বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে
দূর আরবের স্বপন দেখি বাংলাদেশের কুটির হতে।
বেহোশ হয়ে চলেছি যেন কেঁদে কেঁদে কাবার পথে॥
হায় গো খোদা, কেন মোরে
পাঠাইলে হায় কাঙাল ক'রে;
যেতে নারি প্রিয় নবীর মাজার শরীফ জিয়ারতে॥
স্বপ্নে শুনি নিতুই রাতে- যেন কাবার মিনার থেকে
কাঁদছে বেলাল ঘুমন্ত সব মুসলিমেরে ডেকে ডেকে।
ইয়া ইলাহি! বল সে কবে
আমার স্বপন সফল হবে,
গরিব বলে হব কি নিরাশ, মদিনা দেখার নিয়ামতে॥
- ভাবসন্ধান: এই গানে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি গভীর
ভালোবাসায় উদ্বেল এক দরিদ্র মুসলমান ভক্তের হৃদয়ের আকুলতা, কাবা-মদিনা
দর্শনের তীব্র বাসনা এবং আল্লাহর প্রতি নিবেদিত প্রার্থনা উপস্থাপিত হয়েছে।
আর্থিক অসামর্থ্যের কারণে পবিত্র হজ ও জিয়ারতের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হলেও তাঁর
হৃদয়ে সেই পবিত্র ভূমির প্রতি অগাধ টান ও আধ্যাত্মিক আকর্ষণ বিরাজমান। গানের
মূল সুর হলো— দারিদ্র্য সত্ত্বেও ঈমান, ভালোবাসা ও আশা হারিয়ে না ফেলে আল্লাহর
রহমতের প্রতীক্ষায় থাকা।
গানের ভক্ত বলেন, বাংলাদেশের একটি সাধারণ কুটিরে বসেও তাঁর মন ছুটে যায় সুদূর
আরবের দিকে। তিনি কল্পনায় কাবা শরীফ ও মদিনার পবিত্র কল্পলোকে বিচরণ করেন।
তাঁর হৃদয় এমনভাবে মহানবীর প্রেমে মগ্ন যে, তিনি যেন আত্মবিস্মৃত অবস্থায়
অশ্রুসজল নয়নে কাবার পথে চলেছেন। এখানে ‘স্বপন’ কেবল কল্পনা নয়; বরং এক গভীর
আধ্যাত্মিক আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, যা ভক্তের অন্তরকে সর্বদা আলোড়িত করে।
অন্তরাতে এই ভক্ত আল্লাহর কাছে করুণাভরে নিবেদন করেন যে, কেন তাঁকে এত দরিদ্র
করে পৃথিবীতে পাঠানো হলো, যার ফলে তিনি প্রিয় নবীর রওজা মোবারক জিয়ারত করতে
পারছেন না। এই আক্ষেপে কোনো অভিযোগ নেই; বরং রয়েছে অসহায় এক ভক্তের বেদনা।
তাঁর কাছে মদিনা গমন কেবল একটি ভ্রমণ নয়, বরং প্রিয় নবীর সান্নিধ্য লাভের এক
মহামূল্যবান সৌভাগ্য।
গানটির সঞ্চারী ও আভোগে কবি এক অপূর্ব আধ্যাত্মিক চিত্রকল্প নির্মাণ করেছেন।
ভক্ত স্বপ্নে শুনতে পান, কাবার মিনার থেকে যেন
বিলাল (রা.) সমগ্র মুসলিম
জাহানকে জাগ্রত করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছেন। এই আহ্বান শুধু নামাজের ডাক নয়;
বরং ঈমান, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর পথে ফিরে আসার আহ্বান। ভক্তের হৃদয়ে সেই ধ্বনি
গভীরভাবে অনুরণিত হয় এবং তাঁর মদিনা-দর্শনের আকাঙ্ক্ষাকে আরও তীব্র করে তোলে।
গানের শেষাংশে ভক্ত আল্লাহর কাছে প্রশ্ন রাখেন— কবে তাঁর এই স্বপ্ন পূর্ণ হবে?
তিনি আশা করেন, একদিন আল্লাহর রহমতে তাঁর মদিনা দর্শনের বাসনা সফল হবে। তিনি
ভাবেন, গরিব হওয়ার কারণে কি তিনি এই মহান নিয়ামত থেকে চিরকাল বঞ্চিত থাকবেন?
এই প্রশ্নের মধ্য দিয়ে তাঁর অন্তরের ব্যাকুলতা প্রকাশ পেলেও তিনি নিরাশ হন না;
বরং আল্লাহর অসীম করুণার ওপর আস্থা রাখেন।
- রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে
কিছু জানা যায় না। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫)
মাসে,
টুইন
রেকর্ড কোম্পানি থেকে গানটির
প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৯ বৎসর ৩ মাস।
-
গ্রন্থ:
-
জুলফিকার
- দ্বিতীয় সংস্করণ [ডিসেম্বর, ১৯৫২ (পৌষ ১৩৫৯ বঙ্গাব্দ)]
- নজরুল রচনাবলী সপ্তম খণ্ড [কার্তিক ১৪১৯, নভেম্বর ২০১২।
জুলফিকার দ্বিতীয় খণ্ড। ৩৪ [৩৩]। পৃষ্ঠা ১০৮]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৫৪৮
-
রেকর্ড:
টুইন। সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ (ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৪৫)। এফটি ১২৫৩৫। শিল্পী:
মনু মিঞা (কে মল্লিক)।
সুর:
কাজী
নজরুল ইসলাম। উল্লেখ্য এর জুড়ি গান ছিল- ওরে ও-মদিনা বলতে পারিস [তথ্য]
- পত্রিকা: মোয়াজ্জিন (জ্যৈষ্ঠ্ ১৩৪৬ (মে-জুন ১৩৩৯)।
- স্বরলিপিকার:
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। ইসলাম আল্লাহ ও রসুল বন্দনা। অনুরোধ