 |
|
গায়নার পতাকা |
গায়না
Guyana
দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের একটি দেশ।
রাষ্ট্রীয় নাম: Co-operative Republic of Guyana
গায়না পতাকা:
- সবুজ: কৃষিকাজ ও বনভূমির প্রতীক।
সাদা: নদী ও পানির সম্পদের প্রতীক।
- সোনালি/হলুদ: খনিজ সম্পদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রতীক।
- কালো: সহনশীলতা ও ধৈর্যের প্রতীক।
- লাল: জাতি গঠনের উদ্যোগ এবং উদ্দীপনার প্রতীক।
ভৌগোলিক অবস্থান:
১. মহাদেশীয় অবস্থান
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিকভাবে এটি ক্যারিবীয় অঞ্চলের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
২. ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক গায়না মোটামুটি ১° থেকে ৯°
উত্তর অক্ষাংশ এবং ৫৬° থেকে ৬২° পশ্চিম দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।
৩ . ভৌগোলিক অঞ্চল :
গায়নাক মূলত চারটি প্রধান ভাগ করা হয়ে থাকে।
- উপকূলীয় সমভূমি: দেশের উত্তর দিকে অবস্থিত নিচু ও উর্বর এলাকা, যেখানে অধিকাংশ মানুষ বাস করে।
- পাহাড়ি বালুময় অঞ্চল: ভেতরের দিকে সাদা বালু ও ছোট ছোট পাহাড় বিশিষ্ট এলাকা।
- অভ্যন্তরীণ উচ্চভূমি: দক্ষিণ ও পশ্চিমের মালভূমি এবং মাউন্ট রোরাইমার মতো উঁচু পর্বতমালা।
- সাভানা অঞ্চল: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত বিশাল ঘাসভূমি যা 'রুপুনুনি সাভানা' নামে পরিচিত।
- আয়তন:
প্রায় ২,১৪,৯৬৯ বর্গ কিলোমিটার। এটি দক্ষিণ আমেরিকার মূল ভূখণ্ডের তৃতীয় ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্র (সুরিনাম ও উরুগুয়ের পরে)।
- ৱজনসংখ্যা: ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে অনুষ্ঠিত জনগণনা
অনুসারে: ৮,০২,০০০ থেকে ৮,৪০,০০০-এর মধ্যে।
- জনসংখ্যার ঘনত্ব: প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৪ জন, যা বিশ্বে অন্যতম সর্বনিম্ন।
- জাতিগত বিন্যাস: গায়নার জনসংখ্যা মূলত পাঁচটি প্রধান জাতিগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত
- ইন্দো-গায়ানিজ (প্রায় ৪৪%): এরা মূলত ভারত থেকে আসা চুক্তিবদ্ধ শ্রমিকদের বংশধর।
- আফ্রো-গায়ানিজ (প্রায় ৩০%): এরা আফ্রিকা থেকে আসা দাসদের বংশধর।
- মিশ্র জাতিগোষ্ঠী (প্রায় ১৭%): বিভিন্ন জাতির সংমিশ্রণে গঠিত জনগোষ্ঠী।
- আদিবাসী বা আমেরিন্ডিয়ান (প্রায় ৯%): গায়নার মূল ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা।
- অন্যান্য: ইউরোপীয় (পর্তুগিজ) এবং চীনা বংশোদ্ভূত মানুষ।
- ভাষা: গায়নার ভাষাগত চিত্রটি বেশ বৈচিত্র্যময়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি দক্ষিণ আমেরিকার একমাত্র দেশ যেখানে ইংরেজি দাপ্তরিক ভাষা।
- দাপ্তরিক ভাষা ইংরেজি: সরকারি কাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সংবাদ মাধ্যম এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার হিসেবে গায়না এই ভাষাটি ধরে রেখেছে।
- প্রধান লোকজ ভাষা
- গায়ানিজ ক্রেওল: ইংরেজি দাপ্তরিক ভাষা, তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কথাবার্তার প্রধান ভাষা হলো গায়ানিজ ক্রেওল। এটি ইংরেজি ভিত্তিক একটি ভাষা, যাতে আফ্রিকান, ডাচ, ভারতীয় এবং আদিবাসী ভাষার সংমিশ্রণ রয়েছে।
- অন্যান্য প্রচলিত ভাষা
আদিবাসী ভাষা: দেশের অভ্যন্তরে বসবাসকারী আমেরিন্ডিয়ান বা আদিবাসীরা তাদের নিজস্ব ভাষায় কথা বলে। যেমন: মাকুশি, ওয়াপিশানা, ওয়াই-ওয়াই এবং আকাবায়ো।
- ভারতীয় ভাষা: যদিও ইন্দো-গায়ানিজদের প্রধান ভাষা এখন ইংরেজি বা ক্রেওল, তবে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে (হিন্দু ও মুসলিম) হিন্দি, উর্দু এবং সংস্কৃত ভাষার সীমিত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়।
- পর্তুগিজ ও স্প্যানিশ: প্রতিবেশী দেশ
ব্রাজিল এবং
ভেনেজুয়েলার সাথে যোগাযোগের কারণে এবং অভিবাসনের ফলে এই ভাষা দুটির ব্যবহারও বর্তমানে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
- ধর্ম: গায়নার জনসংখ্যা মূলত তিনটি প্রধান ধর্মে বিভক্ত:
- খ্রি ষ্ট ধর্ম (প্রায় ৬৩% - ৬৬%): এটি দেশটির বৃহত্তম ধর্ম। খ্রিস্টানদের মধ্যে বিভিন্ন উপদল রয়েছে, যার মধ্যে পেন্টেকোস্টাল (সবচেয়ে বড় গোষ্ঠী), রোমান ক্যাথলিক, অ্যাংলিকান এবং সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট উল্লেখযোগ্য।
- হিন্দুধর্ম (প্রায় ২৪.৮% - ২৫%): গায়না পশ্চিম গোলার্ধের অন্যতম দেশ যেখানে হিন্দুদের হার অনেক বেশি। মূলত ভারত থেকে আসা বংশোদ্ভূতরাই এই ধর্মের অনুসারী। দীপাবলি ও হোলি (ফাগুয়া) এখানে রাষ্ট্রীয় ছুটির দিন।
- ইসলাম (প্রায় ৭%): মুসলমানরা মূলত ভারতীয় বংশোদ্ভূত। তবে আফ্রো-গায়ানিজদের মধ্যেও কিছু মুসলিম রয়েছেন। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এখানে গুরুত্বের সাথে পালন করা হয়।
- অন্যান্য ধর্ম ও বিশ্বাস
আদিবাসী বিশ্বাস: গায়নার গভীর জঙ্গলে বসবাসকারী অনেক আদিবাসী গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী প্রকৃতিবাদী ধর্ম (যেমন- আরেরুয়া) পালন করে।
- রাস্তাফারিয়ান: অল্প সংখ্যক মানুষ রাস্তাফারি মতবাদে বিশ্বাসী।
- বাহাই ধর্ম: খুব সীমিত পরিসরে এই ধর্মের অনুসারী দেখা যায়।
- নাস্তিক বা ধর্মহীন: জনসংখ্যার প্রায় ৩% - ৪% কোনো নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস করেন না।
রাষ্ট্র ও ধর্ম
ধর্মনিরপেক্ষতা: গায়না একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। দেশটির সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্র ও ধর্মের পৃথকীকরণ নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। গায়নায় রাষ্ট্র ও ধর্মের সম্পর্ক মূলত নিচের বৈশিষ্ট্যগুলোর মাধ্যমে ফুটে ওঠে:
- ১. সাংবিধানিক অবস্থান :
গায়নার সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে সমর্থন করে না। সংবিধানের ১৪৫ (১) অনুচ্ছেদ প্রতিটি নাগরিককে তাদের বিবেক, চিন্তা এবং ধর্মের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। এর অর্থ হলো:
প্রত্যেক নাগরিকের নিজস্ব ধর্ম পালনের, প্রচারের এবং পরিবর্তনের পূর্ণ অধিকার আছে।
রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মকে "রাষ্ট্রধর্ম" হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না।
- ২. ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চা: গায়নার ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল কাগজে-কলমে নয়, বরং জাতীয় জীবনেও এর প্রতিফলন দেখা যায় ।
সরকারি কোনো কর্মকাণ্ডে বা জাতীয় অনুষ্ঠানে নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের প্রাধান্য থাকে না। তবে সব ধর্মের প্রতিনিধিরাই রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হন।
- শিক্ষা ব্যবস্থা: সরকারি স্কুলগুলোতে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের বাধ্যতামূলক পাঠদান করা হয় না। তবে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠী তাদের নিজস্ব স্কুল পরিচালনা করতে পারে।
- জাতীয় ছুটি: ধর্মনিরপেক্ষতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হলো গায়নায় প্রধান তিনটি ধর্মের উৎসবগুলোকেই (খ্রিস্টানদের বড়দিন
ও গুড ফ্রাইডে, হিন্দুদের দীপাবলি বা হোলি এবং মুসলিমদের ঈদ) রাষ্ট্রীয় ছুটির তালিকায় রাখা হয়েছে।
- রাজনৈতিক প্রভাব :
গায়নার রাজনীতিতে ধর্ম সরাসরি নিয়ন্ত্রক শক্তি হিসেবে কাজ করে না। তবে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি ড. মোহাম্মদ ইরফান আলী গায়নার প্রথম মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান, যা দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সংস্কৃতির একটি বড় উদাহরণ।
- ধর্মীয় সহনশীলতা :
গায়নাকে দক্ষিণ আমেরিকার অন্যতম ধর্মীয় সহনশীল দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। এখানে মসজিদ, মন্দির এবং গির্জা প্রায়ই একে অপরের খুব কাছে অবস্থিত থাকে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবের সময় একে অপরের সাথে আনন্দ ভাগ করে নেওয়া এখানে এক সাধারণ সংস্কৃতি।
মুদ্রা: গায়নার সরকারি মুদ্রার নাম হলো গায়ানিজ ডলার
(Guyanese Dollar)। আন্তর্জাতিক বাজারে এর কোড হলো
GYD এবং সাধারণ চিহ্ন হিসেবে এটি $ বা G$ ব্যবহার করা হয়।
- প্রচলিত মান
নোট: বর্তমানে ২০, ৫০, ১০০, ৫০০, ১০০০ এবং ৫০০০ গায়ানিজ ডলারের নোট প্রচলিত আছে।
- ধাতব মুদ্রা: ১, ৫ এবং ১০ ডলারের কয়েন প্রচলিত (যদিও ১ ও ৫ ডলারের কয়েনের ব্যবহার এখন খুব কমে গেছে)।
- মুদ্রার মান (বিনিময় হার) গায়ানিজ ডলারের মান মার্কিন ডলারের বিপরীতে মোটামুটি স্থিতিশীল থাকে। জানুয়ারি ২০২৬-এর কাছাকাছি সময়ে আনুমানিক বিনিময় হার হলো:
১ মার্কিন ডলার = ২০৮-২১০ গায়ানিজ ডলার। ১ বাংলাদেশি টাকা =১.৭৫-১.৮০ গায়ানিজ ডলার।
ইতিহাস:
গায়নার ইতিহাস বেশ বৈচিত্র্যময় এবং ঔপনিবেশিক শাসনের উত্থান-পতনের গল্পে ভরপুর। দেশটির ইতিহাসকে মূলত কয়েকটি প্রধান যুগে ভাগ করা যায়:
- আদিবাসী যুগ
ইউরোপীয়দের আগমনের আগে গায়নায় মূলত দুটি আদিবাসী গোষ্ঠী বাস করতো আরাওয়াক (Arawaks) এবং কারিব (Caribs)। 'গায়না' নামটি এই আদিবাসী
জনগোষ্ঠী। যার অর্থ হলো "অনেক পানির দেশ" ।
- ঔপনিবেশিক শাসন (ডাচ ও ব্রিটিশ)
- ডাচ শাসন (১৫৮১): ১৬শ শতাব্দীর শেষে ওলন্দাজ বা ডাচরা প্রথম এখানে বসতি স্থাপন করে। তারা বাণিজ্য কেন্দ্র তৈরি করে এবং মূলত চিনি চাষের ওপর গুরুত্ব দেয়।
- ব্রিটিশদের দখল: ১৮শ শতাব্দীর শেষ থেকে ১৯শ শতাব্দীর শুরুর দিকে ব্রিটিশরা এলাকাটি দখল করে নেয়। ১৮৩১
খ্রিষ্টাব্দে তিনটি আলাদা প্রদেশ (এসকুইবো, ডেমেরারা এবং বারবিস) একত্রিত করে "ব্রিটিশ গায়ানা" নামকরণ করা হয়।
- দাসপ্রথা: চিনি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ব্রিটিশরা প্রথমে আফ্রিকা থেকে হাজার হাজার মানুষকে দাস হিসেবে নিয়ে আসে। ১৮৩৪
খ্রিষ্টাব্দে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর শ্রমের ঘাটতি মেটাতে ভারত থেকে বিপুল সংখ্যক চুক্তিবদ্ধ শ্রমিক নিয়ে আসা হয়। গায়নার বর্তমান জাতিগত বৈচিত্র্যের মূল ভিত্তি এই ইতিহাস।
- স্বাধীনতা অর্জন (১৯৬৬) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতার দাবি জোরালো হয়। ১৯৬৬
খ্রিষ্টাব্দের ২৬ মে গায়না ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৭০
খ্রিষ্টাব্দের ২৩ ফেব্রুয়ারি এটি একটি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয় এবং নাম হয় "কো-অপারেটিভ রিপাবলিক অফ গায়না"।
- বর্তমান গায়না: তেলের যুগ
দীর্ঘকাল ধরে কৃষি এবং খনিজ (সোনা ও বক্সাইট) নির্ভর অর্থনীতির পর, ২০১৫
খ্রিষ্টাব্দে গায়নার উপকূলে বিশাল তেল ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়। এটি বর্তমানে দেশটির অর্থনীতিকে বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত করেছে।