ইতালির পতাকা

ইতালি
Italy


পশ্চিম ও দক্ষিণ ইউরোপের একটি রাষ্ট্র। প্রাতিষ্ঠানিক নাম: ইতালিয়ান প্রজাতন্ত্র
[Repubblica Italiana (Italian Republic)]

ভৌগোলিক অবস্থান: স্থানাঙ্ক: ৪২°৩০' উত্তর ১২°৩০'পূর্ব। এর উত্তরে আল্পস্ পর্বতমালা সংলগ্ন ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও স্লোভেনিয়া দ্বারা পরিবেষ্টিত দেশ। এর ভিতরে রয়েছে ভ্যাটিক্যান সিটি ও সান ম্যারিনো নামক দুটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র।

আয়তন:৩,০১,৩৩৮ বর্গকিলোমিটার (১,১৬,৩৪৭ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা:২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের জনগণনা অনুসারে প্রায় ৬,০৩,৫৯,৫৪৬ জন।

নাম: ইতালিয়া
(Italia) নামের বুৎপত্তি নিয়ে বহু মতবাদ রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, ইতালির প্রাচীন নাম Víteliú শব্দটি এসেছিল গ্রিক ভাষা থেকে। প্রথমে এই শব্দটি ইতালিতে প্রচলিত ইন্দো-ইউরোপীয়ান ভাষা পরিবারের প্রাচীন ওস্কান ভাষায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। পরে ল্যাটিন ভাষায় তা অন্তর্ভুক্ত হয়। ল্যাটিন vitulus শব্দের অর্থ হলো- বাছুর। ইতালিয়া শব্দের অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে -'ছোট গবাদিপশুদের চারণভূমি' হিসেবে।

গ্রিক ইতিহাসবিদ ডিওনিসিয়াস অব হালিকারনাসাস লোক-কাহিনী ও গ্রিক পৌরাণিক কাহিনির সূত্র ধরে ইতালিকে ইটালুস
(Italus) নামে অভিহিত করেছেন। এই কাহিনিদ্বয় অনুসারে,

এই লোক-কাহিনি মতে- ওনোট্রাস ছিলেন আর্কেডিয়ার অধিবাসী লাইকায়োনের পুত্র। তিনি কোনো এক সময় তিনি আর্কেডিয়ার থেকে ইতালিয়ান উপদ্বীপে চলে আসেন এবং একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে রাজত্ব গড়ে তোলেন। ওনোট্রাসের নামানুসারে এই জাতির নাম হয় ওনোট্রিয়ান । গ্রিক পৌরাণিক কাহিনি মতে এই পুত্রের নাম ইতালুস। তিনি ছিলেন পেনেলপে এবং তেলেগোনাসের (ওডিসিয়াস) পুত্র। ইটালুস থেকে পরবর্তী সময়ে ইতালুস থেকে ইতালি নামের উদ্ভব হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এরিস্টটল ও থুসিদিদেসও এই মতের সপক্ষে রায় দেন।

ইতিহাস: মন্টে পোগ্গিয়োলো প্রত্নক্ষেত্রে প্রাপ্ত প্রাচীন প্রস্তর সভ্যতার সহস্রাধিক প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা থেকে অনুমান করা হয় যে, ৮ লক্ষ ৫০ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে এই অঞ্চলে হোমো গণের প্রজাতির আবির্ভাব ঘটেছিল। এদের ভিতরে হোমো গণের হোমো নিয়ানডার্থালেনসিস নামক প্রজাতি বসতি স্থাপন করেছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২ লক্ষ অব্দের দিকে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০ হাজার অব্দের দিকে এই অঞ্চলে আধুনিক মানুষ (হোমো স্যাপিয়েন্স) বসতি স্থাপন করেছিল।

রোমান সভ্যতার উত্থানের পূর্বে ইতালিতে নানা জাতি ও জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। এদের মধ্যে উম্ব্রিয়ান, ল্যাটিন, ভলস্কি, সামনিট, কেল্ট এবং লিগুরিয়ান জনগোষ্ঠীর অনেকেই ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী ছিল। এছাড়া ইট্রুস্কান, ইলিমিয়ান, সিকানী এবং প্রাগৈতিহাসিক সার্দিনীয় জনগোষ্ঠী ইতালির প্রাচীন ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

খ্রিষ্টপূর্ব সপ্তদশ থেকে একাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে মাইসেনীয় গ্রিকদের সঙ্গে ইতালির যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পরবর্তীকালে খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম ও সপ্তম শতাব্দীতে গ্রিকরা সিসিলি দ্বীপ ও দক্ষিণ ইতালিতে বহু উপনিবেশ স্থাপন করে। এই অঞ্চলটি পরে “ম্যাগনা গ্রায়েসিয়া” বা বৃহত্তর গ্রিস নামে পরিচিতি লাভ করে। একই সময়ে ফিনিশীয়রা সার্দিনিয়া ও সিসিলির উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যকেন্দ্র ও বসতি স্থাপন করে।

আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীতে টাইবার নদীর তীরে একটি ক্ষুদ্র ল্যাটিন কৃষি-সমাজ থেকে রোম নগরীর বিকাশ শুরু হয়। পরবর্তীকালে রোম ধীরে ধীরে সমগ্র ইতালিকে এবং পরে ভূমধ্যসাগরীয় বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে নিজেদের অধীনে এনে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। এই সাম্রাজ্যে গ্রিক ও রোমান সংস্কৃতির মেলবন্ধনে এক নতুন সভ্যতার বিকাশ ঘটে, যার প্রভাব আজও আধুনিক আইন, প্রশাসন, দর্শন, সাহিত্য, স্থাপত্য ও শিল্পকলায় বিদ্যমান। পশ্চিমা সভ্যতার বহু মৌলিক ভিত্তি এই গ্রিক-রোমান ঐতিহ্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।

চতুর্থ শতাব্দীর শেষভাগে রোমান সাম্রাজ্য ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ৩৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তা আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত হয়— পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্য এবং পূর্ব রোমান সাম্রাজ্য (বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য)। পরবর্তী সময়ে জার্মানিক ও মধ্য এশীয় বিভিন্ন জাতি, যেমন গোথ, ভ্যান্ডাল, হুন, ফ্রাঙ্ক প্রভৃতির আক্রমণে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম রোমান সম্রাটের অপসারণের মাধ্যমে পশ্চিম সাম্রাজ্যের অবসান ঘটে। এরপর ইতালীয় উপদ্বীপ বহু ক্ষুদ্র রাজ্য, ডাচি ও নগর-রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে যায়। দীর্ঘ প্রায় তেরো শতাব্দী ধরে এসব রাষ্ট্রের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যুদ্ধ ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলতে থাকে। অন্যদিকে পূর্ব রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নিজেকে রোমান সাম্রাজ্যের বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং বহু শতাব্দী ধরে রোমান ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে।

ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে ইতালির বিভিন্ন অংশে লোম্বার্ড, বাইজেন্টাইন ও পাপাল শক্তির মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলতে থাকে। অষ্টম শতাব্দীতে ফ্রাঙ্ক সম্রাট শার্লেমেন ইতালির একটি বৃহৎ অংশের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। মধ্যযুগে ইতালি একক রাষ্ট্রে পরিণত না হয়ে ভেনিস, জেনোয়া, ফ্লোরেন্স, মিলান ও নেপলসের মতো শক্তিশালী নগর-রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল। এদের মধ্যে বাণিজ্য, সামরিক শক্তি ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ইতালিকে ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করে।

চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালি ইউরোপীয় নবজাগরণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ফ্লোরেন্স, রোম ও ভেনিসে শিল্প, সাহিত্য, বিজ্ঞান ও দর্শনের অভূতপূর্ব বিকাশ ঘটে। লিওনার্দো দা ভিঞ্চি, মাইকেলেঞ্জেলো এবং গ্যালিলিও গ্যালিলেই-এর মতো ব্যক্তিত্বেরা বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে স্থায়ী অবদান রাখেন। তবে একই সময়ে ফ্রান্স, স্পেন ও পবিত্র রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে ইতালির ভূখণ্ড নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হয় এবং ইতালির রাজনৈতিক ঐক্য আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

উনবিংশ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ফলে ইতালির একীকরণ শুরু হয়। জিউসেপ্পে ম্যাজিনি, কামিলো বেনসো দি কাভুর এবং জিউসেপ্পে গ্যারিবাল্ডি-এর নেতৃত্বে বিভিন্ন রাজ্য ও অঞ্চল ধীরে ধীরে একত্রিত হয়। ১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে ভিক্টর ইমানুয়েল দ্বিতীয়-এর নেতৃত্বে ইতালি রাজ্যের প্রতিষ্ঠা ঘটে।

১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোম যুক্ত হলে ইতালির রাজনৈতিক একীকরণ সম্পূর্ণ হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালি মিত্রশক্তির পক্ষে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে বেনিতো মুসোলিনি
১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে ক্ষমতায় আসেন এবং ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইতালি আডলফ হিটলার-এর জার্মানির মিত্র হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেয়। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মুসোলিনির পতন ঘটে।

১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে গণভোটে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়ে ইতালি প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। যুদ্ধোত্তর সময়ে ইতালি দ্রুত শিল্পোন্নয়ন ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতিতে পরিণত হয়। দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ এবং ন্যাটো-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। বর্তমানে ইতালি তার সমৃদ্ধ ইতিহাস, শিল্প-সংস্কৃতি, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, সাহিত্য ও অর্থনৈতিক শক্তির জন্য বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত। রোমান সভ্যতার উত্তরাধিকার, নবজাগরণের গৌরব এবং আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিকাশে ইতালির অবদান বিশ্ব ইতিহাসে এক বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।