এ-কূল ভাঙে ও-কূল গড়ে এই তো নদীর খেলা।
সকাল বেলা আমির, রে ভাই (ও ভাই) ফকির, সন্ধ্যাবেলা॥
সেই নদীর ধারে কোন্ ভরসায়
বাঁধলি বাসা, ওরে বেভুল, বাঁধলি বাসা, কিসের আশায়?
যখন ধরলো ভাঙন পেলি নে তুই পারে যাবার ভেলা।
এই তো বিধির খেলা রে ভাই এই তো বিধির খেলা॥
এই দেহ ভেঙে হয় রে মাটি, মাটিতে হয় দেহ
যে কুমোর গড়ে সেই দেহ, তার খোঁজ নিল না কেহ (রে ভাই)।
রাতে রাজা সাজে নাচমহলে
দিনে ভিক্ষা মেগে বটের তলে
শেষে শ্মশান ঘাটে গিয়ে দেখে সবাই মাটির ঢেলা
এই তো বিধির খেলা রে ভাই ভব নদীর খেলা॥
মাঝি তাই মানুষকে সতর্ক করে বলে—যে নদীর তীরে প্রতিনিয়ত ভাঙন চলছে, সেই নদীর ধারে কীসের ভরসায়, কীসের আশায় ঘর বাঁধিস? সংসারের অনিশ্চিত তীরে মানুষ যতই স্থায়ী আশ্রয় গড়ে তুলতে চায়, বিধির ভাঙনে একসময় সেই আশ্রয়ও বিলীন হয়। কিন্তু বিপদ যখন সত্যিই এসে উপস্থিত হয়, তখন পার হওয়ার জন্য তার হাতে কোনো ভেলাও থাকে না। মানুষের জীবনও তেমনি মায়াময় সংসারের ভাঙাগড়ার মধ্যে আবদ্ধ; সে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা না জেনেই সংসারে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন দেখে। অথচ শেষ পর্যন্ত তাকে এই অনিত্যতার স্রোত পেরোতেই হয়।
এই ভাঙাগড়ার অন্তরালে রয়েছে পরমসত্তার বিধান। মানুষের দৃষ্টিতে যা আকস্মিক, অন্যায় বা দুর্ভাগ্য বলে মনে হয়, বৃহত্তর সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে তা পরমসত্তার বিধিরই অংশ। তিনি যেন নদীর স্রোতের মতোই অবিরাম সৃষ্টি, স্থিতি ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে জগতের লীলা পরিচালনা করেন। তাই গানটি শুধু জীবনের অনিত্যতার কথা বলে থেমে থাকে না; বিধির এই রহস্যময়, লীলাময় রূপের প্রতিও ইঙ্গিত করে।
মানবদেহের ক্ষেত্রেও সেই একই বিধির খেলা। দেহ ভেঙে মাটিতে মিশে যায়, আবার সেই মাটি থেকেই নতুন দেহের সৃষ্টি হয়। যে কুমোর মাটি দিয়ে দেহ গড়ে, অর্থাৎ যে পরম স্রষ্টা জীবদেহ সৃষ্টি করেন, মানুষ সাধারণত তাঁর সন্ধান করে না। সে নিজের দেহ, পরিচয়, সম্পদ ও পার্থিব অবস্থাকেই সত্য বলে ধরে নেয়; অথচ তার অস্তিত্বের মূল স্রষ্টাকে ভুলে থাকে। জন্ম ও মৃত্যুর এই চক্রেও তাই সৃষ্টির রহস্য এবং পরমসত্তার বিধান প্রকাশিত।
মানুষের সামাজিক অবস্থানও এই বিধির খেলায় চিরস্থায়ী নয়। যে মানুষ রাতে রাজা সেজে নাচমহলে সম্মান ও ঐশ্বর্যের আস্বাদ নেয়, দিনের বেলায় তাকেই হয়তো বটতলায় বসে ভিক্ষা করতে হয়। আবার জীবনের শেষ পরিণতিতে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, সম্মানিত-অপমানিত—সবার পরিচয় মুছে যায়; শ্মশানঘাটে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকের দেহই মাটির ঢেলায় পরিণত হয়। সেখানে পার্থিব বৈভবের কোনো মূল্য থাকে না।
অতএব, গানটির মর্মবাণী হলো—সংসার অনিত্য, মানুষের অর্জন অনিশ্চিত এবং জীবন
বিধির অধীন। নদীর ভাঙাগড়ার মতোই সৃষ্টি ও বিনাশ, উত্থান ও পতন, ধন ও দারিদ্র্য,
জীবন ও মৃত্যু পরমসত্তার লীলাময় বিধানের অন্তর্গত। মানুষ এই অনিত্য জগতের মোহে
স্থায়ী আশ্রয় খুঁজে বেড়ালেও প্রকৃত সত্য হলো—সে নিজেই সেই ভব-নদীর যাত্রী। তাই
অহংকার, সম্পদ ও পার্থিব অবস্থানের পরিবর্তে তার উচিত নিজের অস্তিত্বের
স্রষ্টাকে উপলব্ধি করা এবং পরমসত্তার বিধির এই রহস্যময় লীলাকে অনুধাবন করা।