ব্রাহ্মবিবাহ
হিন্দু ধর্মগ্রন্থে (যেমন মনুস্মৃতি, যাজ্ঞবল্ক্য স্মৃতি ইত্যাদি) বর্ণিত বিবাহের আট প্রকারের মধ্যে সর্বোত্তম রূপ। এটি মূলত ব্রাহ্মণদের জন্য নির্ধারিত ছিল, কিন্তু পরবর্তীকালে অন্য বর্ণেও প্রচলিত হয়। এৱই বিবাহের বৈশিষ্ট্য হলো- প্রাচীন এই বিবাহ পদ্ধতি ছিল সাধারণ একটি বিধির বিচারে একটি অনুষ্ঠান মাত্র। কালক্রমে সনাতন হিন্দুধর্মের বিবাহরীতিতে নানাবিধ আচার অনুষ্ঠান যুক্ত সাধারণ বিবাহ-অনুষ্ঠান বিবাহ-উৎসবে পরিণত হয়েছে এবং ধীরে ধীরে ব্রাহ্মবিবাহ রীতি অপাংক্তেয় হয়ে পরেছিল।

১৯শ শতাব্দীতে রাজা রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মধর্ম ভিত্তিক ধর্মদর্শনের সূত্রে উদ্ভব হয়েছিল ব্রাহ্মসমাজ । এই সমাজের বিশেষ বিধি অনুসারে যে বিবাহ-কার্য শুরু হয়েছিল, বর্তমানে তা ' ব্রাহ্ম বিবাহ' নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । এটি মূর্তিপূজা, যৌতুক, বহুবিবাহ, শিশুবিবাহ ইত্যাদি থেকে মুক্ত একটি সরল, একেশ্বরবাদী বিবাহ পদ্ধতি। ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দের ব্রাহ্ম ম্যারেজ অ্যাক্ট
(Special Marriage Act III) দ্বারা আইনি স্বীকৃতি লাভ করে। মূলত কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত ব্রাহ্ম সমাজের দীর্ঘ আন্দোলনের ফলেই ব্রিটিশ সরকার এই আইনটি পাস করে।

ব্রাহ্মরা মূর্তিপূজা ও প্রচলিত হিন্দু আচার বর্জন করায় তৎকালীন হিন্দু আইনে তাদের বিবাহ বৈধতা পাওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। এছাড়া তারা অসবর্ণ বিবাহ (বিভিন্ন জাতির মধ্যে বিয়ে) এবং বিধবা বিবাহের সপক্ষে ছিল। এসব বিয়েকে আইনি স্বীকৃতি দিতেই এই বিশেষ আইনের প্রয়োজন হয়।

প্রধান বিধানসমূহের যথাযথ এবং সঠিক বাংলা অনুবাদ।

এই আইনটি ছিল ভারতের প্রথম সিভিল ম্যারেজ আইন, যা ব্রাহ্মসমাজের সংস্কারমূলক দাবির ফলে পাস হয়। পরবর্তীকালে এটি ১৯৫৪ সালের Special Marriage Act দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয় (ভারতে), কিন্তু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে এর কিছু অংশ এখনও প্রযোজ্য।

ব্রাহ্মসমাজে ব্রাহ্মরীতিতে প্রথম বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল ১৮৬১ খ্রিষ্টব্দের ২৬ জুলাই। এই বিবাহটি ছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের দ্বিতীয় কন্যা সুকুমারী দেবীর সাথে হেমেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়-এর। তৎকালীন 'তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা'র নথিপত্র অনুযায়ী এটিই ছিল ব্রাহ্ম সমাজের ইতিহাসে সম্পূর্ণ ব্রাহ্মরীতি বা 'অনুষ্ঠান পদ্ধতি' মেনে প্রথম বিবাহ।

তত্ত্ববোধিনী শ্রাবণ ১৭৮৩ শক [পৃষ্ঠা: ৬৭-৬৮]

‘ব্রাহ্মবিবাহ। গত ১২ শ্রাবণ শুক্রবার ব্রাহ্ম ধর্ম্মের ব্যবস্থানুসারে শ্ৰীযুক্ত রাজারাম মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের পুত্র শ্রীযুক্ত হেমেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সহিত শ্রীযুক্ত দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের কন্যার শুভ বিবাহ অতি সমারোহ পূৰ্ব্বক সম্পন্ন হইয়া গিয়াছে। বঙ্গদেশে ব্রাহ্মধর্ম্মানুযায়ী বিবাহের এই প্রথম সূত্রপাত হইল। বিবাহ সভায় লোকের বিস্তর সমারোহ হইয়াছিল। আর আহ্লাদের বিষয় এই যে প্রায় দুই শত ব্রাহ্ম সভাস্থ হইয়া যথা-বিধানে কাৰ্য্য সম্পাদন করিয়াছিলেন। যথা-নিয়মে পাত্রের অভ্যর্থনা হইলে পর ব্রহ্ম-বিষয়ক একটী সঙ্গীত সহকারে ব্রহ্মোপাসনা আরম্ভ হইল। চতুর্দ্দিক নিস্তব্ধ হইল; জন-কোলাহল আর কিছুমাত্র রহিল না—কেবল ব্রহ্মনামের মঙ্গল-ধ্বনি উঠিতে লাগিল। তৎপরে কন্যাদান কার্য্য সম্পন্ন হইলে উপাচার্য্য শ্ৰীযুক্ত আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশ মহাশয় দম্পতীকে…উপদেশ করিলেন।’

এই বিবাহের বিস্তারিত বিবরণ তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার সূত্রে উল্লৈখ পাওয়া যায়, ব্রজেন্দ্রনাথ  বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'স্বর্ণকুমারী দেবী' গ্রন্থে।
[দেখুন: বিবরণ]