শনিবারের চিঠি

বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকা, যা প্রতি শনিবারে প্রকাশিত হতো। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ জুলাই (শনিবার, ১০ শ্রাবণ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ), এই পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। সম্পাদক ছিলেন যোগানন্দ দাস। আর এর প্রধান সংগঠক ছিলেন রামানন্দ চট্রোপাধ্যায়ের পুত্র অশোক চট্রোপাধ্যায়। পত্রিকাটির প্রথম পর্যায়ে মাত্র ২৭টি সংখ্যা প্রকাশিত হওয়ার পর পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে নীরোদ সি চৌধুরীর সম্পাদনায় মাসিক হিসাবে ‘শনিবারের চিঠি’ আবার বের হয়। পরে এই বছরেই ‘শনিবারের চিঠি’ সম্পাদনায় দায়িত্ব নেন সজনীকান্ত দাস এবং ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত তিনি সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

১৬৬ পৃষ্ঠা থেকে শুরু করতে হবে- আত্মস্মৃতি

১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে থেকে ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পরিমল গোস্বামী সাপ্তাহিক ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে সজনীকান্ত দাস পুনরায় মাসিক ‘শনিবারের চিঠি’র সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

শনিবারের চিঠি প্রকাশের উদ্দেশ্য ছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দলের সমালোচনা করা। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে নজরুল ইসলাম বিখ্যাত হয়ে উঠেছিলেন 'বিদ্রোহী' কবিতার মাধ্যমে। এই সময় মোহিতলাল মজুমদার দাবি করেন যে, নজরুল তাঁর 'আমি' নামক প্রবন্ধ নকল করে 'বিদ্রোহী' রচনা করেছেন। এ নিয়ে মোহিতলাল ও নজরুলের ভিতরে তিক্ততার সৃষ্টি হয়। এই সময় মোহিতলাল রীতিমতো দলবল নিয়ে নজরুলের অন্যতম বাক্যিক-আক্রমণকারীতে পরিণত হন। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল নজরুলের বিবাহ। ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ এপ্রিল (শুক্রবার ১২ বৈশাখ ১৩৩১ বঙ্গাব্দ)] নজরুলের সাথে কুমিল্লার বসন্তকুমার সেনগুপ্ত ও গিরিবালার একমাত্র কন্যা আশালতার (দুলি/দোলন) বিবাহ হয়। এর ফলে অধিকাংশ হিন্দু সাহিত্যক নজরুলের বিরুদ্ধে চলে যায়। এই সময় নজরুলের রচনা প্রবাসী পত্রিকা প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকে। এরপর মোহিতলাল এবং নজরুলের বিবাহে অসন্তুষ্ট সাহিত্যিকরা জোট বেঁধে 'শনিবারে চিঠি' ব্যবহার করা শুরু করে।

নজরুলের সমালোচনা ও তার রচনার প্যারোডি রচনা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম বেছে নিয়েছিলেন 'শনিবারের চিঠি'কে। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ছিলেন সজনীকান্ত দাস, যোগানন্দ রায় প্রমুখ।

১৩ সেপ্টেম্বর (শনিবার ২৮ ভাদ্র ১৩৩১), শনিবারের চিঠি' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল নজরুল ইসলামকে নিয়ে সজনীকান্ত দাসের গদ্য-পদ্যে লেখা বিদ্রূপাত্মক রচনা 'আবাহন'।  রচনাটি প্রকাশিত হয়েছিল 'ভাবকুমার প্রধান' ছদ্ম নামে।

'শনিবারের চিঠি' পত্রিকার একাদশ সংখ্যায় (শনিবার ৪ অক্টোবর ১৯২৪, ১৮ আশ্বিন ১৩৩১) প্রকাশিত হয়েছিল বিদ্রোহী কবিতার ব্যঙ্গাত্মক ২টি কবিতা বা প্যারোডি প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্যারোডির দুটির নাম ছিল- 'আমি ব্যাং' ও 'আমি বীর'। 'আম ব্যাং' রচনা করেছিলেন সজনীকান্ত দাস। আর 'আমি বীর' ছিল যৌথ রচনা। এর রচয়িতা ছিলেন যোগানন্দ দাস, সজনীকান্ত দাস এবং অশোক চট্টোপাধ্যায়। তবে এই দুটি প্যারোডির মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনার সৃষ্টি করেছিল- কামস্কাট্‌কীয় ছন্দে রচিত 'আমি ব্যাং'। সজনীকান্ত দাশ তাঁর আত্মস্মৃতি গ্রন্থে লিখেছেন-

'...ইতিমধ্যে একাদশ বা শারদীয় সংখ্যা 'শনিবারের চিঠি'তে (১৮ই আশ্বিন) আমার "কামস্কাট্‌কীয় ছন্দ" প্রকাশিত হইয়া বাংলা-সাহিত্য-সংসারে যথেষ্ট সোরগোল তুলিল'।

নজরুল যখন এই প্যারোডি পাঠ করলেন, তখন তিনি ভেবেই নিয়েছিলেন যে, এটি রচনা করেছেন মোহিতলাল মজুমদার। তাই মোহিতলাল মজুমদারকে আক্রমণ করে  'কল্লোল' পত্রিকায় প্রকাশ করলেন সর্বনাশের ঘন্টা

 সর্বনাশের ঘন্টা। কবিতাটির রচিত হয়েছিল ১৩৩১ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে। অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'কল্লোল যুগ' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, 

'কোনো বিশেষ এক পাড়া থেকে নজরুল-নিন্দা বেরুতে লাগল প্রতি সপ্তাহে। ১৩৩১-এর কার্তিকে "কল্লোলে" নজরুল তার উত্তর দিলে কবিতায়। কবিতার নাম "সর্বনাশের ঘণ্টা। গ্রন্থাকার কবিতাটি উদ্ধৃতি করার পর, লিখেছেন- 'মনে আছে এই কবিতা নজরুল কল্লোল-আপিসে বসে লিখেছিল এক বৈঠকে। ঠিক কল্লোল-আপিসে হয়তো নয়, মণীন্দ্রের ঘরে।' উল্লেখ্য, মণীন্দ্র চাকী ছিলেন কল্লোল পত্রিকার একমাত্র বেতনভুক কর্মচারী। তিনি থাকতেন, কল্লোলো অফিসের এক গলি পরে তিনি থাকতেন। কিন্তু এই ঘর হয়ে উঠেছিল কল্লোল অফিসের বাড়তি অঙ্গন।'

উল্লেখ্যে, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের 'কল্লোল যুগ' গ্রন্থের 'এক পাড়া' থেকে প্রকাশিত পত্রিকাটি ছিল 'শনিবারের চিঠি'। ‌আর কবিতার 'গুরু' ছিলেন  কবি মোহিতলাল মজুমদার। এই কবিতার উত্তর দেওয়ার জন্য 'দ্রোণ-গুরু' নামে একটি কবিতা নিয়ে মোহিতলাল মজুমদার শনিবারের চিঠি'র অফিসে হাজির হন। এই সময় পূজার ছুটি উপলক্ষে '
শনিবারের চিঠি' তিন সপ্তাহ বন্ধ ছিল। মোহিতলাল বললেন কবিতাটি শনিবারের চিঠি'র মূল অংশে না রেখে ক্রোড়পত্র হিসেবে ছাপাতে হবে। পরে কবিতাটি দ্বাদশ সংখ্যা বা 'বিশেষ বিদ্রোহ সংখ্যা'য় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশকাল ছিল- ৮ কার্তিক ১৩৩১ (শনিবার ২৫ অক্টোবর ১৯২৪) লিখেছিলেন 'দ্রোণ-গুরু' কবিতা।

নজরুল-মোহিতলালের দ্বন্দ্বের সূত্রে কল্লোল সাহিত্য গোষ্ঠী এবং শনিবারের চিঠি'র কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে একটি বিরোধের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। এর সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়েছিল 'শনিবারের চিঠি'র উপর। চিত্তরঞ্জন রায়ের স্বরাজ পার্টির বিরুদ্ধে 'শনিবারে চিঠি'র অভিযান ছিল। এই দলের অধিকাংশ নেতা-কর্মী গ্রেফতার হলেন। এই সূত্রে দেশের মানুষের কাছে এঁরা সংগ্রামী বীর হিসেবে শ্রদ্ধার আসরে বসেছিলেন। ফলে 'শনিবারের চিঠি' এঁদের সমালোচনা করার সাহস হারিয়ে ফেলেন। এই ক্ষেত্রে অনেক লেখক শনিবারের চিঠির সংশ্রব ত্যাগ করেছিলেন। এর সাথে কল্লোল গোষ্ঠী এবং নজরুলের ভক্তরা 'শনিবারের চিঠি'-কে একরকম বয়কট করলেন। এ্‌সব সহ্য করে শনিবারের চিঠি' সপ্তদশ সংখ্যা পর্যন্ত যথাযথ মানে প্রকাশিত হলেও, এরপরে সংখ্যা থেকে জৌলুশ হারাতে থাকে। পঞ্চবিংশ সংখ্যা পর্যন্ত ৬৪ পৃষ্ঠার পরিবের্তে ৩২ পৃষ্ঠা মুদ্রিত হয়েছিল। অবশেষে ১৩৩১ বঙ্গাব্দের ৯ ফাল্গুন (শনিবার ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯২৫) বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।