ভারতবর্ষে রেকর্ড প্রচলনের ইতিহাস
ভারতবর্ষে গ্রামোফোন রেকর্ডের প্রচলন উনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে শুরু হয় এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তা দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই ইতিহাসে কলকাতা ছিল প্রধান কেন্দ্র।
রেকর্ডের সূচনাপর্ব: রেকর্ডের সূচনাপর্ব শুরু হয়েছিল ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ইউরোপে একই ধ্বনি বার বার বাদনের যন্ত্রের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন, ইংরেজ বিজ্ঞানী থমাস ইয়ং। এই যন্ত্রটি এখনো প্রচলিত সুরেলা কাঁটা
(tuning
forks) নামে।
১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ং এই যন্ত্রটি প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন ধ্বনির কম্পাঙ্ক বিষয়ক গবেষণার জন্য।
১৮৫৩ থাকে ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের উপযোগী যান্ত্রিক কৌশল প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন ফরাসি বিজ্ঞানী
Édouard-Léon Scott de Martinvillee
।
এর নাম ছিল
ফোনোটোগ্রাফ। এই যন্ত্রে শব্দের কম্পাঙ্ক কাগজের উপর অঙ্কিত হতো। কিন্তু বাজিয়ে
শোনানোর ব্যবস্থা ছিল না। ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে শব্দধারণ ও বাদন কৌশল আবিষ্কার করেন
ফরাসি ফরাসি কবি চার্লস ক্রোস (Charles
Cros)। তিনি মুদ্রণশিল্পে ব্যবহৃত আলোকচিত্র খোদিত প্রক্রিয়া অনুসরণে এই
যন্ত্রটি আবিষ্কার করেছিলেন ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে।
কিন্তু যন্ত্রের নানা ত্রুটি থাকার কারণে কালক্রমে হারিয়ে গিয়েছিল। এরই উন্নত রূপ
দান করেছিলেন
এডিসন। নাম দিয়েছিলেন
ফোনোগ্রাফ।
১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারিতে এই
আবিষ্কারের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পেটেন্ড লাভ করেন। তিনি টিনের পাতলা
পাতের উপর শব্দ ধারণ করে, তা বাজানোর পদ্ধতির উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন।
১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে ওয়াশিংটন ডিসিতে ফনোগ্রাফ নিয়ে টেলিফোন যন্ত্রের আবিষ্কারক গ্রাহাম বেল এবং তাঁর দুই সহযোগী মিলে গবেষণা শুরু করেন। এঁরা পাতলা টিনের পাতে শব্দ ধারণের পরিবরতে মোমের প্রলেপ লাগানো কাগজের পাতে শব্দধারণ করার প্রক্রিয়া উদ্ভাবন করেন। নতুন এই যন্ত্রের বাজারজাত করার জন্য এঁরা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভোল্টা গ্রামোফোন কোম্পানি। আর এই বছরেই স্যামুয়েল হ্যারাডন নামক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন নাগরিক, একটি নিম্নমানের গ্রামোফোন যন্ত্র সাথে করে কলকাতা আসেন। তিনি কলকাতা টাউন হলে 'মহামেডান লিটারেরি সোসাইটির বার্ষিক সম্মেলনে এই যন্ত্রটি প্রদর্শন করেন। এরপর ১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজের অধ্যাপক ফাদার লাফোঁ একটি ফনোগ্রাফ কলকাতায় আনেন। অধ্যাপক ফাদার লাফোঁর প্রিয় শিষ্য জগদীশচন্দ্র বসু এই যন্ত্র নিয়ে গবেষণা করেন।
১৮৮৭ এমিল বার্লিনার (Emile
Berliner)
নতুন ধরনের একটি যন্ত্র হাজির করলেন। তিনি এই যন্ত্রটির নাম দেন
গ্রামোফোন।
তিনি সিলিণ্ডারের পরিবর্তে সমতল ও গোলাকার ডিস্ক ব্যবহার করেন। ডিস্কে স্পাইরাল
ট্রাকের প্রবর্তন করেন তিনি। এছাড়া একটি মাস্টার ডিস্ক থেকে একাধিক কপি করার
পদ্ধতিও তিনি প্রবর্তন করেন। এর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল চাকতি বা ডিস্কের শব্দধারণের
যুগ।
১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের
সিডি আবিষ্কারের
পূরবকাল পর্ন্ত, গ্রামোফোন কোম্পানির এই প্রক্রিয়াটি সফলভাবে সচল ছিল।
এরপর রেকর্ড ব্যবসায়ে ইউরোপ আমেরিকার বহু ব্যবসায়ী অর্থ লগ্নি শুরু করে।
প্রতিযোগিতামূলক ব্যবসায়ের সূত্রে ধীরে ধীরে রেকর্ড শিল্পের ব্যাপক উন্নতি ঘটে।
১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের দিকে
প্রেসিডেন্সি কলেজের পরীক্ষাগারে জন্য একটি ফনোগ্রাফ যন্ত্র আনার ব্যবস্থা করা
হয়। গগনেন্দ্রনাথ
ঠাকুরের বাড়িতে
খামখেয়ালী সভার
প্রথম অধিবেশন হয় ২৪ মাঘ ১৩০৩ বঙ্গাব্দে [শুক্রবার ৫ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দ]।
এই সভায় ফনোগ্রাফ যন্ত্রে গান ও কবিতা শ্রবণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর অর্থ হলো
১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে ঠাকুর বাড়িতে ফনোগ্রাফের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এইভাবে
বঙ্গদেশের মানুষ ফনোগ্রাফ এবং গ্রামোফোন নামক যন্ত্রের সাথে পরিচিত হয়ে
উঠেছিল।
১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দে রেকর্ড বিশেষজ্ঞ ফ্রেডরিক উইলিয়াম গেইসবার্গ লণ্ডনে অবস্থানরত
কিছু ভারতীয়দের দিয়ে ৪৪টি শ্রবণ নমুনা রেকর্ডে ধারণ করেছিলেন। এর ভিতরে ছিল হিন্দি,
আরবি, ফার্সি, উর্দু, পাঞ্জাবি ভাষার গান ও আবৃত্তি। গানের তালিকায় ছিল রামায়ণ,
হোলি। আবৃত্তি নমুনায় ছিল হাফিজ ও মির্জা গালিবের কবিতা, গুরু নানকের দোঁহা,
কোরান শরিফ থেকে তেলাওয়াত। শিল্পীদের নাম তালিকায় পাওয়া যায় ক্যাপ্টেন ভোলানাথ,
হরনাম দাস এবং আহমেদ। উল্লেখ্য এই রেকর্ডগুলোর এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায় নাই।
তবে
গ্রামোফোন কোম্পানির রেকর্ড তালিকায় এসব রেকর্ডের নাম পাওয়া যায়।
১৯০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে হেমেন্দ্রমোহন বসু একটি 'এডিসন
ফোনোগ্রাফ' কিনেছিলেন। এরপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু
বন্ধু এবং সে কালের বিখ্যাত কিছু শিল্পীর গান মোমের সিলিন্ডার রেকর্ডবন্দী করা শুরু
করেছিলেন। হেমেন্দ্রমোহনের সেই সব বন্ধুদের মধ্যে ছিলেন তাঁর মামা জগদীশচন্দ্র বসু,
প্রফুল্লচন্দ্র রায়, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়
প্রমুখ। সাউন্ড রেকর্ডিং-এর প্রতি হেমেন্দ্রমোহনের আগ্রহ তাঁকে প্রভাবিত করেছিল
ফোনোগ্রাফ ও সিলিন্ডার রেকর্ডের ব্যবসায় আসতে।
ইতিমধ্যে গ্রামোফোন কোম্পানি
রেকর্ড ব্যবসার উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, রাশিয়া-সহ কিছু দেশে
কণ্ঠসঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীত রেকর্ডে ধারণ ও বিক্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছিল। এরই
ধারাবহিকতায় ভারতীয় গানের রেকর্ড বাজারজাত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে তারা।
১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে
গ্রামোফোন
কোম্পানি রেকর্ডের বাজার অনুসন্ধানে জন ওয়াটসন হডকে ভারতে পাঠায়। ওয়াটসন কলকাতা,
মাদ্রাজ, বোম্বে ও দিল্লি ভ্রমণ করেন এবং রেকর্ড বাণিজ্যের বিপুল সম্ভাবনা দেখতে
পান। ভারতীয় ভাষায় গান এবং আবৃত্তি প্রকাশের ভারতে রেকর্ড ব্যবস্থা চালু করার জন্য
কোম্পানির পক্ষে কলকাতায় একটি অফিস খোলেন- ৬/১, চৌরঙ্গি রোডে।
এই কোম্পানির নাম ছিল-
The Gramophone & Typewriter Ltd.
(দ্যা গ্রামোফোন অ্যান্ড টাইপরাইটার
লিমিটেড)। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে এই অফিস স্থানান্তরিত হয় ৮/২, ডালহৌসি স্কোয়ারে।
এই সূত্রে
ভারতীয় সঙ্গীতের রেকর্ডের জন্য উপযুক্ত লোক পাঠানোর সুপারিশ করেন। এই অনুরোধে
কোম্পানি ভারতীয় সঙ্গীত ও আবৃত্তির রেকর্ডের অভিজ্ঞাতা আছে, এই বিবেচনায়
গেইসবার্গের নেতৃত্বে একটি রেকর্ড কর্মীকে পাঠান। ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ অক্টোবর
গেইসবার্গ তাঁর দলবল নিয়ে কলকাতায় পৌঁছান। এর ফলে ভারতে বাণিজ্যিক রেকর্ড শিল্পের সূচনা হয়। পরে এই প্রতিষ্ঠানই
HMV (His Master's Voice)
এবং পরবর্তীকালে
Saregama নামে পরিচিত হয়।
গেইসবার্গ প্রথমে রেকর্ডিং ব্যবস্থা স্থাপন করার পর
W.S. Burk
এর একটি ইংরেজি
গান রেকর্ড করেন। এরপর তিনি স্থানীয় শিল্পীদের গান রেকর্ড করার
উদ্যোগ নেন। যথার্থ শিল্পী খোঁজার চেষ্টা করে তিনি উপযুক্ত শিল্পীর সন্ধান পানি নি।
পরে তৎকালীন প্রখ্যাত অভিনেতা অমরেন্দ্রনাথ দত্তের সহায়তায় ক্লাসিক থিয়েটারের দুই নর্তকী-গায়িকা মিস শশীমুখী ও মিস ফণিবালানিকে
গান গাওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়। পরীক্ষামূলকভাবে এঁদের গান রেকর্ড করার জন্য, কলকাতার একটি হোটেলে দু'টি ঘর ভাড়া করা হয়। ১৯০২
খ্রিষ্টাব্দের ৮ নভেম্বর- গেইসবার্গ প্রথম বাংলা গান রেকর্ড করালেন শশীমুখীর কণ্ঠে।
গানটি ছিল কীর্তন- 'আমি কি সজনি কুসুমেরি'। শশীমুখীর গানের রেকর্ড নম্বর ছিল-
13024 (Matrix no. E1001)।
অপর একটি গান
গেয়েছিলেন মিস্ ফণীবালা। এঁর গাওয়া গানটির হদিস পাওয়া যায় নি। এই সূত্রে রেকর্ডের
বাংলা গানের প্রথম শিল্পী হিসেবে মিস্ শশীমুখী এবং মিস্ ফণীবালা স্মরণীয়া হয়ে
রয়েছেন। তবে এই গানে
গেইসবার্গ সন্তুষ্ট হতে পারেন নি। এরপর তিনি
আরও ভালো কণ্ঠের শিল্পীদের খুঁজতে থাকেন।
এর দুই দিন পর, তৎকালিন ক্ল্যাসিকাল থিয়েটারের সহায়তায় গেইসবার্গ
আরও কিছু শিল্পীর গান রেকর্ড করেন। এঁদের গানেও গেইসবার্গ সন্তুষ্ট হতে পারেন নি।
এরপর তিনি ১১ই নভেম্বর গহরজানের গান রেকর্ড করেন। এ ছাড়া এই দিনে
রেকর্ড করেছিলেন শৈল বাঈ। তবে গহরজানের গান শুনে গেইসবার্গ মুগ্ধ হন। তিনি গেয়েছিলেন
দাদরা অঙ্গের একটি হিন্দি গান। গানটির শিরোনাম হিসেবে উল্লেখ ছিল
'Mahomedan
Song'। তাঁর
কণ্ঠে রেকর্ডকৃত প্রথম বাংলা গান ছিল 'ভালবাসিবে বলে ভালোবাসিনে।' এরপর তিনি
গহরজানের কণ্ঠে আরও কয়েকটি গানের রেকর্ড করেন। এই রেকর্ডে শিল্পী নিজের নাম উল্লেখ
করেছিলেন- "My name is Gauhar Jan!"
এই নাম বলা হয়েছিল রেকর্ডের শেষে। জার্মানিতে রেকর্ড প্রেস করা গানের শিল্পীর পরিচয়
পাওয়ার জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
এরপর কয়েকদিনে তিনি রেকর্ড করেন আরও
কিছু শিল্পীর গান রেকর্ড করেন। এই শিল্পীরা ছিলেন হরিমতি. সুশীলা, বিনোদিনী, কিরণ,
রাণী প্রমুখ। এছাড়া তিনি রেকর্ড করেছিলেন ক্ল্যাসিক থিয়েটার ও করিনথিয়ান থিয়েটার
বৃন্দবাদন।
১৯০০ খ্রিষ্টাব্ কুন্তলীন কেশ তেল এবং সুগন্ধী প্রস্তুতকারক
হেমেন্দ্রনাথ বসু একটি ফোনোগ্রাফ যন্ত্র কেনেন। এই সূত্রে
তাঁর ভিতরে এই যন্ত্রের ব্যবসার বাসনা জেগে উঠে। ইতিমধ্যে আমেরিকা, ইংল্যন্ড, ইতালি, ফ্রান্স,
জার্মানি রাশিয়া ইত্যাদি দেশে যখন সঙ্গীতের রেকর্ডের চাহিদা ক্রমেই বেড়ে চলেছিল,
সেই সময় ভারতীয় শিল্পীদের গানের চাহিদা বুঝে হেমেন্দ্রনাথ বসু কলকাতাস্থ 'ধর্মতলার
মার্বেল হাউসে দ্য টকিং মেশিন হল (The
Talking Machine Hall) নামে
রেকর্ড তৈরির
কারখানা স্থাপন করেন। এই রেকর্ড ছিল
ফনোগ্রামের সিলিন্ডার। পরে বৌবাজার স্ট্রীটের দেলখোস হাউসে এই কারখানা স্থানান্তরিত হয়।
তাঁর রেকর্ড কোম্পানির নাম ছিল এইচ.বোসেস।
১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দের
দিকে ফ্রান্সের প্যাথেফোন কোম্পানির সঙ্গে হেমেন্দ্রমোহনের বাণিজ্যিক যোগাযোগ হয়।
এরপর ৪১ নম্বর ধর্মতলা স্ট্রিটের, মার্বল হাউসে শুরু হয় সিলিন্ডার রেকর্ড ও
ফোনোগ্রাফের ব্যবসা। সেই দোকানের নাম ছিল ‘টকিং মেশিন হল’। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে
হেমেন্দ্রমোহন শুরু করেছিলেন তাঁর নিজস্ব রেকর্ডের প্রতিষ্ঠান ‘এইচ বোসেস রেকর্ড’।
সে সময়ে সংবাদপত্রে ‘এইচ বোসেস রেকর্ড’-এর বিজ্ঞাপন প্রচারিত হতো। সেই সময় এই
কোম্পানির শিল্পীদের তালিকায় ছিলেন স্টার থিয়েটারের
নরী সুন্দরী, বসন্তকুমারী কিংবা
কাশীবাবু। শুরুর দিকে, শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং
দ্বিজেন্দ্রলাল
রায়। এছাড়া এই কোম্পানির শিল্পী তালিকায় ছিলেন ভারতীয় ধ্রুপদী সঙ্গীত শিল্পীরা। এঁরা
ছিলেন ওস্তাদ রমজান খান, মেটিয়াবুরুজের পিয়ারা সাহেব ও
লালচাঁদ বড়াল।
১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের
ডিসেম্বর মাসে
বেকা কোম্পানির পরিচালক
Ernest lowe
-এর নেতৃত্বে ভারতে আসেন ভারতীয় শিল্পীদের গানের রেকর্ড করার জন্য। এবারের
অভিযাত্রায় এঁরা রেকর্ড করেন বোম্বাই, লক্ষ্ণৌ, বেনারস এবং কলকাতায়। এরপর এইও দলটি
রেঙ্গুন, ব্যাঙ্কক ও সিঙ্গাপুরে রেকর্ড করার জন্য চলে যান। এই সময়ে রেকর্ডগুলো
বাজারজাত করেছিল 'দ্য টকিং মেশিন এবং ইন্ডিয়ান রেকর্ড কোম্পানি এই সময়ে এদের
কেন্দ্রীয় অফিস ছিল বোম্বেতে। আর শাখা অফিস ছিল কলকাতা, দিল্লী, মাদ্রাজ এবং
রেঙ্গুন।ভারতে গ্রামোফোন কোম্পানি লিমিটেড তাদের রেকর্ড বাজারজাত করার
আগে, তিন ধরনের রেকর্ড প্রকাশ করতো তিনটি পরিচিতিতে। এগুলো ছিল-
-
Gramophone record
। ৭ ইঞ্চি
-
Gramophone Concert Record
।
১০ ইঞ্চি
-
Gramophone Concert Record
। ১২ ইঞ্চি
গ্রামোফোন কোম্পানির
রেকর্ডের জন্য শব্দে গ্রহণ করা হতো কলকাতায়।
এই তিন ধরনের কালোবর্ণের
রেকর্ড ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তৈরি হতো জার্মানীর
হ্যানোভার থেকে।
এসব রেকর্ডে এক পিঠে গান থাকতো। অপর পিঠ থাকতো ফাঁকা। ১৯০৭
খ্রিষ্টাব্দের ডিসেম্বর পর্যন্ত এ সকল রেকর্ডে থাকতো 'রেকর্ডি পরীর' ছোটো
মনোগ্রাম। এসকল রেকর্ড বাজারজাত করতো- গ্রামোফোন এন্ড টাইপরাইটার লিমিটেড।
জার্মানের
হ্যানোভারে মুদ্রিত হতো বলে প্রচুর সময় ও অর্থ ব্যয় হতো।
এই অসুবিধা দূরীকরণে ১৯০৭
খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন কোম্পানি কলকাতার বেলেঘাটায় গ্রামোফোন ডিস্ক রেকর্ড উৎপাদনের
কারখানা স্থাপন করে। এর ফলে ভারতবর্ষে গ্রামোফোন কোম্পানি রেকর্ডের বাজার দ্রুত
সম্প্রসারিত হয়। গ্রামোফোন কোম্পানির বাণিজ্যের প্রসার দেখে ভারতে আরও নানা
কোম্পানি রেকর্ড ব্যবসার জন্য আসে। ফলে সিলিন্ডার রেকর্ডের চাহিদা কমে যেতে
থাকে। এই অবস্থায় হেমেন্দ্রনাথ প্যাথে কোম্পানির সহায়তায় ডিস্ক রেকর্ড বাজারজাত
করার উদ্যোগ নেন।
কিন্তু
১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের শুরুর দিকে এই রেকর্ড প্রকাশের বিষয়টি চলে যায় গ্রামোফোন রেকর্ড
কোম্পানি লিমিটেডের অধীনে। সে সময় এ সকল রেকর্ডে লেখা থাকতো 'মেড ইন জার্মানি'।
১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে
২৩ মে
গ্রামোফোন
কোম্পানি কলকাতার শিয়ালদহের ১৩৯ বেলেঘাটা সড়কে অফিস খোলে। এখানেই রেকর্ড উৎপাদনের জন্য
কারখানা স্থাপিত হয়। ১৮ ডিসেম্বর প্রথম এই কারখানা থেকে রেকর্ড মুদ্রিত হয়েছিল।
এসকল রেকর্ডে তৈরির স্থানের নাম হিসেবে থাকতো- 'মেড ইন
ক্যালকাটা'। কলকাতা থেকে রেকর্ড প্রকাশের ফলে রেকর্ডের মূল্যও কমে যায়। ফলে
ভারতে রেকর্ড ব্যবসার একটি সুবর্ণ ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং ভারতে সিলিণ্ডার রেকর্ডের
ব্যবসা দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে সিলিণ্ডার গ্রামোফোন রেকর্ডে
উৎপাদনের ধারায় ব্যবসায় টিকে থাকতে না পেরে প্রথম বিলুপ্ত ঘটে
প্যাথেফোন
রেকোর্ড কোম্পানির।
১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাসে
Gramophone record
(৭ ইঞ্চি),
Gramophone Concert Record
(১০ ইঞ্চি)
এবং Gramophone Concert Record
(১২ ইঞ্চি)
রেকর্ড কলকাতার কারখানা থেকে উৎপাদিত শুরু করে। এই সময় থেকে রেকর্ড লেবেলে 'পরী' বা
কুকুরের ছবি মুদ্রিত হতো।
১৯১২-১৩ খ্রিষ্টাব্দ এক পাশে মুদ্রিত রেকর্ডগুলো দ্বিপার্শিক রেকর্ড হিসেবে
পুনঃমূদ্রিত হতো। এই সময় জনপ্রিয় রেকর্ডগুলোর রঙ ছিল বেগুনি। এসকল রেকর্ডের
দাম ছিল ৩ রুপি ১২ আনা। যেখানে সাধারণ কালো রঙের রেকর্ডের দাম ছিল ৩ রুপি। পরে বহু
জনপ্রিয় গান বেগুনি রেকর্ডে মুদ্রিত হয়েছিল।
এত সব প্রতিযোগীদের ভিতরে
গ্রামোফোন
কোম্পানি ভারতে
তার জায়গা ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে
গ্রামোফোন
রেকর্ড কোম্পানি তাদের রেকর্ডকে 'হিজ মাস্টার্স ভয়েস'
লেবেলে বাজারজাত করা শুরু করে।
১৯২৮
খ্রিষ্টাব্দে 'টুইন রেকর্ড কোম্পানি লিমিটেড' প্রথম ভারতের রেকর্ড বাজারজাত করা শুরু
করে। এটি গ্রামোফোন রেকর্ডের সহযোগী রেকর্ড কোম্পানি হিসেবে ইংল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত
হয়েছিল। কিন্তু ভারতে এরা স্বাধীন কোম্পানি হিসেবে রেকর্ড বাজারজাত করতো। এদের ছিল
স্বতন্ত্র বিপণন ব্যবস্থা। ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দে এই রেকর্ড কোম্পানির প্রকাশিত প্রথম
রেকর্ড ছিল-
-
ওলো আয় জলকে যাবি [নৃত্য সংবলিত, জংলা]
-
এসে হেসে কেন চলে যাও [ঠুংরি]
শিল্পী: গোবিন্দরানি রাই
রেকর্ড নম্বর: FH 41
১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে গ্রামোফোন কম্পানি ৩৩, যশোর রোড, দমদম-এ
স্থানান্তরিত হয়।
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে জার্মানি থেকে সাউন্ড রেকর্ডিং নিয়ে লেখাপড়া শেষ করে চণ্ডীচরণ
সাহা। তিনি ৬/১ অক্রুর দত্ত লেন- স্বদেশী রেকর্ড কোম্পানি 'হিন্দুস্থান মিউজিক্যাল
প্রোডাক্টস লিমিটেড' স্থাপন করেন। এখান থেকে প্রকাশিত রেকর্ডের নাম ছিল 'হিন্দুস্থান
রেকর্ড'। আগষ্ট মাসে রবীন্দ্রনাথের স্বকণ্ঠে গান এবং আবৃত্তি দিয়ে কোম্পানির প্রথম রেকর্ডিং
শুরু হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের গানটি ছিল-
- তবু মনে রেখো (গান)
- আমি যখন মতো হব
(আবৃত্তি)
রেকর্ড নম্বর: H1
১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে জিতেন্দ্রনাথ ঘোষ প্রতিষ্ঠিত আরেক স্বদেশি রেকর্ড কোম্পানি ‘মেগাফোন রেকর্ড’
আত্মপ্রকাশ করে। এঁরা যাত্রা শুরু করেছিল কাজী নজরুল ইসলাম রচিত দুটি গান দিয়ে।
গান দুটি ছিল-
- লক্ষ্মী মা তুই ওঠগো
আবার [লক্ষ্মী বন্দনা]
শিল্পী: ধীরেন দাস
কথা ও সুর: নজরুল ইসলাম
- জয় বাণী
বিদ্যাদায়িনী [সরস্বতী বন্দনা]
শিল্পী: ধীরেন দাস
কথা: নজরুল ইসলাম
সুর: ধীরেন দাস
১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে ভারতে কলাম্বিয়া কোম্পানির মালিকানা লাভ
করেছিল কলকাতার স্থানীয় বাঙালি মালিক। এর পরিচালনায় ছিলেন নৃপন মজুমদার। তাঁর উদ্যোগে
ভারতীয় কলাম্বিয়া রেকর্ড কোম্পানি হিস মাস্টার ভয়েস -এর প্রবল
প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠে। এই বছরের এপ্রিল মাসে এই কোম্পানি থেকে প্রথম বাংলা গান
প্রকাশিত হয়। এই রেকর্ডের দুটি গান ছিল-
- আবার ফাগুন এসেছে
ফিরে
- মলয়া! শোন রে তোরে
বলি
শিল্পী: শ্রীমতী স্নেহলতা দেবী
কথা ও সুর: হীরেন বসু
রেকর্ড নম্বর: GE 2001
কলকাতার ১৮৩ ধর্মতলা স্ট্রিটে 'সেনোলা
মিউজিক্যাল প্রডাক্টাস' নাম একটি বাণিজ্যক প্রতিষ্ঠান গ্রামোফোন যন্ত্র এবং নানা
কোম্পানির রেকর্ড বিক্রয় করতো। ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রতিষ্ঠান নিজেদের লেবেলে
রেকর্ড প্রকাশ করা শুরু করে। এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা ও পরিকল্পনাকারী ছিলেন
বিভূতিভূষণ সাহা। এই কোম্পানির রেকর্ড সেনোলা নামে বাজারজাত হতো।
১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে এই কোম্পানি থেকে প্রূথম রেকরড
প্রকাশিত হয়। প্রকাশিত গান দুটি ছিল-
- আমার বাংলা মায়ের
বাণী
- (ওগো) আমার সোনার
হিন্দুস্থান
শিল্পী: আশা রায়
কথা ও সুর: সুরবন্ধু মজুমদার
রেকর্ড নম্বর: QS 1
১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দে
'পাইওনিয়ার রেকর্ডর্স এন্ড মিউজিক্যাল
ভ্যারাইটিস'-নামক একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এই রেকর্ড প্রকাশ করেছিল।
এদের প্রকাশিত রেকর্ডের নাম ছিল- পাইওনিয়ার রেকর্ড। ১৯৩৬
খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবর মাস এদের প্রথম রেকর্ড প্রকাশিত হয়।
প্রকাশিত গান দুটি ছিল-
-
তোমার গানের শুরু এবার
শিল্পী: সুশীল চক্রবর্তী
কথা: হাসিরাশি দেবী
- পরান আমার কাঁদে যদি
শিল্পী:
সুশীল চক্রবর্তী
কথা: দুর্গেশ দত্ত
রেকর্ড নম্বর: NQ 1
১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দ
প্রতিষ্ঠিত হয়- ভারত রেকর্ডস। এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এদের প্রথম প্রকাশিত হয় হয়।
এই রেকর্ডের দুটি গান ছিল-
- ফাগুন দক্ষিণ বায়
শিল্পী:
রমা নন্দী
কথা: তড়িৎ কুমার ঘোষ
সুর: সন্তোষ সেনগুপ্ত
- কোথায় পথের শুরু
শিল্পী:
রমা নন্দী
কথা: সুধীন্দ্র নিয়োগী
সুর: সন্তোষ সেনগুপ্ত
রেকর্ড নম্বর: SC 1
১৯৩৭-৩৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে 'রিগ্যাল
রেকর্ড' লেবেলে কিছুদিন রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল। এসব কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে
কলম্বিয়া রেকর্ডের বাজার অনেকটাই দখল করে নিতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত
হিস মাস্টার ভয়েস -এর কৌশলে
এই কোম্পানি তাদের অংশভাগী হয়ে গিয়েছিল। ১৯৩৮ খ্রিষ্টাব্দে জুলাই মাসে এদের প্রথম
রেকর্ড প্রকাশিত হয়। এই রেকর্ডের গানগুলো ছিল-
- অচিন দেশের পাখি
শিল্পী:
সুকুমার ভট্টাচার্য
কথা: বিজয় মাধব মণ্ডল
সুর: গোকুল মুখোপাধ্যায়
- দুঃখের আলো
জ্বলুক পথে
শিল্পী:
সুকুমার ভট্টাচার্য
কথা: রমেন চৌধুরী
সুর: গোকুল মুখোপাধ্যায়
রেকর্ড নম্বর:
RL 1001
১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দ প্রতিষ্ঠিত হয়- ইকোটোন রেকর্ড
কোম্পানি। এই বছরের শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল এদের প্রথম রেকর্ড।
- পঞ্চবটীর ভগবান
ডাকরে মন রামকৃষ্ণ বলে
- শিল্পী:
বিশ্বনাথ মৈত্র
কথা: যুগলকিশোর দাস
সুর: বিশ্বনাথ মৈত্র
পরিচালনা: সুখময় গাঙ্গুলী
রেকর্ড নম্বর: ECT 1
১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ প্রতিষ্ঠিত হয়- ভারতী রেকর্ড কোম্পানি। এদের রেকের্ডের নাম ছিল-
ভারতী রেকর্ড। এই রেকর্ডে প্রকাশিত গান দুটি ছিল-
- কাছে ছিলে যবে
প্রাণ চায় চক্ষু না চায়
শিল্পী:
সমর গুপ্ত
কথা ও সুর: রবীন্দনাথ ঠাকুর
পরিচালনা: শৈলেশ ভড়
রেকর্ড নম্বর: BRT 101
এইচএমভি রেকর্ড লেবেল
- এন সিরিজরিজ
১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের আগষ্ট মাসে এইচএমভির এন সিরিজের রেকর্ড
প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। এর নম্বর ছিল- এন ৩৬৩৭। কিন্তু এই নম্বর প্রদানে
কোনো ধারাবাহিক রীতি অনুসৃত হয় নি। রেকর্ডে লেবেলে ধারাবাহিক সংখ্যা নির্ধরাণ
করা শুরু হয়েছিল ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দের মে মাস থেকে। এই ধারার প্রথম নম্বর ছিল এন
৪১৯৯। এই রেকর্ডের রঙ ছিল সবুজ। ১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্ন্ত এই সবুজ রঙের
রেকর্ডও বাজারজাত করা হয়েছিল। এর পর বাদামী-ধূসর (plum color) বর্ণের রেকর্ড
বাজার জাত করা হয়। এই সিরিজটি ১৯৪৪ খ্রিষ্টাব্দের শেষার্ধ পর্যন্ত প্রচলিত ছিল।
রেকর্ড লেবেল:
এন-৯৭৮১
সূত্র:
- Country Music
Records: A Discography, 1921-1942/ Tony Russell/Oxford 2004
-
Michael S. Kinnear.The Record
News January 1991