১৩ সেপ্টেম্বর (শনিবার ২৮ ভাদ্র ১৩৩১), শনিবারের চিঠি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল নজরুল ইসলামকে নিয়ে সজনীকান্ত দাসের গদ্য-পদ্যে লেখা বিদ্রূপাত্মক রচনা 'আবাহন'। রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'ভাবকুমার প্রধান' ছদ্ম নামে।
'শনিবারের চিঠি' পত্রিকার একাদশ সংখ্যায় (শনিবার ৪ অক্টোবর ১৯২৪, ১৮ আশ্বিন ১৩৩১) প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্রোহী কবিতার ব্যঙ্গাত্মক ২টি কবিতা বা প্যারোডি প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্যারোডির দুটির নাম ছিল- 'আমি ব্যাং' ও 'আমি বীর'। 'আম ব্যাং' রচনা করেছিলেন সজনীকান্ত দাস। আর 'আমি বীর' ছিল যৌথ রচনা। এর রচয়িতা ছিলেন যোগানন্দ দাস, সজনীকান্ত দাস এবং অশোক চট্টোপাধ্যায়। তবে এই দুটি প্যারোডির মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল- কামস্কাট্কীয় ছন্দে রচিত 'আমি ব্যাং'। সজনীকান্ত দাশ তাঁর আত্মস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন-'...ইতিমধ্যে একাদশ বা শারদীয় সংখ্যা 'শনিবারের চিঠি'তে (১৮ই আশ্বিন) আমার "কামস্কাট্কীয় ছন্দ" প্রকাশিত হইয়া বাংলা-সাহিত্য-সংসারে যথেষ্ট সোরগোল তুলিল'।
নজরুল যখন এই প্যারোডি পাঠ করলেন, তখন তিনি ভেবেই নিয়েছিলেন যে, এটি রচনা করেছেন মোহিতলাল মজুমদার। তাই মোহিতলাল মজুমদারকে আক্রমণ করে 'কল্লোল' পত্রিকায় প্রকাশ করলেন সর্বনাশের ঘন্টা।
সর্বনাশের ঘন্টা। কবিতাটির রচিত হয়েছিল ১৩৩১ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'কল্লোল যুগ' গ্রন্থ থেকে জানা যায়,
উল্লেখ্যে, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'কল্লোল যুগ' গ্রন্থের 'এক পাড়া' থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটি ছিল 'শনিবারের চিঠি'। আর কবিতার 'গুরু' ছিলেন কবি মোহিতলাল মজুমদার। এই কবিতার উত্তর দেওয়ার জন্য 'দ্রোণ-গুরু' নামে একটি কবিতা নিয়ে মোহিতলাল মজুমদার শনিবারের চিঠি'র অফিসে হাজির হন। এই সময় পূজার ছুটি উপলক্ষে 'শনিবারের চিঠি' তিন সপ্তাহ বন্ধ ছিল। মোহিতলাল বললেন কবিতাটি শনিবারের চিঠি'র মূল অংশে না রেখে ক্রোড়পত্র হিসেবে ছাপাতে হবে। পরে কবিতাটি দ্বাদশ সংখ্যা বা 'বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যা'য় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশকাল ছিল- ৮ কার্তিক ১৩৩১ (শনিবার ২৫ অক্টোবর ১৯২৪) লিখেছিলেন 'দ্রোণ-গুরু' কবিতা।'কোনো বিশেষ এক পাড়া থেকে নজরুল-নিন্দা বেরুতে লাগল প্রতি সপ্তাহে। ১৩৩১-এর কার্তিকে "কল্লোলে" নজরুল তার উত্তর দিলে কবিতায়। কবিতার নাম "সর্বনাশের ঘণ্টা। গ্রন্থাকার কবিতাটি উদ্ধৃতি করার পর, লিখেছেন- 'মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল-আপিসে বসে লিখেছিল এক বৈঠকে। ঠিক কল্লোল-আপিসে হয়তো নয়, মণীন্দ্রের ঘরে।' উল্লেখ্য, মণীন্দ্র চাকী ছিলেন কল্লোল পত্রিকার একমাত্র বেতনভুক কর্মচারী। তিনি থাকতেন, কল্লোলো অফিসের এক গলি পরে তিনি থাকতেন। কিন্তু এই ঘর হয়ে উঠেছিল কল্লোল অফিসের বাড়তি অঙ্গন।'
নজরুল-মোহিতলালের দ্বন্দ্বের সূত্রে কল্লোল সাহিত্য গোষ্ঠী এবং শনিবারের চিঠি'র কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে একটি বিরোধের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এর সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়েছিল 'শনিবারের চিঠি'র উপর। চিত্তরঞ্জন রায়ের স্বরাজ পার্টির বিরুদ্ধে 'শনিবারে চিঠি'র অভিযান ছিল। এই দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী গ্রেফতার হলেন। এই সূত্রে দেশের মানুষের কাছে এঁরা সংগ্রামী বীর হিসেবে শ্রদ্ধার আসরে বসেছিলেন। ফলে 'শনিবারের চিঠি' এঁদের সমালোচনা করার সাহস হারিয়ে ফেলেন। এই ক্ষেত্রে অনেক লেখক শনিবারের চিঠির সংশ্রব ত্যাগ করেছিলেন। এর সাথে কল্লোল গোষ্ঠী এবং নজরুলের ভক্তরা 'শনিবারের চিঠি'-কে একরকম বয়কট করলেন। এ্সব সহ্য করে শনিবারের চিঠি' সপ্তদশ সংখ্যা পর্যন্ত যথাযথ মানে প্রকাশিত হলেও, এরপরে সংখ্যা থেকে জৌলুশ হারাতে থাকে। পঞ্চবিংশ সংখ্যা পর্যন্ত ৬৪ পৃষ্ঠার পরিবের্তে ৩২ পৃষ্ঠা মুদ্রিত হয়েছিল। অবশেষে ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৯ ফাল্গুন (শনিবার ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯২৫) বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।