রেকর্ড
[রেকর্ড অভিধান]
[রেকর্ডের ইতিহাস]
[ভারতবর্ষে রেকর্ডের ইতিহাস ]
বলতে ভবিষ্যতে ব্যবহার, সংরক্ষণ বা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে তথ্য, উপাত্ত, শব্দ কিংবা চিত্রকে স্থায়ীভাবে ধারণ করে রাখার মাধ্যমকে বোঝায়। সাধারণ অর্থে রেকর্ড বলতে যে কোনো সংরক্ষিত তথ্যকে বোঝালেও শব্দপ্রযুক্তি ও সঙ্গীতের ক্ষেত্রে রেকর্ড বলতে মূলত এমন একটি মাধ্যমকে বোঝায়, যাতে শব্দ ধারণ করে পরবর্তীকালে তা পুনরায় শ্রবণ করা যায়।
মানবসভ্যতার আদিযুগ থেকেই মানুষ বিভিন্ন উপায়ে তথ্য সংরক্ষণের চেষ্টা করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে গুহার প্রাচীরে চিত্র ও সাংকেতিক চিহ্ন অঙ্কনের মাধ্যমে তথ্য সংরক্ষণের প্রচলন ছিল। পরবর্তীকালে মাটির ফলক, পাথরের ফলক, প্যাপিরাস, পার্চমেন্ট, তালপাতা, কাগজ, ধাতব পাত প্রভৃতি উপাদানে লিখিত তথ্য সংরক্ষণের রীতি গড়ে ওঠে। এগুলো ছিল মূলত দৃশ্যমান তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যম।
শব্দ সংরক্ষণের ইতিহাস শুরু হয় উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি উদ্ভাবক
Édouard-Léon Scott de Martinville
ফোনোটোগ্রাফ
(Phonautograph)
উদ্ভাবন করেন। এই যন্ত্রে শব্দতরঙ্গকে কাগজের ওপর রেখাচিত্র আকারে ধারণ করা গেলেও তা পুনরায় শোনানো সম্ভব ছিল না। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন উদ্ভাবক থমাস আলভা এডিসন ফোনোগ্রাফ
(Phonograph) উদ্ভাবনের মাধ্যমে প্রথম শব্দ ধারণ ও পুনরুৎপাদনের কার্যকর ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তাঁর ব্যবহৃত মোমের সিলিন্ডারকে সিলিন্ডার রেকর্ড বলা হতো।
১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে জার্মান-আমেরিকান উদ্ভাবক এমিল বার্লিনার সমতল চাকতিভিত্তিক
গ্রামোফোন রেকর্ড উদ্ভাবন করেন। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল ছাঁচ
(pressing) ব্যবহার করে একই মূল রেকর্ড
থেকে অসংখ্য প্রতিলিপি তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন। এর ফলে রেকর্ড উৎপাদনের ব্যয় অনেক
কমে যায় এবং গ্রামোফোন রেকর্ড দ্রুত বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিংশ
শতাব্দীর প্রথমার্ধে সিলিন্ডার রেকর্ডের ব্যবহার প্রায় সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে
ডিস্ক রেকর্ডই বিশ্বের প্রধান শব্দসংরক্ষণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
পরবর্তীকালে রেকর্ড প্রযুক্তির আরও উন্নয়ন ঘটে।
শেলাক (Shellac) নির্মিত ৭৮
RPM রেকর্ডের পর আসে দীর্ঘ-বাদনক্ষম ৩৩⅓
RPM লং প্লে (LP) রেকর্ড এবং ৪৫ RPM সিঙ্গল রেকর্ড। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে চৌম্বক টেপ, কমপ্যাক্ট ডিস্ক (CD), ডিজিটাল অডিও ডিস্ক এবং পরবর্তীকালে ডিজিটাল ফাইলভিত্তিক শব্দসংরক্ষণ প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটে। তবুও ভিনাইল রেকর্ড এখনও সঙ্গীতপ্রেমী ও সংগ্রাহকদের কাছে বিশেষ মর্যাদা বহন করে।
বাংলা ভাষায় 'রেকর্ড' শব্দটি দীর্ঘদিন ধরে গ্রামোফোন রেকর্ডের সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। যদিও প্রযুক্তিগত অর্থে রেকর্ড বলতে কেবল গ্রামোফোন ডিস্ক নয়, শব্দ সংরক্ষণের সকল মাধ্যমকেই বোঝায়।
রেকর্ডের প্রকার :
শব্দ ধারণের মাধ্যম অনুসারে রেকর্ডকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়—
-
সিলিন্ডার রেকর্ড
(Cylinder Record) : এডিসনের ফোনোগ্রাফে ব্যবহৃত মোমের নলাকার রেকর্ড।
চোঙাকৃত রেকর্ড - পেলিওফোন
(Conical Record বা
Paleophone) —
শঙ্কু বা চোঙাকৃত শব্দধারণ মাধ্যম। এটি পরীক্ষামূলক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক
প্রচলন লাভ করেনি।
- ডিস্ক রেকর্ড (Disc Record)
: বার্লিনারের উদ্ভাবিত সমতল চাকতিভিত্তিক রেকর্ড, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী প্রচলিত হয়।
রেকর্ডিং পদ্ধতি :
যান্ত্রিক রেকর্ডিংয়ে শব্দতরঙ্গের কম্পনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সূচ
(Stylus) রেকর্ডের পৃষ্ঠে খাঁজ (groove) অঙ্কন করে। এই খাঁজের মধ্যেই শব্দের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। যান্ত্রিক রেকর্ডিংয়ের খাঁজ অঙ্কনের দুটি প্রধান পদ্ধতি রয়েছে—
- উলম্ব কর্তন (Vertical Cut বা
Hill-and-Dale Recording): এই পদ্ধতিতে সূচ খাঁজের গভীরতা পরিবর্তন করে শব্দ ধারণ করে। এডিসনের ফোনোগ্রাফ ও পরবর্তী সিলিন্ডার রেকর্ডে এই পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো।
- পার্শ্বিক কর্তন
(Lateral Cut) : এই পদ্ধতিতে সূচ ডান-বাম দিকে সরে খাঁজ অঙ্কন করে। এমিল বার্লিনারের গ্রামোফোন রেকর্ডে এই পদ্ধতি প্রবর্তিত হয় এবং পরবর্তীকালে অধিকাংশ ডিস্ক রেকর্ডে এটিই মান হিসেবে গৃহীত হয়।
রেকর্ডের ঘূর্ণনগতি : রেকর্ড সঠিকভাবে বাজানোর জন্য নির্দিষ্ট ঘূর্ণনগতির প্রয়োজন হয়। এই গতি ঘূর্ণন প্রতি মিনিট
(Revolutions per Minute) বা
RPM এককে প্রকাশ করা হয়। প্রাথমিক যুগে বিভিন্ন নির্মাতা বিভিন্ন ঘূর্ণনগতির রেকর্ড তৈরি করতেন; ফলে এক কোম্পানির রেকর্ড অন্য কোম্পানির যন্ত্রে সঠিকভাবে বাজানো যেত না। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিকভাবে কয়েকটি মান নির্ধারিত হয়।
- প্রায় ৭০
RPM
: এমিল বার্লিনারের প্রাথমিক ৭ ইঞ্চি গ্রামোফোন রেকর্ড। ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ
বার্লিনারের আদি গ্রামোফোন রেকর্ডের ঘূর্ণনগতি
- ৭৮
RPM : বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে শেলাক ডিস্কের আন্তর্জাতিক মান।
- ৩৩⅓ RPM : ১৯৩১ সালে পরীক্ষামূলকভাবে এবং ১৯৪৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে দীর্ঘ-বাদনক্ষম (LP) রেকর্ডে ব্যবহৃত হয়।
- ৪৫ RPM : ১৯৪৯ সালে RCA Victor সিঙ্গল রেকর্ডের জন্য প্রবর্তন করে।
রেকর্ডের আকার:
সিলিন্ডার রেকর্ড ও ডিস্ক রেকর্ডের বিচারে আকারের
পার্থক্য রয়েছে। যেহেতু সিলিন্ডার রেকর্ডে, একটি সিলিন্ডারকে পাতলা টিনের পাত দ্বারা
মোড়ানো হতো, তাই এর পরিমাপের জন্য দৈর্ঘ্য ও ব্যাসের পরিমাপটা মুখ্য বিষয় ছিল।
কিন্তু থালার মতো ডিস্ক রেকর্ডর পরিমাপ করা হয় এর ব্যাসের দ্বারা।
- সিলিন্ডার রেকর্ডের পরিমাপ: এডিসনের প্রাথমিক স্ট্যান্ডার্ড সিলিন্ডার রেকর্ড
(Standard Cylinder Record)-এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪.২৫ ইঞ্চি (১০.৮ সেন্টিমিটার) এবং ব্যাস ২.১৮৭৫ ইঞ্চি (৫.৫৬ সেন্টিমিটার)। এগুলো সাধারণত ১২০
RPM গতিতে বাজানো হতো।
প্রতিটি সিলিন্ডারে প্রায় ২ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা যেত এবং এর প্রাথমিক বিক্রয়মূল্য ছিল ৫০ মার্কিন সেন্ট।
প্রথম যুগের সিলিন্ডার রেকর্ডের অন্যতম প্রধান সীমাবদ্ধতা ছিল এর প্রতিলিপি তৈরির অসুবিধা। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রতিটি সিলিন্ডারে শিল্পীদের পৃথকভাবে গান বা বক্তৃতা রেকর্ড করতে হতো; ফলে একই রেকর্ডের বহু অনুলিপি সহজে তৈরি করা সম্ভব ছিল না। এর কারণে উৎপাদনব্যয় বৃদ্ধি পেত, বিক্রয়মূল্য কমানো কঠিন হতো এবং একটি জনপ্রিয় রেকর্ডের চাহিদা পূরণ করতে যথেষ্ট সময় লাগত।
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে থমাস আলভা এডিসন বৃহৎ আকারের কনসার্ট ফোনোগ্রাফ
(Concert Phonograph) বাজারে আনেন। এই যন্ত্রে ব্যবহৃত কনসার্ট সিলিন্ডার-এর দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৪.২৫ ইঞ্চি এবং ব্যাস ৫ ইঞ্চি। বৃহত্তর আকারের কারণে এতে ধারণকৃত শব্দের মান সাধারণ সিলিন্ডারের তুলনায় উন্নত ছিল। যন্ত্রটির মূল্য ছিল প্রায় ১২০ মার্কিন ডলার, যা সে সময়ের হিসেবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে এটি সাধারণ ক্রেতাদের কাছে তেমন জনপ্রিয়তা লাভ করতে পারেনি।
পরবর্তীকালে ডিস্ক রেকর্ডের দ্রুত প্রসার এবং সীমিত বাজারচাহিদার কারণে ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে কনসার্ট সিলিন্ডারের উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।
প্রথম যুগের সিলিন্ডার রেকর্ডের অন্যতম সমস্যা ছিল একই রেকর্ডের বহু প্রতিলিপি সহজে তৈরি করা না যাওয়া। এই সীমাবদ্ধতা দূর করার জন্য এডিসনের গবেষণাগারে ১৯০১–১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে ছাঁচ ব্যবহার করে সিলিন্ডার তৈরির নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবিত হয়। এই পদ্ধতিতে সরাসরি স্টাইলাস দ্বারা প্রতিটি সিলিন্ডারে পৃথকভাবে শব্দ খোদাই করার পরিবর্তে একটি মূল রেকর্ড (master) থেকে ছাঁচের সাহায্যে বহু অনুলিপি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়। শক্ত হার্ড-ওয়াক্স
(Hard Wax) ব্যবহারের ফলে রেকর্ডের স্থায়িত্বও বৃদ্ধি পায়।
এই নতুন প্রযুক্তিতে মাস্টার রেকর্ডের ওপর স্বর্ণের সূক্ষ্ম প্রলেপ
(gold sputtering) প্রয়োগ করে ইলেক্ট্রোফর্মিং পদ্ধতিতে ধাতব ছাঁচ প্রস্তুত করা হতো। এই কারণে নতুন রেকর্ডগুলোর নাম দেওয়া হয় New High Speed Hard Wax Moulded Records।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের মাঝামাঝি সময়ে নামটি সংক্ষিপ্ত করে
Gold Moulded Records রাখা হয়। এই প্রযুক্তির সাহায্যে একটি মাস্টার থেকে প্রায় ১২০–১৫০টি সিলিন্ডার প্রস্তুত করা সম্ভব হতো। ফলে উৎপাদনব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং প্রতিটি সিলিন্ডারের বিক্রয়মূল্য প্রায় ৩৫ মার্কিন সেন্ট-এ নেমে আসে। এই উন্নয়ন সত্ত্বেও ডিস্কভিত্তিক গ্রামোফোন রেকর্ডের সহজ উৎপাদন ও ব্যাপক বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে সিলিন্ডার রেকর্ড ধীরে ধীরে বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।
এই সিলিন্ডারগুলো ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে এই রেকর্ড
উৎপাদন ভন্ধ হয় যায়।
- ডিস্ক রেকর্ডের পরিমাপ:
সিলিন্ডার রেকর্ডের ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য ও ব্যাস উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ হলেও ডিস্ক রেকর্ডের আকার নির্ধারণ করা হয় এর ব্যাস দ্বারা। গ্রামোফোন রেকর্ডের প্রযুক্তিগত উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন আকারের ডিস্ক রেকর্ড প্রচলিত হয়, যা ধারণক্ষমতা ও ব্যবহারভেদে ভিন্ন ছিল।ডিস্ক রেকর্ডের প্রচলিত আকারগুলো হলো—
- ৫ ইঞ্চি (প্রায় ১৩ সেন্টিমিটার): ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে এমিল বার্লিনারের
প্রাথমিক পরীক্ষামূলক গ্রামোফোন রেকর্ডের ব্যাস ছিল প্রায় ৫ ইঞ্চি। এগুলো মূলত
প্রযুক্তি পরীক্ষা ও প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছিল এবং বাণিজ্যিকভাবে
প্রচলিত ছিল না।
- ৭ ইঞ্চি (প্রায় ১৭.৮ সেন্টিমিটার): ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনারের গ্রামোফোন কোম্পানি প্রথম বাণিজ্যিকভাবে ৭ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। এই রেকর্ডগুলো সাধারণত এক পিঠে প্রায় ২ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করতে পারত এবং প্রাথমিক গ্রামোফোন যন্ত্রে ব্যবহৃত হতো।
- ১০ ইঞ্চি (প্রায় ২৫.৪ সেন্টিমিটার) : ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনারের গ্রামোফোন কোম্পানি ১০ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ড বাজারে আনে। অধিক ধারণক্ষমতার কারণে এই রেকর্ডে সাধারণত এক পিঠে প্রায় ৩ মিনিট পর্যন্ত শব্দ সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এটি সর্বাধিক ব্যবহৃত রেকর্ডের আকারে পরিণত হয়।
- ১২ ইঞ্চি (প্রায় ৩০.৫ সেন্টিমিটার) : ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড প্রচলিত হয়। এই রেকর্ডে এক পিঠে সাধারণত ৪–৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা যেত। দীর্ঘ সংগীত, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, অপেরা, বক্তৃতা এবং অন্যান্য দীর্ঘ সময়ের শব্দরেকর্ড প্রকাশের জন্য এই আকারের রেকর্ড বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতো।
পরবর্তীকালে ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের বিশেষ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত ট্রান্সক্রিপশন ডিস্কও নির্মিত হয়। তবে সাধারণ বাণিজ্যিক গ্রামোফোন রেকর্ড হিসেবে ৭, ১০ এবং ১২ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্কই সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করে।
রেকর্ডের উপাদান
- টিনের পাত
(Tin Foil)
প্রথম ব্যবহার: ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী: Thomas A. Edison
রেকর্ডের ধরন: সিলিন্ডার রেকর্ড
আদর্শিক আকার: দৈর্ঘ্য ৪.২৫ ইঞ্চি; ব্যাস প্রায় ২.১৮৭৫ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: প্রায় ১২০ RPM
ব্যবহার: এডিসনের প্রথম ফোনোগ্রাফে শব্দ ধারণের জন্য ব্যবহৃত
হয়।
- মোম
(Wax)
প্রথম ব্যবহার: ১৮৮৬–১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী:
Volta Laboratory (Alexander Graham Bell, Chichester A. Bell ও Charles Sumner
Tainter)
রেকর্ডের ধরন: সিলিন্ডার রেকর্ড
আদর্শিক আকার: দৈর্ঘ্য ৪.২৫ ইঞ্চি; ব্যাস প্রায় ২.১৮৭৫ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: ১২০
RPM
ব্যবহার: টিনের পাতের পরিবর্তে মোমের সিলিন্ডার ব্যবহৃত হয়;
পরে Edison-ও এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেন।
- কঠিন মোম (Hard Wax)
প্রথম ব্যবহার: ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী:
National Phonograph Company
রেকর্ডের ধরন: সিলিন্ডার রেকর্ড (Gold Moulded Records)
আদর্শিক আকার: দৈর্ঘ্য ৪.২৫ ইঞ্চি; ব্যাস প্রায় ২.১৮৭৫ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: ১৬০
RPM (Gold Moulded-এর প্রচলিত মান)
ব্যবহার: ছাঁচের সাহায্যে একাধিক সিলিন্ডার তৈরি করা সম্ভব
হয়।
- সেলুলয়েড (Celluloid)
প্রথম ব্যবহার: ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ
(Lambert Company); ১৯১২
খ্রিষ্টাব্দে Edison Blue Amberol
রেকর্ডের ধরন: সিলিন্ডার রেকর্ড
আদর্শিক আকার: দৈর্ঘ্য ৪.২৫ ইঞ্চি; ব্যাস প্রায় ২.১৮৭৫ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: ১৬০
RPM
ব্যবহার: ভাঙনরোধী ও অধিক টেকসই সিলিন্ডার।
- কঠিন রাবার
(Hard Rubber)
প্রথম ব্যবহার: ১৮৮৮–১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী:
Berliner Gramophone Company
রেকর্ডের ধরন: ডিস্ক রেকর্ড
আকার: ৫ ইঞ্চি (পরীক্ষামূলক)
ঘূর্ণনগতি: প্রায় ৭০
RPM
ব্যবহার: এমিল বার্লিনারের প্রাথমিক গ্রামোফোন ডিস্কে
ব্যবহৃত।
- শেলাক যৌগ
(Shellac Compound) ।
১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দের পরে স্লেট এবং চুনাপাথরের মিশ্রণ দিয়ে
শেলাক রেকর্ড তৈরি
শুরু হয়। একে সাধারণভাবে মাটির রেকর্ড বলা হয়ে থাকে। এই রেকর্ডগুলো বেশ ভারি হতো। ভারতে লাক্ষা
নামক একধরনের রজন উৎপন্ন হয়। এটি
Kerria lacca নামের ক্ষুদ্র পতঙ্গ গাছের ডালে নিঃসৃত করে। এই রজন পরিশোধন করে শেলাক তৈরি করা হয়।
এগুলোকে লাক্ষা ডিস্ক বলা হতো।
প্রথম ব্যবহার: ১৮৯৪–১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী: Berliner Gramophone Company
রেকর্ডের ধরন: ডিস্ক রেকর্ড
প্রচলিত আকার: ৭, ১০ ও ১২ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: প্রথমে প্রায় ৭০
RPM; পরে ৭৮
RPM
আন্তর্জাতিক মান
হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ব্যবহার: শেলাক, স্লেটের গুঁড়ো, চুনাপাথরের গুঁড়ো, কার্বন
ব্ল্যাক ও তন্তুজাতীয় পদার্থের মিশ্রণে তৈরি। বাংলায় 'মাটির রেকর্ড' নামে
পরিচিত।
- ল্যাকার
(Lacquer/Acetate)
প্রথম ব্যবহার: প্রায় ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী:
RCA Victor ও অন্যান্য রেকর্ডিং প্রতিষ্ঠান
রেকর্ডের ধরন: মাস্টার ডিস্ক
প্রচলিত আকার: ১০, ১২ ও ১৬ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: ৩৩⅓, ৭৮ অথবা প্রয়োজন অনুযায়ী
ব্যবহার: মূলত মাস্টার রেকর্ড ও তাৎক্ষণিক রেকর্ডিংয়ের জন্য।
- ভিনাইল
(Polyvinyl Chloride, PVC)
প্রথম ব্যবহার: ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী:
Columbia Records
রেকর্ডের ধরন:
LP, EP ও
Single Disc
প্রচলিত আকার: ৭, ১০ ও ১২ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: ৩৩⅓ RPM ও ৪৫ RPM
ব্যবহার: কম শব্দ, অধিক স্থায়িত্ব ও উন্নত শব্দমানের জন্য
বর্তমানে সর্বাধিক পরিচিত গ্রামোফোন রেকর্ড উপাদান।
- পলিস্টাইরিন
(Polystyrene)
প্রথম ব্যবহার: প্রায় ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ
প্রবর্তনকারী: RCA Victor এবং অন্যান্য মার্কিন রেকর্ড
কোম্পানি
রেকর্ডের ধরন: Single Disc
প্রচলিত আকার: ৭ ইঞ্চি
ঘূর্ণনগতি: ৪৫ RPM
ব্যবহার: ইনজেকশন-মোল্ডিং পদ্ধতিতে স্বল্পমূল্যের সিঙ্গল
রেকর্ড তৈরিতে ব্যবহৃত।
তথ্যসূত্র
- Gelatt, Roland. The Fabulous Phonograph: From Tin Foil to High Fidelity. 2nd ed. New York: Macmillan Publishing Co., 1977. (First published 1955.)
- Read, Oliver, and Walter L. Welch. From Tin Foil to Stereo: Evolution of the Phonograph. 2nd ed. Indianapolis: Howard W. Sams & Co., 1976. (First published 1959.)
- Morton, David L., Jr. Sound Recording: The Life Story of a Technology. Baltimore: Johns Hopkins University Press, 2004.
- Millard, Andre. America on Record: A History of Recorded Sound. 2nd ed. Cambridge: Cambridge University Press, 2005. (First published 1995.)
- Koenigsberg, Allen. The Patent History of the Phonograph, 1877–1912. APM Press, 1990.
- Copeland, Peter. Manual of Analogue Sound Restoration Techniques. London: The British Library, 2008.
- Andrews, Frank. Recording History: The British Record Industry, 1888–1931. London: Science Museum, 1989.
- Frow, George L. The Cylinder Phonograph Companion. London: City of London Phonograph and Gramophone Society, 1994.
Emerson, Victor H. Phonograph and Graphophone. New York: Harper & Brothers, 1895.
The Phonogram. Edison Phonograph Company, 1891–1901.
- Scientific American. New York: Munn & Co., 1877 and subsequent issues (articles on the phonograph and sound recording).