জুলিয়াস সিজার
ইংরেজি Julius Caesar
প্রখ্যাত রোমান সেনাপতি ও শাসক। 

খ্রিষ্টপূর্ব ১০০ অব্দে ১২ বা ১৩ জুলাই প্রাচীন রোমের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কথিত আছে, ইনি ছিলেন ট্রয়ের রাজকুমার ঈনিয়াস (Aeneas)-এর বংশধর। তাঁর পিতা গাইয়ুস জুলিয়াস সিজার (Gaius Julius Caesar) ছিলেন রোমান রাজনৈতিক কর্মকর্তা এবং একসময় এশিয়া প্রদেশের শাসনকর্তার দায়িত্ব পালন করেন। মায়ের নাম ছিল আউরেলিয়া কোট্টা (Aurelia Cotta)

জুলিয়াস সিজারের কোনো ভাই ছিল না। তাঁর দুটি বড় বোন ছিল। এদের নাম জুলিয়া সিজারিস মেজর
(Julia Caesaris Major)
জুলিয়া সিজারিস মাইনর  (Julia Caesaris Minor)। প্রথম বোনের সম্পর্কে প্রাচীন সূত্রে খুব অল্প তথ্য পাওয়া যায়। তবে ছোট বোন জুলিয়া সিজারিস মাইনর ছিলেন রোমের প্রথম সম্রাট অগাস্টাসের মাতামহী। তাঁর কন্যা আটিয়া (Atia) ছিলেন অগাস্টাসের মাতা।

শৈশব ও শিক্ষা
জুলিয়াস সিজারের শৈশব কাটে রোমে। তিনি এমন এক সময়ে জন্মগ্রহণ করেন, যখন রোমান প্রজাতন্ত্র রাজনৈতিক সংঘাত ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। তাঁর পরিবার ছিল প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত জুলিয়াই
(Julii) বংশের অন্তর্ভুক্ত। পারিবারিক মর্যাদা থাকলেও তাঁর পরিবার সে সময়ে রোমের সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।

শৈশবেই সিজার রাজনীতি, বাগ্মিতা ও সামরিক জীবনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। সে সময় রোমের সম্ভ্রান্ত পরিবারের তরুণদের মতো তিনিও বক্তৃতা, আইন, সাহিত্য ও দর্শনের শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীকালে তাঁর অসাধারণ বাগ্মিতা ও লেখনীর পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি লাতিন ভাষার পাশাপাশি গ্রিক ভাষাতেও শিক্ষিত ছিলেন।

তরুণ বয়সেই সিজার রোমের রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান রোমের জনপ্রিয়তাবাদী বা পোপুলারেস (Populares) গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিল। এই সময় রোমের রাজনীতিতে মারিয়ুস (Gaius Marius) লুসিকাস কোর্নেলিয়াস সুল্লা (Lucius Cornelius Sulla)-কে কেন্দ্র করে তীব্র সংঘাত চলছিল। উল্লেখ্য, সিজারের খালা জুলিয়া, ছিলেন গাইয়ুস মারিয়ুসের স্ত্রী। ফলে মারিয়ুসের রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্কও ছিল।

সিজারের বিবাহ: তাঁর প্রথম স্ত্রী বা বাগদত্তা। প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য সূত্র Suetonius-এর বিবরণে তাঁকে সিজারের বাগদত্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, স্ত্রী হিসেবে নয়। তিনি কৈশোরে সিজারের সঙ্গে বাগদত্তা হয়েছিলেন এবং আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ৮৪ অব্দে সিজার সেই সম্পর্ক ভেঙে কর্নেলিয়াকে বিবাহ করেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ আছে। Plutarch-এর বিবরণ থেকে কিছু গবেষক মনে করেন, কোস্সুতিয়ার সঙ্গে সিজারের স্বল্পকালীন বিবাহ হয়ে থাকতে পারে। আধুনিক গবেষণাতেও বিষয়টি বিতর্কিত।  খ্রিষ্টপূর্ব ৮৪ অব্দের দিকে তিনি কোস্সুতিয়ার সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ করে কর্নেলিয়া, কনসাল লুসিয়াস কর্নেলিয়াস সিন্‌নার কন্যাকে বিবাহ করেন।

সুল্লার বিরোধিতা ও সিজারের রোম ত্যাগ
খ্রিষ্টপূর্ব ৮২ অব্দে সুল্লা রোমের একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা লাভ করলে তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের দমন করতে শুরু করেন। সিজারও তাঁর বিরোধী রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে বিপদের মধ্যে পড়েন।
সুল্লা তাঁকে তাঁর স্ত্রী কর্নেলিয়া (Cornelia)-কে তালাক দেওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু সিজার সেই নির্দেশ অমান্য করেন। ফলে সিজার কিছু সময়ের জন্য রোম ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁর সম্পত্তির একটি অংশও বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যস্থতায় তাঁর জীবন রক্ষা পায় এবং তিনি রোমে ফিরে আসেন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৮১ অব্দে তিনি এশিয়া প্রদেশের শাসনকর্তা মার্কুস মিনুসিয়াস থার্মুস
(Marcus Minucius Thermus)-এর সামরিক দলে যোগ দেন। থার্মুসের অধীনে তিনি মিতিলেনি এই সময় থার্মুস তাঁকে বিথিনিয়ার রাজা নিকোমেদেস চতুর্থ (Nicomedes IV)-এর কাছে রোমের জন্য নৌবহর সংগ্রহ করতে পাঠান। পরে তিনি কিলিকিয়ায় পুব্লিয়ুস সার্ভিলিয়ুস ভাতিয়া ইসাউরিকুস (Publius Servilius Vatia Isauricus)-এর অধীনে সামরিক দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে তিনি অল্প সময় অবস্থান করেন। (Mytilene) অবরোধে অংশ নেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৮০ অব্দে মিতিলেনি দখলের যুদ্ধে সাহসিকতার জন্য তিনি Civic Crown (Corona Civica) লাভ করেন।

সিজারের রোমে প্রত্যাবর্তন
খ্রিষ্টপূর্ব ৭৮ অব্দে সুল্লার মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে সিজার দ্রুত রোমে ফিরে আসেন। রোমে ফিরে তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫ অব্দে তিনি রোডস দ্বীপে বক্তৃতা ও বাগ্মিতার শিক্ষা নিতে যান। পথে জলদস্যুরা তাঁকে অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। জলদস্যুরা তাঁর মুক্তির জন্য ২০ ট্যালেন্ট মুক্তিপণ দাবি করলে সিজার তা কম মনে করে নিজের মুক্তিপণের পরিমাণ ৫০ ট্যালেন্টে নির্ধারণ করতে বলেন। মুক্তিপণ দেওয়ার পর তিনি মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নিজ উদ্যোগে নৌবাহিনী সংগ্রহ করে সেই জলদস্যুদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। জলদস্যুদের অনুসরণ করেন এবং তাদের গ্রেফতার করেন। পরে তিনি তাঁদের পার্গামনের কারাগারে বন্দী রাখেন এবং এশিয়া প্রদেশের শাসনকর্তার অনুমোদনের অপেক্ষা না করে তাঁদের ক্রুশবিদ্ধ করে মৃত্যুদণ্ড দেন।  

খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯ অব্দে সিজারের খালা জুলিয়ার মৃত্যু হয়। সিজার তাঁর খালার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় জনসমক্ষে একটি শোকভাষণ দেন। এই ভাষণে তিনি জুলিয়া ও মারিয়ুসের পারিবারিক মর্যাদা এবং তাঁদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা তুলে ধরেন। এরপর তিনি ধীরে ধীরে রোমের রাজনৈতিক জীবনে উচ্চপদে উন্নীত হতে থাকেন। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯ অব্দে তিনি কোয়েস্টর
(Quaestor) পদে নির্বাচিত হন। পরে এডাইল (Aedile) এবং প্রেটর (Praetor) পদে অধিষ্ঠিত হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৫ অব্দে এডাইল হিসেবে তিনি রোমে বিভিন্ন জনসাধারণের অনুষ্ঠান ও ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায়। এই বৎসরে তাঁর স্ত্রী কোর্নেলিয়া সিন্নিলা মৃত্যুবরণ করেন।

এরপর তিনি কোয়েষ্টর হিসাবে স্পেনে যান। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৭ অব্দে তিনি রোমে ফিরে আসেন এবং পম্পেইয়াকে (
Pompeia ) বিবাহ করেন।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬৩ অব্দে তিনি
Pontifex Maximus পদের জন্য নির্বাচনে দাঁড়ান এবং সহজেই নির্বাচনে জয়লাভ করেন। এই বৎসরে Catiline ষড়যন্ত্রের মোকাবেলা করে Cicero কনসুল হন। এই ষড়যন্ত্রের সাথে সিজারের কিছু যোগ থাকলেও তিনি রক্ষা পান।

খ্রিষ্টপূর্ব ৬১ অব্দে তিনি হিস্পানিয়ার প্রোপাইটর (propraetor) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে সামরিক অভিযান পরিচালনা করে তিনি সাফল্য অর্জন করেন এবং বিপুল সম্পদ লাভ করেন। এই অর্থ তাঁর ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এরপর সিজার স্পেনের গভর্নর হিসাবে নিয়োগ পান। স্পেন দুটি স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর রাজ্য দখল করেন। এই সময় তিনি
triumph উপাধি লাভ করেন। এরপর তিনি কন্সুল পদের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৬০ অব্দে সিজার পম্পেই (Pompey the Great) ও মার্কুস লিসিনিয়াস ক্রাসুস (Marcus Licinius Crassus)-এর সঙ্গে একটি অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক জোট গঠন করেন। ইতিহাসে এটি প্রথম ত্রয়ীশক্তি (First Triumvirate) নামে পরিচিত। এই জোটের মাধ্যমে তিনজনই নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করতে সক্ষম হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯ অব্দে সিজার রোমের কনসুল নির্বাচিত হন। কনসুল থাকাকালে তিনি পম্পেই ও তাঁর সৈন্যদের জন্য ভূমি বরাদ্দ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর কনসুলের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তিনি প্রাদেশিক শাসন ও সামরিক কর্তৃত্ব লাভ করেন।

গল প্রদেশের শাসনকর্তা
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮ অব্দে সিজার সিসালপাইন গল (Cisalpine Gaul) এবং ইলিরিকাম (Illyricum)-এর শাসনকর্তা ও সামরিক অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সময়ে তিনি ট্রান্সআল্পাইন গল বা গ্যালিয়া নার্বোনেনসিস (Gallia Narbonensis)-এর ওপরও সামরিক কর্তৃত্ব লাভ করেন। এই সময় গলের বৃহত্তর অংশ রোমানদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না। দক্ষিণ গলের নার্বোনেনসিস অঞ্চল আগে থেকেই রোমান প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আল্পসের উত্তরে বিস্তীর্ণ গলীয় অঞ্চল বিভিন্ন কেল্টীয় জাতিগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। এসব জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সংঘাতও ছিল। গলের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে সিজার সেখানে রোমের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ গ্রহণ করেন।

গল যুদ্ধ
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮ অব্দে জুলিয়াস সিজার গলের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর গল অঞ্চলে ধারাবাহিক সামরিক অভিযান শুরু করেন। এই যুদ্ধ প্রায় আট বছর ধরে চলে এবং খ্রিষ্টপূর্ব ৫১ অব্দে প্রধান প্রতিরোধগুলো দমন করার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। এই সময়ে সিজার শুধু গলের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধই করেননি; তিনি রাইন নদী অতিক্রম করে জার্মান ভূখণ্ডে এবং ইংলিশ চ্যানেল পেরিয়ে ব্রিটেনেও অভিযান পরিচালনা করেন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮ অব্দ হেলভেতি ও আরিওভিস্তুসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
গল যুদ্ধের সূচনা হয় হেলভেতিদের গল অঞ্চলের মধ্য দিয়ে অভিবাসনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। হেলভেতিরা বর্তমান সুইজারল্যান্ড অঞ্চলের অধিবাসী ছিল। তারা গলের পশ্চিমাঞ্চলে বসতি স্থাপনের উদ্দেশ্যে নিজেদের ভূখণ্ড ত্যাগ করলে সিজার তাদের অগ্রযাত্রা প্রতিহত করেন। প্রথমে আরার নদীর তীরে সংঘর্ষ এবং পরে বিব্রাক্টের কাছে বড় যুদ্ধে হেলভেতিরা পরাজিত হয় এবং নিজেদের পূর্ববর্তী ভূখণ্ডে ফিরে যেতে বাধ্য হয়। এরপর সিজার জার্মান নেতা আরিওভিস্তুসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। আরিওভিস্তুস সুয়েবি-সহ কয়েকটি জার্মান গোষ্ঠীর নেতা হিসেবে গলের পূর্বাঞ্চলে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছিলেন। সিজার তাঁর সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করলেও তা ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত সংঘর্ষে আরিওভিস্তুস পরাজিত হয়ে রাইন নদীর ওপারে ফিরে যান।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৭ অব্দ: বেলজীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
এই বছর সিজার উত্তর গলের বেলজীয় জাতিগোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালান। বেলজীয়দের কয়েকটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রোমানদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সিজার প্রথমে আক্সোনা নদী অতিক্রম করে তাদের প্রতিরোধ ভেঙে দেন। এরপর নার্ভি-সহ কয়েকটি গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র যুদ্ধ হয়। নার্ভিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রোমান বাহিনী কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়লেও শেষ পর্যন্ত সিজার জয়লাভ করেন। বছরের শেষে বেলজীয় প্রতিরোধ অনেকাংশে ভেঙে পড়ে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬ অব্দ: ভেনেতি ও পশ্চিম গলের অভিযান
খ্রিষ্টপূর্ব ৫৬ অব্দে গলের পশ্চিমাঞ্চলের ভেনেতি জাতিগোষ্ঠী রোমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। ভেনেতিরা সমুদ্রযুদ্ধে দক্ষ ছিল এবং তাদের শক্তিশালী নৌবহর ছিল। সিজারের সেনাপতি ডেসিমুস জুনিয়াস ব্রুটুস আলবিনুসের নেতৃত্বে রোমান নৌবহর তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালায়। মরবিহান উপসাগরের কাছে সংঘটিত নৌযুদ্ধে ভেনেতিরা পরাজিত হয়। একই সময়ে সিজারের অন্যান্য সেনাপতি নর্মান্দি ও পশ্চিম গলের বিভিন্ন অঞ্চল এবং আকিতানিয়া অঞ্চলেও অভিযান পরিচালনা করেন। এর ফলে গলের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু জাতিগোষ্ঠী রোমের অধীনতা স্বীকার করে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫ অব্দ:
রাইন অতিক্রম ও প্রথম ব্রিটেন অভিযান খ্রিষ্টপূর্ব ৫৫ অব্দে উসিপেতেস ও টেনকতেরি নামে জার্মান গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সংঘর্ষের পর সিজার রাইন নদী অতিক্রম করেন। তিনি সেখানে একটি বিশাল কাঠের সেতু নির্মাণ করে রোমান বাহিনীকে নদীর ওপারে নিয়ে যান। এর মাধ্যমে রাইনের পূর্বাঞ্চলের জার্মান গোষ্ঠীগুলোর ওপর রোমের সামরিক শক্তির প্রভাব প্রদর্শন করেন। একই বছর সিজার প্রথমবার ব্রিটেনে অভিযান পরিচালনা করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটেনের কিছু গোষ্ঠীর সঙ্গে গলের বিদ্রোহীদের সম্ভাব্য যোগাযোগ ও সাহায্য বন্ধ করা এবং রোমের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা। তিনি ব্রিটেনের উপকূলে অবতরণ করতে সক্ষম হলেও সেখানে দীর্ঘস্থায়ী বিজয় অর্জন করেননি।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪ অব্দ:
দ্বিতীয় ব্রিটেন অভিযান ও গলে বিদ্রোহ খ্রিষ্টপূর্ব ৫৪ অব্দে সিজার আরও বড় বাহিনী নিয়ে দ্বিতীয়বার ব্রিটেনে অভিযান করেন। এবার তিনি থেমস নদীর দিকে অগ্রসর হন এবং কয়েকটি ব্রিটিশ গোষ্ঠীকে বশ্যতা স্বীকারে বাধ্য করেন। তবে স্থায়ীভাবে ব্রিটেন দখল না করে তিনি গলে ফিরে আসেন। গলে ফিরে আসার পর পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। এ সময় অ্যাম্বিওরিক্সের নেতৃত্বে এবুরোনেস ও অন্যান্য গোষ্ঠী রোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। তিতুরিয়ুস সাবিনুস ও লুসিয়ুস অরেলিয়ুস কোট্টার অধীন রোমান বাহিনী অ্যাম্বিওরিক্সের হাতে ভয়াবহভাবে পরাজিত হয় এবং দুই সেনাপতিসহ বিপুলসংখ্যক রোমান সৈন্য নিহত হয়। এরপর কুইন্টুস টুল্লিয়ুস সিসেরোর শিবিরও আক্রান্ত হয়। সিজার দ্রুত সেখানে পৌঁছে অবরোধ ভেঙে দেন।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩ অব্দ:
নতুন বিদ্রোহ দমন খ্রিষ্টপূর্ব ৫৩ অব্দে গলের বিভিন্ন অঞ্চলে আবার বিদ্রোহের লক্ষণ দেখা দেয়। সিজার নার্ভি, সেনোনেস, কার্নুতেস ও মেনাপি-সহ কয়েকটি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। ত্রেভেরি নেতা ইন্দুতিওমারুসও রোমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সিজারের সেনাপতি টাইটুস লাবিয়েনুসের সঙ্গে সংঘর্ষে ইন্দুতিওমারুস নিহত হন। এই বছর সিজার আবার রাইন নদী অতিক্রম করে জার্মান ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন। তবে এবারও তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল স্থায়ীভাবে জার্মান অঞ্চল দখল করা নয়; বরং গলের বিদ্রোহীদের সম্ভাব্য জার্মান সহায়তা বন্ধ করা এবং রোমের সামরিক শক্তি প্রদর্শন করা।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫২ অব্দ:
ভার্সিঙ্গেতোরিক্সের নেতৃত্বে বৃহৎ গলীয় বিদ্রোহ খ্রিষ্টপূর্ব ৫২ অব্দে গল যুদ্ধের সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ শুরু হয়। আর্ভের্নি নেতা ভার্সিঙ্গেতোরিক্স বিভিন্ন গলীয় জাতিগোষ্ঠীকে একত্রিত করে রোমের বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এমনকি পূর্বে রোমের মিত্র হিসেবে থাকা এদুইরাও শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের সঙ্গে যোগ দেয়। সিজার দ্রুত আক্রমণাত্মক অভিযান শুরু করেন। তিনি ভেল্লাউনোদুনুম, কেনাবুম ও নোভিওদুনুম দখল করার পর আভারিকুম অবরোধ করেন। দীর্ঘ প্রতিরোধের পর আভারিকুম রোমানদের হাতে পতিত হয়। এরপর সিজার গের্গোভিয়ার দিকে অগ্রসর হন। সেখানে ভার্সিঙ্গেতোরিক্সের বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে রোমানরা বড় ধরনের পরাজয়ের সম্মুখীন হয় এবং সিজারকে পশ্চাদপসরণ করতে হয়। এটি গল যুদ্ধে সিজারের অন্যতম উল্লেখযোগ্য পরাজয়। গের্গোভিয়ার পর গলের বিদ্রোহ আরও বিস্তৃত হয়। সিজারকে পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত বাহিনী পুনর্গঠন করতে হয়। এদিকে লাবিয়েনুস প্যারিসি ও তাদের মিত্রদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে সাফল্য অর্জন করেন এবং পরে সিজারের প্রধান বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন। এরপর ভার্সিঙ্গেতোরিক্স আলেসিয়ার দুর্গে আশ্রয় নেন। সিজার আলেসিয়াকে চারদিক থেকে অবরোধ করে বিশাল প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা নির্মাণ করেন। একই সঙ্গে বাইরে থেকে আসা গলীয় সাহায্যকারী বাহিনীকে প্রতিহত করার জন্য আরেকটি প্রতিরক্ষা-রেখা নির্মাণ করা হয়। গলীয় বাহিনী বাইরে থেকে অবরোধ ভাঙার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। খাদ্যাভাব ও দীর্ঘ অবরোধের ফলে ভার্সিঙ্গেতোরিক্স আত্মসমর্পণ করেন। তাঁর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে গলের বৃহৎ সম্মিলিত বিদ্রোহ কার্যত পরাজিত হয়।

খ্রিষ্টপূর্ব ৫১ অব্দ:
শেষ প্রতিরোধ দমন আলেসিয়ার পতনের পরও গলের সর্বত্র যুদ্ধ সম্পূর্ণ শেষ হয়নি। খ্রিষ্টপূর্ব ৫১ অব্দে কয়েকটি অঞ্চলে নতুন করে প্রতিরোধ দেখা দেয়। বিটুরিজ, কার্নুতেস, বেলোভাকি ও আরমোরিক অঞ্চলের বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রোমান বাহিনী অভিযান চালায়। দক্ষিণ-পশ্চিম গলের ক্যাডুর্কি নেতা লুক্টেরিয়ুস ও দ্রাপ্পেসও রোমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। শেষ পর্যন্ত সিজার উক্সেলোদুনুম দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গের পানির উৎস বিচ্ছিন্ন করে তিনি প্রতিরোধকারীদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করেন। এরপর ত্রেভেরি ও অন্যান্য অবশিষ্ট প্রতিরোধও দমন করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৫১ অব্দের শেষদিকে গলের প্রধান সামরিক প্রতিরোধ কার্যত শেষ হয়ে যায়। এইভাবে খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮ থেকে ৫১ অব্দ পর্যন্ত প্রায় আট বছর ধরে চলা গল যুদ্ধের মাধ্যমে সিজার গলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রোমের নিয়ন্ত্রণে আনেন। এই বিজয়ের ফলে রোমান সাম্রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত বহুগুণে বিস্তৃত হয় এবং সিজারের ব্যক্তিগত সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বিপুলভাবে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে এই গল বিজয়ই তাঁকে রোমের রাজনীতিতে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলায় অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।

রোমের পথে রুবিকন অতিক্রম
গল বিজয়ের পর খ্রিষ্টপূর্ব ৫০ অব্দে সিজারের সঙ্গে রোমের সিনেটের বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। সিজারের গল প্রদেশের শাসনকাল শেষের দিকে চলে আসায় সিনেট তাঁকে তাঁর সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে সাধারণ নাগরিক হিসেবে রোমে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়। সিজার আশঙ্কা করেছিলেন, রোমে নিরস্ত্র অবস্থায় ফিরে গেলে তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা তাঁকে বিচারের সম্মুখীন করতে পারে। তিনি প্রস্তাব দেন যে, পম্পেইও তাঁর সেনাবাহিনী ভেঙে দিলে তিনিও তাঁর বাহিনী ভেঙে দেবেন। কিন্তু সিনেটে সমঝোতা না হওয়ায় পরিস্থিতি ক্রমশ গৃহযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যায়।

খ্রিষ্টপূর্ব ৪৯ অব্দের জানুয়ারি মাসে সিনেট সিজারকে রাষ্ট্রের শত্রু ঘোষণা করার পথে এগিয়ে গেলে তিনি তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে গল থেকে ইতালির সীমান্তে এসে পৌঁছান। এরপর তিনি রুবিকন নদী অতিক্রম করেন। এই নদী অতিক্রমের অর্থ ছিল তাঁর প্রাদেশিক সামরিক ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করে সসৈন্যে ইতালিতে প্রবেশ করা এবং কার্যত সিনেটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা। কথিত আছে, এ সময় সিজার বলেন—
“Alea iacta est”—অর্থাৎ, “দানের পাশা নিক্ষিপ্ত হয়েছে।”

রুবিকন অতিক্রম করার পর সিজার দ্রুত ইতালির অভ্যন্তরে অগ্রসর হতে থাকেন। তাঁর অগ্রযাত্রার গতি এত দ্রুত ছিল যে পম্পেই ও তাঁর সমর্থকেরা রোমে যথেষ্ট প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুযোগ পাননি। পম্পেইয়ের হাতে সিজারের তুলনায় অধিক সৈন্যসংখ্যা থাকলেও সেই বাহিনীর বড় অংশ ইতালির বাইরে বিভিন্ন প্রদেশে অবস্থান করছিল। ফলে পম্পেই রোম ত্যাগ করে দক্ষিণ ইতালির ব্রুন্দিসিয়ামে চলে যান। সিজার দ্রুত ইতালির অধিকাংশ অঞ্চল নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন। প্রাচীন লেখক প্লুতার্কের বিবরণ অনুযায়ী, রুবিকন অতিক্রম করার পর মাত্র ষাট দিনের মধ্যে এবং প্রায় রক্তপাত ছাড়াই সিজার সমগ্র ইতালির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন।

পম্পেই ব্রুন্দিসিয়াম থেকে তাঁর সৈন্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে গ্রিসের এপিরাসে চলে যান। সিজার তাঁকে অনুসরণ করতে চাইলেও তখন তাঁর পর্যাপ্ত নৌযান ছিল না। ফলে তিনি প্রথমে রোমে ফিরে এসে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং পরে পম্পেইয়ের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে থাকা স্পেনের দিকে অগ্রসর হন। রুবিকন অতিক্রমের এই ঘটনা থেকেই পরবর্তীকালে ইংরেজি “to cross the Rubicon” বাগ্‌ধারাটির উৎপত্তি হয়েছে বলে প্রচলিত। এর অর্থ—এমন একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া, যার পরে আর সহজে ফিরে আসার সুযোগ থাকে না।

ইতিমধ্যে পম্পেই বলকান উপদ্বীপে বিরাট এক বাহিনী গঠন করেন। পম্পেই ও জুলিয়াস সিজারের মধ্যে রোমের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব নিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই শুরু হয়। সিজার পম্পেইয়ের বাহিনীর মোকাবিলার উদ্দেশ্যে গ্রিসের দিকে অভিযান চালান। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ অব্দে গ্রিসের থেসালিতে অবস্থিত ফারসালাসের প্রান্তরে দু'বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয়। এই যুদ্ধে সিজারের বাহিনী পম্পেইয়ের বাহিনীকে পরাজিত করে।

যুদ্ধে পরাজিত হয়ে পম্পেই মিশরে পালিয়ে যান। সেখানে মিশরের রাজা ত্রয়োদশ টলেমির কর্মকর্তাদের ষড়যন্ত্রে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ অব্দে পম্পেই নিহত হন। এরপর সিজার মিশরে প্রবেশ করেন এবং মিশরের সিংহাসন নিয়ে টলেমি ও তাঁর বোন ক্লিওপেট্রার বিরোধে হস্তক্ষেপ করেন। শেষ পর্যন্ত ক্লিওপেট্রা সিজারের সমর্থনে মিশরের শাসনক্ষমতা লাভ করেন।

ফারসালাসের বিজয়ের পর সিজার তাঁর বিজয়ের সংবাদ রোমে পাঠানোর সময় তিনটি বিখ্যাত শব্দ ব্যবহার করেছিলেন—Veni, vidi, vici—অর্থাৎ, “এলাম, দেখলাম, জয় করলাম।” তবে এই উক্তিটি ফারসালাসের যুদ্ধের পর নয়; খ্রিষ্টপূর্ব ৪৭ অব্দে এশিয়া মাইনরের জেলায় জেলাসের যুদ্ধে দ্রুত বিজয়ের সংবাদ জানাতে তিনি এটি ব্যবহার করেছিলেন বলে প্রাচীন সূত্রে উল্লেখ আছে।

খ্রিষ্টপূর্ব ৪৮ অব্দে সিজার পুনরায় ডিক্টেটর (dictator) নির্বাচিত হন। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে তাঁকে দশ বছরের জন্য ডিক্টেটর নিযুক্ত করা হয়। এরপর খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তাঁকে আজীবন ডিক্টেটর (dictator perpetuo) ঘোষণা করা হয়। এর ফলে তাঁর হাতে রোম প্রজাতন্ত্রের প্রায় একচ্ছত্র রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়।
 
আর খ্রিষ্ট-পূর্ব ৪৪ অব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি আমরণ ডিরেক্টর পদ লাভ করেন। কিন্তু এই একচ্ছত্র ক্ষমতা রোমের বহু সিনেটরের মধ্যে গভীর অসন্তোষ সৃষ্টি করে। একদল ষড়যন্ত্রকারী সিনেটর সিজারকে হত্যার পরিকল্পনা করে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪ অব্দের ১৫ মার্চ, অর্থাৎ রোমান পঞ্জিকার Ides of March দিনে, সিনেটের সভায় ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁকে আক্রমণ করে হত্যা করে। 

মৃত্যুর পূর্বে তিনি তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকার করে গিয়েছিলেন অগাস্টাস
-কে। সেই সূত্রে রোমের পরবর্তী রাজা হন অগাস্টাস
সূত্র: