লতিফা
বানান বিশ্লেষণ : ল্+অ+ত্+ই+ফ্+আ
উচ্চারণ : lo.t̪i.fa (লো.তি.ফা)
শব্দ-উৎস : আরবি লতিফা> বাংলা লতিফা।
পদ : বিশেষ্য
অর্থ : সুফি দর্শনে একটি পারিভাষিক শব্দ। সুফি মতে, মানুষের অন্তরে অবস্থিত কতিপয় নির্দিষ্ট স্থান। ধ্যানরত অবস্থায় আল্লাহর জ্যোতি এই সব স্থানে অবতীর্ণ হয়। অবস্থানের বিচারে মানবদেহে ১০টি লতিফা রয়েছে। এগুলো হলো-
- কলব লতিফা : মানুষের বাম স্তনের দুই আঙুল নিচে এর অবস্থান। এই অবস্থানে হরিৎবর্ণ রূপে আল্লাহর জ্যোতি অবতীর্ণ হয়। উত্তম কাজের দ্বারা এই লতিফার ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি পায়। পূর্ণ উজ্জ্বলতায় এই লতিফা শ্বেতবিন্দুতে পরিণত হয়। আর পাপ নিমজ্জিত হলে- কলব কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করে। আল্লার জিকির এবং সুরা ফাতিহা পাঠ এবং তার অনুসরণে কলব সংশোধিত হয়।
- রুহ লতিফা : মানুষের ডান স্তনের দুই আঙুল নিচে এর অবস্থান। এই অবস্থানে লোহিতবর্ণ রূপে আল্লাহর জ্যোতি অবতীর্ণ হয়। এই লতিফাকে মানুষের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সৎকর্মের দ্বারা রুহ শুভ্রতা লাভ করে। অসৎকাজের কারণে রুহ জীবিত দেহেই মৃত্যুবরণ করে। ধ্যানের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে।
- শিররুন লতিফা : গোপন হৃদয় হিসেবে এই লতিফা পরিচিত। এর অবস্থান বুকের মাঝ বরাবর একটু নিচে। এই লতিফাতে আল্লার শুভ্র জ্যোতি অবতীর্ণ হয়। এই লতিফাকে যিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন, তিনি মুসলে মাশরাফ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এই লতিফার দ্বারা মানুষ শুভ ও অশুভ অবস্থা সম্পর্কে জানতে পারেন।
- খাফি লতিফা : এটি অপর একটি গোপন লতিফা। এই লতিফাটি রুহ লতিফার নচে অবস্থিত। অনেকের মতে এর অবস্থান কপালের মধ্যভাগে। এই লতিফায় আল্লার কৃষ্ণজ্যোতি অবস্থান করে। কর্ম ও চিন্তা অনুযায়ী, সাধকের মনে আনন্দ-বেদনার জন্ম হয়। এবং মানুষ বুকের ভিতরে এই আনন্দ-বেদনা অনুভব করেন।
- আকফা লতিফা : এটি অপর একটি গোপন লতিফা। মানুষের বুকের নিচের দিকে এর অবস্থান। অনেকের মতে এর অবস্থান শিরোদেশে। এই লতিফায় আল্লাহর সবুজ জ্যোতি অবতীর্ণ হয়।এই লতিফাকে মানুষের মন ও দেহের রাজা বলা হয়। মানুষের ভাবনা এই লতিফায় এসে বাস্তবায়নের পথ সুগম করে দেয়। এই লতিফা থেকে মানুষ বাকাবিল্লাহ-এর দিকে অগ্রসর হতে পারে।
- নাফস লতিফা : এই লতিফার সুনির্দিষ্ট স্থান নেই। সাধারণভাবে সুফি সাধকরা মনে করেন, নাফস থাকে দুই চোখ বা দই ভ্রূরুর মাঝখানে। কখনো এর অবস্থান হয় নাভি। নাফস মরীচিকার মতো দেখা না দেখায় অবস্থায় নানা রূপে, নানা রঙে বিরাজ করে। সাধক একে সদা চঞ্চল বিজলির মতো অনুভব করেন। এর স্বাভাবিক বর্ণ সাদা। শয়তান এই লতিফায় প্রবেশ করে, মানুষকে নানা রূপ কুমন্ত্রণা দেয়। তাই নাফসের সাধনা বা নির্দেশনা সতর্কতার সাথে গ্রহণ করতে হয়।
- আব লতিফা : মানবদেহের মৌলিক উপদানসমূহ পানির ভূমিকা অসামান্য। তাই জলরূপে এই লতিফার দেহের সমগ্র সকল স্থানে অবস্থান করে। দেহের বাইরে যে পানি তা বিশ্বজগতের অংশ। আর দেহের পানি দেহের অংশ। সাধনার দ্বারা অন্তর-বাহিরকে একীভূত দশা ভাবতে হয়। যার ভিতর দিয়ে মানুষ সর্বব্যাপী জলের মতো, স্রষ্টাকে অনুভব করতে পারেন।
- আতস লতিফা : শরীরে উষ্ণতা ছড়ায় আছে শরীরে আগুন। স্রষ্টার অগ্নিরূপকে দেহাগ্নির সাথে মিলনের সাধনা হয় এই লতিফা। ই লতিফার স্থানও দেহের সর্বত্র।
- খাক লতিফা : মানুষের দেহে রয়েছে মাটির উপাদান। তাই সুফি সাধকরা মনে করেন দেহ হলো মাটি দিয়ে তৈরি। তাই খাক লতিফার স্থান দেহের সর্বত্র।
- বাদ লতিফা : মানুষের দেহের ভিতরে অবস্থিত ফাঁকা জায়গাকে বলা হয় বাদ। এই সকল স্থানে থাকে বাতাস। দেহস্থ বায়ু বা ফাঁকা স্থান হলি এই লতিফার স্থান।
মানুষের সাথে সকল সময় থাকে আব, আতস, খাক ও বাতাস। মূলত পঞ্চভূতের চারটি দেহের চালিকা শক্তিকে বা ভিত্তি করে এই চারটি লতিফা বিরাজ করে। বাকি ছয়টি লতিফা (কাল্ব, রুহু, শিররুন, খাফি, আখ্ফা, নাফস) হলো সাধনার। তাই সাধকরা ছাড়া এই লতিফার সাধনা করতে পারেন না।