রেকর্ডে ও রেকর্ড কোম্পানির বর্ণানুক্রমিক তালিকা

রেকর্ড ও তার ইতিহাস
[রেকর্ড অভিধান]
[ভারতবর্ষে রেকর্ডের ইতিহাস]

সাধারণভাবে রেকর্ডে পরিচয়ে বলা যায়- এক ধরনের গোলাকার চাকতি, যাতে ধ্বনি তরঙ্গের রূপরেখা খোদিত থাকে। এই চাকতি ঘূর্ণায়মান অবস্থায় পিন উক্ত খোদিত রেখার স্পর্শে ধ্বনি পুনরুদ্ধার হয় এবং শব্দবর্ধক যন্ত্রের সাহায্য ধ্বনি শ্রবণযোগ্য হয়ে উঠে। শব্দ ধারণ করা এবং তা শ্রাবণ করা, এই আকাঙ্ক্ষা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল শব্দধারণ এবং তা শ্রবণের উপযোগী যান্ত্রিক ব্যবস্থার উন্নয়ের ধারাবাহিক গবেষণার সূত্রে রেকর্ডে উদ্ভব হয়েছে।

সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দকে যথাযথভাবে বারবার বাজানোর উপযোগী প্রথম যন্ত্র হলো টিউনিং ফর্ক
(tuning forks)। ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে এই যন্ত্রটি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন ইংরেজ বিজ্ঞানী থমাস ইয়ং। তিনি যন্ত্রের কাঁটাকে এমনভাবে তৈরি করেছিলেন যে, তাতে আঘাত করলে প্রতিবার সুনির্দিষ্ট কম্পাঙ্কের শব্দ তৈরি হতো। এখনো পদার্থবিজ্ঞানের গবেষণাগারে এই যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। এই যন্ত্রে নতুন কোনো কম্পাঙ্কের ধ্বনি ধারণ করা যায় না। ১৮৫৩ থাকে ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের উপযোগী যান্ত্রিক কৌশল প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী Édouard-Léon Scott de Martinvillee। এর নাম ছিল ফোনোটোগ্রাফ। এই যন্ত্রে শব্দের কম্পাঙ্ক কাগজের উপর অঙ্কিত হতো। কিন্তু বাজিয়ে শোনানোর ব্যবস্থা ছিল না। ফলে এই যন্ত্রটি কোনো ব্যবসায়িক সাফল্য লাভ করে নি। এবং কিছু দিনের ভিতরে এই যন্ত্র কথা লোকে ভুলে গিয়েছিল।

১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে শব্দধারণ ও বাদন কৌশল আবিষ্কার করেন ফরাসি ফরাসি কবি চার্লস ক্রোস
(Charles Cros) ।  তিনি মুদ্রণশিল্পে ব্যবহৃত আলোকচিত্র খোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণে এই যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে। এই বিষয়ে তিনি ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ এপ্রিলে ফরাসি বিজ্ঞান একাডেমিতে একটি প্রতিবেদন পাঠান। এই বৎসরে এই যন্ত্র সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেন ৩০ অক্টোবরে। এই প্রতিবেদনের নাম ছিল phonographe। অবশ্য লেখকের পছন্দের নাম ছিল paleophone (পেলিওফোন)। এরপর শুরু হয় থমাস আলভা এডিসনের ফোনোগ্রাফের যুগ। টুইন

১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দ ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে এডিসনের ফোনোগ্রাফ এই আবিষ্কারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেটেন্ড লাভ করেন।

১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দদ ১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দ
১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দ ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দ ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দ
১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দ

১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বার্লিনারের গ্রামোফোন রেকর্ড

১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ
১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দের পরে স্লেট এবং চুনাপাথরের মিশ্রণ দিয়ে রেকর্ড তৈরি শুরু হয়। একে সাধারণভাবে মাটির রেকর্ড বলা হয়ে থাকে। এই রেকর্ডগুলো বেশ ভারি হতো।

১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম ব্যারি ওয়েন (
William Barry Owen, এমিল বার্লিনারের ব্যবসার সাথে যুক্ত হন এবং UK Gramophone Company প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনারের গ্রামোফোন কোম্পানি প্রথম ১০ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ড বাজারজাত করে।

১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে উইলিয়াম ওয়েন
Lambert Typewriter Company তৈরির অধিকার লাভ করেন। এই সূত্রে এই কোম্পানির নাম হয় Gramophone & Typewriter Ltd. । অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শাখার অবনতি হলে, কলাম্বিয়া রেকর্ডস এবং জোনোফোন এই শাখাকে কিনে নেয়। এর ভিতর গ্রামোফোন টকিং মেশিন তৈরিকারক এল্ড্রি আর জনসন (Eldridge R. Johnson) নতুন একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। এই নামকরণ করা হয় Victor Talking Machine Company। প্রথম দিকে কলাম্বিয়া রেকর্ড-এর সাথে সত্তাধিকার নিয়ে দ্বন্দ্ব ছিল। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে এই দ্বন্দ্ব মিটে গেলে, এরা ফ্ল্যাট রেকর্ড তৈরি করা শুরু করে। এর আগে কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানির রেকর্ড ছিল চোঙাকৃতির। ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দ ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ
  • ৩রা জুলাই প্রতিষ্ঠা হয় 'The Nicol Record Co. Ltd.। এদের রেকর্ডে নাম ছিল- নিকোল রেকর্ড। এদের নতুন প্রতিষ্ঠানের অফিস স্থাপিত হয় লণ্ডনের ১৪৭-১৫০ গ্রেট স্যাফ্‌ফ্রোন স্ট্রিট-এ। এদের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে। এরা প্রায় ১৫০টি এক-পার্শ্বীয় ডিস্ক রেকর্ড বাজারে ছাড়ে। এই রেকর্ডগুলো তৈরি হয়েছিল লালাভ বাদামি ল্যাকুয়ার্ড কার্ডবোর্ডর দিয়ে। এর উদ্ভাবন করেছিলেন কোম্পানির দুই ডিরেক্টর - জর্জ হেনরি বার্ট এবং কার্ল ক্রইগর।
  • কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি কালো মোম-রেকর্ড বাজারে ছাড়ে। সব মিলিয়ে সে সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে  কলাম্বিয়া রেকর্ড বিক্রয়ের তিনটি প্রধান কোম্পানির একটিতে পরিণত হয়। উল্লেখ্য অপর দুটি কোম্পানি ছিল Edison Phonograph Company এবং Victor Talking Machine Company। এই সময় নিউ ইয়র্ক মেট্রোপলিটান অপেরার তারকা শিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশ করে। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ব-কাল পর্যন্ত এদের রেকর্ডের শব্দমান এডিশন, ভিক্টর বা ইংল্যান্ডের হিস মাস্টার ভয়েস, ইতালির ফোনোটিপিয়া রেকর্ড-এর মতো ভাল ছিল না।
  • বার্লিনার গ্রামোফোন কোম্পানি বাজারজাত করেছিল ১২ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ড। এই সকল রেকর্ডের বাদনকাল ছিল ২ মিনিট।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে
  • নিকোল রেকর্ড মার্চ মাসে জন ওয়াটসন হড নিকোল রেকর্ড কোম্পানির পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন।
     উল্লেখ্য, গ্রামোফোন এ্যান্ড টাইপরাইটার কোম্পানির কলকাতায় শাখা অফিসের প্রথম ম্যানেজার ছিলেন। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লণ্ডনে ফিরে যান। নিকোল রেকর্ড কোম্পানির পরিচালক হিসেবে যোগদান করার পর, ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে তিনি ভারতে রেকর্ড ব্যবসার বাজার যাচাইয়ের জন্য জন ওয়াটসন হড ভারতে আসেন। সাথে ছিলেন  সাথে ছিলেন নিকোল রেকর্ড বিশেষজ্ঞ আমেরিকান গায়ক স্টেফেন কার্ল পোর্টার। এই সময় ভারতে মানিকলাল সাহা নিকোল ফ্রেরেস লিমিটেডের প্রথম এজেন্ট হন।
  • ইতালিয়ান রেকর্ড কোম্পানি ফোনোটিপিয়া আত্মপ্রকাশ করে। এদের রেকর্ডের নাম ছিল ফোনোটিপিয়া রেকর্ড
  • ভারতীয় ব্যবসায়ী দ্বারকানাথ ঘোষ ডোয়ার্কিন এন্ড সন নামে রেকর্ড তৈরি শুরু করেন।
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ
  • ফেব্রুয়ারি মাসে নিকোল রেকর্ড কোম্পানির পরিচালক জন ওয়াটসন হড কলকাতা থেকে লণ্ডনে ফিরে যান। এই সময় পোর্টার তাঁর রেকর্ডিং-এর কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন। পুরো বছর ধরে তিনি ভারতীয় ভাষার বিভিন্ন কথন শৈলী ও গানের প্রায় ৭ শত রেকর্ড করেন। ভারতীয় সঙ্গীতের তালিকায় ছিল বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, তামিল, তেলেগু ভাষার গান। এরপর তিনি তিনি বার্মাতে রেকর্ডিং-এর কাজ করেন। এরপর তিনি লণ্ডন হয়ে আমেরিকা চলে যান।
  • ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে সেপ্টেম্বর, কলকাতায় এই রেকর্ড কোম্পানি নিকোল ফ্রেরেস (ইন্ডিয়া) লিমিটেড [Nicol Freres (India) Ltd] নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ভারতীয় এই প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার এ্যাডলফ মুহলবার্গ কলকাতায় আসেন এবং কলকাতার ২/১-২-৩ কর্পোরেশন স্ট্রিট একটি অফিস খোলেন। কিন্তু কোম্পানির অন্তর্দ্বন্দ্বে এই প্রচেষ্টা ততটা ফলপ্রসু হয় নি। ইতিমধ্যে এই কোম্পানির প্রধান অংশীদার এই কোম্পানি অধিগ্রহণ করেন এবং উত্তর ইংল্যান্ডের ম্যাঞ্চেস্টারের নিকটবর্তী স্টকপোর্টে কার্যক্রম স্থানান্তরিত করেন।
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ:
  • রয়্যাল রেকর্ড নামে ভারতীয় ব্যবসায়ী সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রয়্যাল রেকর্ড প্রকাশ করেন। এর এক পিঠে গান রেকর্ড করা হতো। দাম ছিল দুই টাকা। উল্লেখ্য, ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতার হ্যারিসন রোডে 'মুখার্জী অ্যাণ্ড মুখার্জী' নামে একটি গ্রামোফোন এবং রেকর্ড ব্যবসায়ের দোকান খোলেন। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি গ্রামোফোন কোম্পানির জন ওয়াটসন হড-এর সহায়তায় নিকোল রেকর্ডের ডিলারশিপ পান। সম্ভবত ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের পরে তাদের আর কোনো রেকর্ড প্রকাশিত হয় নি।
  • ইংল্যান্ডে নিকোল ফ্রেরেস (ইন্ডিয়া) লিমিটেড এবং নিকোল রেকর্ড কোম্পানি পুরোপুরি ধ্বসে পড়লেও ভারতের নিকোল ফ্রেরেস (ইন্ডিয়া) রেকর্ডের ব্যবসায় সাফল্য লাভ করেছিল। এই সাফল্যের পিছনে বিশেষ অবদান ছিল কলকাতার রেকর্ড ব্যবসায়ী মানিক লাল সাহা। উল্লেখ্য, ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে মানিকলাল সাহা নিকোল ফ্রেরেস লিমিটেডের প্রথম এজেন্ট হয়েছিলন। তাঁর অফিস ছিল কলকাতার ২৩/৫ ধর্মতলার স্ট্রিটে। তিনি পূর্ব-ভারতের রেকর্ডের অন্যতম পাইকারি ব্যবসায়ী ছিলেন।

    শেষ পর্যন্ত ফলে লণ্ডনের নিকোল রেকর্ড কোম্পানি বন্ধ করে দেওয়া। এই সময় জন ওয়াটসন হড নেকোল রেকরড কোম্পানির বেশরিভাগ স্বত্ব কিনে নেন। এই সূত্রে তিনি রেকর্ড উৎপাদক কারখানা এবং রেকর্ড ব্যবসা অধিকার করেন। এরপর তিনি তাঁর নতুন ব্যবসার অফিস উত্তর ইংল্যান্ডের ম্যান্চেস্টারের নিকটবর্তী স্টকপোরর্টে স্থানান্তর করেন। ৩রা মার্চ তাঁর নিকোল ফ্রেরেস (ইন্ডিয়া) লিমিটেডের মান্যেজার এ্যাডলফ মুহলবার্গ এবং  ওয়াটসন হড কোম্পানি Watson Hawd and Co নামে নামে নতুন কোম্পানি চালু করেণ।  ১৯শে জুন থেকে এই প্রতিষ্ঠান নিকোল ফ্রেরেসের সাথে তাঁদের কারখানায় রেকর্ড তৈরি শুরু করে। এই নতুন কোম্পানির ঠিকানা ছিল- ওয়েলিংটন মিলস, ওয়েলিংটন রোড, স্টোকপোর্ট। এই কোম্পানি ভারতে কোম্পানি নিকোল ফ্রেরেস (ইন্ডিয়া)-এর কাছে রেকর্ড সরবরাহ করা শুরু করে।

    গোড়ার দিকে নিকোল রেকর্ড একপার্শ্বিক রেকর্ড প্রকাশ করতো। রেকর্ডের উপরে রুপালি রঙের কালিতে সরাসরি রেকর্ডের পরিচয় মুদ্রিত হতো। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এরা দ্বিপার্শ্বিক রেকর্ড প্রকাশ শুরু করে। এই রেকর্ডের লালা কাগজের উপর কালো কালিতে ছাপানো লেবেল লাগানো হতো।
  • বেকা রেকর্ড কোম্পানির প্রতিনিধি ভারতে আসে। কোম্পানির ডিরেক্টর আর্নেস্ট  লো, বোম্বেতে তাদের রেকর্ডিং কার্যক্রম শুরু হয়।

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের একটি গ্রামোফোন-বাদন যন্ত্রর

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ
  • কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি ফাইবার দিয়ে রেকর্ড তৈরি করা শুরু করে । এই রেকর্ড বাজানোর জন্য ব্যবহার করা হতো স্বর্ণাবৃত পিন। কিন্তু শব্দের গুণগত মানের বিচারে এই রেকর্ড জনপ্রিয়তা লাভ করে নি। শব্দের ধারণের ডিস্কের ঘূর্ণনগতি একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। প্রতি মিনিটে ঘূর্ণন (আরপিএম) সংখ্যা দ্বারা এই মান নির্ধারিত হয়। এই সময়ে ৬০ আরপিএম থেকে ১৩০ আরপিএম ঘূর্ণনগতির রেকর্ড প্রকাশিত হতো।
     
  • ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনার গ্রামোফোন কোম্পানি নিউইয়র্ক প্রতিনিধি আলফ্রেড ক্লার্ক প্যারিস অপেরার জন্য ২৪টি সমতলীয় রেকর্ড তৈরি করে। এই রেকর্ডগুলো লোহা এবং সীসার তৈরি বাক্সে ভরে সংরক্ষণ করা হয় অপেরা হাউসের নিচের কক্ষে।
  • ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে দক্ষিণ ভারতে  নিকোল রেকর্ডের  প্রধান পাইকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এম.তারা এন্ড কোং। এদের অফিস ছিল মাদ্রাজের ৫ ব্রডওয়ে এবং ১৮৬ এসপ্লানেড। পশ্চিম ভারতের  নিকোল রেকর্ডের  একটি শাখা অফিস খোলে বোম্বাইয়ের ৩৭ পারসি বাজার স্ট্রিটে। তখন বার্মার রেকর্ড বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ হতো কলকাতা থেকে। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই কোম্পানি ভারতে প্রায় ৬০০ রেকর্ড বাজারে ছাড়তে সক্ষম হয়েছিল। এই রেকর্ডের ভিতরে ছিল বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু গুজরাটি ভাষার গান এবং যন্ত্রসঙ্গীত। এছাড়া কোরান তেলাওয়াত ও সংস্কৃত মন্ত্র রেকর্ড প্রকাশ করেছিল।
  • এই বছরে জন ওয়াটসন হড ধীরে ধীরে তাঁর কোম্পানির মাধ্যমে বিভিন্ন ছোট ছোট রেকর্ড কোম্পানির রেকর্ড প্রকাশের সাথে যুক্ত হয়ে যান। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত দ্যা ব্রিটিশ সোনোগ্রাম কোম্পানি লিমিটেড এবং হডের কোম্পানি একীভূত হয় এবং ডিস্ক রেকর্ড কোম্পানির রেকর্ড তৈরিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।  ব্রিটিশ সোনোগ্রাম কোম্পানির 'THE SOVEREIGN RECORD'  নিজেদের উদ্যোগে তৈরি হওয়া শুরু করে লণ্ডনে। নিকল রেকর্ড নামে এরা প্রায় এক শত দ্বিপার্শীয় রেকর্ড বাজারজাত করে।
১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ
  •  ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দর ভারতীয় নিকল কোম্পানির কলকাতা অফিস বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় থেকে এদের ব্যবাসয়িক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে বোম্বে থেকে।
  • ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সকল কোম্পানির রেকর্ডই ছিল এক-পার্শ্বীয়। এই সময় অনেক কোম্পানিই উভয় পার্শ্ব বাদন-উপযোগী রেকর্ড তৈরির উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছিল। কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি এই রেকর্ড তৈরিতে সাফল্য লাভ করে। এই সময় এই রেকর্ডের নাম ছিল Double-Faced record'। ১০ ইঞ্চি মাপের এই ডিস্কগুলো তখন বিক্রয় হতো ৬৫ সেন্ট মূল্যে। এই সময় কলাম্বিয়া রেকর্ড লোগো হিসেবে এক জোড়া সেমিকোয়েভার স্বরের প্রতীক ব্যবহার করতো। এই বছর থেকে থেকে কলাম্বিয়া মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড তৈরি বন্ধ করে দেয়। এর পরিবর্তে তারা সেলুলয়েড সিলিন্ডার রেকর্ড বাজারে আনে।
১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ
  • এডিসন সাড়ে চার মিনিট বাদন উপযোগী এ্যাম্বর সিলিন্ডার বাজারজাত করেন। এই সূত্রে শব্দ বাদনে প্লাস্টিক জাতীয় উপকরণের ব্যবহার শুরু হয়।
  • ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগে নিকোল রেকর্ডের কার্যক্রম বেশ কমে যায়। এই সময় এরা নতুন রেকর্ড প্রকাশের পরিবর্তে পুরানো রেকর্ড বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। এই সময় এই কোম্পানি মূলত চলতো কর্মচারীদের দ্বারা। আর এরা এই ব্যবসা করতো McClean Atmaran and Co. -এর মাধ্যমে। এরপর ধীরে ধীরে নিকল রেকর্ড এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যায়।
১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে গ্রামোফোন কোম্পানি জোনোফোন রেকর্ড একই দামে রেকর্ড বিক্রয় শুরু করেছিল। এই রেকর্ড উভয়-পার্শ্ব বাদন-উপযোগী এদের রেকর্ডের দাম ছিল মাত্র ২ টাকা।

১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের কলম্বিয়া দুটি কোম্পানিতে ভাগ হয়ে যায়। এর একটি কোম্পানি রেকর্ড তৈরি করতো অপরটি রেকর্ড বাজানোর যন্ত্র তৈরি করতো।

১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে রেকর্ডের ঘূর্ণনমান সুনির্দিষ্ট ঠিক রাখা হতো না। ফলে এক যন্ত্রের রেকর্ড করা শব্দ বা রেকর্ড অন্য যন্ত্রে যথাযথভাবে বাদিত হতো না। এই অসুবিধা দূর করার জন্য, ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এই ঘূর্ণন গতি নির্দিষ্ট করা হয়। প্রথম এই নির্দিষ্ট গতি ছিল ৭৮-আরপিএম। তখন রেকর্ডের প্রতি পিঠে প্রায় ৪১ মিনিটের শব্দ ধারণ করা হতো। এই সময় সিলিণ্ডার বা চোঙের মধ্যে রেকর্ডের শব্দকে প্রেরণ করে শব্দের উচ্চতা বৃদ্ধি করা হয়েছিল।

১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের ইলেকট্রিক লাউড স্পীকার গ্রামোফোনে ব্যবহার শুরু হয়। রেকর্ডের ঘূর্ণন মানের বিচারে তিন ধরনের রেকর্ড বাজারজাত হয়েছিল।

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে কলম্বিয়া নব্য আবিষ্কৃত বৈদ্যুতিক রেকর্ড পদ্ধতি ব্যবহার করা শুরু করে। এই ধরনের শব্দধারণযুক্ত রেকর্ডে তারা Viva-tonal শব্দ ব্যবহার করতো।

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে
কলম্বিয়া Okeh Records কোম্পানি কিনে নেয়।  ফলে জাজ এবং ব্লুজ শিল্পীদের অনেকের রেকর্ড প্রকাশের অধিকার লাভ করে।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকান কলম্বিয়া কোম্পানি থেকে পৃথক হয়ে, ব্রিটিশ কলম্বিয়া গ্রামোফোন কোম্পানিতে পরিণত হয়। পরে গ্রামোফোন কোম্পানির সাথে একত্রিত হয়ে
 Electric & Musical Industries Ltd. (EMI) নামে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু
The "Gramophone Company Ltd." নামটি অনেকদিন চালু ছিল।

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে সকল ধরনের রেকর্ডের ঘূর্ণনগতির একটি আদর্শমান দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এই সময় রেকর্ডের সাধারণ ঘূর্ণন মান ৭৮ আরপিএম ঠিক রেখে অন্যান্য রেকর্ডের ঘূর্ণনগতি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হব। এই সূতরে দুটি ঘূর্ণন গতিকে আদর্শ হিসাবে গ্রহণ করা হয়। এই মান দুটি হলো— 45 এবং 33⅓ আরপিএম।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বেশ নমনীয় প্লাস্টিকের রেকর্ড বাজারজাত করেছিল কিছু কোম্পানি। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো ছিল জার্মানির ফোনিকর্ড (
Phonycord এবং ব্রিটিশ ফিল্মোফোন (Filmophone) ও গুডসন (Goodson) । কিন্তু এদের কোনো রেকর্ডই শেষ পর্যন্ত বাজারে টিকে থাকতে পারে নি।

১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে কলাম্বিয়া কোম্পানির মালিকানা লাভ করেছিল কলকাতার উদ্যোক্তা। এর পরিচালনায় ছিলেন নৃপন মজুমদার। তাঁর উদ্যোগে ভারতীয় কলম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি, হিস মাস্টার ভয়েস -এর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে। এই কোম্পানির উদ্যোগে ১৯৩৭-৩৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে 'রিগ্যাল রেকর্ড' লেবেলে কিছুদিন রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কলম্বিয়া রেকর্ডের বাজার অনেকটাই দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিস মাস্টার ভয়েস -এর কৌশলে এই কোম্পানি তাদের অংশভাগী হয়ে গিয়েছিল।
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সহজবহনযোগ্য ৭৮আরপিএম-এর রেকর্ড-সহ গ্রামোফোন যন্ত্রের নমুনা
১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের বেতার সম্প্রচারের জন্য ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের ভাইনাল রেকর্ড প্রকাশ করা হয়েছিল। এগুলোর ঘূর্ণগতি ছিল ৩৩ আরপিএম। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ভাইনাল রেকর্ড একটি দীর্ঘবাদন রেকর্ডের আদর্শ মান হিসেবে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।
  ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ আগষ্ট ভারতে
The Gramophone Co. (India) Limited) । নামক একটি কোম্পানি চালু হয়। কিছুদিন পর এই নামটি পরিবর্তন করে রাখা হয় The Gramophone Co. of India Limited ।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি প্রথম দীর্ঘবাদন রেকর্ড (Long Playing Record) প্রকাশ করে। এই সময়ে ঘূর্ণন গতি ছিল  33⅓ আরপিএমি। 

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে
RCA Victor প্রকাশ করে ৪৫ আরপিএম রেকর্ড। ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত শব্দ একটি চ্যানেলে ধারণ করা হতো। এরপর থেকে একটি একক ট্রাকে দুই চ্যানেলের শব্দ ধারণের চেষ্টা করা হয়। সেই সূত্রে ১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে বাণিজ্যিকভাবে স্টেরিও রেকর্ড সিসটেম প্রচলিত হয়।
 
একটি আধুনিক গ্রামোফোন রেকর্ড ও রেকর্ড প্লেয়ারের নমুনা
১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ:
  • প্রথম তৈরি হয় ট্রান্‌জিস্টর ফনোগ্রাফ। এর মডেল ছিল TPA-1 " এবং TPA-2। এতে শুধু ৪৫ আরপিএম রেকর্ড বাজানো যেতো। এতে ব্যবহৃত হতো ১.৫ ভোল্টের 'ডি' ব্যাটারি। এরপর থেকে হ্যান্ডেল দিয়ে রেকর্ড ঘুরানোর যুগ শেষ হয়ে যায়। মূলত এর পরে এর যান্ত্রিক কৌশল পরিবর্তন ঘটেছে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্র হিসেবে। রেকর্ড, রেকর্ড প্লেয়ারের রেকর্ড ঘুরানোর অংশ, শব্দ উৎপাদনের মান ইত্যাদি ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটেছিল।
  • ১৯৫৬-১৯৮৫ ফরাসি French Pathé Cellodiscs  পাতলা ভাইনাল প্লাস্টিক দিয়ে রেকর্ড তৈরি করেছিল। এগুলো খুব বেশিদিন ব্যবহার করা যেতো না।
  • ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে ১লা এপ্রিল The Gramophone Co. (India) Limited- এর সাথে Private শব্দটি যুক্ত হয়।
১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর পুনরায় এর নাম হয় “The Gramophone Company of India Limited”
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে
EMI । নামে কোম্পানি হিসেবে বৈধতা পায়।
১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের
RPG Group । এই কোম্পানির অধিকার ইএমআই-এর কাছ থেকে ক্রয় করে।
২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর এই কোম্পানির নামকরণ করা হয় 'সারেগামা'।

কম্পিউটার সিডি আবিষ্কারের পর থেকে গ্রামোফোনের চাহিদায় মারাত্মক বিপর্যয় ঘটে। বর্তমানে রেকর্ড এবং গ্রামোফোন যন্ত্র একটি শো-পিসে পরিণত হয়েছে।