মণিপুরী নৃত্য
ভারতীয় চিরায়ত নৃত্যশেলীর একটি অন্যতম ধারা।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভারত-মায়ানমার সীমান্তে অবস্থিত মণিপুর রাজ্যে বিকশিত একটি
স্বতন্ত্র
নৃত্যশৈলী। এই নাচ মণিপুরে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে একই সাথে
ধর্মাচরণের অঙ্গ এবং সামাজিক ঐতিহ্য হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। অন্যান্য
জাতিসত্ত্বার ঐতিহ্যগত সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উপাদানগুলো যতটা গুরুত্বপূর্ণ,
মণিপুরীদের কাছে তাঁদের গীত-বাদ্য-নৃত্য তার চেয়ে অনেক বেশি গৌরময় এবং মহিমান্বিত।
এই কারণে মণিপুরের জাতীয় উৎসবের প্রাণভোমরা হলো- মণিপুরী গীত-বাদ্য-নৃত্য।
নৃতত্ত্বিক
বৈশিষ্ট্যের বিচারে এরা মিশ্র মোঙ্গলীয়। ভারতের
নৃতাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রে
অনুমান করা হয়, প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার বছর আগে ভারতবর্ষে
মোঙ্গলীয় জনগোষ্ঠী প্রবেশ করেছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দিয়ে। এরা প্রথমে পূর্ব
ও উত্তর ভারতের পাহাড়ী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। বিশেষ করে চীন-ভারতের সীমান্তবর্তী
তিব্বত, ভুটান এবং হিমালয়ের ভারতবর্ষে অভিমুখী অঞ্চল নেপাল, সিকিম এবং তৎসলগ্ন
অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। উত্তর-পূর্ব ভারতের
এই অঞ্চলে মোঙ্গোলীয়রা প্রবেশ করেছিল
মায়ানমারের চীন প্রদেশের চীন পাহাড়ের বন্ধুর পথ পেরিয়ে। স্থানীয়
প্রোটো-অস্ট্রালয়েড -দের সাথে সংমিশ্রণও ঘটেছিল। বাঙলি জাতিগোষ্ঠীর সাথে এদের
সংমিশ্রণ ঘটেছে পূর্ব-ভারতের পাহাড়ী মোঙ্গলয়েডদের সাথে। পরে এই
নৃতাত্ত্বিক ধারার সাথে মিশেছিল ভারতীয়-আর্য ভাষাভাষীদের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার সাথে।
ভাষার বিচারে বর্গীয়করণের বিচারে মণিপুরী ভাষা, সিনো-তিব্বতীয় ভাষার তিব্বত-বর্মীয়
শাখার সদ্স্য। স্থানীয় অধিভাষীর এই ভাষা মৈতেই।
মণিপুরী নাচের বিকাশ
মণিপুরী নাচের উৎপত্তি এবং এর বিকাশ সম্পর্কে প্রমাণসাপেক্ষ্য ইতিহাস বেশি পাওয়া
যায় না। প্রাগৈতিহাসিক যুগে- মণিপুরীরে লোক-সঙ্গীত বিকাশ ঘটেছিল
সনামহি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। এই ধর্মের প্রধান
দেবতা সনামহি ছিলেন গৃহদেবতা আর বনদেবতা ছিলেন উমংগলাই। এছাড়া ছিল পাখাংবা (দেবতা
এবং প্রথম রাজা) এবং অন্যান্য দেবদেবী। মণিপুরে এসকল দেবদেবীর পূজা-অর্চনার সাথে
পরিবেশিত হতো লোকগান এবং লোকনৃত্য। ফলে মণিপুরের প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই গীত ও
নৃত্য হয়ে উঠেছিল ধর্মাচরণের আবশ্যকীয় উপকরণ। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও এই সময়ের মণিপুরী
নাচের বিষয় হিসেবে ছিল সামাজিক অনুষ্ঠানভিত্তিক এবং লোকসঙ্গীত ও লোকনৃত্য।
এই সময় উৎপত্তি ঘটেছিল
লাইহারাউবা নৃত্যের আদি রূপ।
লাই শব্দের অর্থ দেবতা এবং হারাউবা শব্দের অর্থ হলো- আনন্দদায়াক। মণিপুরবাসীরা
দেবতার উদ্দেশ্যে যে আনন্দদায়ক নৃত্য পরিবেশন করতেন, তাই কালক্রমে
লাইহারাউবা নৃত্যে পরিণত হয়েছিল। এই সময় মণিপুরের প্রতিটি
গ্রামে এই লাইহারাঊবা উৎসব হতো। তবে গ্রাম ভেদে প্রাধান্য পেতো নিজস্ব বনদেবতা। এর
নাম ছিল উমংলাই।
মণিপুরবাসীরা ভারতীয় আর্য ভাষাভাষীদের সংস্পর্শে এসেছিল আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০ অব্দের
দিকে। মহাভারতের আদিপর্ব এবং অশ্বমেধ পর্ব থেকে জানা যায়, তৃতীয় পাণ্ডব
অর্জুন ঘটনাক্রমে মণিপুরে
এসেছিলেন। এই সময় মণিপুরের রাজ ছিলেন
গন্ধর্বরাজ চিত্রভানু। এই সূত্রে
মণিপুরবাসীরা মনে করেন যে,
তাঁরা গন্ধর্ববংশীয়।
অর্জুন গন্ধর্বরাজের কন্যা চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করেছিলেন। এঁদের
সন্তানের নাম ছিল বভ্রুবাহন। এরপর অর্জুন মণিপুর থেকে তীর্থযাত্রায় চলে যান। এর বেশ
কিছুদিন পর পাণ্ডবদের অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া নিয়ে অর্জুন মণিপুরে আসেন। বভ্রুবাহন
অশ্বমেধ যজ্ঞের ঘোড়া আটক করলে, অর্জুনের সাথে তাঁর যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধে
মণিপুরে নিজপুত্র বভ্রুবাহনের সাথে যুদ্ধে ইনি প্রাণ হারালে–
অর্জুনের স্ত্রী
নাগকন্যা উলূপী নাগলোক থেকে সঞ্জীবনী এনে তাঁকে জীবিত করে তোলেন।
এরপর তিনি অশ্বসহ স্বরাজ্যে ফিরে সেন।
আর্যদের সংস্পর্শে এসে মণিপুরে সনাতন ধরধ্মের পরিবর্তন ঘটেছিল। এই সূত্রেই
মণিপুরের লোক-উপখ্যানের সাথে মিশ্রণ ঘটেছিল আর্যদের পৌরাণিক ধর্মের দেবদেবীদের। কালক্রমে এঁদের ধর্মদর্শনে প্রধান দেবদেবীর স্থান
করে নিয়েছিল, শিব, পার্বতী, কৃষ্ণ, রাধা প্রমুখ। একই
সাথে এঁদের নৃত্যভাবনাতেই পরিবর্তন ঘটেছিল। সম্ভবত এই সময়ে
মণিপুরে শৈব ও বৈষ্ণব ধর্মের ভিত্তি রচিত হয়েছিল। কালক্রমে মণিপুরে
শৈব-ধর্মাদর্শ থেকে উদ্ভব হয়েছিল লাইহারাওবা এবং রাসনৃত্য।
১৫৪ খ্রিষ্টাব্দে রচিত একটি তাম্রফলক থেকে জানা যায় যে, রাজা কোয়াইথপ্পকে
সঙ্গীত ও নৃত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ৭০৭ খ্রিষ্টাব্দের ব্রহ্মদেশ (আধুনিক মায়ানমার)
রাজা থো-লো-ফেঙ মণিপুর দখল করেন নেন। তিনি সঙ্গীতে অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। তিনি
আসাম ও মণিপুরের বিশিষ্ট সঙ্গীত ও নৃত্যের একটি দল চীনদেশে পাঠিয়েছিলেন। এই সময়
মণিপুরের নাচের বিষয় বস্তু ছিল- মিশ্র ধর্মীয় দর্শনভিত্তিক।
কালক্রমে প্রধান পূজ্য হয়ে উঠছিলেন হর-পারবতী। এই হর-পার্তীর আরধানার সূত্রে সৃষ্টি
হয়েছিল 'মৈরাং পূর্বা' মহাকাব্য। পরে এই কাহিনী অবলম্বনেই কবি হিজুম আঙঙ্হাল সিং
রচনা করেছিলেন অপর একটি মহাকাব্য। এই মহাকাব্যে বর্ণিত হয়েছে- মণিপুরের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় লোককাহিনী হলো- খাম্বা-থৈবী
উপখ্যান। কথিত আছে রাজা লয়াম্বার রাজত্বকালে (১১২৭-৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) খাম্বা এবং থৈবী
জীবিত ছিলেন। এঁদেরকে শিব ও পার্বতীর অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো। এই কাহিনি মতে-
খাম্বা ছিলেন দরিদ্র কৃষকের পুত্র এবং থৈবী ছিলেন রাজকন্যা।
লাইহারাউবা নৃত্য উৎপত্তি ঘটেছিল এঁদের
প্রণয়োপখ্যান অবলম্বনে।
মণিপুরী ভাষায় লাই শব্দের অর্থ দেবতা। কিন্তু পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে জানা যায়,
মণিপুরে লাই বলতে মহাদেবের লিঙ্গ-প্রতিকী
রূপকে বুঝানো হয়ে থাকে। এই সময়ে মণিপুরে শৈব ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। মণিপুরী ভাষায়
হারাউবা শব্দের অর্থ হলো-আনন্দনৃত্য। লিঙ্গপূজা এবং এই উপলক্ষে পরিবেশিত আনন্দ
নৃত্যই হয়ে উঠেছিল
লাইহারাউবা নৃত্য। মণিপুরবাসীদের ধারণা ছিল-
হরপার্বতীর পূজায় ভক্তিভরে নৃত্য পরিবেশন করলে- হরপার্বতীসহ সকল দেবতা তুষ্ট হবেন।
ফলে
লাইহারাউবা নৃত্য হয়ে উঠেছিল পূজা-পদ্ধতি।
খাম্বা থৈবী উপাখ্যান
মণিপুরের রাজা লায়াম্বার রাজত্বকালে (১১২৭-৫৪ খ্রিষ্টাব্দ), রাজধানী ইম্ফল থেকে
প্রায় ত্রিশ মাইল দূরে, মৈরাঙ নামক এক গ্রামে খাম্বা নামক এক দরিদ্র এবং সাহসী যুবক
বাস করতেন। মৈরাঙ রাজবংশের থৈবী নামক এক রাজকন্যা একবার লোগতাক হ্রদে সহচরীদের
নিয়ে মৎস্যশিকারে যান। রাজার আদেশে ওই স্থানে কোনো পুরুষ লোকের প্রবেশ নিষেধ ছিল।
খাম্বা প্রভু থানজিং কর্তৃক স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে ওই সময়ে লোগতাক হ্রদে যান।
সেখানে রাজকন্যা থৈবীর সাথে খাম্বা দেখা হয় এবং উভয় উভয়কে দেখে মুগ্ধ হন এবং
প্রণয়াসক্ত হন। সামাজিক বৈষম্যের কারণে উভয়ের বিবাহ প্রায় অসম্ভব ছিল। প্রথম
দিকে রাজরোষে বহুবার তাঁর জীবন বিপন্ন হয়। থৈবীকেও কিছুদিন দাসীবৃত্তি করতে হয়। শেষ
পর্যন্ত রাজা উভয়ের বিবাহে সম্মতি দেন। বিবহের কিছুদিন পর, খাম্বা থেবীকে সন্দেহ
করা শুরু করে। তৎকালীন মণিপুরের রীতি অনুসারে সতী পরীক্ষার রীতি ছিল। কোনো বিবাহিত
নারীর ঘরের দরজার ফাঁক দিয়ে অন্য কোন পুরুষ বর্শার অগ্রভাগ প্রবেশ করালে, ওই নারী
যদি বর্শাটি টেনে ঘরের ভিতর রাখে, তবে ওই নারীকে অসৎ বিবেচনা করা হবে। আর ওই
স্ত্রীলোক যদি বর্শা গ্রহণ করে, সজোরে ঘরের বাইরে নিক্ষেপ করে, তবে সে সতী বিবেচিত
হবে।
খাম্বা এই পরীক্ষার জন্য থৈবীকে দূরের গ্রামে যাবে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
রাত্রিবেলা খাম্বা ফিরে এসে থৈবীর ঘরের দরজা দিয়ে বর্শার অগ্রভাগ প্রবেশ করিয়ে
অপেক্ষা করতে থাকেন। থৈবী এই বর্শা নিয়ে সজোরে বাইরে নিক্ষেপ করলে, ওই বর্শা
খাম্বার বুকে বিদ্ধ হয় এবং ওই আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়। ঘরের বাইরে এসে থৈবী এই দৃশ্য
দেখে, ওই বর্শা নিজের বুকে বিদ্ধ করে আত্মহত্যা করেন। এই করুণ কাহিনী অবলম্বনে
মৈরাঙ গ্রামে প্রতিবৎসর লাইহারাউবা নৃত্য-আলেখ্য অনুষ্ঠিত হয়। মণিপুরের এই অঞ্চলের
মানুষ খাম্বা এবং থৈবীকে শিব-পার্বতীর অংশ হিসেবে পূজা করে।
মণিপুরী ভাষায় লাই শব্দের অর্থ দেবতা। তবে মণিপুরে লাই বলতে মহাদেবের লিঙ্গ-প্রতিকী
রূপকে বুঝানো হয়ে থাকে।
এই সময়ে মণিপুরে শৈব ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল। মণিপুরী ভাষায় হারাউবা শব্দের অর্থ
হলো-আনন্দনৃত্য। লিঙ্গপূজা এবং এই উপলক্ষে পরিবেশিত আনন্দ নৃত্যই হয়ে উঠেছিল
লাইহারাউবা নৃত্য। মণিপুরবাসীদের ধারণা ছিল- হরপার্বতীর
পূজায় ভক্তিভরে নৃত্য পরিবেশন করলে- হরপার্বতীসহ সকল দেবতা তুষ্ট হবেন। ফলে
লাইহারাউবা নৃত্য হয়ে উঠেছিল পূজা-পদ্ধতি। এর বিন্যাস নৃত্যনাট্যের মতো।
লাইহারাউবা নৃত্যোৎসবের সাথে রয়েছে মণিপুরের দেবদাস ও দেবদাসী। মণিপুরী ভাষায়
এঁদেরকে বলা হয়- মৈবা ও মৈবী।
১২৫০ খ্রিষ্টাব্দে মণিপুরের রাজার সাথে চীনের যুদ্ধ হয়।
এই যুদ্ধে মণিপুরে সেনাবাহিনী জয় লাভ করে। এই সময় চীনের বন্দী সৈন্যদের সুসারমেঙ-এ
রাখা হয়। পরে বন্দী সৈন্যদের কাছ থেকে মণিপুরবাসীরা নানা ধরণের জ্ঞান অর্জন করতে
সক্ষম হন।
১৪৬৭ খ্রিষ্টাব্দে মণিপুর রাজা কায়াম্বার রাজত্বকালে ব্রহ্মদেশের রাজা পঙ-এর রাজ
দরবারে কিছু সুদক্ষ সঙ্গীত ও নৃত্যশিল্পী প্রেরণ করেন। বিনিময়ে ব্রহ্মদেশ থেকে কিছু
রণশিঙ্গাবাদক মণিপুরে আসেন। এই সময় মণিপুরে শৈব এবং বৈষ্ণব ধর্মের প্রচলন ছিল।
১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে
মণিপুর শৈব এবং বৈষ্ণব ধর্মের সহাবস্থানে একটি শান্তির জনপদে পরিণত হয়েছিল।
এরপর ধীরে ধীরে বৈষ্ণবধর্ম মণিপুরের প্রধান ধর্ম হিসেবে
আত্মপ্রকাশ করে।
১৭০৪ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পিতাম্বর ছারাই রোঙ্বা বিষ্ণুকে প্রধান দেবতা হিসেবে গ্রহণ
করেন। পরে তিনি বৈষ্ণবধর্মকে মণিপুরের
রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেন।
১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে রাজা পামহৈবা
মণিপুরের রাজত্ব লাভের পর,
বৈষ্ণবদের আধিপত্য
প্রবলতর হয়ে মণিপুরকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। রামানন্দীর ভাবদর্শের বিশ্বাসী
বৈষ্ণব সাধক শান্তি দাস অধিকারীর অনুপ্রেরণায় রাজা পামহৈবা বৈষ্ণব মত গ্রহণ করেন।
এই
সময় এই
অঞ্চলে
শৈবমতাদর্শের লোকের একরকম কোণঠাসা হয়ে পড়ে। রাজা পামহৈবা অন্যান্য মতের গ্রন্থাদি ও
নিদর্শন ধ্বংস করে দেয়।
রাজা নিজেকে গরীব নেওয়াজ (গরীবের বন্ধু) উপাধী গ্রহ করেন।
এই সময়
রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার
অভাবে
'লাইহারাউবা নৃত্য মর্যাদা হারাতে হারাতে প্রায়
বিলুপ্তির পথে চলে যায়।
১৭৫১ খ্রিষ্টাব্দে রাজা
পামহৈবার মৃত্যুর রাজত্ব নিয়ে উত্তরাধিকারদের ভিতরে কিছু সংঘাত
হয়।
ফলে মণিপুরী রাজতন্ত্রে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। অবশেষে ১৭৫৯ খ্রিষ্টাব্দে মহারাজ
ভাগ্যচন্দ্র তাঁর চাচা ছিৎসাই-এর কাছ থেকে রাজত্ব লাভ করেন। কিন্তু ছিৎসাই-এর
সহযোগিতায় ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে বার্মার সৈন্যরা মণিপুর দখল করে নেয়। এই সময়
ভাগ্যচন্দ্র তাঁর কিছু অনুচর নিয়ে সপরিবারে আসামে পালিয়ে যান। আসামের রাজা রাজেশ্বর
সিংহ তাঁকে আশ্রয় দেন। এই সময়, মণিপুরের রাজা হন ছিৎসাই। রাজা ছিৎসাই, ভাগ্যচন্দ্রকে
হত্যা করার জন্য আসামের রাজার কাছে গোপন পত্র পাঠান। মণিপুর রাজ্যের রাজার এই আদেশ
অমান্য করলে, আসাম বিপদগ্রস্থ হবে, আবার মান্য করলে অতিথির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।
এই দ্বৈতভাবনা থেকে উদ্ধারের জন্য রাজেশ্বর একটি অভিনব কৌশল অবলম্বন করেন। এই সময়
এক বন্য হাতির আক্রমণে প্রজাকুল অতীষ্ট হয়ে উঠেছিল। তাই ভাগ্যচন্দ্রকে এই হাতিকে
হত্যা বশ করার কথা বলেন।
মণিপুরী লোককাহিনি থেকে জানা যায় ভাগ্যচন্দ্র ছিলেন অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। যদিও
তাঁর এই অলৌকিক ক্ষমতার দ্বারা বার্মার আক্রমণ প্রতিহত করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিন্তু
এবারে স্বপ্নদর্শনের মাধ্যমে এই বিপদ থেকে রক্ষা পান। কথিত আছে শ্রীকৃষ্ণ স্বপ্নে
তাঁর কণ্ঠের (কৃষ্ণের) তুলসীমালা নিয়ে হাতির সামনে উপস্থিত হতে বলেন। এই স্বপ্নাদেশ
অনুসারে ভাগ্যচন্দ্র হাতির সামনে গেলে, হাতি তাঁকে অভিবাদন করে, নিজের কাঁধে বসায়।
১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এই হাতির পিঠে চড়ে সসৈন্যে মণিপুর আসেন এবং শত্রুদের
বিতারিত করে সিংহাসন পুনরুদ্ধার করেন।
রাজা ভাগ্যচন্দ্রের আমলে রাজ্যের প্রভূত উন্নতিসাধন হয়। তাঁর সময়ে মণিপুরে
রাসলীলাভিত্তিক নৃত্যনুষ্ঠানের প্রচলন ঘটে। তিনি মণিপুরী নাচের উপর গ্রন্থাদি
রচনা করেন। তাঁরই প্রচেষ্টায় রাসোৎসব মণিপুরের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়। তিনি আসামের
লোকযাত্রা, বাংলার কীর্তন এবং মণিপুরের লোকনৃত্যের সমন্বয়ে একটি শাস্ত্রীয় নৃত্যে
রূপ দেন।
রাসনৃ্ত্যের পৌরাণিক
প্রেক্ষাপট
শ্রীকৃষ্ণ একবার রাধাকে নিয়ে একটি
রাসলীলা'র (রাধাকৃষ্ণের নৃত্যলীলা) ব্যবস্থা করেন। মহাদেব এই লীলা দেখার আগ্রহ প্রকাশ
করলে, কৃষ্ণ তাঁকে রাসলীলাস্থলের দ্বার রক্ষক হয়ে এই লীলা উপভোগের অনুমতি দেন।
মহাদেব যথারীতি দ্বাররক্ষক হয়েই এই লীলা উপভোগ করতে করতে তাঁর দ্বাররক্ষার কর্তব্য
ভুলে যান। এই সময়, পার্বতী সেখানে উপস্থিত হন। মোহিত মহাদেবকে ফাঁকি দিয়ে, পার্বতী
এই লীলা উপভোগ করেন। এই অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর, পার্বতী নিজেদের জন্য একটি রাসলীলার
আয়োজন করার জন্য মহাদেবের কাছে আবদার করেন। মহাদেব তাতে সম্মত হয়ে রাসলীলার উপযোগী
স্থান নির্বাচন করার জন্য সারা পৃথিবী ঘুরে বেড়ালেন। কিন্তু উপযুক্ত স্থান পেলেন
না। অবশেষে তিনি ঘুরতে ঘুরতে মণিপুর
রাজ্যে এলেন। এখানকার কোউব্রু পর্বত (কুমার পর্বত)-কে এই নাচের জন্য উপযুক্ত
স্থান মনে করেলন। কিন্তু পাহাড়, জলাভূমি মিলিয়ে এই স্থানটি রাসলীলার উপযুক্ত ছিল
না। তাই তিনি এই স্থানকে রাসলীলার উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য− সূর্য,
চন্দ্র এবং পাঁচটি গ্রহকে আহ্বান করলেন। মণিপুরী ভাষায় এদের নাম হলো−
নোঙমাইজিঙ (সূর্য), নিঙ্থোউকাবা (চন্দ্র), লেইপাক্পোকু (মঙ্গল), য়ুম-সাইকে-সা
(বুধ), সাগোলসেল (বৃহস্পতি), ইরাই (শুক্র) এবং খাঙ্জা (শনি)। রাসলীলার ক্ষেত্র
নির্মাণের সময় দেখা গেল, কুমারপর্বতের পাদদেশ জলমগ্ন। মহাদেব এই স্থানকে জলশুন্য
এবং রাসক্ষেত্রে উপযোগী পরিচ্ছন্ন স্থানে পরিণত করার জন্য কৃষ্ণকে অনুরোধ করেন।
কৃষ্ণ এই কাজের জন্য ১০জন দেবতার নিয়োগ করেলন। এঁরা হলেন−
হওবা শোরারেল (ইন্দ্র),
মারজিঙ (কুবের), রাঙব্রেল (যম), খোরিকাবা (বরুণ), ইরুমলাকপা (বায়ু), নোঙসাবা ও
কোঙবা-মেইরোম্বা।
এদের সমবেত চেষ্টায় রাসলীলার ক্ষেত্র তৈরি হলে,
এই স্থানে সাতদিন সাতরাত শিব-পার্বতীর রাসলীলা অনুষ্ঠিত হয়। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গীত সহযোগী
ছিলেন গন্ধর্ব এবং অন্যান্য দেবতারা। রাত্রিবেলার অনুষ্ঠানের জন্য নাগরাজ অনন্তদেব
তাঁর মাথার মণি দান করেন। নাগদেবের মণির নামানুসারে এই স্থানের নাম হয় মণিপুর। কথিত
আছে, রাসলীলা শেষে দেবতারা মণিপুরকে একটি জনপদের মর্যাদা দেন এবং এই অঞ্চলের প্রথম
রাজা হন অনন্তদেব। এই থেকে মণিপুরে নৃত্যগীতের সূচনা হয়।
এই
কাহিনি অনুসারে মনে হয়, রাসলীলা বা রাস নৃত্যই মণিপুরের আদি নৃত্য।
মণিপুরে রাসনৃত্যের বিকাশ
কথিত আছে, রাজা ভাগ্যচন্দ্র
স্বপ্নে রাসলীলা করার আদেশ পেয়েছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ স্বপ্নের ভিতর
তাঁকে জানান যে, রাজকন্যা বিম্ববতীমঞ্জরীকে রাধা সাজিয়ে শ্রীকৃষ্ণের মূর্তিমণ্ডলীর
ভিতরে রেখে নৃত্যলীলা করতে হবে। রাজা তাঁর কন্যাকে রাস নৃত্য শিখিয়ে, স্বপ্নের আদেশ
পালন করেন। কালক্রমে এই নৃত্য
রাসনৃত্য নামে মণিপুরে ছড়িয়ে পড়ে। এই কাহিনির
সাথে কোনো ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে একথা সত্য
যে এই সময় থেকেই মণিপুরে রাসনৃত্যের
চর্চা শুরু হয়েছিল। শৈবযুগে
রাসনৃত্য
পৃথক নৃত্য শৈলী হিসেবে বিকশিত না হলেও−
তালরাস, দণ্ডরাস এবং
মণ্ডলরাসে প্রচলন ছিল। নৃত্য-গীতযুক্ত অভিনয় অংশ নিয়ে রাসের
যে নানা পর্ব পাওয়া যায়, রাজা ভাগ্যচন্দ্রই তা সাজিয়েছিলেন। তিনি মহারাস, বসন্তরাস,
কুঞ্জরাস ও ভঙ্গীপারেঙ প্রবর্তন করেন। উল্লেখ্য,
রাসনৃত্য বিষয়ক তাঁর বিখ্যাত
গ্রন্থ 'গোবিন্দ সঙ্গীত লীলাবিলাস'-কে রাসনৃত্যের আদি পুস্তক হিসেবে
বিবেচনা করা হয়। এই
গ্রন্থে নাট্যকে রূপক (প্রাচীন নাট্য) ও রাসক (নৃত্যনাট্য) পর্যায়ে বর্ণনা করেছেন।
আগে রাসলীলায় গান, নাচ এবং অভিনয় ছিল। কিন্তু সুসমন্বয়ে তা গ্রথিত ছিল না। তিনি এই
গ্রন্থের রাসক অধ্যায়ে রাসনৃত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক ও পদ্ধতি লিপিবদ্ধ করেন। এই
গ্রন্থানুসারে রাসনৃত্যকে
৫টি পর্যায়ে ভাগ করেন। এই ভাগগুলো হলো−
মহারাসক, মঞ্জুরাসক, নিত্যরাসক, নির্বেশরাসক ও গোপরাসক। বর্তমানে এই রাসকগুলো
মহারাস, বসন্তরাস, নিত্যরাস, কুঞ্জরাস, গোপরাস বা গোষ্ঠরাস এবং উলুখল রাস নামে
পরিচিত।
মণিপুরী নাচের বৈশিষ্ট্য
লাইহারাউবা নৃত্য
বা রাসনৃত্য-এর
উপস্থাপনের বিষয় যাই হোক, নাচের ভঙ্গী প্রায় একই। এই নাচে নাট্য, নৃত্য এবং নৃত্তের
প্রয়োগ হয় সমানভাবে। এতে লাস্য ও তাণ্ডব নৃত্য রয়েছে, তবে তাতে ভাব
এবং বিভাব সমভাবে প্রকাশ পায়। এই নাচে আঙ্গিকাভিনয় গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে
আছে। এই নাচে দেহ ভঙ্গিমাকে নানা ধরণের জ্যামিতিক অবয়বে ফুটিয়ে তোলা হয় বিষয়ের সাথে
সামঞ্জস্য রেখে। এই নাচে ভক্তিরস প্রবল। এমনকি শৃঙ্গার রসের ভিতরে অপূর্ব সংযম লক্ষ্য
করা যায়, যা ভক্তিরসকেই উজ্জীবিত করে।
এই নৃত্যশৈলীতে একক দেহভঙ্গিমাকে বলা হয় ভঙ্গী
আর বিভিন্ন ভঙ্গীর সমষ্টিগত রূপ হলো ভঙ্গিপারেঙ। মণিপুরী নৃত্যশৈলীতে চারপ্রকার
ভঙ্গী ব্যবহৃত হয়। এগুলো হলো−
-
সমভঙ্গ: এই ভঙ্গীতে দেহ সোজা ও
স্থিতিশীল অবস্থায় থাকে। মেরুদণ্ড সোজা করে এই ভঙ্গীতে চাঞ্চল্য নেই।
-
আভঙ্গ: এই ভঙ্গীতে মেরুদণ্ড নমনীয় ও
সক্রীয় রেখে অঙ্গভঙ্গী করা হয়। ফলে নানারূপ দেহভঙ্গিমা ফুটে উঠে।
-
ত্রিভঙ্গ:
এই ভঙ্গীটি লাস্যভাব ফুটে উঠে। ক্ষিপ্র
গতিতে নানারূপ দেহভঙ্গীমা ফুটিয়ে তোলা হয়। বংশীধারী শ্রীকৃষ্ণের ভঙ্গিমা এর
উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
-
অতিভঙ্গ: এই ভঙ্গীতে তাণ্ডবভাব
প্রকট হয়ে ধরা পড়ে। উদ্দাম নৃত্যের মধ্য দিয়ে দেহের নানা রূপ ভঙ্গিমা ফুটিয়ে
তোলা হয়।
এই চারটি ভঙ্গীর সমন্বয়ে মিশ্রণে ভঙ্গিপারেঙ
গঠিত হয়। মণিপুরী নাচে পাঁচটি পর্যায়ে ভঙ্গিপারেঙ ব্যবহার করা। লাস্য এই এবং
তাণ্ডবভাবের বিচারে ভঙ্গিপারেঙ দুটি পর্যায়ে বিভক্ত। যেমন-
-
ভঙ্গিপারেঙ লাস্য: এই ভঙ্গিপারেঙ-এ
দুটি ভঙ্গিমা ব্যবহৃত হয়। ভঙ্গিমা দুটি হলো−
সীমিতাঙ্গ ও স্ফুরিতাঙ্গ।
-
ভঙ্গপারেঙ তাণ্ডব:
এই ভঙ্গিপারেঙ-এ তিনটি
ভঙ্গিমা ব্যবহৃত হয়। ভঙ্গিমা তিনটি হলো−
গুণ্ঠন, চলন এবং প্রসরণ।
ভঙ্গিপারেঙ পাঁচ প্রকার। এই প্রকারগুলো হলো- অছুবা, খুড়ুম্বা, বৃন্দাবন, গোষ্ঠ ও
গোষ্ঠ বৃন্দাবন।
মণিপুরী নৃত্যে নৃত্য সংগঠনে অন্যতম অঙ্গকে চালি বলা হয়। পদ, জঙ্ঘা, উরু ও কটিদেশ
একই সরল রেখায় রেখে নৃত্য পরিবেশনের কৌশলকে চালি বলা হয়।
মণিপুরী নৃত্যে বাদ্যযন্ত্র
মণিপুরী নৃত্যে তালযন্ত্র একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। এর ভিতরে আনদ্ধ
যন্ত্র হলো- পুঙ, ইয়াবুঙ, হারাপুঙ, তানইবুঙ, নাগনা, খোল, ঢোলক, দফত, খঞ্জরী,
পাখোয়াজ ও ঢোল। ঘনবাদ্যের ভিতরে আছে সেমবুঙ, ঝালারি, মঙগঙ, জাল, করতাল, রমতাল
ইত্যাদি। তত যন্ত্রের মধ্যে রয়েছে পেনা, এস্রাজ, তানপুরা। সুষি-যন্ত্রের মধ্যে
রয়েছে বাঁশি, ময়বুঙ, পেরে ও খঙ।
মণিপুরী নৃত্যে ব্যবহৃত তালিসমূহ:
মণিপুরী নৃত্যে নানাবিধ তাল এবং তার লয়ের প্রয়োগ লক্ষ করা যায়। এর ভিতরে
উল্লেখযোগ্য তালগুলো হলো তাণ্চেপ, মেনকুপ, রূপক, দশকোশ, তিনতাল দশকোশ, তিনতাল মাচা,
তেবড়া, রাজমেল, দুতাল, অছুবা, যাত্রা রূপক, তিনতাল অছৌবা, তিনতাল মেল, ভঙ্গদাস,
গাজন, মদন, মৈতৈ, সুরফাঁক, ঝাঁপ, রাস, চারতাল। চার মাত্রা থেকে আটষট্টি মাত্রা
পর্যন্ত বিভিন্ন ভাগে অলঙ্কার পুংলোন বা প্রস্তর ছন্দিত হয়। অনেক সময় দুই বা
ততোধিক তালের সমন্বয়ে এবং নৃত্যালঙ্কার প্রয়োগে তাল প্রবন্ধ ও নৃত্য প্রবন্ধ গঠিত
হয়।
মণিপুরী নৃত্যের পোশাক
কথিত আছে, রাজ ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে রাসনৃত্যের পোশাকের নির্দেশ
পেয়েছিলেন। এই পোশাকের অন্যতম হলো জড়ি জড়ানো মাথার চূড়া। মুখের উপর পাতলা জালের মতো
সাদা কাপড়ের আবরণ। একে বলা হয় মাইখুম। ঘন সবুজ ভেলভেটের ব্লাউজ বা রেশমী ফিরুৎ।
চুমকি খচিত সবুজ শার্টিনের পেটিকোট। পোশাকের নিম্নভাগে পিতলের তবকমোড়া বিভিন্
গোলাকার আয়না সমান্তরালভাবে বাসন থাকে। নিম্নভাগে কাপড়ের ভিতর বেত দিয়ে শক্ত করা
থাকে। এই পোশাককে কুমিন বলা হয়। উপরের দিকে থাকে রুপোলি কাজ করা আয়না বসানো সাদা
স্বচ্ছ ঘাঘরা। এই ঘাঘরাকে বলা হয় পেশোয়ান। কাঁধের উপর থাকে পাশে ঝোলানো কাপড়। একে
বলা হয় খাওন। এর নিম্নভাগে থাকে সোনালী ও রূপালী কাজ করা। অর্ধচন্দ্রাকর, গোল চৌকা
কাঁচ বসানো মখমলের বেল্ট ব্যবহৃত হয়। একে বলা হয় খানপ।
এই
নাচের সময় তাল, তানথাক, তাংখা, রতনচূড়, অনন্ত, সেনাখুজি, খুড়পা, কুণ্ডলীন,
পারেঙ, ঝাপা ইত্যাদি অলঙ্কার থাকে। লাইহারবা নৃত্যে ফনেক নামক পোশাক ব্যবহার করা
হয়। ফনেক-এর পাড়ে পদ্মফুল, ও মৌমাছির নকশা থাকে। ফনেকের মাঝখানে লাল ও কালো রঙের
সারি থাকে। এর ভিতরে কাল রাত্রির এবং লাল প্রভাতের প্রতীক।
মণিপুরী নৃত্যের প্রচার
মণিপুরের এই ঐতিহ্যবাহী নৃত্যকে বিশ্ব-দরবারে তুলে আনেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
তিনি সিলেট, কাছাড় এবং আগরতলা ভ্রমণের সময় এই নাচ দেখে মুগ্ধ হন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে
তিনি নবকুমার সিংহ নামক একজন মণিপুরী নৃত্যের শিক্ষককে শান্তিনিকেতনে নিয়ে আসেন।
পরে নবকুমার সিংহের পরিচালনায় নটীর পূজা এবং ঋতুরঙ্গ মণিপুরী নৃত্যশৈলীতে মঞ্চস্থ
হয়। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথ সিনারিক সিং রাজকুমার এবং নীলেশ্বর মুখার্জিকে
মণিপুরী নাচের শিক্ষক হিসেবে শান্তিনিকেতনে আনেন। এই নৃত্যশৈলী অনুসারে শ্যামা,
চিত্রাঙ্গদা এবং চণ্ডালিকা-র নৃত্যরূপ দেওয়া হয়। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের
অনুরোধে শান্তিনকেতনে আসেন নৃত্যগুরু আতম্বা সিং। শান্তিনিকেতনের সূত্রে মণিপূরী
নাচ ক্রমান্বয়ে ভারতীয় চিরায়ত সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার পাশে স্থান করে নিয়েছে।
সূত্র :