বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
লায়লী! লায়লী! ভাঙিয়ো না ধ্যান মজনুঁর এ মিনতি।
লায়লী! লায়লী! ভাঙিয়ো না ধ্যান মজনুঁর এ মিনতি।
লায়লী কোথায়? আমি শুধু দেখি লা এলা'র জ্যোতি॥
পাথর খুঁজিয়া ফিরিয়াছি প্রিয়া প্রেম-দরিয়ার কূলে,
খোদার প্রেমের পরশ-মানিক পেলাম কখন ভুলে।
সে মানিক যদি দেখ একবার
মজনুঁরে তুমি চাহিবে না আর
জুলেখা-ইয়ুসুফ লাজ মানে হেরি' তাহার খুব-সুরতি॥
মজনুঁরে ও যে লয়লী ভোলায় সে যে কত সুন্দর
বুঝিবে লায়লী যদি তুমি তারে নেহার এক নজর।
সাধ মিটিবে না হেথা ভালোবেসে,
চল চল প্রিয়া লা এলা'র দেশে
নিত্য মিলনে ভুলিব আমরা এই বিরহের ক্ষতি॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে লায়লী-মজনুর প্রেমকাহিনিকে অবলম্বন করে পার্থিব প্রেম থেকে আল্লাহর প্রেমে আত্মোন্নয়নের সুফি আদর্শ প্রকাশ করা হয়েছে। জাগতিক প্রেম ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু
আল্লার প্রতি প্রেম চিরন্তন—এই উপলব্ধিই গানের মূল প্রতিপাদ্য।
এই ভাবাদর্শে এই গানে পার্থিব প্রেম থেকে পরমাত্মার প্রেমে উত্তরণের সুফি দর্শনকে লায়লী-মজনুর কিংবদন্তির প্রতীকের মাধ্যমে অত্যন্ত কাব্যিক ও আধ্যাত্মিক রূপে
উপস্থাপন করেছেন। এখানে লায়লী ও মজনু কেবল ঐতিহাসিক প্রেমিক-প্রেমিকা নন; তাঁরা মানবাত্মা ও
আল্লার প্রেমের প্রতীক।
গানের শুরুতে মজনু লায়লীর কাছে অনুরোধ করে বলেন, তাঁর ধ্যান ভঙ্গ না করতে। কারণ তিনি আর কেবল লায়লীর রূপ দেখছেন না; তাঁর চোখে সর্বত্র ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর জ্যোতি উদ্ভাসিত হচ্ছে। অর্থাৎ তাঁর হৃদয়ে জাগতিক প্রেম রূপান্তরিত হয়ে আল্লাহর প্রেমে পরিণত হয়েছে। এখন তাঁর ধ্যানের কেন্দ্র কোনো মানবী নয়, বরং একমাত্র পরম সত্তা।
এরপর মজনু বলেন, তিনি একসময় প্রেমের সাগরের তীরে লায়লীর মতো একটি পাথর বা জড় বস্তুকেই খুঁজে বেড়িয়েছেন। কিন্তু অজান্তেই তিনি খুঁজে পেয়েছেন খোদার প্রেমরূপী পরশমণি। এই পরশমণি এমন এক অমূল্য সম্পদ, যা মানুষের অন্তরকে সম্পূর্ণ বদলে দেয়। একবার যদি কেউ সেই ঐশী প্রেমের স্বাদ পায়, তবে পার্থিব প্রেমের প্রতি আর আকর্ষণ থাকে না।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি বলেন, আল্লাহর সেই অতুলনীয় সৌন্দর্যের তুলনায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ রূপও ম্লান। এমনকি সৌন্দর্যের জন্য প্রসিদ্ধ ইউসুফ (আ.) ও প্রেমের প্রতীক জুলেখা-র কাহিনিও তাঁর ঐশী রূপের সামনে লজ্জিত হয়ে পড়ে। এখানে বোঝানো হয়েছে যে, সৃষ্টির সমস্ত সৌন্দর্যের উৎসই আল্লাহ; তাই তাঁর সৌন্দর্যই সর্বোচ্চ ও চিরন্তন।
গানটির শেষাংশে স্তবকে মজনু লায়লীকে আহ্বান জানান, কেবল জাগতিক ভালোবাসায় তৃপ্তি নেই। তিনি বলেন, এসো, আমরা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-এর দেশে—অর্থাৎ আল্লাহর প্রেম, তাওহিদ ও আত্মিক মিলনের জগতে—প্রবেশ করি। সেখানে চিরন্তন মিলনের আনন্দে এই পৃথিবীর বিচ্ছেদ, বিরহ ও দুঃখের সব ক্ষত মুছে যাবে। এটি আসলে মানুষের আত্মার সঙ্গে পরম সত্তার মিলনের আকাঙ্ক্ষার রূপক প্রকাশ।
-
রচনাকাল ও স্থান:
গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৫) মাসে, এইচ.এম.ভি. রেকর্ড কোম্পানি গানটি প্রথম রেকর্ড করে। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৮ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ, (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ২৮২ সংখ্যক গান।
- রেকর্ড:
এইচএমভি
[ফেব্রুয়ারি ১৯৩৯ (মাঘ-ফাল্গুন ১৩৪৫)। এন ১৭২৫৪।
শিল্পী: আব্বাসউদ্দীন আহমদ। সুর: কমল দাশগুপ্ত]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
সুধীন দাশ
ও ব্রহ্মমোহন ঠাকুর
[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি, অষ্টম খণ্ড নজরুল ইন্সটিটিউট ১২ ভাদ্র, ১৩৯৯ বঙ্গাব্দ/ ২৭
আগষ্ট, ১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দ। ২১
সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৯৮-১০১]
[নমুনা]
- সুরকার:
কমল
দাশগুপ্ত।
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম। হামদ। বন্দনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য