ভাষা
language

ভাষাভাষা হলো দুই বা ততোধিক সত্তার মধ্যে তথ্য, ভাব, অনুভূতি, নির্দেশ, সংকেত বা অন্য কোনো অর্থবহ বার্তা আদান-প্রদানের জন্য ব্যবহৃত একটি নিয়মবদ্ধ যোগাযোগব্যবস্থা।

অর্থাৎ ভাষা কেবল মানুষের মুখে উচ্চারিত শব্দের সমষ্টি নয়; এটি দুই বা ততোধিক সত্তার মধ্যে যোগাযোগের একটি নিয়মবদ্ধ মাধ্যম। এই সত্তাগুলো মানুষ হতে পারে, হতে পারে অন্য কোনো প্রাণী, আবার হতে পারে যন্ত্র বা কম্পিউটারও। আমরা অভ্যাসবশত মানুষের ভাষাকেই "ভাষা" বলে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে থাকি; কিন্তু একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে প্রশ্ন জাগে—গাভীর ডাকে বাছুর যে মায়ের কাছে ছুটে আসে, সেই ডাককে ভাষা বলতে বাধা কোথায়? কিংবা মানুষ ও কম্পিউটারের মধ্যে যে সুনির্দিষ্ট সংকেতের আদান-প্রদান ঘটে, তাকে কি ভাষা বলা যাবে না? 

প্রথাগত ব্যাকরণের সীমানা অতিক্রম করে ভাষাকে যদি যোগাযোগের একটি সার্বিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে মানুষের মুখের ভাষার বাইরেও অসংখ্য ভাষা আমাদের চারপাশে বিচরণ করছে। আমরা সেগুলোর সাহায্য নিচ্ছি, ব্যবহার করছি, বিশ্লেষণ করছি—কখনও সচেতনভাবে, কখনও অচেতনেই।

প্রথাগত ব্যাকরণের সীমানা অতিক্রম করে ভাষাকে যদি যোগাযোগের একটি সার্বিক ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে দেখা যাবে মানুষের মুখের ভাষার বাইরেও অসংখ্য ভাষা আমাদের চারপাশে বিচরণ করছে। আমরা সেগুলোর সাহায্য নিচ্ছি, ব্যবহার করছি, বিশ্লেষণ করছি- কখনও সচেতনভাবে, কখনও অচেতনেই।

কম্পিউটারের কথাই ধরা যাক। অসংখ্য লজিক গেটের সমন্বয়ে গঠিত এই যন্ত্র মানুষের প্রদত্ত নির্দেশ পালন করে। সেই নির্দেশও একটি সুনির্দিষ্ট ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কম্পিউটারের সর্বপ্রাথমিক ভাষা হলো যান্ত্রিকত্কভাষা। এই ভাষার নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের মাধ্যমেই মানুষ জটিলতম গণনা থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্ময়কর কাজ পর্যন্ত সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছে। এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে ভাষা কেবল মুখনিঃসৃত ধ্বনির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; নিয়মবদ্ধ সংকেতের মাধ্যমে অর্থ আদান-প্রদান সম্ভব হলেই সেখানে ভাষার উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যায়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে ভাষার পরিধি আরও বিস্তৃত হয়ে ওঠে। নৃত্যের মুদ্রায় আবেগ ও কাহিনি প্রকাশ পায়, চোখের ইশারায় অনুচ্চারিত অনুভূতি বিনিময় হয়, বধিরদের সাংকেতিক ভাষায় জটিল ভাব প্রকাশিত হয়, আবার কম্পিউটার মানুষের নির্দেশ বুঝে নির্দিষ্ট কাজ সম্পাদন করে। এমনকি "প্রকৃতির ভাষা" বলেও আমরা একটি রূপক অভিব্যক্তি ব্যবহার করি, যখন মেঘ, নদী, ঋতু বা ফুলের মাধ্যমে কোনো অর্থ অনুভব করি। ভাষার সব রূপ অবশ্য এক প্রকৃতির নয়; কিছু বাস্তব যোগাযোগব্যবস্থা, কিছু রূপক প্রকাশ। তবু এরা সবাই আমাদের ভাষা-ধারণাকে আরও বিস্তৃত করে।

প্রচলিত ভাষাতত্ত্বে ভাষাকে সাধারণত মানুষের মুখনিঃসৃত অর্থবহ ধ্বনির নিয়মবদ্ধ ব্যবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এই সংজ্ঞার অন্যতম প্রবক্তা সুকুমার সেন। তিনি তাঁর ভাষার ইতিবৃত্ত গ্রন্থে লিখেছেন, "মানুষের উচ্চারিত, অর্থবহ বহুজনবোধ্য ধ্বনিসমষ্টিই ভাষা।" মানবভাষার আলোচনায় এই সংজ্ঞা যথার্থ ও কার্যকর। কিন্তু বিস্তৃত যোগাযোগতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এর কিছু সীমাবদ্ধতাও লক্ষ করা যায়। যদি উচ্চারিত ধ্বনিই ভাষার একমাত্র রূপ হয়, তবে অশোকের শিলালিপি, বধিরদের সাংকেতিক ভাষা কিংবা কম্পিউটারের যান্ত্রকভাষাকে ভাষার অন্তর্ভুক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। আবার নৃত্যের মুদ্রায় যে অর্থ ও অনুভূতির প্রকাশ ঘটে, তাকেও ভাষা বলা যাবে না—এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাও সহজ নয়।

এই কারণে ভাষাকে দুই স্তরে বিবেচনা করা অধিক যুক্তিযুক্ত। প্রথমটি সাধারণ অর্থে ভাষা, যা দুই বা ততোধিক সত্তার মধ্যে অর্থবহ তথ্য বা সংকেত আদান-প্রদানের যেকোনো নিয়মবদ্ধ ব্যবস্থা। দ্বিতীয়টি মানবভাষা, যা মানুষের মুখনিঃসৃত ধ্বনি, তার লিখিত রূপ এবং সেই ধ্বনি ও প্রতীকের ব্যবহারবিধির সমন্বয়ে গঠিত। ভাষাতত্ত্বে এই দ্বিতীয় অর্থই প্রধান আলোচ্য; তবে ভাষার সামগ্রিক ধারণা অনুধাবন করতে হলে প্রথম অর্থটিকেও উপেক্ষা করা যায় না।

ভাষার উৎপত্তি
মানুষের ভাষার সূচনা ঠিক কবে হয়েছিল, তা নির্দিষ্টভাবে নির্ণয় করা অত্যন্ত দুরূহ। ভাষার কথা বাদ দিলেও আধুনিক বিজ্ঞান এখনো মানুষের উৎপত্তির সুনির্দিষ্ট সময় ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ ও ক্রমবিবর্তন সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে মানুষের ভাষার ইতিহাস আলোচনা করতে হলে মানুষের জৈবিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের ধারাকেও বিবেচনায় নিতে হয়। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীতে জীবনের প্রাচীনতম নিদর্শন প্রায় ৩৫০–৩৮০ কোটি বছর আগের। নৃতত্ত্ববিদদের মতে, আধুনিক মানুষ
(Homo sapiens) প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকায় আবির্ভূত হয়। মরক্কোর জেবেল ইরহুদ (Jebel Irhoud) থেকে আবিষ্কৃত জীবাশ্ম এই ধারণাকে সমর্থন করে। এর আগে ইথিওপিয়ার ওমো কিবিশ (Omo Kibish) অঞ্চলের প্রায় দুই লক্ষ বছর পুরোনো জীবাশ্মকেই আধুনিক মানুষের প্রাচীনতম নিদর্শন বলে মনে করা হতো।

আদিম মানুষের মস্তিষ্কের গঠন আধুনিক মানুষের মতোই ছিল, তবে তাদের প্রযুক্তি, জ্ঞান ও সামাজিক সংগঠন তুলনামূলকভাবে প্রাথমিক স্তরের ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ থেকে জানা যায়, তারা দলবদ্ধভাবে বসবাস করত এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে জীবনধারণ করত। অনেক ভাষাবিজ্ঞানী ও নৃতত্ত্ববিদের মতে, এই সামাজিক জীবনধারা থেকেই তথ্য আদান-প্রদানের প্রয়োজন সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে ভাষার আদিম রূপের বিকাশ ঘটে।  

জীবের ক্রমবিবর্তনের ধারায় মানুষের ভাষার উৎপত্তিকে একটি নির্দিষ্ট দিন বা ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব নয়। যেমন মানুষের আবির্ভাবেরও কোনো নির্দিষ্ট "জন্মদিন" নির্ধারণ করা যায় না, তেমনি ভাষারও কোনো নির্দিষ্ট জন্মমুহূর্ত নির্দেশ করা সম্ভব নয়। ভাষা মানুষের জৈবিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তনের সঙ্গে ধীরে ধীরে বিকশিত হয়েছে।

ভাষার উৎপত্তি-সংক্রান্ত প্রধান মতবাদ
মানুষের ভাষার উৎপত্তি কীভাবে ঘটেছিল, সে বিষয়ে প্রাচীনকাল থেকে ভাষাবিজ্ঞানী, দার্শনিক, নৃতত্ত্ববিদ ও মনোবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মতবাদ উপস্থাপন করেছেন। তবে ভাষার উৎপত্তির কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকায় এসব মতবাদ মূলত অনুমাননির্ভর। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানও এখন পর্যন্ত ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে কোনো একক ও সর্বজনস্বীকৃত তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। নিচে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি মতবাদ সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো—
ভাষার আদিরূপ
বর্তমানে প্রচলিত সব ভাষার উৎপত্তি একটি মাত্র আদি ভাষা থেকে হয়েছে—এমন কোনো নিশ্চিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। আবার একাধিক স্বাধীন প্রাক্-ভাষা থেকে ভাষাগুলোর উৎপত্তি হয়েছে—এ কথাও নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়। মানব জাতির পূর্বপুরুষের বিভিন্ন প্রজাতি আফ্রিকা ও ইউরেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত ছিল। তবে আধুনিক মানুষের উৎপত্তি আফ্রিকাতেই ঘটেছে বলে অধিকাংশ গবেষক একমত।

মানুষ প্রকৃতিরই অংশ। দীর্ঘ জৈবিক ও সামাজিক বিবর্তনের ধারায় মানুষ ধীরে ধীরে এমন এক মানসিক সক্ষমতা অর্জন করে, যার মাধ্যমে সে ধ্বনির সাহায্যে প্রতীক সৃষ্টি এবং তা ব্যবহার করে ভাব প্রকাশ করতে সক্ষম হয়। এই প্রাথমিক যোগাযোগব্যবস্থাই ক্রমে শব্দ, বাক্য এবং ব্যাকরণে সমৃদ্ধ হয়ে পূর্ণাঙ্গ ভাষায় পরিণত হয়। তবে সেই আদি ভাষার কোনো প্রত্যক্ষ নিদর্শন আজ আর আমাদের কাছে নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, জীবাশ্ম, জিনগত গবেষণা এবং তুলনামূলক ভাষাবিজ্ঞানের সহায়তায় গবেষকেরা কেবল তার সম্ভাব্য রূপ সম্পর্কে ধারণা করার চেষ্টা করেন। তাই ভাষার উৎপত্তি আজও ভাষাবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব এবং জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্যতম জটিল ও অমীমাংসিত গবেষণাক্ষেত্র।

তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের মাধ্যমে ভাষাবিদেরা একই ভাষাপরিবারভুক্ত ভাষাসমূহের একটি পুনর্গঠিত আদি ভাষার অস্তিত্ব অনুমান করেন। এই কাল্পনিক পূর্বপুরুষ ভাষাকে প্রাক্-ভাষা (Proto-language) বলা হয়। এটি কোনো প্রত্যক্ষভাবে লিপিবদ্ধ ভাষা নয়; বরং বিভিন্ন উত্তরসূরি ভাষার তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে পুনর্গঠিত একটি ভাষাতাত্ত্বিক মডেল।  

ভাষার ক্রমবিবর্তন

পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অসংখ্য ভাষার প্রচলন রয়েছে। এই ভাষাবৈচিত্র্যের প্রধান কারণ ভাষার দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তন। তবে ভাষার সৃষ্টি ও বৈচিত্র্যের পেছনে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, জনবসতির স্থানান্তর, ভাষাসংস্পর্শ, সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং ভাষানীতিসহ বিভিন্ন কারণও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একটি ভাষার পরিবর্তন অল্প সময়ে সাধারণত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করা যায় না। কিন্তু কয়েক প্রজন্ম বা প্রায় একশো বছরের ব্যবধানে ভাষার ধ্বনি, শব্দভাণ্ডার, ব্যাকরণ ও উচ্চারণে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। সময়ের ব্যবধান যত বৃদ্ধি পায়, আদি ভাষা ও পরবর্তী রূপের পার্থক্যও তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

একই সময়ে দূরবর্তী দুটি অঞ্চলে একই ভাষার প্রচলন থাকলেও ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও যোগাযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে ভাষার ভিন্ন ভিন্ন রূপ গড়ে উঠতে পারে। এর একটি সুপরিচিত উদাহরণ ইংরেজি ভাষা। ব্রিটিশ ইংরেজি, আমেরিকান ইংরেজি, অস্ট্রেলীয় ইংরেজি, কানাডীয় ইংরেজি এবং অন্যান্য আঞ্চলিক ইংরেজিতে উচ্চারণ, শব্দভাণ্ডার, বানান ও কিছু ব্যাকরণগত পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তবে এগুলো এখনো একই ভাষার মান্য রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়।

মানবসভ্যতার প্রাচীন যুগে দূরবর্তী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের সুযোগ সীমিত ছিল। ফলে একই ভাষার বিভিন্ন উপভাষা ধীরে ধীরে পৃথক ভাষায় পরিণত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাপরিবারের ইন্দো-ইরানীয় শাখা থেকে ভারতীয় আর্যভাষা ও ইরানীয় ভাষাগুলোর পৃথক বিকাশ ঘটেছে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীতে পশ্চিম রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর কথ্য ল্যাটিন (Vulgar Latin) ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্রভাবে বিবর্তিত হতে থাকে। দীর্ঘকাল ধরে ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা ও সীমিত যোগাযোগের ফলে সেখান থেকে ইতালীয়, ফরাসি, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, রোমানীয়সহ বিভিন্ন রোমান্স ভাষার উদ্ভব ঘটে।

বর্তমান যুগে গণমাধ্যম, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে একই ভাষার বিভিন্ন উপভাষার মধ্যে পার্থক্য অনেক ক্ষেত্রে হ্রাস পাচ্ছে। রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদমাধ্যম, ইন্টারনেট এবং প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা একটি প্রমিত ভাষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ফলে বহু ক্ষেত্রে উপভাষার স্বতন্ত্র ভাষায় পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা কমে এসেছে। তবে এটিকে সম্পূর্ণ অসম্ভব বলা যায় না। ইতিহাসে যেমন নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে, তেমনি বর্তমানেও সামাজিক, রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কারণে কোনো কোনো উপভাষা পৃথক ভাষার মর্যাদা লাভ করতে পারে। আবার এর বিপরীত ঘটনাও ঘটছে—অনেক ছোট ভাষা প্রভাবশালী ভাষার চাপে ব্যবহার হারিয়ে বিলুপ্তির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। একটি ভাষার বিবর্তনে আঞ্চলিক পরিবেশ, ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, রাজনৈতিক পরিবর্তন, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাব, শিক্ষা, গণমাধ্যম এবং ভাষানীতি—সবকটিই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে একই প্রমিত ভাষার মধ্যেও বিভিন্ন আঞ্চলিক রূপের সৃষ্টি হয়। বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও এ ধরনের বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, পানি ও জল—উভয় শব্দই বাংলায় ‘water’ অর্থে ব্যবহৃত হয়।

পানি শব্দটি সংস্কৃত পানীয় থেকে উদ্ভূত এবং হিন্দিসহ উত্তর ভারতীয় বহু ভাষায় বহুল প্রচলিত। বাংলায় জল শব্দটি সংস্কৃত জল থেকে এসেছে। বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে পানি শব্দটি অধিক প্রচলিত হলেও বর্তমানে এটি ধর্মীয় পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন ব্যবহারে স্থান করে নিয়েছে। একইভাবে পশ্চিমবঙ্গে জল শব্দটি অধিক প্রচলিত হলেও পানি শব্দও ব্যবহৃত হয়।

বাংলাদেশে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্যের কারণে নামাজ, জায়নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত প্রভৃতি আরবি-ফারসি উৎসের শব্দ দৈনন্দিন ভাষায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে সংস্কৃত উৎসের কিছু শব্দ তুলনামূলকভাবে বেশি প্রচলিত। এ ধরনের পার্থক্য ভাষার আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে। কখনও কখনও দুটি ভাষার কথ্যরীতি অত্যন্ত কাছাকাছি হলেও তাদের লিখনপদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। যেমন, হিন্দি ও উর্দু। উভয়ের কথ্যরূপ (বিশেষত কথ্য হিন্দুস্তানি) অনেকাংশে পারস্পরিক বোধগম্য হলেও হিন্দি দেবনাগরী লিপিতে এবং উর্দু ফারসি-আরবি লিপিতে লেখা হয়। ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণেও এ দুটি ভাষা পৃথক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

একইভাবে সার্বীয় ও ক্রোয়েশীয় ভাষার কথ্যরীতি অত্যন্ত নিকটবর্তী। তবে সার্বীয় ভাষা প্রধানত সিরিলিক ও লাতিন—উভয় লিপিতে লেখা হয়, আর ক্রোয়েশীয় ভাষা কেবল লাতিন লিপিতে লেখা হয়।

ধর্মীয় ঐতিহ্য, জাতীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের কারণেও এ দুটি ভাষা পৃথক ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ম্যাসিডোনীয় ও বুলগেরীয় ভাষার মধ্যেও ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে। অনেক বুলগেরীয় ভাষাবিদ ম্যাসিডোনীয়কে বুলগেরীয় ভাষার একটি উপভাষা হিসেবে বিবেচনা করলেও উত্তর ম্যাসিডোনিয়ায় এটি একটি স্বতন্ত্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃত। একইভাবে লো জার্মান ও ডাচ ভাষার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে সুইস জার্মান ও মানক জার্মান-এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও উভয়কেই জার্মান ভাষার বিভিন্ন রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভাষাবিদদের মতে, ড্যানিশ, নরওয়েজীয় এবং সুইডিশ ভাষার পারস্পরিক পার্থক্য তুলনামূলকভাবে কম। অপরদিকে ইতালির বিভিন্ন অঞ্চলের উপভাষার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি পার্থক্য দেখা যায়। তবুও জাতীয় রাষ্ট্র, ভাষানীতি ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ড্যানিশ, নরওয়েজীয় ও সুইডিশ পৃথক ভাষা হিসেবে স্বীকৃত, আর ইতালির অধিকাংশ আঞ্চলিক ভাষারূপকে ইতালীয় ভাষার উপভাষা হিসেবে গণ্য করা হয়।

ভাষাগত বিবর্তনের ফলে আদি ভাষার মৃত্যু

ক, দীর্ঘকালব্যাপী বিবর্তনের ফলে একটি ভাষা পরিবর্তিত হয়ে এক বা একাধিক নতুন রূপ লাভ করতে পারে। কালক্রমে এসব নতুন ভাষার ধ্বনি, শব্দভাণ্ডার, রূপতত্ত্ব ও বাক্যতত্ত্বে এত বেশি পরিবর্তন ঘটে যে ভাষাবিজ্ঞানীরা আদি ভাষা এবং তার উত্তরসূরি ভাষাগুলোকে পৃথক ভাষা হিসেবে শনাক্ত করেন। আদি ভাষার আর কোনো জীবিত বক্তা না থাকলে, সেই ভাষা মৃতভাষায় পরিণত হয়।

খ. স্থানান্তরজনিত বিবর্তন কোনো ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ভৌগোলিক কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে এবং তাদের পারস্পরিক যোগাযোগ দীর্ঘকাল ব্যাহত হলে, প্রতিটি বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর ভাষায় স্বতন্ত্র পরিবর্তন ঘটতে থাকে। দীর্ঘ সময় পরে এসব কথ্যরীতি পৃথক ভাষায় পরিণত হতে পারে। ফলে আদি ভাষার কথ্য রূপ বিলুপ্ত হয়ে যায়।

উদাহরণস্বরূপ, ল্যাটিন ভাষা থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে ইতালীয়, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ফরাসি, রোমানীয় প্রভৃতি রোমান্স ভাষার উদ্ভব হয়েছে। বর্তমানে কথ্য ল্যাটিনের আর কোনো মাতৃভাষী নেই।

গ. অপর ভাষার প্রভাবে বিলুপ্তি কোনো শক্তিশালী বা বহুল ব্যবহৃত ভাষার প্রভাবে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ভাষার ব্যবহার ক্রমে কমে যেতে পারে। একসময় নতুন প্রজন্ম মাতৃভাষা ত্যাগ করে প্রভাবশালী ভাষা গ্রহণ করলে পূর্ববর্তী ভাষাটি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঞ্চলের আদিবাসী টঙ্কাওয়া (Tonkawa) ভাষার বক্তারা ধীরে ধীরে ইংরেজি ভাষা গ্রহণ করেন। বর্তমানে টঙ্কাওয়া ভাষার কোনো সাবলীল মাতৃভাষী বক্তা নেই; ফলে ভাষাটি বিলুপ্ত ভাষা হিসেবে বিবেচিত।

ঘ. ভাষার সংমিশ্রণ অনেক সময় ভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ যোগাযোগের ফলে বিভিন্ন ভাষার উপাদান মিলিয়ে নতুন ভাষার উদ্ভব হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এ ধরনের যোগাযোগভিত্তিক সরল ভাষাকে পিজিন (Pidgin) বলা হয়। পরবর্তীকালে যদি কোনো পিজিন একটি জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় পরিণত হয় এবং পূর্ণাঙ্গ ভাষার বৈশিষ্ট্য অর্জন করে, তবে তাকে ক্রেওল (Creole) বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে Tok Pisin, Bislama, Mauritian Creole, Haitian Creole প্রভৃতি ভাষার নাম উল্লেখ করা যায়। Chinook Jargon-ও একটি সুপরিচিত যোগাযোগভিত্তিক পিজিন ভাষা।

ভাষাগত ব্যবধান:
মানুষ তার প্রয়োজনে নিজ এলাকার বাইরে অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে। আবার কখনও অন্য ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী তাদের প্রয়োজনেই অন্য অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করে বা যোগাযোগ গড়ে তোলে। যে কারণেই হোক না কেন, দুই বা ততোধিক ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী পরস্পরের সংস্পর্শে এলে তাদের ভাষার মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব বিস্তার শুরু হয়। এই ভাষাসংস্পর্শ  থেকে সাধারণত নিম্নলিখিত পরিবর্তনগুলো ঘটে—

১. শব্দ ধার (Lexical borrowing) উভয় ভাষার বক্তারা পরস্পরের ভাষা থেকে শব্দ গ্রহণ করেন। সাধারণত নতুন বা পূর্বে অপরিচিত বস্তু, ধারণা, প্রযুক্তি কিংবা সাংস্কৃতিক উপাদানের নামই সর্বপ্রথম ধার করা হয়। যেমন, কম্পিউটার যন্ত্রটি বাঙালির কাছে একসময় সম্পূর্ণ নতুন ছিল। তাই এর নাম ইংরেজি computer থেকে গ্রহণ করে বাংলায় কম্পিউটার রূপে প্রচলিত হয়েছে।
২. প্রচলিত শব্দের পরিবর্তে বিদেশি শব্দের ব্যবহার কোনো ভাষায় নিজস্ব শব্দ থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মর্যাদা, শিক্ষা, প্রযুক্তি বা সাংস্কৃতিক প্রভাবের কারণে বিদেশি শব্দ প্রচলিত হয়ে যেতে পারে। বাংলা ভাষায় ইংরেজি থেকে অসংখ্য শব্দ এভাবে গৃহীত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে। আবার বাংলা ও সংস্কৃত থেকেও বহু শব্দ অন্যান্য ভাষায় প্রবেশ করেছে। যেমন, সংস্কৃত পণ্ডিত শব্দটি ইংরেজিতে pundit রূপে গৃহীত হয়েছে।

ভাষার বিলুপ্তির বর্তমান চিত্র
ভভাষাবিদদের মতে বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৭,০০০-এর বেশি জীবিত ভাষা রয়েছে। তবে এদের অধিকাংশ ভাষার বক্তাসংখ্যা খুবই কম। অল্পসংখ্যক ভাষায় কোটি কোটি মানুষ কথা বললেও বহু ভাষার বক্তাসংখ্যা কয়েক শত, কয়েক দশ বা তারও কম। এমনকি কিছু ভাষার মাত্র একজন বা দুজন বক্তাও কোনো সময়ে জীবিত ছিলেন। শেষ বক্তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই ভাষাও বিলুপ্ত ভাষায় পরিণত হয়। উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গত কয়েক শতাব্দীতে শত শত ভাষা বিলুপ্ত হয়েছে। বিশেষত ঔপনিবেশিক শাসন, নগরায়ণ, অভিবাসন, শিক্ষা ও প্রশাসনে প্রভাবশালী ভাষার আধিপত্য এবং ভাষা-পরিবর্তনের ফলে বহু ক্ষুদ্র ভাষা আজ অস্তিত্বের সংকটে রয়েছে।

ভাষার শ্রেণিকরণ