হজরত আলী (রাঃ)
(৬০১-৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ)
সুন্নি অনুসারীদের মতে ইসলাম ধর্মের চতুর্থ খলিফা।
আনুমানিক ৬০১ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ই সেপ্টেম্বর কাবাগৃহের অভ্যন্তরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আবু তালিব ইবন আব্দুল মুত্তালিব
ছিলেন কুরাইশ গোত্রের প্রভাবশালী শাখা বনু হাশিমের নেতা। তিনি
কাবা'র
রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর মা ফাতিমা বিন্ত আসাদ
কাবা'র
রক্ষণাবেক্ষণের অংশভাগী ছিলেন। তাঁর গর্ভযন্ত্রণা উপস্থিত
হলে- তিনি কাবাগৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেন। এবং সেখানে আলী (রাঃ)-এর জন্ম হয়।
জন্মের পর তিনি ও তাঁর মা তিন দিন পর্যন্ত কাবার অভ্যন্তরে অবস্থান করেন।
এরপর এই গৃহের বাইরে আসার পর
হজরত মুহম্মদ
(সাঃ) তাদের অভ্যর্থনা জানান এবং নবজাতককে অন্নপ্রাশন করান।
হজরত মুহম্মদ
(সাঃ) নিজেই শিশুটির নাম রাখেন 'আলী' । এর অর্থ
হলো- 'উন্নত ও মহান'।
শৈশব তাঁর পিতা আবু তালিব অর্থ সংকটে পড়লে-
মুহম্মদ (সাঃ) ও তাঁর স্ত্রী
খাদিজা রাঃ -
তাঁকে দত্তক নেন। শিশুকালে
মুহম্মদ (সাঃ)-তাঁকে পুত্রস্নেহে লালন করেন। তিনি
মুহম্মদ (সাঃ) -এর সকল কাজে সহযোগিতা করতেন। হেরা পর্বতের গুহায়
মুহম্মদ (সাঃ) যখন ধ্যানমগ্ন থাকতেন, আলি (রাঃ) প্রায়ই তাঁর সাথে থাকতেন। কখনো কখনো তাঁরা একসাথে ৩-৪ দিন পর্যন্ত পাহাড়ে অবস্থান করতেন। আলী (রাঃ) মাঝে মাঝে মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জন্য খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতেন।
মুহম্মদ (সাঃ) -এর
নবুয়ত লাভের পর-
খাদিজা রাঃ
প্রথম ইসলাম ধর্মগ্রহণ করেন। এরপরই দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আলী (রাঃ) এই ধর্মগ্রহণ
করেছিলেন।
মক্কায় মুসলমানদের ওপর অত্যাচার এবং বনু হাশিম গোত্রের প্রতি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বর্জন চলাকালীন আলী (রাঃ) অবিচলভাবে নবিজীরএর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
মুহম্মদ (সাঃ) তায়েফ শহরে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন তায়েফের কিশোররা তাঁকে পাথর নিক্ষেপ করে আঘাত করা শুরু করে। সেই মুহূর্তে আলি (রাঃ) নিজের জীবন বিপন্ন করে নবীজিকে রক্ষা করেন এবং আক্রমণকারীদের সরিয়ে দেন।
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে
মুহম্মদ (সাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রের খবর পাওয়ার পর,
তিনি নিরাপত্তার জন্য
মদিনাতে হিজরত করেন। এই সময় আলি (রাঃ) নবীজির জীবন রক্ষার্থে মক্কায় থেকে যান এবং নবীজির ছদ্মবেশ ধারণ করে শত্রুদের বিভ্রান্ত করেন।
এরপর মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব বন্ধন স্থাপনকালে
নবিজী আলি (রাঃ)-কে নিজের ভাই হিসেবে মনোনীত করেন ।
আনুমানিক ৬২৩ থেকে ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মুহম্মদ (সাঃ) তাঁর কন্যা ফাতিমাকে
আলি (রাঃ)-এর সাথে বিবাহ দেন।
৬২৬ খ্রিষ্টাব্দে ওহুদের যুদ্ধে তিনি
নবিজীর জীবন রক্ষার্থে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন।
৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে খন্দকের
যুদ্ধে তিনি নবিজীর জীবন রক্ষার্থে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। আমর ইবনে আবদে ওদ নামক প্রসিদ্ধ আরব যোদ্ধাকে পরাজিত করে
খ্যতি লাভ করেন।
৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে বদরের যুদ্ধে
তিনি মুসলিম বাহিনীর পতাকা
বহন করেছিলেন।
৬২৮ খ্রিষ্টাব্দে আলি (রাঃ) হুদায়বিয়া য় মুসলমান ও মুশরিকদের মধ্যে ঐতিহাসিক
চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই বছরে অনুষ্ঠিত খায়বারের যুদ্ধে তিনি মুসলিম বাহিনীর পতাকা
বহন করেছিলেন। বলা হয়ে থাকে- খায়বারের যুদ্ধের বিজয়ে তিনি মূখ্য
ভূমিকা রেখেছিলেন।
৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে হুনায়ুনের যুদ্ধে
তিনি নবিজীর জীবন রক্ষার্থে তিনি অসীম বীরত্বের পরিচয় দেন। এই বছরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কুরআনিক ঘোষণা প্রচারের জন্য
মুহম্মদ (সাঃ)
আলি (রাঃ )-কে নিয়োগ দেন। সুন্নি হাদিস সংকলন সুনান আন-নাসাঈ অনুসারে এটি ছিল একটি ঐশ্বরিক নির্দেশ।
এ ছাড়া এই বছরে মক্কা বিজয়ে আলি (রাঃ )-এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজয়ের পর তিনি কাবা শরিফের ভেতরে অবস্থিত সমস্ত মূর্তি অপসারণ করেন।
৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে তাবুকের যুদ্ধ চলাকালে তিনি মদিনায় অবস্থান করেন
এবং নগরীর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন ।
৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে আলি (রাঃ) ইয়েমেনে ইসলাম প্রচারের বিশেষ দূত হিসেবে প্রেরিত হন। তাঁর সফল প্রচারণার ফলে হামদান গোত্র শান্তিপূর্ণভাবে ইসলাম গ্রহণ করে। এছাড়াও তিনি বানু জাধিমা গোত্রের সাথে মুসলমানদের সম্ভাব্য রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ঠেকিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান নিশ্চিত করেন।
৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে
মুহম্মদ (সাঃ)
মৃত্যুর পর, যখন তাঁর দাফন কর্ম নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিলেন- তখন মক্কার আনসারদের
একাংশ 'সাকিফা বনু সায়িদা' নামক স্থানে সমবেত হয়ে- তাঁর এবং তাঁর অনুসারীদের
অনুপস্থিতিতে
আবু বকর
সিদ্দিকী (রাঃ) -কে প্রথম খলিফা ঘোষণা করা হয়।
বনু হাশিম গোত্র এবং মুহম্মদ (সাঃ)-এর কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবি দ্রুত আলী (রাঃ)-এর বাসভবনে একত্রিত হয়ে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। এই প্রতিবাদকারীদের মধ্যে হযরত জুবায়ের (রাঃ) এবং নবিজীর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিব (রাঃ)-এর মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
এই সংবাদ পেয়ে হযরত উমর (রাঃ) একটি সশস্ত্র দল নিয়ে হযরত আলী (রাঃ)-এর বাসভবনে উপস্থিত হন এবং স্পষ্ট ভাষায় হুমকি দেন যে, যদি
আলী (রাঃ) ও তাঁর অনুসারীরা আবু বকর (রাঃ)-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ না করেন, তবে তিনি বাড়িটি জ্বালিয়ে দেবেন। এই
অবস্থায় হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর হস্তক্ষেপ ও অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে উমর (রাঃ) ও তাঁর দল সেখান থেকে ফিরে যান।
আবু বকর (রাঃ) বনু হাশিম গোত্রের উপর একটি কার্যকর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বয়কট আরোপ করেন।
এবং আবু বকর (রাঃ) হযরত ফাতিমা (রাঃ)-এর কাছ থেকে
ফাদাকের উর্বর কৃষিজমি জব্দ করে নেন।
উল্লেখ্য, হযরত ফাতিমা (রাঃ) এই সম্পত্তি তাঁর পিতার উত্তরাধিকারসূত্রে এই জমি বিশেষ উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন।
৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে
আবু বকর
(রাঃ) , তাঁর মৃত্যুর পূর্বে তিনি উমর (রাঃ)-কে তার উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেন। তবে এই নিয়োগে আলী (রাঃ)-এর সাথে কোনো ধরনের পরামর্শ করা হয় নি।
এই নিয়োগে প্রাথমিকভাবে কয়েকজন প্রবীণ সাহাবি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। হযরত উমর (রাঃ)-এর
শাসনামলে তিনি স্বেচ্ছায় নিজেকে সরিয়ে রাখেন। হযরত উসমান (রাঃ)-এর শাসনামলে জনজীবন থেকে অনেকটা দূরে সরে যান। তিনি রিদ্দার যুদ্ধ এবং প্রাথমিক মুসলিম বিজয় অভিযানসমূহে সরাসরি অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।
তবে তিনি আবু বকর (রাঃ) ও হযরত উমর (রাঃ)-কে প্রশাসনিক ও ধর্মীয় বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করতেন।
৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে হজরত উমর (রাঃ)-এর মৃত্যুর পূর্বে- তিনি একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট শুরা কমিটি গঠন করেন।
এই কমিটি পরবর্তী খলিফা নির্বাচন করার দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই কমিটিতে হযরত আলি (রাঃ) এবং হযরত উসমান (রাঃ) ছিলেন প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী। উমর (রাঃ)-এর
মৃত্যুর পর খলিফা নির্বাচিত হন ওসমান (রাঃ) ।
হজরত আলীর খিলাফতের বৈধতা
৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দের উসমান (রাঃ)-এর মৃত্যুর পর, পরবর্তী খলিফার হওয়ার ক্ষেত্রে
হজরত আলী (রাঃ) এবং তালহা (রাঃ)-এর নাম ঘোষিত হয়। শেষ পর্যন্ত
আলী (রাঃ)
চতুর্থ খলিফা নির্বাচন হন। তবে তাঁর নির্বাচন একটি ছয় সদস্যবিশিষ্ট শুরা কমিটির আনুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে হয় নি।
তবে মদিনা বা মক্কায় বড় ধরনের বিরোধের সৃষ্টি হয় নি। তাঁর বিরুদ্ধে পূর্বর্তী
খলিফা ওসমান (রাঃ)-কে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু সুবিধা বঞ্চিত সাধারণ আলী
(রাঃ)-কে সমর্থন করেছিলেন। অন্যদিকে কুরাইশ বংশের অনেকেই খলিফা হতে চেয়েছিলেন, তাই
তাঁদের সমর্থন তিনি পান নি।
হযরত আলী (রাঃ)-এর খিলাফত গ্রহণের পরপরই হযরত
আয়সা (রাঃ) প্রকাশ্যে
তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেন। তিনি মক্কায় গিয়ে তালহা (রাঃ) ও যুবায়ের (রাঃ)-কে
সাথে নিয়ে হযরত উসমান (রাঃ)-এর হত্যাকারীদের শাস্তির দাবি তোলেন এবং আলী (রাঃ)-কে হত্যার ষড়যন্ত্রে জড়িত বলে অভিযুক্ত করে।
একই সাথে তাঁরা আলী (রাঃ)-এর পদত্যাগের দাবি জানান। তাঁর নতুন খলিফা নির্বাচনের
জন্য কুরাইশ নেতাদের নিয়ে একটি পরিষদ গঠন করার প্রস্তাব দেন। অনেকেই মনে করেন- আলী (রাঃ)-কে ক্ষমতাচ্যুত করাই ছিল
এই প্রচারণার উদ্দেশ্যে। তাঁরা হেজাজ অঞ্চলে প্রচারণা চালিয়ে ব্যর্থ হলে বাসরা শহর দখল করে নেন এবং সেখানে আলী (রাঃ)-এর
সমর্থকদের হত্যা করেন। আলী (রাঃ) কুফা থেকে এক বিশাল সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং তাঁর
সেনবাহিনী নিয়ে বাসরায় মুখোমুখী হন। এই সময় প্রতিটি বাহিনীতে প্রায় দশ হাজার সৈন্য ছিল। তিন দিনব্যাপী আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর, উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ৬৫৬
খ্রিষ্টাব্দে ডিসেম্বর মাসে বিদ্রোহী সৈন্যরা আক্রমণ করলে, উভয় পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।
এই যুদ্ধে হজরত আয়শা (রাঃ) সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তিনি একটি লাল বর্ণের উটের পিঠে বর্ম দ্বারা সুরক্ষিত বিশেষ হাওদায়
অবস্থান নিয়েছিলেন। এই যুদ্ধে
মারওয়ান ইবনে হাকাম (উসমান রাঃ-এর সচিব ছিলেন), বিদ্রোহী দলে থেকেই তালহা
(রাঃ)-কে হত্যা করেন। জুবাইর (রাঃ) যুদ্ধ শুরুর অল্প সময় পরেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে রণক্ষেত্র
ত্যাগ করেন। আলী (রাঃ)-এর সৈন্যরা তাঁকে ধাওয়া করে হত্যা করেছিলেন। এই যুদ্ধে আলী
(রাঃ) জয় লাভ করেন। তিনি হজরত আয়শা (রাঃ) পূর্ণ সম্মান দিয়ে হেজাজে পাঠিয়ে দেন। তিনি
সবার জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেন। তিনি যুদ্ধবন্দী নারীদের দাসত্বে নেওয়া সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। যুদ্ধকালীন সময়ে বাজেয়াপ্তকৃত সকল সম্পত্তি তাদের প্রকৃত মালিকদের ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এই বিজয়ের পর তিনি কুফা শহরে স্থায়ীভাবে অবস্থান নেন। তাঁর শাসনামলের কুফা কার্যকর রাজধানীতে পরিণত হয়েছিল।
মুয়াবিয়ার বিদ্রোহ
সিরিয়ার তৎকালীন গভর্নর মুয়াবিয়াকে আলী (রাঃ) প্রশাসনিক দুর্নীতিতে জড়িত
থাকার অভিযোগে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি মারফত গভর্নর পদ থেকে অপসারণের নির্দেশ
দেন। এরপর তিনি উসমান (রাঃ)-এর হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করে, সিরিয়া জুড়ে একটি
ব্যাপক প্রচারণা চালান। রাজনৈতিক সমর্থন বৃদ্ধির লক্ষ্যে মুয়াবিয়া প্রখ্যাত
সেনানায়ক আমর ইবনুল আসের সাথে একটি জোট গড়ে তোলেন। তিনি মিশরের আজীবনের গভর্নর পদ
লাভের শর্তে উমাইয়া বাহিনীতে যোগ দেন। একই সাধে মুয়াবিয়া গোপনে আলী
(রাঃ)-এর কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করেছিলেন যে, তিনি যদি তাঁকে সিরিয়া ও মিশরের
শাসনভার ছেড়ে দেন, তবে তিনি আলী (রাঃ)-এর খিলাফত মেনে নেবেন। মুয়াবিয়ার বিদ্রোহ
দমনের জন্য আলী (রাঃ) প্রায় ১ লক্ষ সৈন্য নিয়ে অগ্রসর হন। এই সময় মুয়াবিয়ার
সৈন্য ছিল প্রায় ১ লক্ষ ৩০ হাজার। ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দে গ্রীষ্মকালে ফোরাত নদীর তীরে
উভয় বাহিনী মুখোমুখী হয়। উভয় পক্ষ কয়েকদিন ধরে শান্তিপূর্ণ আলোচনা চালিয়েও কোনো
সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে- ৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুলাই, বুধবার মূল যুদ্ধ শুরু
হয়। টানা তিন দিন ধরে যুদ্ধ চলার পর দুপক্ষ বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে একমত হয়। ফলে এই
যুদ্ধ থেমে যায়। যুদ্ধের পর আমর ইবনুল আস (রা) মুয়াবিয়ার (রা) পক্ষ থেকে ও আবু
মুসা আশয়ারি (রা) আলির (রা) পক্ষ থেকে আলোচক নিযুক্ত হন। সাত মাস পর ৬৫৮
খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে, আধরুহ নামক স্থানে সাক্ষাতের পর, আমর ইবনুল
আস (রা) আবু মুসা আশয়ারিকে (রা) এ মর্মে রাজি করান যে, দুপক্ষই লড়াই বন্ধ করবে
এবং একজন নতুন খলিফা নিযুক্ত করা হবে। আলি (রাঃ) ও তাঁর সমর্থকরা এ সিদ্ধান্তে
হতবাক হয়ে যান। আলি (রাঃ) এ সিদ্ধান্ত মানতে অস্বীকৃতি জানালেও মীমাংসা মেনে নেন।
এর ফলে আলী (রাঃ) অবস্থান তার নিজের সমর্থকদের মধ্যেও দুর্বল হয়ে পড়ে।
পরে আলির (রাঃ) বাহিনী থেকে বেশ কিছু সৈন্য বের হয়ে যায়। এই দল খারিজি নামে পরিচিত হয়ে উঠে। ৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে
আলী (রাঃ) ও খারিজিরা মুখোমুখি হয়। আলী (রাঃ) যুদ্ধে জয়ী হলেও ক্রমাগত সংঘর্ষ তার অবস্থানের উপর প্রভাব ফেলছিল।
ইবনে মুলজিম নামে একজন খারেজি ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জানুয়ারি, কুফার শাহী মসজিদে বিষাক্ত
একটি তলোয়ার দিয়ে হযরত আলী রাঃ এর মাথায় আঘাত করে এবং এই আঘাতের কারণেই ঘটনার দুইদিন পর
মৃত্যবরণ করেন।
হজরত আলীর শাসন ব্যবস্থা
খিলাফতকাল কঠোর ন্যায়নীতি বাস্তবায়নের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন। তিনি নবুয়তী যুগের শাসনাদর্শ পুনরুজ্জীবিত করতে গিয়ে ব্যাপক সংস্কার কার্যক্রম হাতে
নেন। তিনি হযরত উসমান (রা.)-এর নিয়োগকৃত দুর্নীতিগ্রস্ত প্রাদেশিক শাসকদের অপসারণ করেন।
মুহম্মদ (সাঃ)
-এর বিধি অনুসারে তিনি তিনি অতিরিক্ত কর আদায় বন্ধ করে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ও রাজস্ব মুসলিম জনগণের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন
করার রীতি প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি সৈন্যদের জন্য বিশেষ আচরণবিধি প্রণয়ন করেছিলেন।
এই বিধিতে ছিল- বেসামরিক জনগণকে হয়রানি না করা, আহত ও পলায়নপর শত্রুসৈন্যদের হত্যা না করা, মৃতদেহ বিকৃত না করা, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত বাসস্থানে প্রবেশ না করা, কোনো প্রকার লুটতরাজ না করা, নারীদের প্রতি কোনো প্রকার অত্যাচার না করা। তিনি
যুদ্ধ জয়ের পর নারীদের দাসে পরিণত করার প্রথা নিষিদ্ধ করেছিলেন। অবশ্য এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু অসন্তোষ দেখা দিয়েছিল।
তাঁর তরবারীর নাম ছিল জুলফিকার।
হজরত আলী (রাঃ)-এর পরিবার
- প্রথমা স্ত্রী:
- দ্বিতীয়া স্ত্রী:
- উমামা বিনতে আবিল আস
- হিলাল ইবনে আলী
- আউন ইবনে আলী
- তৃতীয় স্ত্রী:
- ফাতিমা বিনতে হুজাম
- আব্বাস ইবনে আলী
- আবদুল্লাহ ইবনে আলী
- জাফর ইবনে আলী
- উসমান ইবনে আলী
- চতুর্থ স্ত্রী
- পঞ্চম স্ত্রী
- আসমা বিনতে উমায়েস
- ইয়াহিয়া ইবনে আলী । ভিন্ন মতে আরও একঅটি সন্তান ছিল।
তাঁর নাম ছিল আওন।
- ষষ্ঠ স্ত্রী