কশ্যপ
সনাতন হিন্দু ধর্মের এই নামে একাধিক চরিত্র পাওয়া যায়। যেমন-

কশ্যপ ১:
সনাতন হিন্দু ধর্মের গ্রন্থাদি অনুসারে কশ্যপ নামক
বৈদিক ও পৌরাণিক ঋষি কখনো তিনি সূর্যের সমার্থক নাম হিসেবে পাওয়া যায়

মরীচির পুত্র অরিষ্টনেমিকে প্রথমে দক্ষ প্রজাপতি কন্যা দান করতে সম্মত হননি। বিবাহে ইচ্ছুক কশ্যপ দক্ষপ্রজাপতির দ্বারা প্রত্যাখ্যাত এবং খুব কঠিন ভাবে তিরস্কৃত হয়েছিলেন। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ এবং দুঃখিত হয়ে প্রজাপতি অরিষ্টনেমি ‘কশ্য’ বা মদ পান করেছিলেন। ‘কশ্য’ পান করেছিলেন বলেই তাঁর নাম হল কশ্যপ।

কশ্যপের জন্মপরিচয় সম্পর্কে গ্রন্থাদি থেকে জানা যায়-
 তিনি মরীচি-এর পুত্রসামবেদে কশ্যপকে মরীচির পুত্র বা মারীচ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবার বামদেবের সঙ্গেও একাত্মভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কশ্যপকে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণের দেখা যায়- মহর্ষি কশ্যপ বিশ্বকর্মার ঐন্দ্র মহাভিষেক সম্পন্ন করেছিলেন। উপনিষদগুলিতে এবং অন্যান্য ব্রাহ্মণগ্রন্থগুলিতে কশ্যাপের নাম  উল্লিখিত হয়েছে ব্রহ্মজ্ঞ ঋষি হিসেবে।

মহাভারতে কাশ্যপের মায়ের নাম জানা যায় না। ভাগবত পুরাণ মতে- মরীচের স্ত্রী ছিলেন- কদর্মের কন্যা কলা। বায়ু পুরাণের মতে- কশ্যপের পিতা প্রজাপতি মরীচি প্রজাসৃষ্টির অভিলাষে জল বা ‘অপ’ কামনা করলেন। তারপর সুদীর্ঘকাল তিনি জলে বসবাস করলেন। জলের মধ্যেই জন্ম নিলেন মরীচির পুত্র প্রজাপতি কশ্যপ এবং এই কশ্যপ পরবর্তীকালে সমস্ত প্রাণীজগত সৃষ্টি করলেন।

মহাভারতের মতে- দক্ষ তাঁর ১৩টি কন্যাকে কশ্যপের সাথে বিবাহ দিয়েছিলেন। এঁরা হলেন-অদিতি, দিতি, দনু, কালা, দনায়ু, সিংহিকা, ক্রোধা, প্রাধা, বিশ্বা, বিনতা, কপিলা, মুনি এবং কদ্রু।

কশ্যপের সন্তানাদি

কশ্যপ, পরশুরাম এবং ধরিত্রী দেবী
একুশবার সমগ্র পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করে দেবার পর, পরশুরাম হত্যার ঘটনা থেকে নিবৃত্ত হnL এরপর মানসিক শান্তিলাভ এবং দেবতাদের প্রসন্ন করার জন্য অশ্বমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেন। এই যজ্ঞে কশ্যপ পৌরোহিত্য করেন। সে সময়ে ক্ষত্রিয়শূন্য সমগ্র পৃথিবীই পরশুরামের অধীনে ছিল। যজ্ঞ শেষ হওয়ার পর পরশুরাম দক্ষিণা রূপে এই সমগ্র পৃথিবীই মহর্ষি কশ্যপকে দান করেন। এছাড়াও নিজের অর্জিত বিপুল পরিমাণ ধনসম্পদ এবং একটি সুবর্ণ বেদিও পরশুরাম কশ্যপকে দান করেছিলেন। পরশুরামের দান গ্রহণ করার পর কশ্যপ পরশুরামকে বলেন যে, যেহেতু তিনি ভূমি নিজেই একবার তাঁকে (কশ্যপকে) দান করেছেন। তাই এই ভূমিতে পরশুরাম আর বাস করতে পারবেন না। তাই কশ্যপ তাঁকে অন্যত্র বসবাস করার জন্য বলেন। কশ্যপের কথায় সম্মত হয়ে পরশুরাম সমুদ্রতীরে শূর্পারক দ্বীপে বসবাস করা শুরু করেন। মহাভারতের বনপর্ব এবং শান্তিপর্বে এই ঘটনার পরবর্তী পর্যায়ের কাহিনী দুটি কিছু পৃথক। বনপর্বে আছে- পরশুরাম সমগ্র পৃথিবী কশ্যপ প্রজাপতিকে দান করেছেন জেনে- মূর্তিমতী দেবী পৃথিবী ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে প্রজাপতি ব্রহ্মার কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে-  কোনো একজন মানুষের হাতে দান করা অত্যন্ত অন্যায়। এরপর দেবী পাতালে প্রবেশ করেন। ক্রুদ্ধ দেবীকে সন্তুষ্ট করার জন্য কশ্যপ তপস্যা শুরু করেন। এই তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে দেবী পুনরায় ফিরে আসেন।

মহাভারতের শান্তিপর্বে রয়েছে- পরশুরাম যখন পরপর একুশবার সমগ্র ক্ষত্রিয় জাতিকে হত্যা করলেন, তখন ক্ষত্রিয়শূন্য পৃথিবীতে প্রজাপালন বা দুষ্টের দমনের কোনো উপায় না থাকায় পৃথিবীতে প্রবল অরাজকতা দেখা দেয়।এই অরাজকতা সহ্য করতে না পেরে পৃথিবী ধীরে ধীরে রসাতলে প্রবেশ করতে লাগলেন। তা দেখে কশ্যপ নিজের উরুতে পৃথিবীকে ধারণ করলেন। কশ্যপ পৃথিবীকে আপন উরুতে ধারণ করলেন বলে পৃথিবী উর্বী নামে খ্যাত হন।

এই সময় দেবী কশ্যপকে পৃথিবী এই অরাজকতা বন্ধ করে অবশিষ্ট ক্ষত্রিয়দের সন্ধান করে রাজপদে অভিষিক্ত করার অনুরোধ করেন। এরপর কশ্যপ অবশিষ্ট ক্ষত্রিয় সন্তানদের উদ্ধার করে রাজপদে অভিষিক্ত করেন। পৃথিবী থেকে অরাজকতা দূর হল।

মহাভারতের অনুশাসনপর্বে কশ্যপের পৃথিবীকে ধারণ করা প্রসঙ্গে একটা নতুন কাহিনী পাওয়া যায়। পুরাকালে অঙ্গ নামে একজন ধর্মপরায়ণ রাজা ছিলেন। সম্পূর্ণ পৃথিবীই তাঁর অধীনে ছিল। একসময়ে রাজা অঙ্গ এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেন। যজ্ঞ শেষে দক্ষিণা হিসেবে সমস্ত পৃথিবীটাই তিনি ব্রাহ্মণদের হাতে তুলে দেন। এতে দেবী ক্ষুব্ধ হয়ে ভূলোক ত্যাগ করে ব্রহ্মলোকের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। দেবীর ভূলোক ত্যাগের কারণে পৃথিবী ধীরে ধীরে নির্জীব হয়ে পড়ে এবং গাছপালা, পশু-পাখি সবকিছুই ধীরে ধীরে মৃত্যুমুখে পতিত হতে শুরু হয়। পৃথিবী ধ্বংস হতে চলেছে বুঝতে পেরে তাকে রক্ষা করার জন্য মহর্ষি কশ্যপ স্বয়ং পৃথিবীর মধ্যে প্রবেশ করে তাকে ধারণ করলেন। দেবলোকের হিসাব অনুযায়ী একটানা প্রায় তিরিশ হাজার বছর কশ্যপ এভাবেই পৃথিবীকে ধারণ করেছিলেন। তারপর একসময় পৃথিবী ব্রহ্মলোক থেকে ফিরে এলেন। কশ্যপ তাঁকে আপন কন্যা বলে সম্বোধন করলেন এবং পৃথিবী নিজের দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন আবার। এই ঘটনার পর পৃথিবী কশ্যপের কন্যা অর্থাৎ কাশ্যপী নামে পরিচিত হন।

কশ্যপ ২
মৎস্য পুরাণ মতে (৯.৩২) সাবর্ণব মনুর কালে যে সপ্ত ঋষির আবির্ভাব হবেন। তাঁদের একজনের নাম হবে কশ্যপ।

কশ্যপ ৩
বায়ু পুরাণ মতে (২৩.১৬০) ভবিষ্যৎ ত্রয়োদশ দ্বাপরে ধর্মনারায়ণ যখন ব্যাস হবেন, তখন ভগবান রুদ্র বালি নাম মরত্যলোকে আবির্ভুত হবেন। সে সময়ে তাঁর চারপুত্রের এজনের নাম হবে কশ্যপ।

কশ্যপ ৪
বায়ু পুরাণ মতে (২৩.১৭৩) ষোড়শ দ্বাপরে সঞ্জয় যখন বেদ বিভাগকারী ব্যাস হবেন, তখন ভগবান রুদ্র গোকর্ণ নামে অবতীর্ণ হবেন। সেইসময় তাঁর যে চারটি পুত্র জন্মগ্রহণ করবেন, তাঁদের মধ্যে কশ্যপ একজন।
কশ্যপ ৫:
বায়ু পুরাণ মতে  (১০০.১১৬) ভবিষ্যতে চতুর্দশ মন্বন্তরের অধিপতি ভৌত্য মনুর পুত্রদের মধ্যে একজন।
কশ্যপ ৬:
বায়ু পুরাণ মতে  (১০০.১১৬) ভবিষ্যতে ত্রয়োদশ রৌচ্য মন্বন্তরে যাঁরা সপ্তর্ষি হবেন, তাঁদের মধ্যে কশ্যপ একজন।
কশ্যপ ৭:
বায়ু পুরাণ মতে  (৬২.১৬) স্বারোচিষ মন্বন্তরে যাঁরা সপ্তর্ষি হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একজন হবে কশ্যপ।  মৎস্য পুরাণেও  [৯.৮] এ কথা পাওয়া যায়।
কশ্যপ ৮:
বায়ু পুরাণ মতে  (৬১.৫৫) অত্রিবংশীয় একজন ঋষির নাম কশ্যপ। তিনি সামবেদ সংহিতা প্রণয়ন করেছিলেন বলে বায়ু পুরাণে উল্লিখিত হয়েছে।
কশ্যপ ৯:
বায়ু পুরাণ মতে  (১০০.৯৬)  কশ্যপবংশীয় একজন ঋষি। ভবিষ্যতে ঋতসাবর্ণি মনুর কালে যাঁরা সপ্তর্ষি হবেন, তাঁদের মধ্যে কশ্যপ একজন।