ওয়াহিদুল হক
ইনি ছিলেন তাঁর ভাই-বোনদের মধ্যে বড়। তাঁর
অপর দুই ভাইয়ের নাম ছিল- রেজাউল হক বাচ্চু (সাংবাদিক, প্রয়াত),
জিয়াউল হক
(প্রকৌশলী), ১৯৭১
খ্রিষ্টাব্দে
পাক বাহিনীর সদস্যরা হত্যা
করেছিলেন। দুই বোনের নাম–
নীলুফার জীনাতুল হক ও নারগীস চৌধুরী।
অল্প বয়সে ইনি তাঁর বাবার সাথে ঢাকায় আসেন। এঁরা প্রথমে থাকতেন চাঁদনীঘাটে, পরে চলে
আসেন ঊর্দু রোডে। এখানে ১৪ কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাসার ৭টি কক্ষের একটি অংশে এঁরা
থাকতেন। এর অপরাংশে থাকতেন বাবু রামেন্দ্র মোহন ও তাঁর পরিবার। এই হিন্দু পরিবারের
সাথে ওয়াহিদুল হকদের ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ট সম্পর্ক। শৈশবের সেই সূত্রে তিনি হয়ে উঠতে
পেরেছিলেন সর্বার্থে একজন অসম্প্রাদায়িক মানুষ। রাগ সঙ্গীতের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা
ছিল। এই সূত্রে তাঁদের বাসায় ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু বহুবার রাগ সঙ্গীত পরিবেশন
করতেন। শৈশবের সে সঙ্গীতের প্রভাবও ওয়াহিদুলের হকের পড়েছিল নিঃসন্দেহে।
তিনি আরমানিটোলা গভর্ণমেন্ট হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা কলেজে এবং এই কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও গবেষক সান্জিদা খাতুনকে বিবাহ করেন। এবং এঁর কাছেই তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের তালিম নেন।
কর্মজীবনে ওয়াহিদুল হক ছিলেন সাংবাদিক। পরবর্তী ৫৪ বছরকাল তিনি সাংবাদিকতা পেশায়
নিয়োজিত ছিলেন। ষাটের দশকে 'দি অবজারভার'-পত্রিকার শিফট্-ইন চার্জ ছিলেন।
পরে 'মর্নিং নিউজ' ও 'দ্যা ডেইলি স্টার' পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক
হিসেবে কাজ করেছেন। এক সময় তিনি 'দ্যা পিপলস্' পত্রিকার সম্পাদক। জীবনের
শেষ দিকে 'অভয় বাজে হৃদয় মাঝে' ও 'এখনও গেল না আঁধার' শিরোনামে নিয়মিত কলাম
লিখেছেন 'দৈনিক জনকণ্ঠ' ও 'দৈনিক ভোরের কাগজ' পত্রিকায়। বাংলাদেশ প্রকৌশল
বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগে ১০ বছরেরও বেশী সময় খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও
তিনি কাজ করেছেন।
পেশা হিসেবে তিনি সাংবাদিক হলেও তিনি মূলত সাংস্কৃতিক সংগঠন ছিলেন। ১৯৬১
খ্রিষ্টাব্দে অন্যান্য সংস্কৃতমনা কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে মিলে- ছায়ানট নামক
সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।
তিনি
১৯৬১ থেকে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত 'ছায়ানট'-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং ১৯৯৯ থেকে আমৃত্যু সহ-সভাপতি
ছিলেন।
১৯৬১
খ্রিষ্টাব্দে
ঢাকায় রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী অনুষ্ঠানের প্রধান আয়োজক
ছিলেন।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে স্বাধীনতা যুদ্ধের
সময় 'স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থা'র প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন।
২০০৭
খ্রিষ্টাব্দের ২৭শে জানুয়ারি বিকাল ৫টায় বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়
মৃত্যুবরণ করেন।
২০০৮
খ্রিষ্টাব্দে সংগীতে বিশেষ
অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ
মরণোত্তর
একুশে পদক
পান।
সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায়
তাঁকে 'স্বাধীনতা
পুরস্কার-২০১০' (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়।
যে সকল ছায়ানট ছাড়া অন্যান্য যেসকল কর্মকাণ্ডের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। সেগুলো
হলো–
তিনি
জাতীয় রবীন্দ্র সঙ্গীত সম্মিলন পরিষদ-এর কার্যকরী পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য,
সহ-সভাপতি এবং ১৯৯৯ থেকে আমৃত্যু সভাপতি ছিলেন।
আবৃত্তি সংগঠন 'কণ্ঠশীলন' এবং শিশু আবৃত্তি সংগঠন শিশুতীর্থ-এর প্রতিষ্ঠাতা।
আনন্দধবনি নামক সঙ্গীত-প্রশিক্ষণ কর্মশালার প্রতিষ্ঠাতা।
মুকুল ফৌজ কিশোর সংগঠনের কর্মী।
বাংলাদেশ ব্রতচারী সমিতি-এর সহ-সভাপতি (২০০৩ সাল থেকে আমৃত্যু)।
বাংলাদেশ আবৃত্তি ফেডারেশন (বর্তমান আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি
পূর্ব পাকিস্তান ফিল্ম সোসাইটি পরে বাংলাদেশ ফিল্ম সোসাইটির- প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
বিজ্ঞান সংস্কৃতি পরিষদ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
বসন্ত উৎসব উদ্যাপন পরিষদ-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
আবৃত্তি পরিষদ-এর সভাপতি
স্বাধীন বাংলা শিল্পী সংস্থা-এর প্রতিষ্ঠাতা
২০০১ সাল থেকে আমৃত্যু 'নালন্দা'র-কার্যকরী পরিষদের সদস্য
প্রকাশিত গ্রন্থ
চেতনা ধারায় এসো
গানের ভিতর দিয়ে
সংস্কৃতিই জাগরণের প্রথম সূর্য
প্রবন্ধ সংগ্রহ
ব্যবহারিক বাংলা উচচারণ অভিধান
সংস্কৃতির ভুবন
আবৃত্তি ও গানের সিডি
সকল কাঁটা ধন্য করে
আজ যেমন করে গাইছে আকাশ
আছ অন্তরে
রবীন্দ্রনাথের কবিতা
সন্তান: অপালা ফরহত নবেদ, পার্থ তানভীর নভেদ্, রুচিরা তাবাস্সুম নভেদ্, এষণ ওয়াহিদ।