মরসিয়া কাব্য
শোক গাঁথামূলক কাব্য
ও গানকে সাধারণ ভাবে মর্সিয়া বলা হয়।
আরবী মর্সিয়া শব্দের অর্থ হলো- শোক প্রকাশ করা। আরবী সাহিত্যে মর্সিয়া শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে নানা ধরনের শোকাবহ ঘটনাকে
প্রকাশ করার অর্থে। পরবর্তী সময়ে কারবালা প্রান্তরে শহিদ
ইমাম হোসেন ও অন্য শহিদদেরকে উপজীব্য করে লেখা সাহিত্য মর্সিয়া নামে
আখ্যায়িত হওয়া শুরু হয়েছে।
ইসলামী ইতিহাস অনুসারে, হিজরী ৬১ সনের ১০ই মহরম (১০ অক্টোবর, ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) তারিখে, হজরত মুহম্মদ (সাঃ)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন কারবালা প্রান্তরে শহিদ হন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ভিতর শিয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়।
উল্লেখ্য
মুহম্মদ (সাঃ)-এর
মৃত্যুর পর যে চারজন খলিফা পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন, এঁদের ভিতর চতুর্থ খলিফা ছিলেন, নবীর জামাতা হযরত আলীকে (রা.)। কিন্তু শিয়া
মতাবলম্বীরা মনে করেন, হযরত আলী(রা.)-ই প্রকৃতপক্ষে প্রথম খলিফা মানে। কিন্তু
নবীর মৃত্যুর পর হযরত আলী (রা.) খলিফা নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হন। পরপর তিনজন খলিফার
শাসনকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর, ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এ পদে নির্বাচিত হন। সে সময়
তৃতীয় খলিফা উসমানের (রা.) আত্মীয় মুয়াবিয়া (রা.) এর তীব্র বিরোধিতা করেন। হযরত
আলী (রা.) ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে শাহাদত বরণ করলে, তাঁর পুত্র হযরত হাসান (রা.) খলিফা
হন। কিন্তু তিনি মুয়াবিয়ার (রা.) কাছে খেলাফত ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। এর কিছুপরে
পরেই বিষ প্রয়োগে তাঁকে হত্যা করা হয়। মুয়াবিয়ার (রা.) মৃত্যুর পর হযরত হাসানের
(রা.) ভাই হযরত হুসেইনকে (রা.) খলিফা হিসেবে নির্বাচিত হবেন বলে অনেকে আশা
করেছিলেন। কিন্তু মুয়াবিয়ার (রা.) পুত্র ইয়াজিদ খলিফা হন। এই সূত্রে হযরত হোসেন
(রা.) এবং ইয়াজিদের ভিতরে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত হিজরী ৬১ সনের ১০ই মহরম
(১০ অক্টোবর, ৬৮০ খ্রিষ্টাব্দ) ইয়াজিদের বাহিনীর কাছে কারবালা প্রান্তরে হযরত
হোসেন (রা.) পরাজিত ও নিহত হন। হযরত আলী (রা.) ও তাঁর পুত্রদের সমর্থকরা একে এজিদের
একটি ধর্মবিরোধী কাজ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এই ভাবনা ধীরে ধীরে শিয়া মতবাদের জন্ম
দেয়।
আরবীয় মুসলমানদের দ্বারা পারশ্যে ইসলাম ধর্মের বিকাশ ঘটলে, ফারসি ভাষা-
সাহিত্য-সঙ্গীতে, আরবি মর্সিয়া শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। মুসলমানরা ভারত উপমহাদেশে
রাজত্ব কায়েম করলে, ইসলামী অনুশাসনের সূত্রে সরকারি ভাষা ফার্সি হয়েছিল। এই সময়
মর্সিয়া ভারতীয় ভাষাগুলোতে বিদেশী শব্দ হিসেবে প্রচলিত হয়। বাংলাদেশে ১২০৪
খ্রিষ্টাব্দে ইখতিয়ার উদ্দীন বখতিয়ার খিলজি বঙ্গদেশ জয় করে। ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ
পর্যন্ত বঙ্গদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সময় মুসলমানদের
দ্বারা মোহরম পালিত হওয়া শুরু হয়। এই কাহিনি অবলম্বনে প্রথম মর্সিয়া কাব্য রচনা
করেছিলেন শেখ ফয়জুল্লাহ। ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর রচিত এই গ্রন্থটির নাম 'জয়নবের
চৌতিশা'। এরপর আরও অনেকে এই বিষয়ের উপর কাব্য রচনা করেছিলেন। নিচে উল্লেখযোগ্য
মর্সিয়া কাব্যের নাম কালানুক্রমে তুলে ধরা হল।
- জয়নবের চেতিশা।
শেখ ফয়জুল্লা। ১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দ।
-
জঙ্গনামা । দৌলত উজির বাহরাম খান
(ষোড়শ শতাব্দী)- মক্তুল হোসেন (ফার্সি
কাব্যের অনুবাদ)। মোহাম্মদ খান (১৬৪৬ খ্রিষ্টাব্দ)
-
কাসিমের
লড়াই। সেবরাজ।
- জঙ্গনামা ।
আব্দুল হাকিম
(১৭২৩)
-
জঙ্গনামা।
হোয়াত মাহমুদ
(১৭২৩)-
শহীদ-ই-কারবালা, সখিনার বিলাপ। জাফর
-
সংগ্রাম
হুসন (১৭৪০)
-
কাসেম বধ-কাব্য (১৯০৫)। আবুল্-মা-আলী মহাম্মদ হামিদ আলী
-
মোহররম কাব্য। কায়কোবাদ (১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ)
- মহরম চিত্র। ফজলুর রহমান চৌধুরী। (১৯১৭)