অঞ্জলি সেনগুপ্তা
ঘটনাক্রমে
ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের নজরুল ইসলামের সাথে পরিচয় ঘটেছিল।
১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের
মার্চ মাসে
নজরুল ইসলাম
আর্থিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক অস্থিরতার ছিলেন
এবং এপ্রিল মাসে তা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এই সময় পাঠ্যপুস্তক-ব্যবসায়ী
আলী আকবর খান তাঁকে পাঠ্যপুস্তক লেখার কাজে উৎসাহিত করতে থাকেন। কিন্তু নজরুল তখনও এই কাজে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন না। তাঁর মানসিক অস্থিরতা কিছুটা কাটিয়ে ওঠার উদ্দেশ্যে আলী আকবর খান তাঁকে তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার দৌলতপুরে যাওয়ার প্রস্তাব দেন।
অবশেষে
১৩২৭ বঙ্গাব্দের ২১ চৈত্র রবিবার (৫ এপ্রিল ১৯২১ ), নজরুল কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
এপ্রিল মাসের ৪ তারিখে (সোমবার, ২২ চৈত্র ১৩২৭), কুমিল্লায়
আলী আকবর ও নজরুল এসে উঠেছিলেন কুমিল্লার কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ইন্সপেক্টর ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের
বাড়িতে।
এখানেই ইন্দ্রকুমার-এর পরিবারের সাথে অঞ্জলি সেনগুপ্তার প্রথম নজরুলের দেখা হয়। তখন
তার ব্য়স ছিল ৫-৬ বৎসর।
৫ এপ্রিল (মঙ্গলবার, ২৩ চৈত্র ১৩২৭)
আলী আকবর
নজরুলকে সাথে নিয়ে, তাঁর গ্রামের বাড়ি দৌলতপুরে যান।
আলী আকবরের পরিবারের কর্ত্রী ছিলেন, তাঁর
বিধবা মেজ বোন একতারুন্নেসা। এই বোনের কন্যা সৈয়দা খাতুনকে দেখে নজরুল মুগ্ধ হন। আলী আকবর বিষয়টি বুঝতে পরে
তাঁর এই ভাগ্নীর সাথে মেলামেশার সুযোগ করে দেন। মুগ্ধ কবি সৈয়দা খাতুনের নাম দিলেন
'নার্গিস'।
১৯২১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই জুন (শুক্রবার ৩রা আষাঢ় ১৩২৮) কুমিল্লার দৌলতপুরে, নজরুল ইসলামের সাথে
নার্গিসের আক্দ আসর বসে দৌলতপুরস্থ
আলী আকবর খানের বাসায়। এই অনুষ্ঠানে আলী আকবর খান কুমিল্লা থেকে সপরিবারে
ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তকে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। বিবাহ অনুষ্ঠানে ইন্দ্রকুমারের
পরিবারের প্রায় সকলেই দৌলতপুরে গিয়েছিলেন।
মুজাফ্ফর আহমদের 'কাজী নজরুল ইস্লাম স্মৃতিকথা' গ্রন্থে ইন্দ্রকুমার
সেনগুপ্তের সাথে আর যাঁরা দৌলতপুর গিয়েছিলেন তাঁর একটি তালিকা পাওয়া যায়। এঁরা
ছিলেন- ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত, বিরজাসুন্দরী দেবী (ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের স্ত্রী),
বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ছেলে, বীরেন্দ্রকুমারের স্ত্রী, বীরেন্দ্রকুমার
সেনগুপ্তের শিশুপুত্র প্রবীরকুমার সেনগুপ্ত, গিরিবালা দেবী (বীরেন্দ্রকুমার
সেনগুপ্তের বিধবা জ্যেঠী মা), কুমারী প্রমীলা সেনগুপ্তা (গিরিবালা দেবীর ১৩ বছরের
কন্যা), কুমারী কমলা সেনগুপ্তা (ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের ১২ বছরের মেয়ে), অঞ্জলি
সেনগুপ্তা ওর্ফে জটু ও সন্তোষকুমার সেন (জ্ঞাতি
কিশোর)।
আক্দের আসরে প্রথম তর্ক শুরু হয় কাবিনের শর্ত নিয়ে। এছাড়া কন্যাপক্ষ
থেকে দাবি করা হয় যে, বিবাহের পর নজরুলকে ঘর-জামাই হয়ে থাকতে হবে।
এই বিষয়টি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক উপস্থিত হলে, নজরুল বিবাহ-আসর থেকে
উঠে আসেন। অনেকে মনে করেন যে, আকদ সম্পন্ন হওয়ার আগেই নজরুল বিবাহের আসর ত্যাগ করেছিলেন।
এই কারণে সন্দেহ হয়, আদৌও নজরুলের সাথে নার্গিসের আনুষ্ঠানিক বিবাহ হয়েছিল কিনা।
বিয়ের আসর ত্যাগ করে, নজরুল প্রায় ১১ মাইল কাদা-বিছানো পথে হেঁটে
১৮ই জুন (শনিবার,
৪ঠা আষাঢ়) সকাল বেলায় কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাসায় উঠেছিলেন।
এই সময় নজরুল কিছুদিন এই বাসাতে ছিলেন। নজরুল
বিরজাসুন্দরী দেবীকে মা হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনিও প্রথম দর্শনেই নজরুলকে
পুত্রস্নেহে কাছে টেনে নেন। ফলে নজরুল তাঁর দুই কন্যা প্রমীলা
সেনগুপ্তা এবং অঞ্জলি সেনগুপ্তাকে বোন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন।
নজরুল তাঁর 'হারা ছেলের চিঠি'-তে
এ বিষয়ে লিখেছেন-
'তুমি এসে দাঁড়াতেই আমি কেন অভিভূতের মতো তোমার পানে চেয়ে রইলাম। আমার এখন মুখর মুখও মূকের মতো কথা হারিয়ে ফেলল।
আমি তোমায় চিনলাম। কত দেশ-বিদেশেই তো ঘুরে বেড়ালাম, কিন্তু এমন ভরাট শান্ত স্নিগ্ধ মাতৃরূপ তো আর আমার চোখে পড়েনি। সে রাজরাজেশ্বরী বিশ্বমাতার অন্নপূর্ণা-রূপে দু-চোখ আমার ভরে গেল! তোমার বিহ্বল চোখের চাওয়াতেও জন্ম-জন্মান্তরের মাতৃত্বের অতৃপ্ত ক্ষুধিত চেনা চাওয়া দেখেই আমি চিনলাম, এ যে আমারই হারা-মায়ের দৃষ্টি! তুমি বলেছিলে নাকি, তোমার কোন-সে অতীত-জন্মের হারা-মানিককে খুঁজে পেতেই এমন করে বারেবারে শত শত মা-হারা ছেলের মা হচ্ছ! এমন করে বিশ্বমায়ের ফাঁদ পেতেছে সেই পলাতকা শিশুকে ধরবার জন্য। তাই তুমি ধর্ম-সমাজ কিছু মানোনি, সকল পথে-পাওয়া ছেলেকেই সমানভাবে কোলে দিয়েছ। আকাশে বাতাসে আমার মনের কথা ধ্বনিত হলো; ওরে, এবার আমায় পথে বেরিয়ে পড়া সার্থক হয়েছে! এবার আমি বুঝি 'অসংখ্য বন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ'। কত কথাই না মনে হলো তখন, সে যেন কেমন এক অভিভূতের ভাব। সেসব মনে পড়ে এত বিহ্বল হয়ে পড়ছি আমি যে, আজ তা জানাতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলছি। ... যাক, সে রাত্রিতে বড় শান্তির ঘুম ঘুমালাম- এই সুখে যে, আজ আমি ঘরের কোলে ঘুমাচ্ছি। ... তারপর, বুকে তীর বিঁধে আবার যখন আহত পাখিটির মতন রক্তবমন করতে করতে তোমার দ্বারে এসে লুটিয়ে পড়লাম, তখন তুমি আর মাসি-মা আমায় কী যত্নেই না বুকে করে এসে তুলে নিলে। তোমরা আর আমার ঐ শিশু-বোন কটিই আবার যমের দ্বার হতে আমায় ফিরিয়ে আনলে। আজ ভাবছি কী ঘরের মায়ায় বনের হরিণকে মুগ্ধ করলে ? আশীর্বাদ করো মা, তোমাদের এই দেওয়া প্রাণ যেন তোমাদেরই কাজে লাগিয়ে যেতে পারি।
এই
শিশু বোন একটি ছিলেন একজন অঞ্জলি সেনগুপ্তা। তাঁকে নিয়ে লেখা
খুকি ও কাঠবেরালি
সম্পর্কে মুজাফ্ফর আহমদ
তাঁর 'কাজী নজরুল ইসলাম স্মৃতিকথা'য় লিখেছেন-
খুকী ও কাঠবেরালি" নজরুলের একটি শিশু কবিতা। তার ঝিঙেফুল নামক পুস্তকে কবিতাটি ছাপা হয়েছে । এর রচনার জায়গা কুমিল্লা। তবে, দৌলতপুর হতে কুমিল্লায় ফিরে এসে সে কবিতাটি লিখেছিল, কিংবা তার পরের বারে লিখেছিল তা আমার মনে নেই। এর রচনার পেছনে যে ঘটনা ঘটেছিল নজরুল তা আমাদের বলেছিল। সে একদিন দেখতে পেল যে শ্রীইন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের শিশু কন্যা জটু (ভালো নাম শ্রীমতী অঞ্জলি সেন) একা একা কাঠবেরালির সঙ্গে কথা বলছে। তা দেখেই সে কবিতাটি লিখে ফেলে। এই কবিতার 'রাঙা! দা' হচ্ছেন শরীবীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত, বৌদি তাঁর স্ত্রী, আর ছোড়দি বীরেন সেনের বোন কমলা দাশগুপ্ত। 'রাঙা দিদি? মানে প্রমীলা সেনগপ্ত, পরে নজরুল ইসলামের স্ত্রী!...'
কান্দিপাড়া থাকার সময় নজরুল এই পরিবারের তিন কন্যার
গান শেখাতেন। এঁরা ছিলেন- জটু, দুলি (কবির সাথে বিবাহের পর প্রমীলা)
ও আচ্ছি (কমলা সেনগুপ্তা, জটুর বড় বোন ডাক নাম ছিল বাচ্চু)। নজরুল নানা কাজে
কান্দিপাড়ায় না যাওয়ায়- জটু তাঁকে আঁকা বাঁকা অক্ষরে তিন লাইনের একটি পত্র
লেখেন। এর উত্তরে নজরুল একটি পত্রকবিতা লিখে পাঠান। এই কবিতাটি চিঠি
শিরোনামে
বঙ্গীয়
মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা 'মাঘ ১৩২৮ সংখ্যায়
প্রকাশিত হয়েছিল। পড়ে ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে
ঝিঙেফুল গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়ে
প্রকাশিত হয়েছিল। [দেখুন:
চিঠি]
১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩১শে মার্চ অঞ্জলি সেনগুপ্তা মৃত্যুবরণ করেন।
সন্তান:
পুত্র: অশোককুমার সেনগুপ্ত
সূত্র: