ইহুদি ধর্ম
প্রাচীন একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোর একটি, এটি একটি ইব্রাহিমীয় ধর্ম হিসেবে খ্রিষ্টধর্ম ও ইসলাম ধর্মের সাথে সম্পর্কিত। এর মূল ভিত্তি ইহুদি জাতির ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও আইনি ঐতিহ্য। এই ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন-হজরত মুসা আঃ।

এঁরা এক এবং অদ্বিতীয় পরমসত্তার প্রতি বিশ্বাসী। তিনি নিরাকার। তাই তাঁর কোনো মূর্তি বা ছবি নেই। প্রধান ও সবচেয়ে পবিত্র নাম হলো টেট্রাগ্রামাটোন (Tetragrammaton)। শব্দটি গ্রিক ভাষা থেকে এসেছে, যার অর্থ "চার অক্ষর" (tetra (τέτρα)= চার, grammaton (γράμματον) = অক্ষর)। হিব্রু বাইবেলে (Tanakh) ৬৮০০ বারেরও বেশি উল্লেখিত, এবং এটি ঈশ্বরের সত্যিকারের ব্যক্তিগত নাম।

এই সত্যিকারের  পবিত্র চার অক্ষরবাচক নাম হলো- YHWH। হিব্রু ভাষার এই চারটি অক্ষর হলো-

প্রাচীনকালে সম্ভবত Yahweh (ইয়াহওয়ে বা য়াহওয়েহ্) উচ্চারণ ছিল। বর্তমনে কিন্তু ইহুদিরা এই উচ্চারণ করেন না।

ইহুদি ধর্মের বিকাশ

ইহুদি ধর্মের মন্দির যুগ
মন্দির ভিত্তিক ইহুদি ধর্মের ক্রমবিকাশের ধারায় মন্দিরযুগকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়।

এটি ছিল ইসরাইলের যুক্ত রাজ্য-এর ধর্মীয় কেন্দ্র। সেখানে বলি, উপাসনা ও ধর্মীয় উৎসব পালিত হতো। তবে প্রত্নতাত্ত্বিক ও বাইবেলীয় প্রমাণ থেকে বোঝা যায় যে রাজতন্ত্রের সময়েও স্থানীয় উপাসনাস্থল ও পারিবারিক ধর্মাচার পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি।

এরপর ইসরায়েলীয় রাজ্য দুই ভাগে বিভক্ত হয়: ইসরায়েল — উত্তর রাজ্য যিহূদা (Judah) — দক্ষিণ রাজ্য উত্তর রাজ্য ৭২২ খ্রিষ্টপূর্বে আসিরীয়দের হাতে পতিত হয়। দক্ষিণের যিহূদা রাজ্য ৫৮৬ খ্রিষ্টপূর্বে ব্যাবিলনীয় রাজা নেবুকাদনেজার দ্বিতীয় জেরুশালেম জয় করেন। এই সময় তাঁর বাহিনী মন্দির ধ্বংস করেন এবং ইহুদিদের ব্যাবিলনে নির্বাসিত করেন। এই ঘটনাটি ঘটেছিল Tisha B'Av তারিখে (হিব্রু মাস আভ (Av)-এর ৯ তারিখ)  ধ্বংস হয়।

এটি ইহুদি ধর্মের ইতিহাসের বড় পরিবর্তন। কারণ এর পরে মন্দির-কেন্দ্রিক ধর্ম থেকে সিনাগগ ও প্রার্থনা-কেন্দ্রিক রাব্বিনিক ইহুদি ধর্মে রূপান্তর ঘটেছিল।

ইহুদি ধর্মের মৌলিক বিষয়

১. একেশ্বরবাদ ইহুদি ধর্মের কেন্দ্রে রয়েছেন এক ও অদ্বিতীয় ঈশ্বর—হিব্রু ভাষায় YHWH (ইয়াহওয়েহ)। ঈশ্বর সৃষ্টিকর্তা, সর্বশক্তিমান এবং নৈতিক বিধানের উৎস। শেমা (Shema)-তে ঈশ্বরের একত্বের ঘোষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
২. ঈশ্বর ও ইসরায়েলীয়দের চুক্তি (Covenant) ইহুদি ধর্মে ঈশ্বর ও ইসরায়েলীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে চুক্তি (Berit) একটি মৌলিক ধারণা। আব্রাহাম (আ.)-এর সঙ্গে চুক্তি এবং পরে মুসা (আ.)-এর মাধ্যমে সিনাই পর্বতে চুক্তির ঐতিহ্য ইহুদি ধর্মের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৩. তোরাহ (Torah) তোরাহ ইহুদি ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থীয় ভিত্তি। বিশেষত তোরাহ বলতে হিব্রু বাইবেলের প্রথম পাঁচটি গ্রন্থ—Genesis, Exodus, Leviticus, Numbers ও Deuteronomy—বোঝানো হয়। এতে ধর্মীয় বিধান, নৈতিক নির্দেশ, সামাজিক বিধি এবং ইসরায়েলীয় জাতির প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে।
৪. মিত্‌জভাহ (Mitzvot) বা ধর্মীয় বিধান তোরাহর বিভিন্ন বিধান অনুসরণ করা ইহুদি ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঐতিহ্যগতভাবে ৬১৩টি মিত্‌জভাহ-এর কথা বলা হয়। এগুলোর মধ্যে উপাসনা, খাদ্যবিধি, পারিবারিক জীবন, সামাজিক ন্যায়, দান, বিশ্রাম ও অন্যান্য দৈনন্দিন আচরণের বিধান রয়েছে।
৫. নৈতিক জীবন ও ন্যায়বিচার ইহুদি ধর্মে ঈশ্বরের প্রতি আনুগত্যের পাশাপাশি ন্যায়, সত্য, দয়া, দরিদ্রের প্রতি সহায়তা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। নবীদের শিক্ষায় সামাজিক ন্যায় ও নৈতিকতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
৬. সাবাথ (Shabbat) প্রতি সপ্তাহের সপ্তম দিন—শুক্রবার সূর্যাস্ত থেকে শনিবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত—শাবাত হিসেবে পালন করা হয়। এটি বিশ্রাম, উপাসনা ও পারিবারিক জীবনের জন্য নির্ধারিত পবিত্র সময়।
৭. উপাসনা ও প্রার্থনা ইহুদি ধর্মে প্রার্থনা, তোরাহ পাঠ এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক উপাসনা গুরুত্বপূর্ণ। সিনাগগ (Synagogue) হলো ইহুদিদের প্রধান উপাসনা ও ধর্মীয় শিক্ষার স্থান।
৮. পবিত্র দিবস ও উৎসব ইহুদি ধর্মীয় বর্ষপঞ্জিতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব রয়েছে— Pesach (পেসাখ) — মিসর থেকে ইসরায়েলীয়দের নির্গমনের স্মরণ Shavuot (শাভুওত) — তোরাহ প্রদানের ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত Sukkot (সুক্কোত) — মরুভূমিতে ইসরায়েলীয়দের বিচরণ স্মরণ Rosh Hashanah — ইহুদি নববর্ষ Yom Kippur — প্রায়শ্চিত্ত ও ক্ষমাপ্রার্থনার দিন
৯. ইসরায়েলীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় পরিচয় ইহুদি ধর্মে ইসরায়েল শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান নয়; ইসরায়েলীয় জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক পরিচয়েরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আব্রাহাম, ইসহাক, ইয়াকুব, মুসা, দাউদ প্রমুখের ঐতিহ্য এই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত।
১০. পরকাল, মসিহা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা ইহুদি ধর্মে পরকাল, মৃতের পুনরুত্থান, মসিহা (Messiah) এবং ভবিষ্যৎ জগত সম্পর্কে বিভিন্ন মত রয়েছে। এগুলোর ব্যাখ্যা সব ইহুদি সম্প্রদায়ে একরকম নয়। বিশেষত রাব্বিনিক ইহুদি ধর্মে এসব ধারণার বিভিন্ন ব্যাখ্যা বিকশিত হয়েছে।