বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি পরমেশ্বরী কালিকা
মহাবিদ্যা আদ্যাশক্তি পরমেশ্বরী কালিকা।
পরমা প্রকৃতি জগদম্বিকা, ভবানী ত্রিলোক-পালিকা॥
মহাকালি
মহাসরস্বতী,
মহালক্ষ্মী
তুমি ভগবতী
তুমি বেদমাতা, তুমি গায়ত্রী, ষোড়শী কুমারী বালিকা॥
কোটি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, রুদ্র মা মহামায়া তব মায়ায়,
সৃষ্টি করিয়া করিতেছ লয় সমুদ্রে জলবিম্ব-প্রায়।
অচিন্ত্য
পরমাত্মারূপিণী,
সুর-নর
চরাচর-প্রসবিনী।
নমস্তে শিবে অশুভ নাশিনী, তারা মঙ্গল চণ্ডিকা।
নমস্তে শিরে অশুভ নাশিনী, তারা মঙ্গল সাধিকা॥
- ভাবসন্ধান: আদ্যাশক্তি কালিকা এক ও অদ্বিতীয়া মহাশক্তি, যিনি বিভিন্ন নামে ও রূপে সমগ্র বিশ্বে প্রকাশিত। সৃষ্টি, পালন, সংহার, জ্ঞান, সম্পদ, শক্তি ও মঙ্গল—সবকিছুর উৎস তিনি। ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্র থেকে শুরু করে দেবতা, মানুষ এবং সমগ্র চরাচর তাঁর মহামায়ার অন্তর্গত। তাই তিনি একই সঙ্গে ভয়ংকরী ও মঙ্গলময়ী, সংহারকারিণী ও জননী, অচিন্ত্য পরমাত্মা এবং বিশ্বপ্রসবিনী।
এই ভাবাদর্শে রচিত এই গানে কালী বা আদ্যাশক্তির সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিময় ও বিশ্বজননী রূপের বন্দনা করা হয়েছে। কবির দৃষ্টিতে তিনি একক কোনো দেবীমূর্তি নন; তিনি সমগ্র সৃষ্টি, স্থিতি ও লয়ের মূল শক্তি—মহাবিদ্যা, আদ্যাশক্তি ও পরমেশ্বরী।
গানের শুরুতেই দেবীকে কালিকা, পরমা প্রকৃতি, জগদম্বিকা, ভবানী এবং ত্রিলোক-পালিকা নামে অভিহিত করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনিই প্রকৃতির মূল শক্তি, জগতের জননী এবং তিন লোকের রক্ষাকর্ত্রী। তাঁর মধ্যেই বিভিন্ন দেবীশক্তির প্রকাশ ঘটেছে। তাই কবি বলেছেন—মহাকালী, মহাসরস্বতী ও মহালক্ষ্মী—সবই তাঁর বিভিন্ন রূপ। শক্তি, জ্ঞান ও ঐশ্বর্য—এই তিন মহাশক্তির উৎসও তিনি।
গানটির পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে, কোটি কোটি ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও রুদ্রও মহামায়ার মায়ার অধীন। সৃষ্টি, পালন ও সংহারের দেবতাগণও তাঁর মহাশক্তির মধ্যেই কার্য সম্পাদন করেন। তাঁরা সৃষ্টি করেন এবং আবার সেই সৃষ্টিকে লয়ে বিলীন করেন—যেমন জলের মধ্যে প্রতিবিম্ব সৃষ্টি হয়ে আবার জলের মধ্যেই মিলিয়ে যায়। এর দ্বারা জগতের ক্ষণস্থায়িত্ব এবং মহাশক্তির চিরন্তনতার ধারণা প্রকাশ পেয়েছে।
এরপর দেবীকে বেদমাতা ও গায়ত্রী বলা হয়েছে। অর্থাৎ জ্ঞান, বেদবাণী ও আধ্যাত্মিক চেতনার মূল উৎস তিনিই। আবার তিনি ষোড়শী কুমারী বালিকা—চিরনবীন, চিরসুন্দর ও পূর্ণ যৌবনের প্রতীক। দেবীর মধ্যে একই সঙ্গে মাতৃত্ব, জ্ঞান, শক্তি, সৌন্দর্য ও চিরনবীনতার সমন্বয় ঘটেছে।
দেবীকে বলা হয়েছে অচিন্ত্য পরমাত্মারূপিণী—তাঁর প্রকৃত স্বরূপ মানুষের চিন্তা ও কল্পনার অতীত। তিনি সুর, নর ও চরাচর-প্রসবিনী; অর্থাৎ দেবতা, মানুষ এবং সমগ্র সচরাচর জগত তাঁর থেকেই উৎপন্ন হয়েছে। তিনি বিশ্বসৃষ্টির আদিম জননী।
গানের শেষাংশে দেবীর বিভিন্ন মঙ্গলময় ও শক্তিময় রূপকে প্রণাম জানানো হয়েছে। তিনি শিবা বা শিবময়ী, অশুভের বিনাশকারিণী; তিনি তারা, যিনি জীবকে উদ্ধার করেন; তিনি মঙ্গলচণ্ডিকা, যিনি অমঙ্গল দূর করে কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর ভয়ংকর রূপের অন্তরেও তাই রয়েছে বিশ্বকল্যাণের উদ্দেশ্য।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে
সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের মে
(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪) মাসে,
এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি
এই গানের একটি রেকর্ড প্রকাশ করেছিল। নজরুলের ইসলাম ৩৭ বৎসর ১১ মাস বয়স অন্তের
শেষে গানটি রেকর্ড করা হয়েছিল।
- গ্রন্থ:
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৪৯৭]
- দেবীস্তুতি। [নজরুল রচনাবলী জন্মশধবর্ষ সংস্করণ। বাংলা
একাডেমী ঢাকা। অষ্টম খণ্ড (১২ ভাদ্র ১৩১৫, ২৭শে আগষ্ট ২০০৮)। আদ্যাশক্তি। পৃষ্ঠা: ২৪৫]
- পত্রিকা: বেতার জগৎ
[১৬ জানুয়ারি ১৯৩৮
খ্রিষ্টাব্দ (রবিবার, ২ মাঘ ১৩৪৪)]। 'আমাদের কথা' বিভাগে।
[সূত্র:
বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও
পৃষ্ঠা:৪৫।
- বেতার:
- দেবীস্তুতি
- প্রথম প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৭ জানুয়ারি ১৯৩৮ (বৃহস্পতিবার
১৩ মাঘ ১৩৪৪)। শিল্পী: গীতা মিত্র
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ৯ম বর্ষ ২য় সংখ্যা। প্রচ্ছদ ও পৃষ্ঠা:৪৫।
-
The Indian listener. Vol III. No II, (7th January, 1938) Page 121
- দ্বিতীয় প্রচার। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২৫ জুলাই ১৯৩৯ (মঙ্গলবার, ৯ শ্রাবণ ১৩৪৬)।
[সূত্র: বেতার জগৎ-পত্রিকার ৯ম বর্ষ ১২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা ৫৩৩]
-
রক্তজবা ।
(গীতিচিত্র),। রচয়িতা: অবিনাশ
বন্দ্যোপাধ্যায়। কলকাতা বেতার কেন্দ্র। ২০ নভেম্বর ১৯৩৯ (সোমবার, ৪ অগ্রহায়ণ ১৩৪৬)।
সান্ধ্য অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৬.১০।
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১০ম বর্ষ, ২২শ সংখ্যা। পৃষ্ঠা: ৮৭৭
- নজরুল যখন বেতারে। আসাদুল হক। বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমী। মার্চ ১৯৯৯।
পৃষ্ঠা: ৭৬।
- রেকর্ড:
এইচএমভি। [মে ১৯৩৭ (বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৪)। এন ৯৮৯৬। শিল্পী: মৃণালকান্তি ঘোষ]
[শ্রবণ
নমুনা]
- স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। শাক্ত। দুর্গা। বন্দনা
- সুরাঙ্গ:
ধ্রুপদাঙ্গ