বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম:
একি অসীম পিয়াসা শত জনম গেল
একি অসীম পিয়াসা
শত জনম গেল তবু মিটিল না
তোমারে পাওয়ার আশা॥
সাগর চাহিয়া চাঁদে চির জনম কাঁদে
তেমনি যত নাহি পায় তোমা পানে ধায়
অসীম ভালোবাসা॥
তোমারে যে চাহিয়াছে ভুলে একদিন
সেই জানে তোমারে ভোলা কি কঠিন
তোমার স্মৃতি তার মরণের সাথি হয়
মেটে না প্রেমের পিয়াসা॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মধ্যে প্রেমকে কেবল প্রিয়জনকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা হিসেবে দেখা হয়নি; এখানে প্রেম এক অনন্ত অনুসন্ধান। মানুষ যাকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসে, তাকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়া সম্ভব কি না—সে প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে তাকে পাওয়ার আকুলতা। তাই শত জন্ম অতিবাহিত হলেও প্রেমিকের আশা শেষ হয় না। প্রাপ্তির সীমারেখা যেখানে শেষ, প্রেমের যাত্রা যেন সেখান থেকেই শুরু হয়।তাই কবির কাছে প্রশ্নাতীত এক বিস্ময়- ‘একি অসীম পিয়াসা’।
‘সাগর চাহিয়া চাঁদে চির জনম কাঁদে’—এই উপমাটি গানের মূল ভাবকে বিশেষ গভীরতা দিয়েছে। সাগর ও চাঁদ পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত, অথচ তাদের মিলন অসম্ভব। চাঁদের আকর্ষণে সাগর জেগে ওঠে, তার বুকে জোয়ার আসে, ঢেউ আন্দোলিত হয়; কিন্তু সেই চাঁদ অধরাই থেকে যায়। তেমনি প্রিয়জনের অস্তিত্ব প্রেমিকের সমগ্র সত্তাকে আলোড়িত করে, কিন্তু তাকে সম্পূর্ণভাবে পাওয়া যায় না। এই দূরত্বই প্রেমকে বাঁচিয়ে রাখে এবং তার আকাঙ্ক্ষাকে অনন্ত করে তোলে।
এখানে অপ্রাপ্তি প্রেমের সমাপ্তি নয়। বরং প্রিয়জন যত দূরে থাকেন, প্রেম তত বেশি তাঁর দিকে ধাবিত হয়। কারণ সত্যিকার ভালোবাসার স্বভাবই হলো নিজের সীমা অতিক্রম করে প্রিয়ের দিকে এগিয়ে যাওয়া। তাই ‘যত নাহি পায় তোমা পানে ধায় অসীম ভালোবাসা’—এই পঙ্ক্তিতে প্রেমের এক আশ্চর্য ধর্ম প্রকাশ পেয়েছে: না পাওয়াও কখনো কখনো ভালোবাসাকে নিঃশেষ করে না, বরং তাকে আরও গভীর করে।
গানের শেষাংশে প্রেমের আর-একটি কঠিন সত্য প্রকাশিত হয়েছে। কাউকে একদিন ভুলতে চাইলেই তাকে ভোলা যায় না। বরং যে মানুষটিকে হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে চেষ্টা করা হয়, অনেক সময় তার স্মৃতিই আরও প্রবল হয়ে ফিরে আসে। কারণ ভালোবাসা কেবল স্মৃতিতে ধারণ করা কোনো ঘটনা নয়; তা মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে যায়।
‘তোমার স্মৃতি তার মরণের সাথি হয়’—এখানে প্রিয়জনের স্মৃতি জীবনের শেষ পর্যন্ত অনুসরণকারী এক নীরব সঙ্গী। মানুষ হয়তো প্রিয়জনকে হারায়, বিচ্ছিন্ন হয়, দূরে চলে যায়; কিন্তু ভালোবাসার অভিজ্ঞতাকে সম্পূর্ণভাবে হারাতে পারে না। সেই স্মৃতি সুখেরও হতে পারে, বেদনারও হতে পারে—কিন্তু তা মানুষের অন্তর্জীবনের অংশ হয়ে যায়।
এই দৃষ্টিতে গানটির ‘পিয়াসা’ কেবল কোনো ব্যক্তিকে পাওয়ার তৃষ্ণা নয়; এটি মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা, যা তাকে নিজের সীমার বাইরে কোনো পরম সৌন্দর্য, পরম প্রেম বা পরিপূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। মানুষ হয়তো জানে যে তার আকাঙ্ক্ষার সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি সম্ভব নয়, তবু সে আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করতে পারে না।
তাই বলা যায়- অতএব, এই গানে প্রেমের সার্থকতা কেবল মিলনে নয়, আকাঙ্ক্ষার মধ্যেও নিহিত। প্রিয়জনকে না পাওয়ার বেদনা প্রেমকে ধ্বংস করেনি; বরং তাকে দিয়েছে অসীমতা। তাই গানের শেষ কথা—‘মেটে না প্রেমের পিয়াসা’—আসলে বেদনার কথা হলেও, তার মধ্যে প্রেমের অমরত্বেরই ঘোষণা রয়েছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর (অগ্রহায়ণ -পৌষ ১৩৪৩)
মাসে
এইচএমভি রেক্র্ড কোম্পানি থেকে গানটি প্রথম প্রকাশিত
হয়েছিল। এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৭ বৎসর ৬ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৩৭২
- রেকর্ড:
এইচএমভি । ডিসেম্বর ১৯৩৬ (অগ্রহায়ণ -পৌষ ১৩৪৩)। এন ৯৮৩৬।
শিল্পী: কুমারী বিজনবালা ঘোষ
-
স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
সুধীন দাশ।
[নজরুল-সঙ্গীত
স্বরলিপি, ত্রয়োদশ খণ্ড।
প্রথম সংস্করণ। নজরুল ইন্সটিটিউট। জ্যৈষ্ঠ ১৪০১/মে ১৯৯৪। তৃতীয় গান]
[নমুনা]
-
পর্যায়:
তাল:
ত্রিতাল
গ্রহস্বর: পনা