|
রেকর্ডে ও রেকর্ড কোম্পানির বর্ণানুক্রমিক তালিকা |
![]() |
![]() |
বার্লিনারের প্রথম দিকের ডিস্ক রেকর্ডগুলোর ব্যাস ছিল প্রায় ৫ ইঞ্চি এবং এগুলো শক্ত রাবার দিয়ে নির্মিত হতো। যদিও এগুলো মূলত পরীক্ষামূলক ছিল, তবু এই প্রযুক্তিই পরবর্তী গ্রামোফোন শিল্পের ভিত্তি স্থাপন করে। পরবর্তীকালে শেলাক-নির্মিত ৭, ১০ ও ১২ ইঞ্চি ডিস্ক রেকর্ডের মাধ্যমে এই প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করে।
১৮৮৮ ও ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনার তাঁর গ্রামোফোনের নকশা ও রেকর্ড তৈরির পদ্ধতির আরও উন্নয়ন করেন। এই সময় তিনি বিভিন্ন উপাদান নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান এবং রেকর্ড তৈরির জন্য অধিক উপযোগী পদার্থ নির্বাচন করার চেষ্টা করেন। একই সময়ে ডিস্কের ছাঁচ (প্রস্তুত এবং সেখান থেকে একাধিক প্রতিলিপি তৈরির কৌশলও উন্নত করা হয়। এই প্রযুক্তিই পরবর্তীকালে গ্রামোফোন শিল্পের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনার প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করেন। এই রেকর্ডগুলোর ব্যাস ছিল ৫ ইঞ্চি এবং এগুলো শক্ত রাবার দিয়ে তৈরি হতো। রেকর্ডগুলো একটি থালার উপর স্থাপন করে হাতল ঘুরিয়ে বাজাতে হতো। সে সময় এগুলোর শব্দমান সীমিত হলেও একই রেকর্ড বহু সংখ্যায় প্রস্তুত করা সম্ভব হওয়ায় এগুলোর উৎপাদন ব্যয় সিলিন্ডার রেকর্ডের তুলনায় অনেক কম ছিল। অপরদিকে এডিসনের মোমের সিলিন্ডারে ধারণকৃত শব্দের মান তুলনামূলকভাবে উন্নত হলেও প্রতিটি সিলিন্ডার আলাদাভাবে তৈরি করতে হতো। ফলে সেগুলোর উৎপাদন ব্যয় বেশি ছিল এবং ব্যাপক বাজার সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছিল না।
১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দের পর থেকে বার্লিনার শক্ত রাবারের
পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়বহুল উপাদান ব্যবহারের উপায় অনুসন্ধান করতে থাকেন।
এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে শেলাক-ভিত্তিক যৌগিক পদার্থ
(Shellac Compound)
ব্যবহারের সূচনা হয়, যা পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী ৭৮ আরপিএম রেকর্ড তৈরির প্রধান
উপাদানে পরিণত হয়।
এদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফোনোগ্রাফ শিল্পও দ্রুত বিস্তার লাভ করছিল। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে এডওয়ার্ড ডি. ইস্টন
(Edward D. Easton)
ও তাঁর সহযোগীরা প্রতিষ্ঠা করেন
Columbia Phonograph Company। শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি ওয়াশিংটন ডিসি, মেরিল্যান্ড এবং ডেলাওয়্যার অঞ্চলে এডিসনের ফোনোগ্রাফ ও সিলিন্ডার রেকর্ডের একচেটিয়া পরিবেশক হিসেবে কাজ করত। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠান নিজস্ব রেকর্ড নির্মাণ ও বাজারজাতকরণে প্রবেশ করে এবং বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান রেকর্ড কোম্পানিতে পরিণত হয়।
[দ্রষ্টব্য:
কলাম্বিয়া রেকর্ড
]
১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনার
গ্রামোফোন
কোম্পানি তাঁদের রেকর্ড বাজারজাত করা শুরু হয়। তখন এই রেকর্ডের ব্যাস ছিল ৫
ইঞ্চি (১৩ সেন্টিমিটার)। প্রথমদিকে এই রেকর্ডগুলো একটি
বাদনযন্ত্রের থালার উপরে স্থাপন করে
হাতল ঘুর্ণন গতি দেওয়া হতো। আর এর উপরে পিন সমন্বিত বাদন
অংশ দ্বারা রেকর্ড থেকে শব্দ শ্রবণযোগ্য করে তোলা হতো। মূলত এটি
ছিল যান্ত্রিক বাদন প্রক্রিয়াগত খেলনা সামগ্রীর মতো। পরে
এরা এই যন্ত্রটির শব্দধারণ
প্রক্রিয়াটিকে আরও কম ব্যয়বহুল করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। একই
সাথে বাদন-প্রক্রিয়ার উন্নয়ন করেছিল। একই রেকর্ডের অনেকগুলো কপি তৈরি করা
ব্যবস্থারও উন্নয়ন ঘটেছিল।
১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে এমিল বার্লিনার ওয়াশিংটন ডিসিতে ডিস্ক রেকর্ডের বিপণনের জন্য
United States Gramophone Company
প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর গ্রামোফোন ও ডিস্ক রেকর্ডের বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ শুরু হয়। একই সময়ে গ্রামোফোন যন্ত্রের নির্মাণ, রেকর্ড প্রস্তুত এবং বাজারজাতকরণের জন্য পৃথক ব্যবসায়িক কাঠামো গড়ে ওঠে।
|
|
|
১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত বার্লিনারের গ্রামোফোন রেকর্ড |
১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দে
United States Gramophone Company-এর তত্ত্বাবধানে প্রথম বাণিজ্যিক ৭ ইঞ্চি গ্রামোফোন রেকর্ড বাজারে আসে। এসব রেকর্ডের উপর
E. BERLINER GRAMOPHONE
লেখা লেবেল মুদ্রিত থাকত। এই সময় থেকে শক্ত রাবারের পরিবর্তে শেলাক, স্লেটের গুঁড়ো, চুনাপাথরের গুঁড়ো ও অন্যান্য উপাদানের মিশ্রণে তৈরি রেকর্ডের ব্যবহার শুরু হয়। বাংলায় এগুলো পরবর্তীকালে 'মাটির রেকর্ড' নামে পরিচিতি লাভ করে। এই রেকর্ডগুলোর আদর্শিক ঘূর্ণনগতি ছিল প্রায় ৭০
RPM।
একই সময়ে Columbia Phonograph Company এডিসন ও
North American Phonograph Company-এর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব রেকর্ড নির্মাণ ও বাজারজাতকরণের দিকে অগ্রসর হয়। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান রেকর্ড নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৮৯৫ ও ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন প্রযুক্তির দ্রুত উন্নয়ন ঘটে। ডিস্ক রেকর্ড তৈরির ছাঁচ
(metal stamper) উন্নত হওয়ায় একই মূল রেকর্ড থেকে বিপুল সংখ্যক প্রতিলিপি অল্প ব্যয়ে উৎপাদন করা সম্ভব হয়। এই প্রযুক্তিগত সুবিধার ফলে ডিস্ক রেকর্ড সিলিন্ডার রেকর্ডের তুলনায় অধিক বাণিজ্যিক সাফল্য অর্জন করতে শুরু করে।
১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ব্যবসায়ী
William Barry Owen এমিল বার্লিনারের সহযোগিতায় লন্ডনে
The Gramophone Company প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গ্রামোফোন যন্ত্র ও ডিস্ক রেকর্ডের উৎপাদন ও বিপণন দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। পরবর্তীকালে এই প্রতিষ্ঠানই
His Master's Voice (HMV)
লেবেলের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতি
অর্জন করে।
১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন রেকর্ড ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিয়মিতভাবে বাজারজাত হতে শুরু করে। একই সময়ে ফ্রান্স, জার্মানি এবং রাশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে স্থানীয় ভাষায় সংগীত ও বক্তৃতা রেকর্ড করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর ফলে রেকর্ড কেবল বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক পণ্যে পরিণত হতে শুরু করে।
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে বার্লিনারের গ্রামোফোন কোম্পানি প্রথম ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। পূর্ববর্তী ৭ ইঞ্চি রেকর্ডের তুলনায় এতে অধিক সময়ের শব্দ ধারণ করা সম্ভব হয় এবং এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
একই বছরে তিনি ফোনোগ্রাফের আরো একটি উন্নত সংস্করণ বাজারে আনেন, যার
বিক্রয়মূল্য ছিল মাত্র ৭.৫০ ডলার। এরপর
এডিসন ব্যাপক হারে
ফোনোগ্রাফ তৈরি করতে শুরু করেন।
এই বছরেই বার্লিনারের গ্রামোফোন কোম্পানি প্রথম ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। বড় আকারের এই রেকর্ডে পূর্ববর্তী ৭ ইঞ্চি রেকর্ডের তুলনায় বেশি সময়ের শব্দ ধারণ করা সম্ভব হয় এবং এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। একই সময়ে এডিসন
Concert Phonograph বাজারে আনেন। এতে ৫ ইঞ্চি ব্যাসের বৃহৎ সিলিন্ডার ব্যবহার করা হতো এবং শব্দমানও উন্নত ছিল। তবে যন্ত্রটির মূল্য তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় এটি সাধারণ বাজারে বিশেষ সাফল্য লাভ করতে পারেনি।
১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ
উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে গ্রামোফোন প্রযুক্তি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করলে রেকর্ড শিল্পে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব ঘটে। ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে যুক্তরাজ্যের
The Gramophone Company
টাইপরাইটার ব্যবসায়ও প্রবেশ করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির নাম পরিবর্তন করে
The Gramophone & Typewriter Ltd. (G&T)
রাখা হয়। যদিও নামের সঙ্গে টাইপরাইটার যুক্ত হয়েছিল, তবু গ্রামোফোন যন্ত্র ও
ডিস্ক রেকর্ড নির্মাণই ছিল এর প্রধান ব্যবসা। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমিল
বার্লিনারের গ্রামোফোন ব্যবসা পেটেন্ট-সংক্রান্ত জটিলতায় পড়ে। এর ফলে তাঁর
মার্কিন কার্যক্রমের পুনর্গঠন শুরু হয়।
গ্রামোফোন যন্ত্র নির্মাতা
Eldridge R. Johnson
১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে Victor Talking
Machine Company প্রতিষ্ঠা করেন।
প্রথমদিকে Columbia Phonograph
Company-এর সঙ্গে পেটেন্ট-সংক্রান্ত
বিরোধ থাকলেও পরে তা মীমাংসিত হয়। এরপর
Victor Talking Machine Company
ডিস্ক রেকর্ড এবং গ্রামোফোন যন্ত্রের অন্যতম প্রধান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানে পরিণত
হয়। একই বছর
কলাম্বিয়া রেকর্ড
কোম্পানি সিলিন্ডার রেকর্ডের পাশাপাশি ডিস্ক
রেকর্ডও বাজারজাত করা শুরু করে। এর ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডিস্ক রেকর্ডের
জনপ্রিয়তা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং সিলিন্ডার রেকর্ডের একচেটিয়া অবস্থান ক্রমশ
দুর্বল হয়ে পড়ে।
এই সময়ে American Graphophone
Company-এর অধীনে গ্রাফোফোন প্রযুক্তিরও
উন্নয়ন অব্যাহত থাকে। ভোল্টা ল্যাবরেটরির গবেষণার উত্তরাধিকার বহনকারী এই
প্রতিষ্ঠান উন্নতমানের মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড উৎপাদন করলেও বাজারে ডিস্ক রেকর্ডের
ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে থাকে।
১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে ১০ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ডের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এই রেকর্ডে সাধারণত প্রায় ৩ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা সম্ভব হতো। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ১২ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারে আসে। বড় আকারের এই রেকর্ডে সাধারণত ৪ থেকে ৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা যেত। দীর্ঘ বাদনক্ষমতার কারণে শাস্ত্রীয় সংগীত, অপেরা এবং দীর্ঘ বক্তৃতা রেকর্ড করার ক্ষেত্রে ১২ ইঞ্চি রেকর্ড বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। এই বছর Columbia Phonograph Company উন্নত মানের বাদামি মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড
(Brown Wax XP Records)
বাজারজাত করে। শক্ত মোমের এই রেকর্ডগুলো পূর্ববর্তী মোমের সিলিন্ডারের তুলনায় অধিক টেকসই ছিল এবং শব্দের মানও উন্নত ছিল।
একই বছরের মধ্যভাগে যুক্তরাজ্যের
Nicole Frères Ltd. নিজস্ব উদ্যোগে ডিস্ক রেকর্ড নির্মাণ ও বাজারজাতকরণ শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি পরবর্তীকালে উচ্চমানের রেকর্ড নির্মাণ এবং বিভিন্ন দেশের জন্য রেকর্ড উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
![]() |
|
এডিশন-বেল-এর চোঙাকৃতির রেকর্ডের জন্য আঁকা মূল ছবি |
১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত বাণিজ্যচিহ্ন
His Master's Voice (HMV)-এর বাণিজ্যিক ব্যবহার। এই চিত্রকর্মটি অঙ্কন করেছিলেন ইংরেজ শিল্পী
Francis Barraud। ছবিতে একটি কুকুরকে একটি গ্রামোফোনের চোঙার দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। কুকুরটির নাম ছিল
Nipper।
উল্লেখ্য,
Nipper-এর জন্ম হয় ১৮৮৪ খ্রিষ্টাব্দে। এর প্রথম মালিক ছিলেন মঞ্চসজ্জা শিল্পী
Mark Henry Barraud। ১৮৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর কুকুরটির দায়িত্ব নেন তাঁর ভাই Francis Barraud। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে
নিপার মারা যায় এবং ইংল্যান্ডের
Kingston upon Thames-এ তাকে সমাহিত করা হয়।
ভাইয়ের মৃত্যুর পর স্মৃতিচারণ হিসেবে
Francis Barraud ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দে একটি চিত্রকর্ম অঙ্কন করেন, যেখানে
নিপার-কে একটি
Edison Bell
ফোনোগ্রাফের সামনে বসে শব্দ শুনতে দেখা যায়। ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি
Dog Looking at and Listening to a Phonograph নামে এই চিত্রকর্মের স্বত্ব নিবন্ধনের আবেদন করেন। পরে তিনি ছবিটি
Edison Bell কোম্পানির কাছে বিক্রয়ের চেষ্টা করলে প্রতিষ্ঠানটির এক কর্মকর্তা মন্তব্য করেন,
"Dogs don't listen to phonographs." ফলে প্রতিষ্ঠানটি ছবিটি গ্রহণ করেনি।
এরপর
Francis Barraud
ছবিটি গ্রামোফোন-এর কাছে উপস্থাপন করেন। কোম্পানির পরামর্শে ফোনোগ্রাফের পরিবর্তে একটি
Berliner Gramophone অঙ্কন করা হয় এবং ছবিটির নতুন নামকরণ করা হয়
His Master's Voice।
গ্রামোফোন ছবিটির স্বত্ব ক্রয় করে এবং এটি তাদের বাণিজ্যচিহ্ন হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।
একই সময়ে
Victor Talking Machine Company-এর প্রতিষ্ঠাতা
Eldridge R. Johnson মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এই চিত্রটির বাণিজ্যিক ব্যবহারের অধিকার লাভ করেন। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে
Victor Talking Machine Company তাদের রেকর্ড, গ্রামোফোন যন্ত্র এবং বিজ্ঞাপনে His Master's Voice চিত্রটি ব্যবহার করতে শুরু করে। পরবর্তীকালে এই প্রতীকটি বিশ্বের সর্বাধিক পরিচিত রেকর্ড-বাণিজ্যচিহ্নে পরিণত হয় এবং
HMV নামেও আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে।
১৯০৩ থেকে ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। এই সময়ে ডিস্ক রেকর্ড প্রযুক্তি সিলিন্ডার রেকর্ডের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী থেকে ধীরে ধীরে প্রধান শব্দধারণ মাধ্যমে পরিণত হতে শুরু করে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান উন্নত মানের গ্রামোফোন যন্ত্র, বৃহত্তর আকারের ডিস্ক রেকর্ড এবং উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি প্রবর্তনের মাধ্যমে রেকর্ড শিল্পকে নতুন পর্যায়ে উন্নীত করে।
১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে
The Gramophone & Typewriter Ltd. ১২ ইঞ্চি ব্যাসের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। এর আগে ৭ ও ১০ ইঞ্চি রেকর্ড প্রচলিত থাকলেও ১২ ইঞ্চি রেকর্ডে অধিক সময়ের শব্দ ধারণ করা সম্ভব হওয়ায় এটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। সাধারণত ১০ ইঞ্চি রেকর্ডে প্রায় ৩ মিনিট এবং ১২ ইঞ্চি রেকর্ডে ৪–৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা যেত। দীর্ঘ বাদনসময়ের কারণে অপেরা, শাস্ত্রীয় সংগীত এবং দীর্ঘ বক্তৃতা রেকর্ড করার ক্ষেত্রে ১২ ইঞ্চি রেকর্ড বিশেষভাবে উপযোগী হয়ে ওঠে।
একই সময়ে
Victor Talking Machine Company মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ডিস্ক রেকর্ড ও গ্রামোফোন যন্ত্র নির্মাণে দ্রুত অগ্রসর হয়। উন্নত শব্দমান, নির্ভরযোগ্য যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং কার্যকর বিপণন কৌশলের ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন বাজারে অন্যতম প্রধান রেকর্ড প্রস্তুতকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
অন্যদিকে
Columbia Phonograph Company নতুন ধরনের কালো মোমের সিলিন্ডার রেকর্ড বাজারজাত করে। উন্নত শব্দমান ও অধিক স্থায়িত্বের কারণে এই রেকর্ডগুলো দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড শিল্পে
Columbia Phonograph Company, National Phonograph Company (Edison) এবং
Victor Talking Machine Company—এই তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রধান নির্মাতা ও বিপণনকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ডিস্ক রেকর্ডের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি ক্রমে সিলিন্ডার প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনে।
ইউরোপেও এই সময় রেকর্ড শিল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে।
Carl Lindström Company ফোনোগ্রাফ ও সিলিন্ডার রেকর্ড নির্মাণের পাশাপাশি ডিস্ক রেকর্ড উৎপাদন শুরু করে। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিষ্ঠান ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ রেকর্ড প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার রেকর্ড শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। এই সময় নতুন নতুন রেকর্ড নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব, উন্নত উপকরণের ব্যবহার এবং বৃহৎ আকারের ডিস্ক রেকর্ডের প্রচলনের মাধ্যমে গ্রামোফোন শিল্প আরও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে।
৩ জুলাই ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডনে
The Nicole Record Co. Ltd. প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় স্থাপিত হয় ১৪৭-১৫০
Great Saffron Hill, London-এ। একই বছরের আগস্ট মাসে তারা
Nicole Record নামে প্রথম ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। প্রথম পর্যায়ে প্রায় ১৫০টি এক-পার্শ্বীয় ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এসব রেকর্ড লালচে-বাদামি ল্যাকার-প্রলেপযুক্ত কার্ডবোর্ড দিয়ে তৈরি ছিল। এই বিশেষ রেকর্ড নির্মাণপদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন কোম্পানির পরিচালক
George Henry Burt এবং
Carl Kroeger।
১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে কলম্বিয়া রেকর্ড নিউইয়র্কের
Metropolitan Opera-এর একাধিক খ্যাতিমান শিল্পীর কণ্ঠ রেকর্ড আকারে প্রকাশ করে। এর ফলে অপেরা সংগীত সাধারণ শ্রোতাদের কাছেও সহজলভ্য হয়ে ওঠে। তবে শব্দ পুনরুৎপাদনের মানের বিচারে সে সময়
কলম্বিয়া রেকর্ড-র অনেক রেকর্ড Victor Talking Machine Company, যুক্তরাজ্যের
গ্রামোফোন এবং ইতালির Fonotipia Records-এর উৎকৃষ্ট রেকর্ডগুলোর তুলনায় কিছুটা নিম্নমানের বলে বিবেচিত হতো।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে
এডিসন তাঁর উন্নত সিলিন্ডার রেকর্ডের নাম
Gold Moulded Records রাখেন। এর আগে এগুলোর নাম ছিল
New High Speed Hard Wax Moulded Records। এই প্রযুক্তিতে ধাতব ছাঁচ ব্যবহার করে একটি মূল রেকর্ড থেকে প্রায় ১২০-১৫০টি সিলিন্ডার প্রতিলিপি তৈরি করা সম্ভব হতো। ফলে সিলিন্ডার রেকর্ডের উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং প্রতিটি রেকর্ডের মূল্য প্রায় ৩৫ সেন্টে নেমে আসে।
এই সময়ে সিলিন্ডার রেকর্ডে শক্ত মোম ব্যবহারের ফলে রেকর্ডের স্থায়িত্ব বৃদ্ধি পায় এবং বারবার বাজালেও ক্ষয় তুলনামূলকভাবে কম হতো। তবু উৎপাদন ব্যয়, সংরক্ষণের অসুবিধা এবং ডিস্ক রেকর্ডের তুলনায় সীমিত বাণিজ্যিক সুবিধার কারণে সিলিন্ডার প্রযুক্তি ক্রমে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে থাকে।
এই বছর ১২ ইঞ্চি ব্যাসের গ্রামোফোন ডিস্ক রেকর্ডের বাণিজ্যিক প্রচলন আরও বিস্তৃত হয়। বৃহৎ আকারের এই রেকর্ডে সাধারণত ৪ থেকে ৫ মিনিট পর্যন্ত শব্দ ধারণ করা সম্ভব হতো। দীর্ঘ বাদনসময়ের কারণে অপেরা, শাস্ত্রীয় সংগীত এবং দীর্ঘ বক্তৃতা প্রকাশের ক্ষেত্রে ১২ ইঞ্চি রেকর্ড বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং পরবর্তী কয়েক দশক ধরে এটি রেকর্ড শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডে পরিণত হয়।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে ইউরোপীয় রেকর্ড কোম্পানিগুলো এশিয়া, বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। একই সময়ে ইতালিতে উচ্চমানের শাস্ত্রীয় সংগীত প্রকাশের জন্য নতুন রেকর্ড কোম্পানির আবির্ভাব ঘটে এবং ভারতেও দেশীয় উদ্যোগে রেকর্ড ব্যবসার সূচনা হয়।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে জন ওয়াটসন হড
The Nicole Record Co. Ltd.-এর পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি The Gramophone & Typewriter Ltd.-এর কলকাতা শাখার প্রথম ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লন্ডনে ফিরে যান এবং পরবর্তী বছর
Nicole Record Company-তে যোগ দেন।
Nicole Record Company-র পরিচালক হওয়ার পর ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে জন ওয়াটসন হড ভারতীয় উপমহাদেশে রেকর্ড ব্যবসার সম্ভাবনা যাচাই করার উদ্দেশ্যে ভারতে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন আমেরিকান গায়ক ও
Nicole Record-এর রেকর্ডিং বিশেষজ্ঞ
Stephen Carl Porter। এই সফরের মাধ্যমে ভারতীয় বাজারে
Nicole Record-এর কার্যক্রম সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
একই সময়ে কলকাতার ব্যবসায়ী মানিকলাল সাহা ভারতে
Nicole Frères Ltd.-এর প্রথম এজেন্ট নিযুক্ত হন।
একই বছর ইতালির মিলানে Fonotipia Company প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি
Fonotipia Records নামে উচ্চমানের ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশ শুরু করে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ইউরোপের প্রখ্যাত অপেরা শিল্পী, শাস্ত্রীয় সংগীতশিল্পী এবং বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশের মাধ্যমে
Fonotipia আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে উৎকৃষ্ট শব্দমানের জন্য
Fonotipia Records বিশেষভাবে সমাদৃত ছিল।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার সুপরিচিত বাদ্যযন্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান
Dwarkin & Son-এর প্রতিষ্ঠাতা দ্বারকানাথ ঘোষ রেকর্ড ব্যবসায়ও প্রবেশ করেন। প্রতিষ্ঠানটি গ্রামোফোন যন্ত্রের বিক্রয়, রেকর্ড বিপণন এবং ভারতীয় সংগীতের প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরবর্তী সময়ে
Dwarkin & Son ভারতীয় উপমহাদেশে গ্রামোফোন শিল্পের অন্যতম প্রধান দেশীয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়।
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ ডিস্ক রেকর্ডের আন্তর্জাতিক বাজার সুসংহত রূপ লাভ করে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ প্রধান রেকর্ড কোম্পানি ১০ ও ১২ ইঞ্চি ডিস্ক রেকর্ডকে তাদের প্রধান বাণিজ্যিক মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। একই সময়ে বিভিন্ন ভাষার সংগীত, নাট্যাংশ, বক্তৃতা এবং বাদ্যযন্ত্রের পরিবেশনা রেকর্ড আকারে প্রকাশিত হতে থাকে। এর ফলে রেকর্ড শিল্প কেবল একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক সংগীত ও বিনোদন শিল্পের অন্যতম প্রধান ভিত্তিতে পরিণত হয়।
ফেব্রুয়ারি মাসে The Nicole Record Co. Ltd.-এর পরিচালক John Watson Hawd কলকাতায় তাঁর দায়িত্ব শেষ করে লন্ডনে ফিরে যান। তবে তাঁর সহযোগী আমেরিকান গায়ক ও রেকর্ডিং বিশেষজ্ঞ
Stephen Carl Porter ভারতে থেকে রেকর্ডিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ জুড়ে তিনি বাংলা, হিন্দি, গুজরাটি, তামিল, তেলুগুসহ বিভিন্ন ভারতীয় ভাষার গান, আবৃত্তি ও কথ্যধারার প্রায় ৭০০টি রেকর্ড ধারণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বার্মা (বর্তমান মিয়ানমার)-এ গিয়ে রেকর্ডিং পরিচালনা করেন এবং সেখান থেকে লন্ডন হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর এই রেকর্ডিং কার্যক্রম ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাথমিক শব্দসংরক্ষণের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়।
ভারতে Nicole Record-এর কার্যক্রমকে স্থায়ী রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ২০ সেপ্টেম্বর ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতায়
Nicole Frères (India) Ltd. প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক
Adolf Muhlberg কলকাতায় এসে ২/১-২/৩
Corporation Street-এ কোম্পানির কার্যালয় স্থাপন করেন। উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় শিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায়
নিকোল রেকর্ডের ব্যবসা সম্প্রসারণ।
তবে প্রতিষ্ঠার অল্পদিনের মধ্যেই কোম্পানির অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ ও প্রশাসনিক সমস্যার কারণে ভারতে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। একই সময়ে কোম্পানির প্রধান অংশীদার প্রতিষ্ঠানটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে এর প্রধান কার্যক্রম ইংল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের
Stockport-এ স্থানান্তরিত করে। ফলে ভারতীয় বাজারে
নিকোল রেকর্ডের-এর সম্ভাবনাময় সূচনা বিনষ্ট হয়।
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ আরও ত্বরান্বিত হয়। ইউরোপের বিভিন্ন রেকর্ড কোম্পানি এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য উপনিবেশে তাদের ব্যবসা বিস্তারের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এই সময় দ্বিপার্শ্বিক ডিস্ক রেকর্ডের ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ডিস্ক রেকর্ডের চাহিদা আরও সুসংহত হয়।
এই সময় নিকোল রেকর্ড-এর ইংল্যান্ডের মূল প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়ে এবং তাদের কার্যক্রম পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়। কোম্পানির পরিচালক
John Watson Hawd প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ স্বত্ব অধিগ্রহণ করে উত্তর ইংল্যান্ডের
Stockport-এ রেকর্ড উৎপাদন কার্যক্রম স্থানান্তর করেন। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩ মার্চ তিনি Adolf Muhlberg-এর সহযোগিতায়
Watson Hawd & Co. প্রতিষ্ঠা করেন। নতুন প্রতিষ্ঠানের কারখানা ছিল
Wellington Mills, Wellington Road, Stockport-এ। ১৯ জুন থেকে এই কারখানায় Nicole Frères-এর জন্য রেকর্ড উৎপাদন শুরু হয় এবং সেখান থেকে বিভিন্ন দেশে, বিশেষত ভারতীয় বাজারে
নিকোল রেকর্ড রপ্তানি করা হতে থাকে।
নিকোল রেকর্ডের
-এর ইতিহাসেও এই বছর একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটে। প্রথমদিকে প্রতিষ্ঠানটি এক-পার্শ্বীয় ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশ করত, যার ওপর রূপালি রঙের কালিতে সরাসরি রেকর্ডের তথ্য মুদ্রিত থাকত। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ তারা দ্বিপার্শ্বীয়- ডিস্ক রেকর্ড প্রকাশ শুরু করে। এই নতুন রেকর্ডে লাল কাগজের ওপর কালো কালিতে মুদ্রিত লেবেল সংযোজন করা হতো, যা পরবর্তী সময়ে তাদের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়।
একই সময়ে জার্মানির Beka Record
(বেকা
রেকর্ড) আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়ায় কার্যক্রম শুরু করে। কোম্পানির প্রতিনিধি
Ernest Low ভারতীয় উপমহাদেশে এসে বোম্বেতে রেকর্ডিং কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে
বেক রেকর্ড ইউরোপের বাইরে নিজস্ব শিল্পী ও স্থানীয় সংগীত সংগ্রহের উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং আন্তর্জাতিক রেকর্ড ব্যবসায় নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে সক্ষম হয়।
এই সময় বিশ্ব রেকর্ড শিল্পে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
Victor Talking Machine Company, Columbia Phonograph Company, The Gramophone & Typewriter Ltd., Nicole Record, Beka Record এবং
Fonotipia নিজ নিজ বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শিল্পীদের রেকর্ড প্রকাশে বিশেষ গুরুত্ব দিতে থাকে। এর ফলে রেকর্ড শিল্প ধীরে ধীরে একটি বৈশ্বিক বিনোদন ও সাংস্কৃতিক শিল্পে পরিণত হয়।
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে
রয়্যাল রেকর্ড
নামে নিজস্ব রেকর্ড
প্রকাশ করেন। এর এক পিঠে গান রেকর্ড করা হতো। দাম ছিল দুই টাকা। এর কারখানা ছিল
কলকাতার ৩ ক্রিক রো।
দাম ছিল দুই টাকা।
![]() |
|
১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের একটি গ্রামোফোন-বাদন যন্ত্রর |
এই বছরে দক্ষিণ ভারতে নিকোল রেকর্ডের প্রধান পাইকারি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এম.তারা এন্ড কোং। এদের অফিস ছিল মাদ্রাজের ৫ ব্রডওয়ে এবং ১৮৬ এসপ্লানেড। পশ্চিম ভারতের নিকোল রেকর্ডের একটি শাখা অফিস খোলে বোম্বাইয়ের ৩৭ পারসি বাজার স্ট্রিটে। তখন বার্মার রেকর্ড বিক্রয় নিয়ন্ত্রণ হতো কলকাতা থেকে। ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই কোম্পানি ভারতে প্রায় ৬০০ রেকর্ড বাজারে ছাড়তে সক্ষম হয়েছিল। এই রেকর্ডের ভিতরে ছিল বাংলা, হিন্দি, তামিল, তেলেগু গুজরাটি ভাষার গান এবং যন্ত্রসঙ্গীত। এছাড়া কোরান তেলাওয়াত ও সংস্কৃত মন্ত্র রেকর্ড প্রকাশ করেছিল।
এই বছরে
জন ওয়াটসন হড
ধীরে ধীরে তাঁর কোম্পানির মাধ্যমে বিভিন্ন ছোট ছোট রেকর্ড কোম্পানির রেকর্ড
প্রকাশের সাথে যুক্ত হয়ে যান।
এই বছরে প্রতিষ্ঠিত দ্যা ব্রিটিশ সোনোগ্রাম
কোম্পানি লিমিটেড এবং হডের কোম্পানি একীভূত হয় এবং ডিস্ক রেকর্ড কোম্পানির রেকর্ড
তৈরিতে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। ব্রিটিশ সোনোগ্রাম কোম্পানির
১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দ
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে শেলাকের পরিবর্তে অপেক্ষাকৃত নমনীয় প্লাস্টিকজাতীয় উপাদানে রেকর্ড তৈরির বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়। এই সময় জার্মানির
Phonycord এবং ব্রিটেনের Filmophone ও Goodson কোম্পানি নমনীয় প্লাস্টিকের ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত করে। এসব রেকর্ডের প্রধান সুবিধা ছিল ওজনে হালকা, ভাঙার ঝুঁকি কম এবং উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হওয়া। কিন্তু শব্দমান, স্থায়িত্ব এবং প্রচলিত গ্রামোফোন যন্ত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যের সীমাবদ্ধতার কারণে এগুলোর কোনোটিই দীর্ঘমেয়াদে বাজারে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারেনি। পরবর্তীকালে পলিভিনাইল ক্লোরাইড (PVC) বা ভিনাইল-নির্মিত রেকর্ডের আবির্ভাবের ফলে নমনীয় প্লাস্টিক রেকর্ডের এই প্রাথমিক পরীক্ষামূলক উদ্যোগগুলো ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়।
![]() |
|
১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে সহজবহনযোগ্য ৭৮আরপিএম-এর রেকর্ড-সহ গ্রামোফোন যন্ত্রের নমুনা |
![]() |
| একটি আধুনিক গ্রামোফোন রেকর্ড ও রেকর্ড প্লেয়ারের নমুনা |
১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে স্টেরিও রেকর্ড
পদ্ধতি বাণিজ্যিকভাবে চালু হয়। উল্লেখ্য,
১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের পূর্ব পর্যন্ত অধিকাংশ বাণিজ্যিক রেকর্ডে
মোনোফোনিক পদ্ধতিতে একটি মাত্র অডিও চ্যানেলে শব্দ
ধারণ করা হতো। পরবর্তীকালে একই খাঁজে দুইটি পৃথক শব্দ-চ্যানেল ধারণের প্রযুক্তি
উদ্ভাবনের চেষ্টা শুরু হয়। এই গবেষণার ফলস্বরূপ এতে বাম ও ডান দুটি স্বতন্ত্র চ্যানেলে শব্দ ধারণ
করা সম্ভব হওয়ায় সংগীতের শব্দের বাস্তবধর্মিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর কোম্পানিটির নাম পুনরায় পরিবর্তন করে
The Gramophone Company of India Limited রাখা হয়।
১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের EMI (Electric & Musical Industries)-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কোম্পানিটির সাংগঠনিক অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয় এবং এটি
EMI গোষ্ঠীর অধীনে ভারতের রেকর্ড ব্যবসা পরিচালনা করতে থাকে।
১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের RPG Group কোম্পানিটি EMI-এর কাছ থেকে অধিগ্রহণ করে। এর ফলে ভারতের অন্যতম প্রাচীন রেকর্ড কোম্পানিটি ভারতীয় মালিকানাধীন শিল্পগোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।
২০০০ খ্রিষ্টাব্দের ৩ সেপ্টেম্বর The Gramophone Company of India Limited-এর নাম পরিবর্তন করে
Saregama India Limited রাখা হয়। এরপর থেকে প্রতিষ্ঠানটি
Saregama ব্র্যান্ডনামে সংগীত, চলচ্চিত্র, ডিজিটাল অডিও এবং অন্যান্য বিনোদনমূলক সামগ্রী প্রকাশ ও বিপণন করে আসছে।