প্রাচীন
মেসোপটেমিয়া সভ্যতার
আক্কাদিয়ান শাসনামলে রচিত পৌরাণিক মহাকাব্যের (গিলগামেশ মহাকাব্য) প্রধান চরিত্র বিশেষ। ধারণা
করা হয়- এই মহাকাব্যটি রচিত হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২১০০ অব্দের দিকে।
গ্রন্থটির লেখা হয়েছিল
কীলক লিপিতে। সম্রাট আসুরবানিপলের গ্রন্থগারে সংরক্ষিত কাব্যটিতে মোট চরণ সংখ্যা
প্রায় ৩ হাজার।
এই কাব্যের গিলগামেশ ছিলেন
উরুক নগরীর রাজা।
সুমেরীয় সাহিত্য অনুসারে, গিলগামেশের পিতা ছিলেন রাজা
লুগালবান্দা। তাঁর মা ছিলেন
দেবী নিনসুন। এই কারণে বলা হয়েছে গিলগামেশের দুই-তৃতীয়াংশ ছিল দৈব সত্তা। গিলগামেশের
রাজত্বের পূর্বে খ্রিষ্টপূর্ব
৩৪০০-৩১০০ অব্দের ভিতরে রাজা লুগালবান্দা
উরুকে রাজা হিসেবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। এরপর কুয়ারা থেকে আসা ডুমুজিদ নামক একে জেলে
উরুক দখল করে নেন। এনমেবারগেসি উরুক আক্রমণ করে, ডুমুজিদকে বন্দী করেন।
এরপর গিলগামেশকে তার তাঁর এই রাজ্যের শাসক হিসেবে নিযুক্ত করেন। সম্ভবত রাজা গিলাগমেসের রাজত্বকাল ছিল খ্রিষ্টপূর্ব ২৯০০-২৩৫০ অব্দের ভিতরে।
গিলগামেশ মহাকাব্যের সম্পূর্ণ বিদ্যমান পাঠ্যটি ঊনবিংশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে তুর্কি
প্রত্নতাত্ত্বিক হরমুজদ রাসামের অসম্পূর্ণ আক্কাদিয়ান-ভাষার ফলকে পাওয়া যায়। এটি
পাওয়া গিয়েছিল নিনেভের অ্যাসিরিয়ান রাজা আশুরবানিপালের (শাসনকাল
খ্রিষ্টপূর্ব ৬৬৮-৬২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ) গ্রন্থাগারে পাওয়া গিয়েছিল।
খ্রিষ্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে উত্তর ইরাকের মসুল শহরের কাছাকাছি আবিষ্কৃত হয় নিনেভেহ
(Nineveh)
নামক একটি প্রাচীন শহর। এটি ছিল অ্যাসিরীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের
তত্ত্বাবধানে প্রত্নতাত্ত্বিক অস্টিন হেনরি লায়ার্ড
(Austen Henry Layard)
এখানে রাজা আশুরবানিপালের হারিয়ে যাওয়া প্রাচীন গ্রন্থাগার আবিষ্কার করেন। এই
গ্রন্থাগার থেকে উদ্ধার করা হয় ৩০,০০০ পাথরের ফলক। এসব ফলকের ১২টিতে পাওয়া যায় গিলগামেশ মহাকাব্য।
এই ফলকগুলির মধ্যে যে
অসম্পূর্ণ অংশ ছিল- আংশিকভাবে মেসোপটেমিয়া এবং আনাতোলিয়ার অন্য কোথাও পাওয়া বিভিন্ন টুকরো
হিসেবে পাওয়া গেছে। এছাড়া খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধে ভিন্ন ভিন্ন
ফলকে পাওয়া সুমেরীয় ভাষায় পাঁচটি ছোট কবিতা কিছু নমুনা থেকে এই কাব্যের বিবরণ
পাওয়া গেছে। এই কবিতাগুলোর শিরোনাম হলো- গিলগামেশ এবং হুওয়াওয়া, গিলগামেশ এবং স্বর্গের ষাঁড়, গিলগামেশ এবং আগা অফ কিশ, গিলগামেশ, এনকিডু এবং নেদারওয়ার্ল্ড, এবং গিলগামেশের মৃত্যু।
মহাকাব্যের নিনেভাইট সংস্করণটি শুরু হয়েছে গিলগামেশের প্রশংসায় একটি প্রস্তাবনা দিয়ে।
এই কাব্যের প্রথম ফলকে গিলগামেশকে বলা হয়েছে- তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার জন্য বিখ্যাত
ছিলেন। তিনি ছিলেন বহুদর্শী। তিনি গোপন ও নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ জানতে এবং সেগুলো প্রকাশ
করেছিলেন। তিন প্লাবন-পূর্ বিষয়ে অবগত ছিলেন। তিনি অমরত্বের সন্ধানে দূর-যাত্রা
সম্পন্ন করে ক্লান্ত হয়েছিল। তিনি তাঁর কীর্তির কথা মাটির ফলকে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।
গিলগামেশ মহাকাব্যের পাঠ থেকে জানা যায়-
তিনি উরুক নগরীর প্রাকার এবং এই নগরীতে ইনান্না দেবী
মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। গিলগামেশ প্রাকার নির্মাণে কষ্টসাধ্য কাজে প্রজাদের নিয়োগ
করেছিলেন। তিনি নগরীর অভিজাত ব্যক্তিদের পত্নীদের যোদ্ধাদের কন্যাদের অপহরণ করে ভোগ
করা শুরু করেছিলেন। এই অত্যাচারে অতীষ্ট হয়ে উরুকবাসী দেবরাজ আনুর কাছে অভিযোগ করেন।
আনু গিলগামেশের যোগ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে আরুদেবীকে একটি বন্য ষাঁড় তৈরির নির্দেশ দেন।
আরুরু একটি কাদার পিণ্ডকে তৃণাবৃত প্রান্তরে নিক্ষেপ করলে এনকিদুর জন্ম হয়।
গিলগামেশ কাব্য এনকিদুকে নিনুর্তার পুত্র নামে অভিহিত করা হয়েছে। তার শরীর ষাঁড়ের
মতো হলেও দেহ মাথা ছিল মানুষের মতো। তার দেহ ছিল লোমাবৃত, মাথায় মেয়েদের মতো দীর্ঘ
চুল ছিল। সে হরিণীদের সাথে জলপান করতো, এবং অন্য পশুদের সাথে জলক্রীড়া করতো।
তৃণভূমিতে বিচরণকালে সে শিকারীদের পাধা ফাঁদ বিনষ্ট করতো। শিকারীরা বিষয়টি জানার পর,
সে তার বাবাকে বিষয়টি জানানোর জন্য গিলগামাশের কাছে পাঠায়। ইতিমধ্যে গিলগামেশ
স্বপ্নের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে এনকিদুকে ধরার জন্য এক শামহাত নামক পবিত্র
পতিতাকে পাঠন।
শামহাত তার ছলকলা দিয়ে এনকিদুকে মোহিত করেন। এদের যৌনমিলনের পর, শামহাত এনকিদুর গুণ
কীর্তন করে বলেন, সে দেবতার মতো জ্ঞানী, পশুপালের সহচর হয়ে প্রান্তরে বিচরণ করা তার
শোভা পায় না। তার উচিৎ আনু আর ইশতাহারের আবাস উরুক নগরীতে যাওয়া। সেখানকার রাজ
গিলগামেশ বন্য ষাঁড়ের মতো বলবান এবং প্রবল প্রতাপে রাজত্ব করেন।
শামহাতের যৌবন এবং তার কথায় মুগ্ধ হয়ে এনকিদু শামহাতের হাত ধরে উরুক নগরীতে আসে।
শামহাত তাকে স্নান করিয়ে, পোশাক পড়িয়ে সভ্য মানুষের মতো করে তুললো। এরপর তাকে মদ ও
রুটি খেতে দিল। এরপর শামহাত তাকে নিয়ে গিলগামেশের যৌনোৎসনের লীলস্থল হিসেবে পরিচিত
গণ-মিলনায়তনে নিয়ে এলো। এই সময় গিলগামেশ গণ-মিলনায়তনে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু
গণ-মিলনায়তনের প্রবেশমুখে এনকিদু গিলগামেশকে বাধা দিলে, উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়।
প্রচণ্ড যুদ্ধের পর গিলগামেশ বিজয়ী হয়ে চলে যাওয়ার উদ্যোগ নিলে, এনকিদু হার স্বীকার
করে নিলে উভয়ের বন্ধুত্ব তৈরি হয়।
এরপর গিলগামেশ সিডার বনের হিমবাবা নামক দানবকে হত্যা করার উদ্যোগ নেন। এই দানবকে
সিডার বনের রক্ষক হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন এনলিল। মুখ দিয়ে আগুনে নিঃশ্বাসে ঝড় বইতো।
প্রথমে এনকিদু গিলগামেশকে এই অভিযানে যেতে নিষেধ করেন। এনকিদুর নিষেধ উপেক্ষা করে
গিলগামেশ যখন এই অভিযান বাতিল করলেন না, তখন এমকিদুও তার সঙ্গে গেলেন। তবে এই
যাত্রার পূর্বে এঁরা সূর্যদেবতা শামাশকে বন্দনা ও পূজা করেলেন।
তাঁর দ্রুত গতিতে ছয় সপ্তাহের পথ তিন দিনে অতিক্রম করে বিশাল সিডার বনে এলেন।
যে গাছের উপর হুওয়াওয়া দানব গুমিয়ে ছিল, গিলগামেশ কুঠার দিয়ে সেই গাছের গোড় কাটা
শুরু করেন। হুওয়াওয়া জেগে ওঠে ভয়ঙ্কর রূপ ধরে সামনে এলে, গিলগামেশ ভয় পেয়ে যান। তাই
তিনি শামাশ দেবতার সাহায্যের জন্য প্রার্থনা করেন। শামাস তখন অষ্টবায়ু পাঠিয়ে
হুওয়াওয়াকে অবশ করে ফেলেন। অসহায় হুওয়াওয়া গিলগামেশের কাছে প্রাণ ভিক্ষা চাইলেও,
গিলগামেশ তা না শুনে হুওয়াওয়ার মাথা কেটে ফেললেন এবং বিজয়ীর বেশে উরুকে ফিরে গেলেন।
গিলগামেশের বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে- দেবী ইশতাহার তাঁকে প্রেম নিবেদন করে বললেন- 'হে বীর
তুমি আমার সঙ্গী হও। আমার স্বামী হয়ে- আমাকে তোমার বীর্য উপহার দাহো। আমি তোমায়
নীলকান্ত খচিত সোনার রথ দেবো। এই রথের জন্য দেবো ঝটিকা-দৈত্যের মতো ঘোড়া দেবো।
সিডার সৌরভে ঘেরা গৃহে থাকবে।'
দেবীর প্রেম ক্ষণস্থায়ী বলে- গিলগামেশ এই প্রেম নিবেদন -প্রত্যাখ্যান করে বললেন- 'তুমি
তোমার কোনো প্রেমিককে চিরকাল সঙ্গ দাওনি। তুমি তোমার তরুণ স্বামী তামিজকে কাঁদিয়েছ
বৎসর বৎসর। তোমার পিতার উদ্যান রক্ষক ইশুল্লানুকে প্রেম নিবেদন করেছিলে। কিন্তু সে
তোমাকে প্রত্যাখ্যান করায় তুমি তাকে গন্ধমুষিকে পরিণত করেছিলে। তোমার প্রাসাদ ধ্বংস
করে বীরুকে হত্যা করেছিলে।'
ইশতাহার প্রত্যাখ্যিত হয়ে দেবরাজ আনুর কাছে দেবীর প্রেম প্রত্যাখ্যানকারী হিসেবে
গিলগামেশের বিরুদ্ধ অভিযোগ করেন। সে আবেদনে সাড়া দিয়ে গিলগামেশকে শাস্তি দেওয়ার
জন্য একটি স্বর্গীয় ষাঁড় পাঠালেন। এনকিদু স্বর্গ থেকে নেমে আসা এই ষাঁড়ের লেজ ধরে
কাবু করে ফেলেন, এরপর গিলগামেশ এই ষাঁড়ের গলায় তরোয়াল ঢুকিয়ে হত্যা করেন। ইশতাহার
উরুকের প্রাচীরে দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধ দেখে- গিলগামেশকে৪ অভিশাপ দিলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে
এনকিদু ষাঁড়ের একটি পা কেটে ইশতাহারের মুখে ছুঁড়ে মারেন। এতে দেবী আরও ক্ষুব্ধ হলেন।
দেবীর অপমানের শাস্তি দেওয়ার জন্য দেব সভা ডাকা হয়। দেবসভায় শামাস তাঁর প্রিয় ভক্ত
গিলগামেশের পক্ষ নেওয়ায় এনকিদুর মৃত্যদণ্ড দেওয়া। স্বর্গের এক যন্ত্রণাময় রোগে
এনকিদুর মৃত্যু হয়।
বন্ধুর মৃত্যুতে শোকাহত গিলগামেশ সাতদিন ধরে বিলাপ করেন। গিলগামেশ মৃত্যু অনিবার্য।
এবং তার মৃত্যুর সাথে সাথে, তার সকল শৌর্য-বীর্যের খ্যাতি, কীর্তি শেষ হয়ে যায়। তাই
তিনি অমরত্ব পাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। তিনি জানতেন এই অমরত্নের গোপন কথা
একমাত্র অমর মানুষ জানেন। তাঁর নাম উৎ-নাপিশতিম। এরপর তিনি উৎ-নাপিশতিমের সন্ধানে
বেরিয়ে পড়েন।
তিনি উৎ-নাপিশতিমের কাছে পৌঁছার জন্য সুদূর মাশু-পর্বতের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। এই
পর্বত ছিল সূর্যের দেবতার বাসস্থান। সূর্য সারাদিন পৃথিবীকে আলো ও তাপ দিয়ে
রাতে মাশু পর্বতে বিশ্রাম নিতেন। এই পর্বতের পাহাড়া দিত এক বৃশ্চিকমানব। যার ছিল
ভয়াবহ দ্যুতিময় রূপ আর দৃষ্টিতে ছিল মৃত্যু। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে গিলগামেশ মাশু
পর্বতে এসে বৃশ্চিকমানবকে দেখে অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন। কিন্তু গিলগামেশ দুই তৃতীয়াংশ
দেবতা ছিলেন, তাই বৃশ্চিকমানব তাঁকে দ্বার ছেড়ে দিলেন।
মাশু পর্বতের পরে ছিল অন্ধকার রাজ্য। সাতদিন ধরে এই অন্ধকারের মধ্য দিয়ে চলার পর,
স্বর্গী বারবনিতা সিঁদুরি কুটিরে পৌঁছান। কিন্তু গিলগামেশকে দেখে সিঁদুরি
প্রথমে ভয়ে কুটিরে ভিতরে লুকান। কিন্তু গিলগামেশ দরজা ভেঙে ভিতরে ঢোকার হুমকি দিলে
সিঁদুরি ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। গিলগামেশের কাছে অমরত্বের বিষয় জানতে পেরে- সিঁদুরি
তাঁকে বলেন- 'তুমি তার সন্ধান পাবে না। সৃষ্টির সময় অমরত্ব দেবতারা নিজেদের জন্য
রেখে মানুষের জন্য দিয়েছেন মৃত্যু। তাই অমরত্বের আশা ত্যাগ করে ঘরে ফিরে যায় এবং
জীবনকে উপভোগ কর।'
গিলগামেশ সিঁদুরির উপদেশ অগ্রাহ্য করে, তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় রইলেন। অগ্যতা সিঁদুরি
তাকে মৃত্যুসাগরের তীরে নিয়ে গেলেন। এই সাগরের খেয়াপারের মাঝি ছিলেন উরশানাবি। এই
মাঝি গিলগামেশের মলিন মুখ দেখে বিচলিত হয়ে- এর কারণ জানতে চাইলেন। গিলগামেশ
তাঁকে তাঁর অতীতের কাহিনী বললেন এবং অমরত্বের গোপন কথা জানার জন্য উৎ-নাপিশতিমের
কাছে যাচ্ছেন। সব শুনে উরশানাবি তাঁকে মরণসাগর পার করে দিলেন। এই মরণসাগরের পারেই
ছিল উৎ-নাপিশতিমের আশ্রম। গিলগতামেশ তাঁর কাছে অমরত্বের গোপন রহস্য জানতে চাইলে-
তিনি একটি মহাপ্লাবনের কথা ব্যক্ত করেন।
গিলগামেশ মহাকাব্যে বর্ণিত মহাপ্লাবন
গিলগামেশ মহাকাব্যে বর্ণিত এই মহাপ্লাবনের কারণ এবং মহাপ্লাবনের সংঘটনের বিষয়ে
যা জানা যায়। উৎ-নাপিশতিম তাঁর আত্মপরিচয় দিয়ে এই ঘটনার বর্ণনা দেওয়া শুরু
করেন। উৎ-নাপিশতিম ছিলেন শুরুপ্পাকের রাজা উবারা তুতু'র তৃতীয় পুত্র। তিনি ইআ নামক
দেবতার প্রিয়পাত্র। কোনো এক সময় দেবতারা মানুষের আচরণে অসন্তুষ্ট হয়ে মানবজাতিকে এক
মহাপ্লাবনের মাধ্যমে ধ্বংস করে দেবেন।
ইআ তার ভক্ত উৎ-নাপিশতিমকে রক্ষা করার জন্য, তার নলখাগড়ার কুটিরের দেয়ালে মুখ রেখে
বললেন- 'উবারা তুতুর তৃতীয় পুত্র, তুমি এই ভেঙে ফেল এই ঘর। তৈরি কর এক বিশাল নৌকা।'
তিনি উৎ-নাপিশতিমকে নৌকা বানানোর কৌশল শিখেয়ে দিলেন। ইআর পরামর্শ অনুসারে উৎ-নাপিশতিম
সারাদেশ থেকে কারিগর এনে সাততলা একটি নৌকা তৈরি করলেন। এরপর ওই নৌকায় সকল প্রাণীর
বীজ উঠালেন। তারপর একদিন ভোরের আলোফোটার সময়- দিগন্তরেখায় কালো মেঘ দেখা দিল। সেই
মেঘের ভিতরে ঝড়-ঝঞ্ছার দেবতা আদাদ গর্জন করা শুরু করলেন। পাতালের দেবতা ইরেগাল
মাস্তুল উপড়ালেন। যুদ্ধ আর বাঁধের দেবতা নিবুর্তা বাঁধ ভেঙে দিলেন। এরপর একসাথে
ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টির সাথে সব বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে জল ঢুকে মহাপ্লাবনের সৃষ্টি
করলো। এই ভয়ঙ্কর প্লাবনে দেবতারা পর্যন্ত ভীত হয়ে পড়লেন। ইশতার প্রসবা রমণীর মতো
বিলাপ করতে লাগলেন। সাতদিন পর ঝড় বৃষ্টি শেষ হলে- দেখা গেল নৌকায় আশ্রয় নেওয়া
প্রাণিকূল ছাড়া সবার মৃত্য ঘটেছে। উৎ-নাপিশতিমএর জাহাজ ভাসতে ভাসতে নিশির
পর্বতচূড়ায় ঠেকল। কিন্তু তিনি কোনো ডাঙা দেখতে পেলেন না। এক সপ্তাহ পড়র উৎ-নাপিশতিম
একটি ঘুঘু ছেড়ে দিলেন। ঘুঘু ফিরে এলে তিনি এটি ফিঙে ছাড়লেন। ডাঙা না পেয়ে ফিঙে ফিরে
এলে তিনি একটা দাঁড়কাক ছেলে দিলেন। দাঁড় কাক ডাঙা পেয়ে ফিরে এল না। এবার উৎ-নাপিশতিম
দেবতাদের উদ্দেশ্যে আখ, সিডার আর সুগন্ধী সবুজ পাতার ভোগ তৈরি করে দেবতাদের
উদ্দেশ্যে নিবেদন করলেন। এই ভোগের গন্ধ পেয়ে দেবতারা মাছির মতো উৎ-নাপিশতিমএর পাশে
এসে হাজির হলেন। একজন মানুষ বেঁচে আছে দেখে ইআ-কে ভর্ৎসনা করলেন। কিন্তু ইআ তাঁকে
বুঝালেন যে, পৃথিবী যদি প্রাণিহীন হয়ে যায়, তবে দেবতার কাদের শাসন করবেন, এবং কারাই
বা দেবতাদের পূজা করবে। এরপর এনলিল নিজের রাগকে প্রশমিত করে উৎ-নাপিশতিমএর সামনে
এলেন। উৎ-নাপিশতিম তাঁকে প্রণাম করলে, তিনি তাঁকে অমরত্বের বর প্রদান করলন এবং
তাঁদের মরণসাগের পাড়ে বসবাসের জন্য স্থান নির্ধারণ কর দিলেন।
উৎ-নাপিশতিম তাঁর অমরত্ব হওয়ার কাহিনি বলার পর- গিলগামেশকে অমরত্বের কৌশল জানিয়ে
দিলেন। এই কৌশল ছিল- যদি সে সাত দিন সাতরাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিতে হবে। গিলগামেশ
এতটাই ক্লান্ত ছিলেন যে, শোওয়া মাত্রেই তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন এবং তাঁর ঘুম ভাঙলো অষ্টম
দিনের সকালে। গিলগামেশ তাঁর ব্যর্থতা বুঝতে ফিরে যখন ঘরে ফেরার জন্য
উরশানাবির নৌকায় উঠলেন, তখন গিলগামেশের জন্য উৎ-নাপিশতিমের মনে করুণার উদ্রেক হলো।
তিনি গিলগামেশকে জানালেন- সমুদ্রের গভীরে একটি কাঁটা গাছ জন্মায়। যদি এক ডুবে সে সে
গাছ তুলে এনে খেলে, অমরত্ব লাভ কবেন। গিলগামেশ কালবিলম্ব না করে- সাগরে ডধবন দিয়ে
সেই কাঁটা গাছ তুলে আনলেন। কাঁট গাছ লাভের প্রশ্রান্তি নিয়ে তিনি ঝর্নার জলে স্নান
করে কাঁটা গাছ পাশে রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এই সময় জলের ভিতর থেকে এক সাপ উঠে এসে
সুগন্ধী সেই কাঁটা লতা খেয়ে ফেললেন। যাওয়ার সময় সাপটি তার পালটানো খোলস রেখে
গিয়েছিল। ঘুম ভেঙে গিলগামেশ বুঝলেন সাপ তাঁর সংগৃহীত কাটাগাছ খেয়ে গেছে। গিলগামেশ
বিলাপ করতে করতে বললেন, এতে কষ্ঠকরে তিনি সাপের জন্য অনুগ্রহ এনে দিয়েছেন।