এশিয়া মাইনর/আনাতোলিয়া
ইংরেজি : Asia Minor
ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক  : ৩৮ ডিগ্রি উত্তর ৩২ ডিগ্রি পূর্ব।

এর আক্ষরিক অর্থ হলো ছোট এশিয়া small Asia। গ্রিক ভাষা একে বলা হয়  Μικρὰ Ἀσία । এর অপর নাম আনাতোলিয়া (Anatolia)। গ্রিক Ἀνατολή, Anatolḗ শব্দের অর্থ হলো পূর্ব, সূর্য (উদয়)। আধুনিক তুর্কি ভাষায় একে বলা হয় Anadolu। এর অন্যান্য নাম এশিয়ান তুরস্ক, আনাতোলিয়ান উপদ্বীপ, আনাতোলিয়ান উপত্যাকা এবং তুরস্ক।

মূলত বর্তমান তুরস্কের অধিকাংশ অঞ্চলের প্রাচীন নাম হলো এশিয়া মাইনর বা আনাতোলিয়া। এই অঞ্চলটির উত্তরে কৃষ্ণসাগর, পশ্চিমে অজিয়ন সাগর এবং দক্ষিণে ভূমধ্যসাগর। এই উপদ্বীপের পশ্চিম দিকের অজিয়ন সাগর থেকে একটি প্রণালী বের হয়ে মার্মারা সাগরের সাথে মিলিত হয়েছে। এই প্রণালীটি দার্দানেলেস নামে পরিচিত। আর উত্তরের কৃষ্ণসাগরের সাথে মার্মারা সাগরের সংযোগ সাধন করেছে বসফোরাস প্রণালী। মূলত  বসফোরাস প্রণালী এশিয়া থেকে ইউরোপকে পৃথক করেছে।

আনাতোলিয়াকে বলা হয় ইন্দো-ইউরোপীয়ান ভাষাভাষীদের আদি সূতিকাগার। এই অঞ্চলের গোবেক্লি টেপে (Göbekli Tepe)-তে পাওয়া গেছে পৃথিবীর প্রাচীন সমাধিফলক। এই ফলকগুলো তৈরি করেছিল পাথুরে যুগের শিকারীর জনগোষ্ঠী। এ সকল ফলকের গায়ে পাওয়া গেছে নানা ধরনের জীবজন্তুর ছবি। ধারণা করা হয়, এই সমাধিফলকগুলো তৈরি হয়েছিল প্রায় ৯০০০ অব্দের দিকে। এখানে প্রাপ্ত জীবাশ্ম অনুসরণে ধারণা করা যায় যে, এরা বন্য পশুকে হয়েছিল গৃহপালিত পশুতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল।। সেই সময়ে এরা প্রয়োজনীয় উদ্ভিদের চাষ এবং পরিচর্যার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করেছিল। এই অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ৩টি কৃষিভিত্তিক প্রাচীন নগরী। এগুলো হলো-

আনাতোলিয়ান উপপ্রমেয় (Anatolian hypothesis) মতে খ্রিষ্টপূর্ব ৯৮০০-৭০০০ বৎসর আগে আনাতোলিয়ার নব্য প্রস্তরযুগের সূচনা হয়েছিল। এই সময় এই অঞ্চলের মানুষ যে ভাষায় কথা বলতো, সেই ভাষাই ছিল প্রাগ-ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা। তবে আনাতোলিয়ান উপপ্রমেয়ের সমালোচনা করে কোনো কোনো ভাষা বিজ্ঞানী এই অভিমত দিয়েছেন যে, আনাতোলিয়াতে  প্রাগ-ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা'র মানুষ বাস করতো আদি ব্রোঞ্জযুগ পর্যন্ত। এই বিচারে খ্রিষ্টপূর্ব ৬৫০০ বৎসর পর্যন্ত প্রাগ্‌-ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষার মানুষ আনাতোলিয়াতে বসবাস করতো, এমনটা অনুমান করা যায়।

কুর্গান উপপ্রমেয় (
Kurgan hypothesis) অনুসারে, জানা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০ অব্দ থেকে ১০০০ অব্দের ভিতরে আনাতোলিয়া সভ্যতা থেকে বহু মানুষ ছড়িয়ে পড়া শুরু করে। এদের একটি বিশাল অংশ বলকান এবং ককেশাশ অঞ্চলে প্রবেশ করে। পরে এই সকল অঞ্চল অতিক্রম ইউরোপ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দিকে চলে আসে। আর আনাতোলিয়ায় থেকে যাওয়া জনগোষ্ঠী রাজ্য স্থাপন করে বসবাস করতে থাকে।

আনুমানিক ৩৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে আনাতোলিয়ার ব্রোঞ্জ যুগের সূচনা হয়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দের ভিতরে হিটাইট ভাষার মানুষ এখানে বসতি গড়ে তুলেছিল। এরা প্রথম দিকে এই অঞ্চলে উচ্চভূমিতে বসতি গড়ে তুলেছিল। ১৭৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে এরা শক্তিশালী জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছিল। এদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল হিটাইট সাম্রাজ্য। এই রাজ্যের রাজধানী ছিল কুসারা।

এই সময় আনাতোলিয়ার
হিটাইট ভাষার মানুষ আদিবাসীরা শক্তিশালী রাজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল। এরা আশপাশের জনগোষ্ঠীর বিচারে উন্নতমানের সভ্যতার পত্তন ঘটিয়েছিল। এই রাজ্যের প্রধান নগরী এবং হিটাইট সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল হাট্টুসা।

বসবাসের স্থান অনুসারে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। এই অঞ্চলের মধ্যাঞ্চলে বাস করতো
হিটাইট ভাষার মানুষ। এরা ছিল আনাতোলিয়ার আদিবাসী। এদের প্রধান নগরি ছিল হাট্টুশ।

আনাতোলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে আদি রাজ্য স্থাপিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৪শ শতাব্দীতে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া অঞ্চলে স্থাপিত রাজ্যের নাম ছিল আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্য। এই সাম্রাজ্যের উল্লেখযোগ্য সম্রাট ছিলেন মেসোপটেমিয়া  বা আক্কাদের রাজা সার্গোন (
Sargon of Akkad)। রাজত্বকাল: খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ২৩৩৪-২২৭৯ অব্দ) আনাতোলিয়া দখল করে নেন। এই সম্রাট আক্কাদিয়ান এবং সুমেরিয়ান ভাষা-ভাষীর লোকদের একত্রীভূত করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

এই অঞ্চলের আদিবাসীদের ভাষাকে ভাষাতাত্ত্বিকরা নামকরণ করেছেন হাট্টিয়ান (
Hattian)। এরা বাস করতো মধ্য আনতোলিয়াতে। পক্ষান্তরে মেসোপটেমিয়ার উত্তরাঞ্চল এবং আনাতোলিয়াতে বাস করতো হুরিয়ান (Hurrian) ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীঁ।  খ্রিষ্টপূর্ব ২১শ শতাব্দীতে আক্কাদিয়ান রাজ্যের পতন ঘটে।

আক্কাদিয়ান জনগোষ্ঠীরে উত্তর শাখার নাম ছিল আসুরিয়ান। এরা মেসেপোটেমিয়া এবং আনাতোলিয়া অঞ্চলের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১৮শ শতাব্দীতে আনাতোলিয়ার অধিবাসীরা শক্তিশালী হয়ে উঠে। সেই সূত্রে হাট্টুসা জাতি আনাতোলিয়াতে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। খ্রিষ্টপূর্ব ১১শ শতাব্দী পর্যন্ত এই সাম্রাজ্য প্রবলভাবে এই অঞ্চল শাসন করেছে। খ্রিষ্টপূর্ব ১১৮০ অব্দে হাট্টুসা সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এই সময় ক্ষমতায় আসে নব্য-হাট্টুসা জনগোষ্ঠী। খ্রিষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দ পর্যন্ত এরা আনাতিলিয়া শাসন করে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর দিকে পারস্য সম্রাট আনাতোলিয়া আক্রমণ করে দখল করে নেয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৬৯৯ অব্দে আর্মেনিয়ান জনগোষ্ঠী পশ্চিম আনাতোলিয়া বিদ্রোহ করে। এর ফলে উভয় শক্তির মধ্যে যুদ্ধ হয়। এই যুদ্ধ শেষ হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ৪৪৯ অব্দে। পারস্য-শক্তি পরাজিত হলে, আনাতোলিয়ার অধিবাসীরা স্বাধীনতা লাভ করে। খ্রিষ্টাপূর্ব ৩৩৪ অব্দে আলেকজাণ্ডার এই অঞ্চল দখল করে নেয়। আলাকেজান্ডারের মৃত্যুর পর এই অঞ্চলের গ্রিকশক্তির আধিপত্য দুর্বল হয়ে পড়ে। তারপর হেলেনিক কিছু রাজা এই অঞ্চল শাসন করে। এরপর রোমান রাজা শক্তি শক্তিশালী হয়ে উঠলে, এই অঞ্চলে গ্রিক আধিপত্য ক্ষুণ্ণ হয় এবং রোমানরা পশ্চিম ও মধ্য আনাতোলিয়া দখল করে নেয়। খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে এই অঞ্চলটি আর্মেনিয়ানদের অধিকারে আসে। পরবর্তী সময় আনাতোলিয়া রোমান আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। রোমান সাম্রাজ্য বিভাজিত হলে, এই অঞ্চলে বাইজেন্টিয়ান সাম্রাজ্যের পত্তন ঘটে। আরব ভূখণ্ডে ইসলাম ধর্মের বিকাশের পর আরবদের ক্রমাগত আক্রমণে মধ্য-এশিয়া এবং এশিয়া মাইনরে বাইজাইন্টান ও গ্রিক আধিপত্য বিলুপ্ত হয়। অটোমান সাম্রজ্যে প্রতিষ্ঠার পর আনাতোলিয়া তুরস্কের অধীনে চলে যায়। বরতমানে আনাতোলিয়া বৃহত্তর তুরস্কের অংশ।


https://en.wikipedia.org/wiki/G%C3%B6bekli_Tepe