রেকর্ডে ও রেকর্ড কোম্পানির বর্ণানুক্রমিক তালিকা

রেকর্ড ও তার ইতিহাস
[রেকর্ড অভিধান]
[রেকর্ড বিশ্বকোষ]
[ ভারতবর্ষে রেকর্ডের ইতিহাস]

মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত স্মৃতি সংরক্ষণের ইতিহাস। আদিম যুগে মানুষ গুহার প্রাচীরে চিত্র অঙ্কন, পাথরে খোদাই, মাটির ফলকে লিপি উৎকীর্ণকরণ এবং পরবর্তীকালে প্যাপিরাস, পার্চমেন্ট ও কাগজে লেখার মাধ্যমে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করত। এসব মাধ্যম মানুষের দৃশ্যগত তথ্য সংরক্ষণের প্রয়োজন পূরণ করলেও ধ্বনি বা শব্দ সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা দীর্ঘকাল পর্যন্ত ছিল না। ফলে মানুষের কণ্ঠস্বর, সংগীত বা অন্য কোনো শব্দ একবার উৎপন্ন হওয়ার পর তা চিরতরে বিলীন হয়ে যেত।

উনবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির ফলে শব্দকে যান্ত্রিকভাবে ধারণ ও পুনরুৎপাদনের ধারণা বাস্তব রূপ লাভ করে। এই গবেষণার ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় রেকর্ড—এমন একটি মাধ্যম, যাতে শব্দকে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করে প্রয়োজনে বারবার পুনরায় শোনা যায়। এই আবিষ্কার কেবল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসেই নয়, সংগীত, ভাষা, শিক্ষা, গণযোগাযোগ এবং বিনোদন শিল্পেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে।

প্রথম যুগে রেকর্ড বলতে যে কোনো শব্দধারণকারী মাধ্যমকে বোঝানো হতো। তাই টিনের পাত, মোমের সিলিন্ডার কিংবা সমতল চাকতি—সব ধরনের শব্দধারণ মাধ্যমই রেকর্ড নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীকালে এমিল বার্লিনারের সমতল চাকতিভিত্তিক গ্রামোফোন রেকর্ড বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা অর্জন করলে সাধারণ মানুষের কাছে "রেকর্ড" শব্দটি মূলত ডিস্ক রেকর্ডের সমার্থক হয়ে ওঠে।

শব্দধারণের প্রাথমিক প্রচেষ্টা

শব্দধারণের প্রাথমিক প্রচেষ্টা শব্দ ধারণের ইতিহাসে প্রথম উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেন ফরাসি মুদ্রাকর ও উদ্ভাবক
Édouard-Léon Scott de Martinville। তিনি বহু বছর গবেষণার পর এমন একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যা শব্দতরঙ্গকে দৃশ্যমান রেখাচিত্রে রূপান্তর করতে সক্ষম ছিল। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মার্চ তিনি এই যন্ত্রের পেটেন্ট গ্রহণ করেন। যন্ত্রটির নাম ছিল ফোনোটোগ্রাফ (Phonautograph)। ফোনোটোগ্রাফে একটি শিঙা দিয়ে শব্দ সংগ্রহ করে একটি সূক্ষ্ম ঝিল্লির সঙ্গে যুক্ত স্টাইলাসের সাহায্যে ধোঁয়াযুক্ত কাগজ বা কাচের ওপর শব্দতরঙ্গের কম্পনের অনুরূপ রেখা অঙ্কন করা হতো। এটি শব্দকে দৃশ্যমানভাবে সংরক্ষণ করতে পারলেও সেই সংরক্ষিত শব্দ পুনরায় শোনানো সম্ভব ছিল না। ফলে ফোনোটোগ্রাফ শব্দবিজ্ঞানের গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তা ব্যবহারিক শব্দসংরক্ষণ যন্ত্রে পরিণত হতে পারেনি।

ফোনোগ্রাফের আবিষ্কার
শব্দকে শুধু ধারণ নয়, পুনরায় শ্রবণযোগ্য করার সমস্যার সমাধান করেন মার্কিন উদ্ভাবক থমাস আলভা এডিসন
। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে তিনি এমন একটি যন্ত্রের পরিকল্পনা সম্পন্ন করেন, যা শব্দ ধারণের পাশাপাশি পুনরায় বাজাতে সক্ষম ছিল। একই বছরের ২১ নভেম্বর তিনি তাঁর আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। ডিসেম্বর মাসে Scientific American পত্রিকায় এই নতুন যন্ত্রের পরিচয় প্রকাশিত হয় এবং ২৯ নভেম্বর তিনি এটি সর্বসাধারণের সামনে প্রদর্শন করেন। এডিসন এই যন্ত্রের নাম দেন ফোনোগ্রাফ (Phonograph)ফোনোগ্রাফে একটি ধাতব সিলিন্ডারের উপর টিনের পাত জড়িয়ে রাখা হতো। শব্দের কম্পনে একটি সূচ টিনের পাতে খাঁজ সৃষ্টি করত। পুনরায় একই খাঁজ অনুসরণ করে সূচ চললে সেই কম্পন পুনরুৎপন্ন হতো এবং মূল শব্দ আবার শোনা যেত। ইতিহাসে এটিই ছিল প্রথম কার্যকর শব্দধারণ ও পুনরুৎপাদন ব্যবস্থা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে তিনি এই আবিষ্কারের স্বত্ত্বাধিকার লাভ করেন। অফিসে গিয়ে যন্ত্রের মাধ্যমে সবাইকে যে কয়টি কথা- এই 'কথা বলার যন্ত্র' দিয়ে শুনিয়েছিলেন, তা হলো " Good morning. How do you do? How do you like the phonograph?" ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে এডিসন ২০ ডলারে স্ট্যান্ডার্ড ফোনোগ্রাফ বিক্রি করতে শুরু করেন।

যদিও টিনের পাত সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হতো এবং একই রেকর্ড বহুবার বাজানো যেত না, তবু ফোনোগ্রাফ প্রমাণ করে যে মানুষের কণ্ঠস্বর ও সংগীত যান্ত্রিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব। এই সাফল্য পরবর্তী সকল শব্দধারণ প্রযুক্তির ভিত্তি স্থাপন করে।

ভোল্টা ল্যাবরেটরির উন্নয়ন
ফোনোগ্রাফ আবিষ্কারের কিছুদিন পর টেলিফোনের আবিষ্কারক
Alexander Graham Bell, তাঁর চাচাতো ভাই Chichester Alexander Bell এবং বিজ্ঞানী Charles Sumner Tainter ফোনোগ্রাফের উন্নয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।

ডিস্ক রেকর্ডের উদ্ভব
সিলিন্ডার রেকর্ডের উন্নত শব্দমান থাকা সত্ত্বেও এর একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা ছিল। প্রতিটি রেকর্ড পৃথকভাবে তৈরি করতে হতো; ফলে একই রেকর্ডের বহু অনুলিপি প্রস্তুত করা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ ছিল। এই সমস্যার সমাধান করেন জার্মান-আমেরিকান উদ্ভাবক
Emile Berliner। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনার সমতল চাকতিভিত্তিক একটি নতুন শব্দধারণ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেন, যার নাম দেন গ্রামোফোন তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল সমতল ডিস্কে পার্শ্বিক খাঁজ অঙ্কন এবং সেই মূল ডিস্ক থেকে ধাতব ছাঁচ তৈরি করে অসংখ্য প্রতিলিপি উৎপাদনের প্রযুক্তি উদ্ভাবন। এর ফলে একই রেকর্ড অল্প ব্যয়ে বিপুল সংখ্যায় তৈরি করা সম্ভব হয়।

বার্লিনারের প্রথম দিকের ডিস্ক রেকর্ডগুলোর ব্যাস ছিল প্রায় ৫ ইঞ্চি এবং এগুলো শক্ত রাবার দিয়ে নির্মিত হতো। যদিও এগুলো মূলত পরীক্ষামূলক ছিল, তবু এই প্রযুক্তিই পরবর্তী গ্রামোফোন শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে শেলাক-নির্মিত ৭, ১০ ও ১২ ইঞ্চি ডিস্ক রেকর্ডের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করে।

১৮৮৮ ও ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনার তাঁর গ্রামোফোনের নকশা ও রেকর্ড তৈরির পদ্ধতির আরও উন্নয়ন করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং রেকর্ড তৈরির জন্য অধিক উপযোগী পদার্থ নির্বাচন করার চেষ্টা করেন। একই সময়ে ডিস্কের ছাঁচ (প্রস্তুত এবং সেখান থেকে একাধিক প্রতিলিপি তৈরির কৌশলও উন্নত করা হয়। এই প্রযুক্তিই পরবর্তীকালে গ্রামোফোন শিল্পের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।

১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করেন। এই রেকর্ডগুলোর ব্যাস ছিল ৫ ইঞ্চি এবং এগুলো শক্ত রাবার দিয়ে তৈরি হতো। রেকর্ডগুলো একটি থালার উপর স্থাপন করে হাতল ঘুরিয়ে বাজাতে হতো। সে সময় এগুলোর শব্দমান সীমিত হলেও একই রেকর্ড বহু সংখ্যায় প্রস্তুত করা সম্ভব হওয়ায় এগুলোর উৎপাদন ব্যয় সিলিন্ডার রেকর্ডের তুলনায় অনেক কম ছিল। অপরদিকে এডিসনের মোমের সিলিন্ডারে ধারণকৃত শব্দের মান তুলনামূলকভাবে উন্নত হলেও প্রতিটি সিলিন্ডার আলাদাভাবে তৈরি করতে হতো। ফলে সেগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেশি ছিল এবং ব্যাপক বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছিল না।

১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে বার্লিনার শক্ত রাবারের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়বহুল উপাদান ব্যবহারের উপায় অনুসন্ধান করতে থাকেন। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে শেলাক-ভিত্তিক যৌগিক পদার্থ
(Shellac Compound) ব্যবহারের সূচনা হয়, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী ৭৮ আরপিএম রেকর্ড তৈরির প্রধান উপাদানে পরিণত হয়।

এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফোনোগ্রাফ শিল্পও দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে এডওয়ার্ড ডি. ইস্টন
(Edward D. Easton) ও তাঁর সহযোগীরা প্রতিষ্ঠা করেন Columbia Phonograph Company। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ওয়াশিংটন ডিসি, মেরিল্যান্ড এবং ডেলাওয়্যার অঞ্চলে এডিসনের ফোনোগ্রাফ ও সিলিন্ডার রেকর্ডের একচেটিয়া পরিবেশক হিসেবে কাজ করত। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠান নিজস্ব রেকর্ড নির্মাণ ও বাজারজাতকরণে প্রবেশ করে এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান রেকর্ড কোম্পানিতে পরিণত হয়।  

     [দ্রষ্টব্য: কলাম্বিয়া রেকর্ড ]

১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দবার্লিনার গ্রামোফোন কোম্পানি তাঁদের রেকর্ড বাজারজাত করা শুরু হয়। তখন এই রেকর্ডের ব্যাস ছিল ৫ ইঞ্চি (১৩ সেন্টিমিটার)। প্রথমদিকে এই রেকর্ডগুলো একটি বাদনযন্ত্রের থালার উপরে স্থাপন করে হাতল ঘুর্ণন গতি দেওয়া হতো। আর এর উপরে পিন সমন্বিত বাদন অংশ দ্বারা রেকর্ড থেকে শব্দ শ্রবণযোগ্য করে তোলা হতো। মূলত এটি ছিল যান্ত্রিক বাদন প্রক্রিয়াগত  খেলনা সামগ্রীর মতো। পরে এরা এই যন্ত্রটির শব্দধারণ প্রক্রিয়াটিকে আরও কম ব্যয়বহুল করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। একই সাথে বাদন-প্রক্রিয়ার উন্নয়ন করেছিল। একই রেকর্ডের অনেকগুলো কপি তৈরি করা ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটেছিল। 

১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে এমিল বার্লিনার ওয়াশিংটন ডিসিতে ডিস্ক রেকর্ডের বিপণনের জন্য
United States Gramophone Company প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর গ্রামোফোন ও ডিস্ক রেকর্ডের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ শুরু হয়। একই সময়ে গ্রামোফোন যন্ত্রের নির্মাণ, রেকর্ড প্রস্তুত এবং বাজারজাতকরণের জন্য পৃথক ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে ওঠে।

১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বার্লিনারের গ্রামোফোন রেকর্ড

১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে United States Gramophone Company-এর তত্ত্বাবধানে প্রথম বাণিজ্যিক ৭ ইঞ্চি গ্রামোফোন রেকর্ড বাজারে আসে। এসব রেকর্ডের উপর E. BERLINER GRAMOPHONE লেখা লেবেল মুদ্রিত থাকত। এই সময় থেকে শক্ত রাবারের পরিবর্তে শেলাক, স্লেটের গুঁড়ো, চুনাপাথরের গুঁড়ো ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণে তৈরি রেকর্ডের ব্যবহার শুরু হয়। বাংলায় এগুলো পরবর্তীকালে 'মাটির রেকর্ড' নামে পরিচিতি লাভ করে। এই রেকর্ডগুলোর আদর্শিক ঘূর্ণনগতি ছিল প্রায় ৭০ RPM

একই সময়ে
Columbia Phonograph Company এডিসন ও North American Phonograph Company-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব রেকর্ড নির্মাণ ও বাজারজাতকরণের দিকে অগ্রসর হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রেকর্ড নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৮৯৫ ও ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ঘটে। ডিস্ক রেকর্ড তৈরির ছাঁচ
(metal stamper) উন্নত হওয়ায় একই মূল রেকর্ড থেকে বিপুল সংখ্যক প্রতিলিপি অল্প ব্যয়ে উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এই প্রযুক্তিগত সুবিধার ফলে ডিস্ক রেকর্ড সিলিন্ডার রেকর্ডের তুলনায় অধিক বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে শুরু করে।

১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্যবসায়ী
William Barry Owen এমিল বার্লিনারের সহযোগিতায় লন্ডনে The Gramophone Company প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গ্রামোফোন যন্ত্র ও ডিস্ক রেকর্ডের উৎপাদন ও বিপণন দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানই His Master's Voice (HMV) লেবেলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।

১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন রেকর্ড ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়মিতভাবে বাজারজাত হতে শুরু করে। একই সময়ে ফ্রান্স, জার্মানি এবং রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ভাষায় সংগীত ও বক্তৃতা রেকর্ড করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে রেকর্ড কেবল বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে শুরু করে।

১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনারের গ্রামোফোন কোম্পানি প্রথম ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। পূর্ববর্তী ৭ ইঞ্চি রেকর্ডের তুলনায় এতে অধিক সময়ের শব্দ ধারণ করা সম্ভব হয় এবং এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

একই বছরে
তিনি ফোনোগ্রাফের আরো একটি উন্নত সংস্করণ বাজারে আনেন, যার বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ৭.৫০ ডলার। এরপর এডিসন ব্যাপক হারে ফোনোগ্রাফ তৈরি করতে শুরু করেন। এই বছরেই বার্লিনারের গ্রামোফোন কোম্পানি প্রথম ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। বড় আকারের এই রেকর্ডে পূর্ববর্তী ৭ ইঞ্চি রেকর্ডের তুলনায় বেশি সময়ের শব্দ ধারণ করা সম্ভব হয় এবং এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। একই সময়ে এডিসন
Concert Phonograph বাজারে আনেন। এতে ৫ ইঞ্চি ব্যাসের বৃহৎ সিলিন্ডার ব্যবহার করা হতো এবং শব্দমানও উন্নত ছিল। তবে যন্ত্রটির মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় এটি সাধারণ বাজারে বিশেষ সাফল্য লাভ করতে পারেনি।

১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে গ্রামোফোন প্রযুক্তি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করলে রেকর্ড শিল্পে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব ঘটে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাজ্যের
The Gramophone Company টাইপরাইটার ব্যবসায়ও প্রবেশ করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে The Gramophone & Typewriter Ltd. (G&T) রাখা হয়। যদিও নামের সঙ্গে টাইপরাইটার যুক্ত হয়েছিল, তবু গ্রামোফোন যন্ত্র ও ডিস্ক রেকর্ড নির্মাণই ছিল এর প্রধান ব্যবসা। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমিল বার্লিনারের গ্রামোফোন ব্যবসা পেটেন্ট-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে। এর ফলে তাঁর মার্কিন কার্যক্রমের পুনর্গঠন শুরু হয়।


গ্রামোফোন যন্ত্র নির্মাতা
Eldridge R. Johnson ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে Victor Talking Machine Company প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমদিকে Columbia Phonograph Company-এর সঙ্গে পেটেন্ট-সংক্রান্ত বিরোধ থাকলেও পরে তা মীমাংসিত হয়। এরপর Victor Talking Machine Company ডিস্ক রেকর্ড এবং গ্রামোফোন যন্ত্রের অন্যতম প্রধান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। একই বছর
কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি সিলিন্ডার রেকর্ডের পাশাপাশি ডিস্ক রেকর্ডও বাজারজাত করা শুরু করে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডিস্ক রেকর্ডের জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সিলিন্ডার রেকর্ডের একচেটিয়া অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।

এই সময়ে
American Graphophone Company-এর অধীনে গ্রাফোফোন প্রযুক্তিরও উন্নয়ন অব্যাহত থাকে। ভোল্টা ল্যাবরেটরির গবেষণার উত্তরাধিকার বহনকারী এই প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড উৎপাদন করলেও বাজারে ডিস্ক রেকর্ডের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে থাকে।

১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ডের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই রেকর্ডে সাধারণত প্রায় ৩ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা সম্ভব হতো। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারে আসে। বড় আকারের এই রেকর্ডে সাধারণত ৪ থেকে ৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা যেত। দীর্ঘ বাদনক্ষমতার কারণে শাস্ত্রীয় সংগীত, অপেরা এবং দীর্ঘ বক্তৃতা রেকর্ড করার ক্ষেত্রে ১২ ইঞ্চি রেকর্ড বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। এই বছর
Columbia Phonograph Company উন্নত মানের বাদামি মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড (Brown Wax XP Records) বাজারজাত করে। শক্ত মোমের এই রেকর্ডগুলো পূর্ববর্তী মোমের সিলিন্ডারের তুলনায় অধিক টেকসই ছিল এবং শব্দের মানও উন্নত ছিল।

একই বছরের মধ্যভাগে যুক্তরাজ্যের
Nicole Frères Ltd. নিজস্ব উদ্যোগে ডিস্ক রেকর্ড নির্মাণ ও বাজারজাতকরণ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে উচ্চমানের রেকর্ড নির্মাণ এবং বিভিন্ন দেশের জন্য রেকর্ড উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।

এডিশন-বেল-এর চোঙাকৃতির রেকর্ডের জন্য আঁকা মূল ছবি

১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত বাণিজ্যচিহ্ন His Master's Voice (HMV)-এর বাণিজ্যিক ব্যবহার। এই চিত্রকর্মটি অঙ্কন করেছিলেন ইংরেজ শিল্পী Francis Barraud। ছবিতে একটি কুকুরকে একটি গ্রামোফোনের চোঙার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। কুকুরটির নাম ছিল Nipper উল্লেখ্য, Nipper-এর জন্ম হয় ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। এর প্রথম মালিক ছিলেন মঞ্চসজ্জা শিল্পী Mark Henry Barraud। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর কুকুরটির দায়িত্ব নেন তাঁর ভাই Francis Barraud। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে নিপার মারা যায় এবং ইংল্যান্ডের Kingston upon Thames-এ তাকে সমাহিত করা হয়। ভাইয়ের মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণ হিসেবে Francis Barraud ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি চিত্রকর্ম অঙ্কন করেন, যেখানে নিপার-কে একটি Edison Bell ফোনোগ্রাফের সামনে বসে শব্দ শুনতে দেখা যায়। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি Dog Looking at and Listening to a Phonograph নামে এই চিত্রকর্মের স্বত্ব নিবন্ধনের আবেদন করেন। পরে তিনি ছবিটি Edison Bell কোম্পানির কাছে বিক্রয়ের চেষ্টা করলে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন, "Dogs don't listen to phonographs." ফলে প্রতিষ্ঠানটি ছবিটি গ্রহণ করেনি। এরপর Francis Barraud ছবিটি গ্রামোফোন-এর কাছে উপস্থাপন করেন। কোম্পানির পরামর্শে ফোনোগ্রাফের পরিবর্তে একটি Berliner Gramophone অঙ্কন করা হয় এবং ছবিটির নতুন নামকরণ করা হয় His Master's Voice। গ্রামোফোন ছবিটির স্বত্ব ক্রয় করে এবং এটি তাদের বাণিজ্যচিহ্ন হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। একই সময়ে Victor Talking Machine Company-এর প্রতিষ্ঠাতা Eldridge R. Johnson মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই চিত্রটির বাণিজ্যিক ব্যবহারের অধিকার লাভ করেন। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে Victor Talking Machine Company তাদের রেকর্ড, গ্রামোফোন যন্ত্র এবং বিজ্ঞাপনে His Master's Voice চিত্রটি ব্যবহার করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এই প্রতীকটি বিশ্বের সর্বাধিক পরিচিত রেকর্ড-বাণিজ্যচিহ্নে পরিণত হয় এবং HMV নামেও আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।

১৯০৩ থেকে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে ডিস্ক রেকর্ড প্রযুক্তি সিলিন্ডার রেকর্ডের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ধীরে ধীরে প্রধান শব্দধারণ মাধ্যমে পরিণত হতে শুরু করে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উন্নত মানের গ্রামোফোন যন্ত্র, বৃহত্তর আকারের ডিস্ক রেকর্ড এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি প্রবর্তনের মাধ্যমে রেকর্ড শিল্পকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করে।

১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে
The Gramophone & Typewriter Ltd. ১২ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। এর আগে ৭ ও ১০ ইঞ্চি রেকর্ড প্রচলিত থাকলেও ১২ ইঞ্চি রেকর্ডে অধিক সময়ের শব্দ ধারণ করা সম্ভব হওয়ায় এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধারণত ১০ ইঞ্চি রেকর্ডে প্রায় ৩ মিনিট এবং ১২ ইঞ্চি রেকর্ডে ৪–৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা যেত। দীর্ঘ বাদনসময়ের কারণে অপেরা, শাস্ত্রীয় সংগীত এবং দীর্ঘ বক্তৃতা রেকর্ড করার ক্ষেত্রে ১২ ইঞ্চি রেকর্ড বিশেষভাবে উপযোগী হয়ে ওঠে। একই সময়ে Victor Talking Machine Company মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডিস্ক রেকর্ড ও গ্রামোফোন যন্ত্র নির্মাণে দ্রুত অগ্রসর হয়। উন্নত শব্দমান, নির্ভরযোগ্য যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং কার্যকর বিপণন কৌশলের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন বাজারে অন্যতম প্রধান রেকর্ড প্রস্তুতকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

অন্যদিকে
Columbia Phonograph Company নতুন ধরনের কালো মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড  বাজারজাত করে। উন্নত শব্দমান ও অধিক স্থায়িত্বের কারণে এই রেকর্ডগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড শিল্পে Columbia Phonograph Company, National Phonograph Company (Edison) এবং Victor Talking Machine Company—এই তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্মাতা ও বিপণনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

ডিস্ক রেকর্ডের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে সিলিন্ডার প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনে। ইউরোপেও এই সময় রেকর্ড শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে।
Carl Lindström Company ফোনোগ্রাফ ও সিলিন্ডার রেকর্ড নির্মাণের পাশাপাশি ডিস্ক রেকর্ড উৎপাদন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠান ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ রেকর্ড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রেকর্ড শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। এই সময় নতুন নতুন রেকর্ড নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব, উন্নত উপকরণের ব্যবহার এবং বৃহৎ আকারের ডিস্ক রেকর্ডের প্রচলনের মাধ্যমে গ্রামোফোন শিল্প আরও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে। ৩ জুলাই ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে
The Nicole Record Co. Ltd. প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয় ১৪৭-১৫০ Great Saffron Hill, London-এ। একই বছরের আগস্ট মাসে তারা Nicole Record নামে প্রথম ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১৫০টি এক-পার্শ্বীয় ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এসব রেকর্ড লালচে-বাদামি ল্যাকার-প্রলেপযুক্ত কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি ছিল। এই বিশেষ রেকর্ড নির্মাণপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন কোম্পানির পরিচালক George Henry Burt এবং Carl Kroeger

১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বিয়া রেকর্ড নিউইয়র্কের
Metropolitan Opera-এর একাধিক খ্যাতিমান শিল্পীর কণ্ঠ রেকর্ড আকারে প্রকাশ করে। এর ফলে অপেরা সংগীত সাধারণ শ্রোতাদের কাছেও সহজলভ্য হয়ে ওঠে। তবে শব্দ পুনরুৎপাদনের মানের বিচারে সে সময়  কলম্বিয়া রেকর্ড-র অনেক রেকর্ড Victor Talking Machine Company, যুক্তরাজ্যের গ্রামোফোন এবং ইতালির Fonotipia Records-এর উৎকৃষ্ট রেকর্ডগুলোর তুলনায় কিছুটা নিম্নমানের বলে বিবেচিত হতো।

১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে
এডিসন তাঁর উন্নত সিলিন্ডার রেকর্ডের নাম Gold Moulded Records রাখেন। এর আগে এগুলোর নাম ছিল New High Speed Hard Wax Moulded Records। এই প্রযুক্তিতে ধাতব ছাঁচ ব্যবহার করে একটি মূল রেকর্ড থেকে প্রায় ১২০-১৫০টি সিলিন্ডার প্রতিলিপি তৈরি করা সম্ভব হতো। ফলে সিলিন্ডার রেকর্ডের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং প্রতিটি রেকর্ডের মূল্য প্রায় ৩৫ সেন্টে নেমে আসে। এই সময়ে সিলিন্ডার রেকর্ডে শক্ত মোম  ব্যবহারের ফলে রেকর্ডের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায় এবং বারবার বাজালেও ক্ষয় তুলনামূলকভাবে কম হতো। তবু উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণের অসুবিধা এবং ডিস্ক রেকর্ডের তুলনায় সীমিত বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে সিলিন্ডার প্রযুক্তি ক্রমে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে থাকে।

এই বছর ১২ ইঞ্চি ব্যাসের গ্রামোফোন ডিস্ক রেকর্ডের বাণিজ্যিক প্রচলন আরও বিস্তৃত হয়। বৃহৎ আকারের এই রেকর্ডে সাধারণত ৪ থেকে ৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা সম্ভব হতো। দীর্ঘ বাদনসময়ের কারণে অপেরা, শাস্ত্রীয় সংগীত এবং দীর্ঘ বক্তৃতা প্রকাশের ক্ষেত্রে ১২ ইঞ্চি রেকর্ড বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এটি রেকর্ড শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হয়।

১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপীয় রেকর্ড কোম্পানিগুলো এশিয়া, বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। একই সময়ে ইতালিতে উচ্চমানের শাস্ত্রীয় সংগীত প্রকাশের জন্য নতুন রেকর্ড কোম্পানির আবির্ভাব ঘটে এবং ভারতেও দেশীয় উদ্যোগে রেকর্ড ব্যবসার সূচনা হয়।

১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে  জন ওয়াটসন হড
The Nicole Record Co. Ltd.-এর পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি The Gramophone & Typewriter Ltd.-এর কলকাতা শাখার প্রথম ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লন্ডনে ফিরে যান এবং পরবর্তী বছর Nicole Record Company-তে যোগ দেন। Nicole Record Company-র পরিচালক হওয়ার পর ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে জন ওয়াটসন হড ভারতীয় উপমহাদেশে রেকর্ড ব্যবসার সম্ভাবনা যাচাই করার উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আমেরিকান গায়ক ও Nicole Record-এর রেকর্ডিং বিশেষজ্ঞ Stephen Carl Porter। এই সফরের মাধ্যমে ভারতীয় বাজারে Nicole Record-এর কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

একই সময়ে কলকাতার ব্যবসায়ী মানিকলাল সাহা ভারতে
Nicole Frères Ltd.-এর প্রথম এজেন্ট নিযুক্ত হন। একই বছর ইতালির মিলানে Fonotipia Company প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি Fonotipia Records নামে উচ্চমানের ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশ শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইউরোপের প্রখ্যাত অপেরা শিল্পী, শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী এবং বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশের মাধ্যমে Fonotipia আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে উৎকৃষ্ট শব্দমানের জন্য Fonotipia Records বিশেষভাবে সমাদৃত ছিল। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার সুপরিচিত বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Dwarkin & Son-এর প্রতিষ্ঠাতা দ্বারকানাথ ঘোষ রেকর্ড ব্যবসায়ও প্রবেশ করেন। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামোফোন যন্ত্রের বিক্রয়, রেকর্ড বিপণন এবং ভারতীয় সংগীতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে Dwarkin & Son ভারতীয় উপমহাদেশে গ্রামোফোন শিল্পের অন্যতম প্রধান দেশীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ ডিস্ক রেকর্ডের আন্তর্জাতিক বাজার সুসংহত রূপ লাভ করে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ প্রধান রেকর্ড কোম্পানি ১০ ও ১২ ইঞ্চি ডিস্ক রেকর্ডকে তাদের প্রধান বাণিজ্যিক মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। একই সময়ে বিভিন্ন ভাষার সংগীত, নাট্যাংশ, বক্তৃতা এবং বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা রেকর্ড আকারে প্রকাশিত হতে থাকে। এর ফলে রেকর্ড শিল্প কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক সংগীত ও বিনোদন শিল্পের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।

ফেব্রুয়ারি মাসে
The Nicole Record Co. Ltd.-এর পরিচালক John Watson Hawd কলকাতায় তাঁর দায়িত্ব শেষ করে লন্ডনে ফিরে যান। তবে তাঁর সহযোগী আমেরিকান গায়ক ও রেকর্ডিং বিশেষজ্ঞ Stephen Carl Porter ভারতে থেকে রেকর্ডিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ জুড়ে তিনি বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, তামিল, তেলুগুসহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার গান, আবৃত্তি ও কথ্যধারার প্রায় ৭০০টি রেকর্ড ধারণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার)-এ গিয়ে রেকর্ডিং পরিচালনা করেন এবং সেখান থেকে লন্ডন হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর এই রেকর্ডিং কার্যক্রম ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাথমিক শব্দসংরক্ষণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।

ভারতে
Nicole Record-এর কার্যক্রমকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ২০ সেপ্টেম্বর ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায় Nicole Frères (India) Ltd. প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক Adolf Muhlberg কলকাতায় এসে ২/১-২/৩ Corporation Street-এ কোম্পানির কার্যালয় স্থাপন করেন। উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় শিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় নিকোল রেকর্ডের  ব্যবসা সম্প্রসারণ। তবে প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই কোম্পানির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও প্রশাসনিক সমস্যার কারণে ভারতে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। একই সময়ে কোম্পানির প্রধান অংশীদার প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে এর প্রধান কার্যক্রম ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের Stockport-এ স্থানান্তরিত করে। ফলে ভারতীয় বাজারে নিকোল রেকর্ডের-এর সম্ভাবনাময় সূচনা বিনষ্ট হয়।

১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ আরও ত্বরান্বিত হয়। ইউরোপের বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানি এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য উপনিবেশে তাদের ব্যবসা বিস্তারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই সময় দ্বিপার্শ্বিক ডিস্ক রেকর্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডিস্ক রেকর্ডের চাহিদা আরও সুসংহত হয়। এই সময় নিকোল রেকর্ড-এর ইংল্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে এবং তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়। কোম্পানির পরিচালক
John Watson Hawd প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ স্বত্ব অধিগ্রহণ করে উত্তর ইংল্যান্ডের Stockport-এ রেকর্ড উৎপাদন কার্যক্রম স্থানান্তর করেন। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ তিনি Adolf Muhlberg-এর সহযোগিতায় Watson Hawd & Co. প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন প্রতিষ্ঠানের কারখানা ছিল Wellington Mills, Wellington Road, Stockport-এ। ১৯ জুন থেকে এই কারখানায় Nicole Frères-এর জন্য রেকর্ড উৎপাদন শুরু হয় এবং সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে, বিশেষত ভারতীয় বাজারে
নিকোল রেকর্ড রপ্তানি করা হতে থাকে।

নিকোল রেকর্ডে -এর ইতিহাসেও এই বছর একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। প্রথমদিকে প্রতিষ্ঠানটি এক-পার্শ্বীয়  ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশ করত, যার ওপর রূপালি রঙের কালিতে সরাসরি রেকর্ডের তথ্য মুদ্রিত থাকত। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ তারা দ্বিপার্শ্বীয়- ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশ শুরু করে। এই নতুন রেকর্ডে লাল কাগজের ওপর কালো কালিতে মুদ্রিত লেবেল সংযোজন করা হতো, যা পরবর্তী সময়ে তাদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।

একই সময়ে জার্মানির
Beka Record (
বেকা রেকর্ড) আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়ায় কার্যক্রম শুরু করে। কোম্পানির প্রতিনিধি Ernest Low ভারতীয় উপমহাদেশে এসে বোম্বেতে রেকর্ডিং কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে বেক রেকর্ড ইউরোপের বাইরে নিজস্ব শিল্পী ও স্থানীয় সংগীত সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং আন্তর্জাতিক রেকর্ড ব্যবসায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।

এই সময় বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
Victor Talking Machine Company, Columbia Phonograph Company, The Gramophone & Typewriter Ltd., Nicole Record, Beka Record এবং Fonotipia নিজ নিজ বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকে। এর ফলে রেকর্ড শিল্প ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বিনোদন ও সাংস্কৃতিক শিল্পে পরিণত হয়।

১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে রয়্যাল রেকর্ড নামে নিজস্ব রেকর্ড প্রকাশ করেন। এর এক পিঠে গান রেকর্ড করা হতো। দাম ছিল দুই টাকা। এর কারখানা ছিল কলকাতার ৩ ক্রিক রো। দাম ছিল দুই টাকা।

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের একটি গ্রামোফোন-বাদন যন্ত্রর

১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে রেকর্ড শিল্পে নতুন উপাদান, নতুন প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্প্রসারণের ফলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।

কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি ফাইবার দিয়ে রেকর্ড তৈরি করা শুরু করে । এই রেকর্ড বাজানোর জন্য বিশেষ স্বর্ণাবৃত
(Gold-plated) পিন ব্যবহার করা হতো। কিন্তু শব্দের গুণগত মান সন্তোষজনক না হওয়ায় এই রেকর্ড বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়নি। শব্দের ধারণের ডিস্কের ঘূর্ণনগতি একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। প্রতি মিনিটে ঘূর্ণন (আরপিএম) সংখ্যা দ্বারা এই মান নির্ধারিত হয়। এ সময় বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানি ৬০ থেকে ১৩০ আরপিএম ঘূর্ণনগতির রেকর্ড প্রকাশ করত। ফলে এক কোম্পানির রেকর্ড অন্য কোম্পানির যন্ত্রে সঠিক গতিতে বাজানো সবসময় সম্ভব হতো না। পরবর্তীকালে আন্তর্জাতিকভাবে একটি মানসম্মত ঘূর্ণনগতি নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

এই বছর
Berliner Gramophone Company-এর নিউইয়র্ক প্রতিনিধি Alfred Clark প্যারিস অপেরার শিল্পীদের কণ্ঠে ২৪টি সমতল রেকর্ড ধারণ করেন। ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে রেকর্ডগুলো লোহা ও সীসার তৈরি বিশেষ বাক্সে সংরক্ষণ করে Paris Opera House-এর ভূগর্ভস্থ কক্ষে রাখা হয়।

এই বছরে
বার্লিনার গ্রামোফোন কোম্পানি নিউইয়র্ক প্রতিনিধি আলফ্রেড ক্লার্ক প্যারিস অপেরার জন্য ২৪টি সমতলীয় রেকর্ড তৈরি করে। এই রেকর্ডগুলো লোহা এবং সীসার তৈরি বাক্সে ভরে সংরক্ষণ করা হয় অপেরা হাউসের নিচের কক্ষে।

এই বছরে দক্ষিণ ভারতে  নিকোল রেকর্ডের  প্রধান পাইকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এম.তারা এন্ড কোং। এদের অফিস ছিল মাদ্রাজের ৫ ব্রডওয়ে এবং ১৮৬ এসপ্লানেড। পশ্চিম ভারতের  নিকোল রেকর্ডের  একটি শাখা অফিস খোলে বোম্বাইয়ের ৩৭ পারসি বাজার স্ট্রিটে। তখন বার্মার রেকর্ড বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ হতো কলকাতা থেকে। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই কোম্পানি ভারতে প্রায় ৬০০ রেকর্ড বাজারে ছাড়তে সক্ষম হয়েছিল। এই রেকর্ডের ভিতরে ছিল বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু গুজরাটি ভাষার গান এবং যন্ত্রসঙ্গীত। এছাড়া কোরান তেলাওয়াত ও সংস্কৃত মন্ত্র রেকর্ড প্রকাশ করেছিল।

এই বছরে জন ওয়াটসন হড ধীরে ধীরে তাঁর কোম্পানির মাধ্যমে বিভিন্ন ছোট ছোট রেকর্ড কোম্পানির রেকর্ড প্রকাশের সাথে যুক্ত হয়ে যান।

এই বছরে প্রতিষ্ঠিত দ্যা ব্রিটিশ সোনোগ্রাম কোম্পানি লিমিটেড এবং হডের কোম্পানি একীভূত হয় এবং ডিস্ক রেকর্ড কোম্পানির রেকর্ড তৈরিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে।  ব্রিটিশ সোনোগ্রাম কোম্পানির
'THE SOVEREIGN RECORD'  নিজেদের উদ্যোগে তৈরি হওয়া শুরু করে লণ্ডনে। নিকল রেকর্ড নামে এরা প্রায় এক শত দ্বিপার্শীয় রেকর্ড বাজারজাত করে।

১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দর ভারতীয় নিকল কোম্পানির কলকাতা অফিস বন্ধ হয়ে যায়। এই সময় থেকে এদের ব্যবাসয়িক কার্যক্রম পরিচালিত হতে থাকে বোম্বে থেকে।

১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে রেকর্ড শিল্পে দ্বিপার্শ্বী ডিস্ক রেকর্ডের বাণিজ্যিক সাফল্য একটি নতুন যুগের সূচনা করে। এই বছরে কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি সফলভাবে উভয় পার্শ্বে শব্দধারণযোগ্য ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। এর বাণিজ্যিক নাম ছিল
Double-Faced Record। যদিও এর আগে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরীক্ষামূলকভাবে বা সীমিত আকারে দ্বিপার্শ্বীয় রেকর্ড প্রকাশ করেছিল, কলাম্বিয়াই প্রথম বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের রেকর্ডকে জনপ্রিয় করে তোলে। ১০ ইঞ্চি ব্যাসের এই রেকর্ডের মূল্য ছিল ৬৫ সেন্ট।

সে সময় কোম্পানির লেবেলে এক জোড়া পাশ্চাত্য স্টাফ নোটেশনের
Semiquaver
(অষ্টমাংশ স্বর)-এর প্রতীক ব্যবহৃত হতো। এই বছর থেকেই কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড উৎপাদন বন্ধ করে সেলুলয়েড-নির্মিত সিলিন্ডার রেকর্ড বাজারজাত করা শুরু করে। সেলুলয়েডের স্থায়িত্ব ও ব্যবহারিক সুবিধার কারণে এগুলো মোমের সিলিন্ডারের তুলনায় অধিক টেকসই ছিল।  

১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ
এই বছরে এডিসন সাড়ে চার মিনিট বাদন উপযোগী এ্যাম্বর সিলিন্ডার বাজারজাত করেন। এই সিলিন্ডারগুলো প্রায় সাড়ে চার মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করতে সক্ষম ছিল, যা পূর্ববর্তী দুই মিনিটের সিলিন্ডারের তুলনায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি। এই উদ্ভাবনের ফলে সিলিন্ডার রেকর্ডের ধারণক্ষমতা ও ব্যবহারিক মূল্য বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে এই প্রযুক্তির ভিত্তিতেই আরও উন্নত ও অধিক টেকসই Blue Amberol সিলিন্ডারের উদ্ভব ঘটে।

একই সময়ে নিকোল রেকর্ডের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যভাগে প্রতিষ্ঠানটি নতুন রেকর্ড প্রকাশ প্রায় বন্ধ করে দিয়ে মূলত পূর্বে প্রকাশিত রেকর্ডের বিক্রয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সে সময় প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম মূলত কর্মচারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো এবং বিপণনের দায়িত্ব পালন করত
McClean Atmaram & Co.। ক্রমে নিকোল রেকর্ডের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়।

১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে
Gramophone Company একই মূল্যে দ্বিপার্শ্বীয় Zonophone Record বাজারজাত করা শুরু করে। উভয় পার্শ্বে শব্দধারণযোগ্য এই রেকর্ডগুলোর মূল্য ছিল মাত্র ২ টাকা। তুলনামূলক কম মূল্যের কারণে Zonophone সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে।

১৯১২-১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ
১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে
Columbia-এর ব্যবসায়িক কাঠামো পুনর্গঠিত হয়। এই সময় প্রতিষ্ঠানটি পৃথক দুটি বিভাগে বিভক্ত হয়। একটি বিভাগ রেকর্ড উৎপাদন ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করত, অপর বিভাগ গ্রামোফোন ও অন্যান্য শব্দ-বাদনযন্ত্র নির্মাণে নিয়োজিত ছিল। এই সময় পর্যন্ত বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানি ভিন্ন ভিন্ন ঘূর্ণনগতির আরপিএম রেকর্ড তৈরি করত। ফলে এক কোম্পানির রেকর্ড অন্য কোম্পানির যন্ত্রে সঠিক গতিতে বাজানো সব সময় সম্ভব হতো না। ১৯১০-এর দশকের মধ্যভাগ থেকে শিল্পে ঘূর্ণনগতির মান একীভূত করার প্রচেষ্টা শুরু হয় এবং পরবর্তী দশকে ৭৮ আরপিএম (প্রকৃতপক্ষে প্রায় ৭৮.২৬ আরপিএম) ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মান হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে।

১০ ইঞ্চি রেকর্ডে সাধারণত প্রায় ৩ মিনিট এবং ১২ ইঞ্চি রেকর্ডে প্রায় ৪–৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা সম্ভব হতো। এই সময় পর্যন্ত অধিকাংশ গ্রামোফোন ছিল সম্পূর্ণ যান্ত্রিক
(Acoustic Gramophone)। রেকর্ডের খাঁজ থেকে স্টাইলাসের মাধ্যমে সৃষ্ট কম্পন একটি ডায়াফ্রাম হয়ে ধাতব বা কাগজের তৈরি হর্নে পৌঁছাত এবং হর্নই শব্দকে প্রাকৃতিকভাবে পরিবর্ধিত করে শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিত।

১৯২০-এর দশকের প্রথম ভাগে বৈদ্যুতিক প্রযুক্তির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চললেও বাণিজ্যিকভাবে বৈদ্যুতিক রেকর্ডিং ও বৈদ্যুতিক গ্রামোফোনের প্রচলন শুরু হয় ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে। এই সময় মাইক্রোফোন, বৈদ্যুতিক অ্যাম্প্লিফায়ার এবং লাউডস্পিকার ব্যবহারের ফলে রেকর্ডের শব্দমান ও পুনরুৎপাদনের গুণগত মানে উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটে। পরবর্তীকালে ঘূর্ণনগতির ভিত্তিতে গ্রামোফোন রেকর্ড প্রধানত তিনটি মানে প্রচলিত হয়—

  • ৭৮ আরপিএম (Shellac Record) ৭৮ আরপিএম (Shellac Record) — ১৯২০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক মান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়; ১০ ও ১২ ইঞ্চি শেলাক ডিস্কে ব্যবহৃত হতো। ১৯২৫ সালের পর বৈদ্যুতিক রেকর্ডিং প্রযুক্তির সঙ্গে এর ব্যাপক প্রচলন ঘটে।
১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বিয়া রেকর্ড নবউদ্ভাবিত বৈদ্যুতিক শব্দধারণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে রেকর্ড প্রকাশ শুরু করে। এই নতুন প্রযুক্তিতে মাইক্রোফোন ও বৈদ্যুতিক পরিবর্ধক ব্যবহারের ফলে রেকর্ডের শব্দমান পূর্ববর্তী যান্ত্রিক পদ্ধতির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়। এই প্রযুক্তিতে ধারণকৃত রেকর্ডের জন্য Columbia "Viva-tonal" নামটি ব্যবহার করত, যা তাদের উন্নত শব্দমানের বাণিজ্যিক পরিচয়চিহ্নে পরিণত হয়।

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বিয়া রেকর্ড
Okeh Records অধিগ্রহণ করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি জ্যাজ, ব্লুজ এবং আফ্রিকান-আমেরিকান সংগীতের বহু বিশিষ্ট শিল্পীর রেকর্ড প্রকাশ ও বিতরণের অধিকার লাভ করে। এই অধিগ্রহণ কলম্বিয়াকে সমকালীন জনপ্রিয় সংগীতের বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যায়।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শেলাকের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নমনীয় প্লাস্টিকজাতীয় উপাদানে রেকর্ড তৈরির বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। এই সময় জার্মানির Phonycord এবং ব্রিটেনের Filmophone Goodson কোম্পানি নমনীয় প্লাস্টিকের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। এসব রেকর্ডের প্রধান সুবিধা ছিল ওজনে হালকা, ভাঙার ঝুঁকি কম এবং উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হওয়া। কিন্তু শব্দমান, স্থায়িত্ব এবং প্রচলিত গ্রামোফোন যন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলোর কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে বাজারে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। পরবর্তীকালে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC) বা ভিনাইল-নির্মিত রেকর্ডের আবির্ভাবের ফলে নমনীয় প্লাস্টিক রেকর্ডের এই প্রাথমিক পরীক্ষামূলক উদ্যোগগুলো ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বিয়া গ্রাফোফোন কোম্পানি এবং দ্যা গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেড একীভূত হয়ে
Electric & Musical Industries Ltd. (EMI) নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের সূচনা করে। এই একীভবনের মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রেকর্ড ও শব্দপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। যদিও নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল EMI, তবুও The Gramophone Company Ltd. নামটি এবং এর সুপরিচিত His Master's Voice (HMV) লেবেল দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে। উল্লেখ্য, এই সময়ে মার্কিন Columbia Records এবং ব্রিটিশ Columbia Graphophone Company পৃথক মালিকানা ও ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হতো।

১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে কলাম্বিয়া গ্রামোফোন কোম্পানি নতুনভাবে তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে। এই প্রতিষ্ঠানের ভারতীয় কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন নৃপেন মজুমদার। তাঁর দক্ষ পরিচালনায় কলাম্বিয়া অল্প সময়ের মধ্যেই হিজ মাস্টার্স ভয়েস-এর অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। বাংলা, হিন্দি ও অন্যান্য ভারতীয় ভাষার বহু জনপ্রিয় শিল্পীর রেকর্ড প্রকাশের মাধ্যমে কোম্পানিটি ভারতীয় বাজারে নিজেদের শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। পরবর্তীকালে ১৯৩৭–১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে রিগ্যাল লেবেলে স্বল্পমূল্যের রেকর্ড প্রকাশ করা হয়, যা সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এর ফলে ভারতীয় রেকর্ড বাজারে কলাম্বিয়ার প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়। তবে পরবর্তীকালে ব্যবসায়িক পুনর্গঠন ও মালিকানাগত পরিবর্তনের ফলে কলাম্বিয়া এবং এইচএমভি-এর কার্যক্রম একই কর্পোরেট গোষ্ঠীর অধীনে চলে আসে। এর ফলে উভয় প্রতিষ্ঠানের মধ্যকার পূর্বেকার প্রতিযোগিতার অবসান ঘটে।

১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে বেতার সম্প্রচারের জন্য ১৬ ইঞ্চি ব্যাসের ভিনাইল ট্রান্সক্রিপশন ডিস্ক
(Transcription Disc) ব্যবহার শুরু হয়। এসব ডিস্কের ঘূর্ণনগতি ছিল ৩৩⅓ আরপিএম। এগুলোতে সাধারণ ১০ বা ১২ ইঞ্চি শেলাক রেকর্ডের তুলনায় অনেক বেশি সময়ের শব্দ ধারণ করা সম্ভব হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন বেতার প্রতিষ্ঠান এবং সামরিক সম্প্রচার ব্যবস্থায় এই ধরনের ভিনাইল ডিস্ক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘবাদন রেকর্ড প্রযুক্তির বিকাশে এই ট্রান্সক্রিপশন ডিস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সহজবহনযোগ্য ৭৮আরপিএম-এর রেকর্ড-সহ গ্রামোফোন যন্ত্রের নমুনা


১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ আগস্ট ভারতে
The Gramophone Co. (India) Limited নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার কিছুদিন পর কোম্পানিটির নাম পরিবর্তন করে The Gramophone Co. of India Limited রাখা হয়। পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এই প্রতিষ্ঠান His Master's Voice (HMV) লেবেলে ভারতের অন্যতম প্রধান রেকর্ড প্রযোজনা ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ২১ জুন কলম্বিয়া রেকর্ড প্রথম বাণিজ্যিক দীর্ঘবাদন রেকর্ড  প্রকাশ করে। এই রেকর্ডের ঘূর্ণনগতি ছিল ৩৩⅓ আরপিএম এবং এটি ১২ ইঞ্চি ব্যাসের ভিনাইল মাইক্রোগ্রুভ ডিস্কে নির্মিত হয়েছিল। প্রচলিত ৭৮ আরপিএম শেলাক রেকর্ডের তুলনায় এতে প্রতি পিঠে প্রায় ২০–২৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা সম্ভব ছিল। এই উদ্ভাবনের ফলে দীর্ঘ সংগীত, সিম্ফনি, নাটক ও বক্তৃতা ধারাবাহিকভাবে একটি রেকর্ডেই সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় এবং রেকর্ড শিল্পে নতুন যুগের সূচনা ঘটে।

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে
RCA Victor ৭ ইঞ্চি ব্যাসের ৪৫ আরপিএম ভিনাইল রেকর্ড বাজারজাত করে। এই রেকর্ডে সাধারণত একটি বা দুটি গান ধারণ করা হতো। অল্প সময়ের মধ্যেই এটি জনপ্রিয় গানের Single Record হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে এবং ৩৩⅓ আরপিএম দীর্ঘবাদন রেকর্ডের পাশাপাশি একটি আদর্শ রেকর্ড-মান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক ট্রানজিস্টরচালিত পোর্টেবল ফোনোগ্রাফ বাজারে আসে। এর উল্লেখযোগ্য মডেল ছিল
TPA-1 এবং TPA-2। এই যন্ত্রগুলোতে কেবল ৪৫ আরপিএম রেকর্ড বাজানো যেত এবং এগুলো ১.৫ ভোল্টের 'ডি' (D) ব্যাটারিতে চালিত হতো। এর ফলে রেকর্ড প্লেয়ার আরও বহনযোগ্য ও ব্যবহারবান্ধব হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ে রেকর্ড প্লেয়ারের যান্ত্রিক কাঠামো ধীরে ধীরে ইলেকট্রনিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে ওঠে এবং মোটর, পিক-আপ কার্টিজ, অ্যাম্প্লিফায়ার ও শব্দ পুনরুৎপাদন ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন সাধিত হয়।

১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ফ্রান্সের
Pathé কোম্পানি French Pathé Cellodiscs নামে পাতলা ভিনাইল প্লাস্টিকের রেকর্ড উৎপাদন করে। এগুলো ছিল হালকা ও নমনীয়; তবে দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ায় এবং দীর্ঘদিন ব্যবহারোপযোগী না হওয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে পারেনি।

এই বছরের ১ এপ্রিল
The Gramophone Co. (India) Limited-এর নামের সঙ্গে Private শব্দটি যুক্ত করা হয়। এরপর প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় The Gramophone Co. (India) Private Limited
একটি আধুনিক গ্রামোফোন রেকর্ড ও রেকর্ড প্লেয়ারের নমুনা

১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে স্টেরিও রেকর্ড পদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়। উল্লেখ্য,  ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত অধিকাংশ বাণিজ্যিক রেকর্ডে মোনোফোনিক পদ্ধতিতে একটি মাত্র অডিও চ্যানেলে শব্দ ধারণ করা হতো। পরবর্তীকালে একই খাঁজে দুইটি পৃথক শব্দ-চ্যানেল ধারণের প্রযুক্তি উদ্ভাবনের চেষ্টা শুরু হয়। এই গবেষণার ফলস্বরূপ এতে বাম ও ডান দুটি স্বতন্ত্র চ্যানেলে শব্দ ধারণ করা সম্ভব হওয়ায় সংগীতের শব্দের বাস্তবধর্মিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর কোম্পানিটির নাম পুনরায় পরিবর্তন করে
The Gramophone Company of India Limited রাখা হয়।

১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের
EMI (Electric & Musical Industries)-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোম্পানিটির সাংগঠনিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয় এবং এটি EMI গোষ্ঠীর অধীনে ভারতের রেকর্ড ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকে।

১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের
RPG Group কোম্পানিটি EMI-এর কাছ থেকে অধিগ্রহণ করে। এর ফলে ভারতের অন্যতম প্রাচীন রেকর্ড কোম্পানিটি ভারতীয় মালিকানাধীন শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর
The Gramophone Company of India Limited-এর নাম পরিবর্তন করে Saregama India Limited রাখা হয়। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি Saregama ব্র্যান্ডনামে সংগীত, চলচ্চিত্র, ডিজিটাল অডিও এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক সামগ্রী প্রকাশ ও বিপণন করে আসছে।  

১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর পুনরায় এর নাম হয় “The Gramophone Company of India Limited”
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে EMI । নামে কোম্পানি হিসেবে বৈধতা পায়।
১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের RPG Group । এই কোম্পানির অধিকার ইএমআই-এর কাছ থেকে ক্রয় করে।
২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর এই কোম্পানির নামকরণ করা হয় 'সারেগামা'।

আধুনিক যুগ বিশ শতকের শেষভাগে কমপ্যাক্ট ক্যাসেট, কমপ্যাক্ট ডিস্ক (CD) এবং পরবর্তীকালে ডিজিটাল অডিও প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে গ্রামোফোন রেকর্ডের বাণিজ্যিক গুরুত্ব দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে।

একবিংশ শতাব্দীতে
MP3, ইন্টারনেটভিত্তিক সংগীত বিতরণ এবং অনলাইন স্ট্রিমিং সেবার ব্যাপক প্রসারের ফলে রেকর্ড ও গ্রামোফোনের ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমানে গ্রামোফোন রেকর্ড আর সংগীত শোনার প্রধান মাধ্যম নয়; বরং এটি সংগ্রাহক, গবেষক এবং সংগীতপ্রেমীদের কাছে একটি ঐতিহাসিক ও নান্দনিক নিদর্শন হিসেবে বিশেষ মূল্য বহন করে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সীমিত পরিসরে ভিনাইল রেকর্ডের পুনরুজ্জীবন ঘটলেও, আধুনিক সংগীত বিতরণের প্রধান মাধ্যম এখন সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর।