![]() |
সার্গোনের ব্রোঞ্জনির্মিত মাথা। ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে নেনেভেহ থেকে এটি পাওয়া গেয়িছিল। |
ইউফ্রেতিস নদী দিয়ে ভেসে যাওয়া শিশুটিকে
দেখতে পায় খেজুর বাগানের মালির ওই মালি, যে ওই সন্তানের পিতা ছিল। মালি এবং তার
স্ত্রী এই শিশুটির প্রতিপালন করেন এবং এর নাম রাখেন সার্গোন।
তরুণ বয়সে তিনি কিশ নগরীর রাজা উর-যাবাবার পেয়ালাবাহক হিসেবে চাকরি শুরু করেন। এই
সময় ইশতার দেবী (ইনানা), কোনো কারণে উর-যাবাবার প্রতি রুষ্ঠ হয়েছিলেন। এক
রাত্রিতে একটি ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখে উর-যাবাবা জেগে ওঠেন। এই স্বপ্নের মাধ্যমে
জানতে পরেছিলেন যে, সার্গোন ইশতার দেবীর সহায়তায় উর-যাবাবাকে হত্যা করে রাজত্ব দখল
করবেন। এরপর উর-যাবাবার আতঙ্কিত হয়ে- সার্গোনকে উরুক নগরীর রাজা লুগালজাজেসি'র কাছে
একটি চিঠি দিয়ে পাঠান। ওই চিঠিতে সার্গোনকে হত্যা করার জন্য- উর-যাবাবা উরুক-রাজাকে
অনুরোধ করেছিলেন। বিষয়টি বুঝতে পেরে- সার্গোন তাঁর নিজস্ব অনুচরদের নিয়ে
লুগালজাজেসি-কে হত্যা করেন এবং উরুক নগরীর ক্ষমতা দখল করেন। রাজা হওয়ার পর রাজ্যের
বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ দেখা দিলে তিনি তা কঠোর হস্তে দমন করেন। এরপর তিনি কিশ
নগরের উত্তরে আক্কাদ নগর প্রতিষ্ঠিত করেন। পরে এই নগরকেন্দ্রিক আক্কাদ সভ্যতার
বিকাশ ঘটে।
সার্গোন ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী সেনবাহিনী তৈরি করেন। এরপর তিনি একে একে নিপপুর, সুসা,
লাগাশ, উর, উরুক দখল করেন। এছাড়া প্রায় চারবার
সিরিয়া ও কেনান
আক্রমণ করে ফখল করেন। এ ছাড়া তিনি
আনাতোলিয়া এবং পশ্চিম ইরানের এলাম অঞ্চল দখল করেছিলেন
এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন। প্রায় ৫৬ বছর তিনি আককাদ শাসন করেছিলেন।
সারগন-এর শাসনের আগে ক্ষমতার উত্তরাধিকার নির্বাচিত হতো ধনী ও অভিজাত গোষ্ঠীর মধ্য
থেকে। সারগন এই রীতি ভেঙে তাঁর প্রথম জ্যেষ্ঠ পুত্রকে সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকার
করার উদ্যেগ নেওয়া হয়।
সার্গোনের সময় রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে কৃষিকাজ পরিচালিত হতো। নিজ রাজ্যের প্রজাদের
জন্য তিনি সদয় হলেও অধিকৃত রাজ্যের জনগণের উপর অত্যাচার করতেন। তিনি কোনো অঞ্চল দখল
করার পর, ওই অঞ্চলের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে কৃষিভূমিতে পরিণত করতেন। এবং সেই জমিতে অধিকৃত
অঞ্চলের মানুষদেরকে দাস হিসেবে কৃষিকাজ করতে বাধ্য করতেন।
তিনি তাঁর এলাকায় পণ্য পরিবহনের উপযোগী সড়ক নির্মাণ করেছিলেন। এছাড়া সংবাদ
আদানপ্রদানের জন্য ডাক ব্যবস্থার প্রচলন করেছিলেন। সার্গোনের রাজত্বের প্রধান অর্থ
উৎস ছিল রাজস্ব। রাজস্ব আদায় এবং অন্যান্য রাজকীয় কাজকর্মে সার্গোন-এর নামাঙ্কিত কাদার তৈরি সিলমোহর ব্যবহার করত
রাজকর্মচারীরা।
এক সময় ধারণা করা হতো- গ্রিকরাই প্রথম ব্রোঞ্জের ব্যবহার শিখেছিল। প্রকৃতপক্ষে আককাদীয়রাই
প্রথম ব্রোঞ্জ
তৈরি এবং তা গলিয়ে শিল্পকর্ম করার কৌশল প্রথম শিখেছিল।
সার্গোনার স্ত্রীর নাম ছিল- তাশহুলতুম। এঁদের পুত্র সন্তানরা ছিলেন রিমুশ,
মানিশটুসু, ইবারুম এবং আবইশ-টাকাল। এঁদের একমাত্র কন্যা ছিলেন এনহিদুয়ানা।
এনহিদুয়ানা ছিলেন প্রতিভাময়ী কবি এবং জ্ঞানী। এই সময়ে
আক্কাদের চন্দ্রদেবতার ছিলেন নানা এবং আকাশ দেবতা ছিলেন আন। তাই সার্গোন উরুক রাষ্ট্রীয় উপাসনালয়ের প্রধান পুরোহিত
হিসেবে এনহিদুয়ানকে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
এখন পর্যন্ত এনহেদুয়ানাই মানবসভ্যতার প্রথম কবি ও গীতিকার হিসেবে বিবেচনা
করা হয়। তিনি প্রচুর প্রার্থনাসংগীত রচনা করেছিলেন। এছাড়া পিতার জন্য প্রচুর
প্রচারণাপত্রও রচনা করেছিলেন।
সার্গোনের মৃত্যুর প্রথম রাজা হন তাঁর জ্যৈষ্ঠ পুত্র রিমুশ। ৯ বৎসর রাজত্ব করার পর,
রিমুশ আততায়ীর হাতে মৃত্যু বরণ করেন। এর পরে সার্গোনের দ্বিতীয় পুত্র মানিশ্তু
রাজা হন। ১৫ বৎসর রাজত্ব করার পর, মানিশ্তু আততায়ীর হাতে মৃত্যু বরণ করেন।
এরপর মানিশ্তুর পুত্র নারাম-সিম রাজত্ব লাভ করেন। উল্লেখ্য নারাম-সিম প্রায়
৫৬ বৎসর রাজত্ব করেছিলেন।
নারাম সিন-এর সময়ে আককাদ সাম্রাজ্যটি ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরের লেবানন, উত্তরে
তুরস্ক এবং দক্ষিণে পারস্য উপসাগর অবধি বিস্তার লাভ করেছিল ।
সূত্র: