির অহংকার | বিজনে | সিন্ধুতীরে | সত্য | আত্মাভিমান | আত্ম-অপমান | ক্ষুদ্র আমি | প্রার্থনা | বাসনার ফাঁদ


 

          অক্ষমতা
এ যেন রে অভিশপ্ত প্রেতের পিপাসা —
সলিল রয়েছে প'ড়ে, শুধু দেহ নাই।
এ কেবল হৃদয়ের দুর্বল দুরাশা
সাধের বস্তুর মাঝে করে চাই-চাই।
দুটি চরণেতে বেঁধে ফুলের শৃঙ্খল
কেবল পথের পানে চেয়ে বসে থাকা!
মানবজীবন যেন সকলি নিষ্ফল —
বিশ্ব যেন চিত্রপট, আমি যেন আঁকা !
চিরদিন বুভুক্ষিত প্রাণহুতাশন
আমারে করিছে ছাই প্রতি পলে পলে,
মহত্ত্বের আশা শুধু ভারের মতন
আমারে ডুবায়ে দেয় জড়ত্বের তলে।
কোথা সংসারের কাজে জাগ্রত হৃদয়!
কোথা রে সাহস মোর অস্থিমজ্জাময় !
 

               জাগিবার চেষ্টা
মা কেহ কি আছ মোর, কাছে এসো তবে,
পাশে বসে স্নেহ ক'রে জাগাও আমায়।
স্বপ্নের সমাধি-মাঝে বাঁচিয়া কী হবে,
যুঝিতেছি জাগিবারে — আঁখি রুদ্ধ হায়,
ডেকো না ডেকো না মোরে ক্ষুদ্রতার মাঝে,
স্নেহময় আলস্যেতে রেখো না বাঁধিয়া,
আশীর্বাদ করে মোরে পাঠাও গো কাজে —
পিছনে ডেকো না আর কাতরে কাঁদিয়া।
মোর বলে কাহারেও দেব না কি বল!
মোর প্রাণে পাবে না কি কেহ নবপ্রাণ
করুণা কি শুধু ফেলে নয়নের জল,
প্রেম কি ঘরের কোণে গাহে শুধু গান!
তবেই ঘুচিবে মোর জীবনের লাজ
যদি মা করিতে পারি কারো কোনো কাজ।

           কবির অহংকার
গান গাহি বলে কেন অহংকার করা !
শুধু গাহি বলে কেন কাঁদি না শরমে !
খাঁচার পাখির মতো গান গেয়ে মরা,
এই কি, মা, আদি অন্ত মানবজনমে!
সুখ নাই, সুখ নাই, শুধু মর্মব্যথা —
মরীচিকা-পানে শুধু মরি পিপাসায়।
কে দেখালে প্রলোভন , শূন্য অমরতা —
প্রাণে ম'রে গানে কি রে বেঁচে থাকা যায় !
কে আছ মলিন হেথা, কে আছ দুর্বল,
মোরে তোমাদের মাঝে করো গো আহ্বান —
বারেক একত্রে বসে ফেলি অশ্রুজল,
দূর করি হীন গর্ব, শূন্য অভিমান
তার পরে একসাথে এস কাজ করি
কেবলি বিলাপগান দূরে পরিহরি॥

                বিজনে
আমারে ডেকো না আজি, এ নহে সময় —
একাকী রয়েছি হেথা গভীর বিজন,
রুধিয়া রেখেছি আমি অশান্ত হৃদয়,
দুরন্ত হৃদয় মোর করিব শাসন।
মানবের মাঝে গেলে এ যে ছাড়া পায়,
সহস্রের কোলাহলে হয় পথহারা,
লুব্ধ মুষ্টি যাহা পায় আঁকড়িতে চায়,
চিরদিন চিররাত্রি কেঁদে কেঁদে সারা।
ভর্ৎসনা করিব তারে বিজনে বিরলে,
একটুকু ঘুমাক সে কাঁদিয়া কাঁদিয়া,
শ্যামল বিপুল কোলে আকাশ-অঞ্চলে
প্রকৃতি জননী তারে রাখুন বাঁধিয়া।
শান্ত স্নেহকোলে বসে শিখুক সে স্নেহ,
আমারে আজিকে তোরা ডাকিস নে কেহ।

                 সিন্ধুতীরে
হেথা নাই ক্ষুদ্র কথা, তুচ্ছ কানাকানি,
ধ্বনিত হতেছে চিরদিবসের বাণী।
চিরদিবসের রবি ওঠে, অস্ত যায়,
চিরদিবসের কবি গাহিছে হেথায়।
ধরণীর চারি দিকে সীমাশূন্য গানে
সিন্ধু শত তটিনীরে করিছে আহ্বান —
হেথায় দেখিলে চেয়ে আপনার পানে
দুই চোখে জল আসে, কেঁদে ওঠে প্রাণ।
শত যুগ হেথা বসে মুখপানে চায়,
বিশাল আকাশে পাই হৃদয়ের সাড়া।
তীব্র বক্র ক্ষুদ্র হাসি পায় যদি ছাড়া
রবির কিরণে এসে মরে সে লজ্জায়।
সবারে আনিতে বুকে বুক বেড়ে যায়,
সবারে করিতে ক্ষমা আপনারে ছাড়া।

                  সত্য
                    
ভয়ে ভয়ে ভ্রমিতেছি মানবের মাঝে
হৃদয়ের আলোটুকু নিবে গেছে ব'লে!
কে কী বলে তাই শুনে মরিতেছি লাজে,
কী হয় কী হয় ভেবে ভয়ে প্রাণ দোলে !
'আলো' 'আলো' খুঁজে মরি পরের নয়নে,
'আলো' ‘আলো' খুঁজে খুঁজে কাঁদি পথে পথে,
অবশেষে শুয়ে পড়ি ধূলির শয়নে —
ভয় হয় এক পদ অগ্রসর হতে !
বজ্রের আলোক দিয়ে ভাঙো অন্ধকার,
হৃদি যদি ভেঙে যায় সেও তবু ভালো।
যে গৃহে জানালা নাই সে তো কারাগার —
ভেঙে ফেলো , আসিবেক স্বরগের আলো।
হায় হায় কোথা সেই অখিলের জ্যোতি !
চলিব সরল পথে অশঙ্কিতগতি !

                 
জ্বালায়ে আঁধার শূন্যে কোটি রবিশশী
দাঁড়ায়ে রয়েছ একা অসীমসুন্দর।
সুগভীর শান্ত নেত্র রয়েছে বিকশি,
চিরস্থির শুভ্র হাসি, প্রসন্ন অধর।
আনন্দে আঁধার মরে চরণ পরশি,
লাজ ভয় লাজে ভয়ে মিলাইয়া যায় —
আপন মহিমা হেরি আপনি হরষি
চরাচর শির তুলি তোমাপানে চায়।
আমার হৃদয়দীপ আঁধার হেথায়,
ধূলি হতে তুলি এরে দাও জ্বালাইয়া —
ওই ধ্রুবতারাখানি রেখেছ যেথায়
সেই গগনের প্রান্তে রাখো ঝুলাইয়া।
চিরদিন জেগে রবে নিবিবে না আর,
চিরদিন দেখাইবে আঁধারের পার।

           
আত্মাভিমান
আপনি কণ্টক আমি, আপনি জর্জর।
আপনার মাঝে আমি শুধু ব্যথা পাই।
সকলের কাছে কেন যাচি গো নির্ভর —
গৃহ নাই, গৃহ নাই, মোর গৃহ নাই !
অতি তীক্ষ্ম অতি ক্ষুদ্র আত্ম-অভিমান
সহিতে পারে না হায় তিল অসম্মান।
আগেভাগে সকলের পায়ে ফুটে যায়
ক্ষুদ্র ব'লে পাছে কেহ জানিতে না পায়।
বরঞ্চ আঁধারে রব ধুলায় মলিন,
চাহি না চাহি না এই দীন অহংকার —
আপন দারিদ্র্যে আমি রহিব বিলীন,
বেড়াব না চেয়ে চেয়ে প্রসাদ সবার।
আপনার মাঝে যদি শান্তি পায় মন
বিনীত ধুলার শয্যা সুখের শয়ন।

           আত্ম-অপমান
মোছো তবে অশ্রুজল, চাও হাসিমুখে
বিচিত্র এ জগতের সকলের পানে।
মানে আর অপমানে সুখে আর দুখে
নিখিলের ডেকে লও প্রসন্ন পরানে।
কেহ ভালোবাসে কেহ নাহি ভালোবাসে,
কেহ দূরে যায় কেহ কাছে চলে আসে —
আপনার মাঝে গৃহ পেতে চাও যদি
আপনারে ভুলে তবে থাকো নিরবধি।
ধনীর সন্তান আমি, নহি গো ভিখারি,
হৃদয়ে লুকানো আছে প্রেমের ভাণ্ডার —
আমি ইচ্ছা করি যদি বিলাইতে পারি
গভীর সুখের উৎস হৃদয় আমার।
দুয়ারে দুয়ারে ফিরি মাগি অন্নপান
কেন আমি করি তবে আত্ম-অপমান!

              ক্ষুদ্র আমি
বুঝেছি বুঝেছি, সখা, কেন হাহাকার,
আপনার
'পরে মোর কেন সদা রোষ।
বুঝেছি বিফল কেন জীবন আমার —
আমি আছি, তুমি নাই, তাই অসন্তোষ।
সকল কাজের মাঝে আমারেই হেরি —
ক্ষুদ্র আমি জেগে আছে ক্ষুধা লয়ে তার,
শী
র্ণবাহু-আলিঙ্গনে আমারেই ঘেরি
করিছে আমার হায় অস্থিচর্ম সার।
কোথা নাথ, কোথা তব সুন্দর বদন —
কোথায় তোমার নাথ, বিশ্ব-ঘেরা হাসি।
আমারে কাড়িয়া লও, করো গো গোপন —
আমারে তোমারে মাঝে করো গো উদাসী।
ক্ষুদ্র আমি করিতেছে বড়ো অহংকার,
ভাঙো নাথ, ভাঙো নাথ, অভিমান তার॥

                  
প্রার্থনা
তুমি কাছে নাই ব'লে হেরো, সখা, তাই
'আমি বড়ো' 'আমি বড়ো' করিছে সবাই।
সকলেই উঁচু হয়ে দাঁড়ায়ে সমুখে
বলিতেছে, 'এ জগতে আর কিছু নাই।'
নাথ, তুমি একবার এসো হাসিমুখে
এরা সবে ম্লান হয়ে লুকাক লজ্জায় —
সুখদুঃখ টুটে যাক তব মহাসুখে,
যাক আলো-অন্ধকার তোমার প্রভায়।
নহিলে ডুবেছি আমি, মরেছি হেথায়,
নহিলে ঘুচে না আর মর্মের ক্রন্দন —
শুষ্ক ধূলি তুলি শুধু সুধাপিপাসায়,
প্রেম ব'লে পরিয়াছি মরণবন্ধন।
কভু পড়ি কভু উঠি, হাসি আর কাঁদি —
খেলাঘর ভেঙে প'ড়ে রচিবে সমাধি।

 

            বাসনার ফাঁদ
যারে চাই তার কাছে আমি দিই ধরা,
সে আমার না হইতে আমি হই তার।
পেয়েছি বলিয়ে মিছে অভিমান করা,
অন্যেরে বাঁধিতে গিয়ে বন্ধন আমার।
নিরখিয়া দ্বারমুক্ত সাধের ভাণ্ডার
দুই হাতে লুটে নিই রত্ন ভূরি ভূরি —
নিয়ে যাব মনে করি, ভারে চলা ভার,
চোরা দ্রব্য বোঝা হয়ে চোরে করে চুরি।
চিরদিন ধরণীর কাছে ঋণ চাই,
পথের সম্বল ব'লে জমাইয়া রাখি,
আপনারে বাঁধা রাখি সেটা ভুলে যাই —
পাথেয় লইয়া শেষে কারাগারে থাকি।
বাসনার বোঝা নিয়ে ডোবে-ডোবে তরী —
ফেলিতে সরে না মন, উপায় কী করি!