খ্রিষ্টপূর্ব ‌১১৮৬-১১৭২ অব্দের ব্যবিলনের মেলি-শিপাক-২ এর আমলের সীমানার পাথুরে দেওয়ালে খোদিত চিত্রে আটকোণা তারা দেখা যায়। একে ইশতার দেবীর তারা হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ইনান্না/ইশতার
Inanna

প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার প্রেম, যুদ্ধ এবং উর্বরতার। অনেক ক্ষেত্রে তাঁকে কামুকতা, প্রজনন, ঐশ্বরিক আইনের দেবী হিসেবেও মান্য করা হতো। তাঁকে স্বর্গের রাণী হিসেবেও মান্য করা হতো।

আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্য, ব্যাবিলনীয় এবং অ্যাসিরিয়ান দেবী ইশতার-এর সাথে এঁকে তুলনা করা হয়ে থাকে। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া এই দেবীকে বিশেষ ভাবে স্বর্গরের রাণীর আসনে বসানো হয়েছিল। তাঁর স্বামী ছিলেন ডুমুজিড। তাঁর পরিচারকা ছিলেন নিংশুবু দেবী।

খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০০-৩১০০ অব্দের দিকে সুমেরিয়ান
উরুক নগরীতে এই দেবীর উপাসনা করা হতো। উরুক নগরীর ইনান্না মন্দিরের প্রধান দেবী বিশেষভাবে পূজিতা ছিলেন। গিলগামেশ মহাকাব্যে বলা হয়েছে- গিলগামেশ এই দেবীর পবিত্র মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। অন্যান্য পাঠে এই মন্দিরকে তাঁর বাসভবন হিসেবে বিবেচনা করা হতো

খ্রিষ্টপূর্ব ২৩৫০-২১৫০ আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্যের সিলের উপর ইশতার দেবীর চিত্র

দিনের সকাল ও সন্ধ্যায় এই দেবী তিনটি রূপে পূজিতা হতেন। সকালের দেবী  ইনান্না ( ইনান্না-ইউডি/হুদ), সন্ধ্যায় পূজিতা হতেন সন্ধ্যা  ইনান্না ( ইনান্না সিগ) এবং রাজকুমারী  ইনান্না ( ইনান্না নুন) নামে। ভোরের  ইনান্নার এবং সন্ধ্যা  ইনান্না র সাথে সম্পৃক্ততা শক্র গ্রহের। উল্লেখ্য ভোরের শুক্রগ্রহের নাম  শুকতারা এবং সন্ধ্যার শুক্রগ্রহৈর নাম সন্ধ্যাতারা। তবে তার সবচেয়ে বিশিষ্ট প্রতীকগুলির মধ্যে ছিল সিংহ এবং আট কোণা তারা।

আক্কাদাইন সাম্রজ্যের প্রথম সম্রাট সার্গোন (রাজত্বকাল ২৩৩৪-২২৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) উরুক নগরী দখল করে নেন। এই সময় এই দেবী সুমেরীয় ধর্মের প্রধান দেবী হিসেবে পূজিতা হতেন। এই সময় এই দেবী বিভিন্ন যৌনাচার ভিত্তিক বিশ্বাসের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল। পরে ধীরে ধীরে ব্যাবিলনীয় এবং আসুরিয়ান ধর্মবিশ্বাসে এই দেবী ইনান্না বা ইশতার নামে যুক্ত হয়েছিল।

তবে এই দেবী  আসুরিয়ানদের কাছে অত্যন্ত প্রিয় দেবী হিসেবে সম্মানিতা ছিলেন। এঁরা নিজদের জাতীয় দেবতা আশুরের চেয়ে অধিক মর্যাদায় সম্মান ও পূজা করতেন।

বার্লিনের ভোর্ডেরাসিয়াটিস যাদুঘরে য়ান্না মন্দিরের সম্মুখভাগ

ইশতার দেবীর মন্দিরের পবিত্র গণিকা
এই গণিকারা সাধারণ যৌনকর্মী ছিলেন না। এঁরা দেবীর উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করতেন। এঁরা মন্দিরের অধীনে বসবাস করতেন। এঁদের  যাঁর যৌনকর্ম ছিল  ধর্মীয় ও আচারমূলক। তাই দেবীর পুরোহিত বা দেবীর আশীর্বাদধন্য রাজন্যবর্গের কাছে দেহদান পাপ ছিল না। তাই তাঁর পবিত্রা নারী হিসেবে সম্মানিতা ছিলেন। সাধারণ নারীদের তুলনায় বেশি শিক্ষা ও ক্ষমতা লাভ করতেন।

প্রাচীন সুমের ও ব্যাবিলনে বিভিন্ন ধরনের মন্দির-নারীর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন-

১. নাদিতু (Nadītu): উচ্চবংশীয় নারী। এঁরা দেবীর সেবায় নিয়োজিত হতেন। সাধারণত সন্তান ধারণ করতেন না। এঁরা অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর
২. কাদিশ্‌তু
(Qadištu): কাদিশ্‌তু শব্দের অর্থ ছিল- পবিত্র। এঁরা যৌন আচার পালনে যুক্ত ছিলেন দেবীর প্রতিনিধি হিসেবে।
৩. ইশতারিতু
(Ishtarītu): এঁরা সরাসরি ইশতার মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত উর্বরতা-আচার ও উৎসবে অংশ নিতেন। সব পবিত্র নারীই যৌন সেবায় যুক্ত ছিলেন। এমন প্রমাণ নেই; তবে কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণি নারী এই আচার পালন করতেন।

গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস দাবি করেন- ব্যাবিলনে প্রত্যেক নারীকে জীবনে একবার ইশতার মন্দিরে দেহদান করতে হতো। আধুনিক গবেষকরা মনে করেন- এটি অতিরঞ্জিত বা ভুল ব্যাখ্যা। সব নারীর জন্য বাধ্যতামূলক ছিল- এমন প্রমাণ নেই। সম্ভবত নির্দিষ্ট শ্রেণির নারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল এ নিয়ে আজও বিতর্ক রয়েছে।

এই প্রথা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়ার পিছনে যে কয়েকটি  কারণ উল্লেখ করা হয়।

এই দেবীর সমতূল্য দেবী ছিলেন ফিনিসিয়ানরা তাঁদের দেবী অ্যাস্টার্ট। সম্ভবত সুমেরীয়দের প্রভাবে এমনটা ঘটেছিল। পরবর্তীয় সময়ে সম্ভবত এই দেবীর আদলে গ্রিক দেবী এ্যাফ্রদাইতির প্রকাশ ঘটেছিল।

খ্রিষ্টধর্মের আত্মপ্রকাশের পর এই অন্যান্য দেবী-সহ এই দেবীর পূজা বিলুপ্ত হয়ে যায়।


সূত্র