ইয়াবা
এক ধরনের নেশাজাতীয় ট্যাবলেট। থাই ভাষায়
এর অর্থ পাগলা ঔষধ। প্রতিটি ট্যাবলেটে থাকে ২৫ থেকে ৩৫ ভাগ মিথাইল এ্যাম্ফিটামিন
এবং ৪৫ থেকে ৬৫ ভাগ থাকে ক্যাফেইন নাম যৌগিক পদার্থ। কখনো কখনো অধিকতর নেশাদ্রব্য
তৈরির জন্য এর সাথে হেরোইন মেশানো হয়ে থাকে।
সর্দি, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, ওজন কমানো, দীর্ঘ সময় না ঘুমিয়ে থাকার উদ্দেশ্যে এই
ট্যাবলেটটি ঔষধ হিসেবে ইয়াবা খাওয়া হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, ক্লান্তি দূরীকরণ
এবং সাময়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য
এ্যাডলফ
হিটলার
আদেশে জার্মান সৈন্যদের এই ট্যাবলেট দেওয়া হতো। তবে এই ট্যাবলেটটি পার্শ্ব
প্রতিক্রয়ায় শরীরে ব্যাপক ক্ষতি করে বলে, ডাক্তাররা এটি চিকিৎসার জন্য ব্যবহারের
পরামর্শ দেন না। নেশা করার জন্য নেশাকারীরা পাতলা ধাতব পাতের উপর পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি
করে, তা নলের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। এক্ষেত্রে সিগারেটের রাঙ্তা বা যে কোনো ধরনের
এ্যালুমিনিয়াম ফয়েল ব্যবহার করা হয়।
১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে মিথাইল এ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইন মিশিয়ে এই ঔষধ তৈরি করেছিল
জাপানি
ঔষধ কোম্পানি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এর উন্নত সংস্করণ
জার্মান
সৈন্যরা ব্যবহার করতো। কথিত আছে,
এ্যাডলফ
হিটলার
জার্মান
রসায়নবিদদের উত্তেজক ঔষধ তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই সূত্রে ইয়াবা জাতীয় ঔষধ তৈরি
করা হয়েছিল। তখন এর নাম ছিল 'পারভিটিন'। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ঔষধ হিসেবে
দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় এর ব্যবহার শুরু হয়। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের বাস ও ট্রাকের
ড্রাইভাররা রাত জেগে গাড়ি চালানোর জন্য এই ঔষধের ব্যবহার শুরু করেছিল। তখন এই ঔষধ
পাওয়া যেতো প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে। এই ঔষধের প্রভাবে তখন প্রায়ই সড়ক দুর্ঘটনা
ঘটতো। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে থাই সরকার এই ঔষধ তৈরি ও বিক্রয় বন্ধ করে দেয়। এরপর
থাইল্যান্ডের ড্রাগ ব্যবসায়ীরা এর উৎপাদন শুরু করে এবং পাগলা ঔষধ বা ইয়াবা (ยาบ้า)
নামকরণ করে। অচিরেই ইয়াবা তৈরি এবং বিক্রয় অত্যন্ত লাভজনক হওয়ায়,
মিয়ানমারে ইয়াবা তৈরি ও সরবারহের জাল তৈরি করে।
বাংলাদেশে ইয়াবার ব্যবহার শুরু হয় ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। তখন স্থানীয় যুবকরা যৌন
উত্তেজক ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করতো। প্রথম দিকে বাংলাদেশের
কক্সবাজার এবং তৎসলগ্ন অঞ্চলে যৌন উত্তেজক এবং নেশা দ্রব্য হিসেবে ইয়াবা ছড়িয়ে
পড়ে। এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরভাগে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। ২০০০ খ্রিষ্টাব্দের
দিকে এর ব্যাপকভাবে
টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসা শুরু হয়। পরে
কক্সবাজার অঞ্চলের স্থানীয় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে।
ইয়াবার জনপ্রিয়তার কারণ:
১. সহজে বহন করা যায়।
২. ব্যবহার করার পর- মদ বা গাঁজা মতো কোনো বিশেষ গন্ধ সেবনকারীদের মুখে পাওয়া যায় না। ফলে সহজে ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে না।
৩. খুব দ্রুত শরীরকে চাঙ্গা করে তোলে। প্রথম ব্যবহারকারীদের ভিতরে প্রবল উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়।
৪. বেশ্যাসক্তদের ক্ষেত্রে দ্রুত যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধিতে সহয়তা করে।
৫. যাদের রাতে জেগে কাজ বা লেখাপড়া করতে হয়, তারা জন্য ঘুমা তাড়ানিয়া ঔষধ হিসেবে কাজ করে।
৬. ইয়াবা ব্যবহারের শুরুটা বন্ধুবান্ধবদের মাধ্যমে। অনেক সময় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা বিনামূল্যে বিতরণ করে। পরে যখন ব্যবহারকারী নেশাশক্ত হয়ে যায় তখন নিজেই কিনতে থাকে। এই সময় ইয়াবা ব্যবসায়ীরা তাদের এজেন্টদের মাধ্যমে সরবরাহ করতে থাকে। এক্ষেত্রে মদ বা গাঁজা কেনার জন্য যেরূপ অসুবিধায় পড়তে হয়, ইয়াবার জন্য তা করতে হয় না। সহজ লভ্যতা ইয়াবার জনপ্রিয়তার একটি কারণ।
স্বাস্থ্য ঝুঁকি
১. সাময়িকভাবে যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে। কিন্তু ক্রমাগত ব্যবহারে ফলে পুরুষ ব্যবহারকারীদের যৌন ক্ষমতা হ্রাস পেতে থাকে এবং এক সময় যৌন ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়। অল্প কিছুদিন ব্যবহার করলেও পুরষদের স্বাভাবিক শুক্রাণু উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যায়। মেয়েদের ঋতুচক্র অনিয়মিত হয়ে পড়ে এবং ক্রমে ক্রমে তা অনিরাময়যোগ্য যৌনব্যধিতে পরিণত হয়।
২. রাত্রি জাগরণে জন্য যারা ব্যবহার করে, তাদের ঘুম অনিয়মিত হয়ে পড়ে। এরা ফলে স্বাভাবিক নিদ্রাচক্র নষ্ট হয়ে যায়। দেখা যায় ১০-১২ দিন পর্যন্ত টানা অনিদ্রায় ভোগে। আবার টানা দুই তিন ধরে ঘুমায়। এই অনিয়মের ফলে শরীরে স্বভাবিক ক্রিয়া ব্যাহত হয়। ক্রমে ক্রমে স্মৃতি শক্তি কমে যায়। মানসিক অস্থিরতার কারণে কারো কারো আত্মহত্যার প্রবণতা জেগে উঠে। ব্রেইন ম্যাটার সঙ্কুচিত হয়ে যায়। সেটা যদি ১৫০০ গ্রাম থাকে সেটা শুকিয়ে এক হাজার গ্রামের নিচে নেমে যেতে পারে। জেনেটিক অণুগুলো নষ্ট করে দেয়।
৩. ফুসফুসে পানি জমে, কিডনি অকেজো হয়ে পড়ে। প্লীহা ব্যথা করে এবং ধীরে ধীরে তা ক্যান্সারে রূপ নিতে পারে।
সামাজিক ঝুঁকি
১. ইয়াবা অল্পবিস্তর ব্যবহার শুরু বন্ধুবান্ধবদের অমাধ্যমে। ক্রমে ক্রমে যখন তা নেশায় পরিণত হয়, তখন ইয়াবা কেনার জন্য অর্থ একটি বড় সমস্যা হয়ে যায়। নিয়মিতভাবে যারা ইয়াবা গ্রহণ করে, তাদের প্রতিমাসে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। এই টাকার অভাব মেটানোর জন্য এরা প্রথম দিকে ঘরের সঞ্চিত অর্থ বা জিনিসপত্র চুরি করা শুরু করে। ঘরের সম্পদ ফুরিয়ে গেলে এরা নানা অজুহাতে পরিচিত লোকদের কাছ টাকা সংগ্রহ করে এবং প্রতারকে পরিণত হয়। অনেকে টাকার প্রয়োজনে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই করা শুরু করে।
২. মানসিক অস্থিরতার কারণে ইয়াবাসেবনকারীরা পরিবারের লোকজনের সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করে। অত্যধিক যৌন উত্তেজনার কারণে এদের ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যখন এদের ভিতরে যৌনক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন দাম্পত্যজীবনে ব্যাপক যৌমসমস্যার সৃষ্টি করে।
ইয়াবার প্রকরণ:
ইউরোপ, আমেরিকা এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় ইয়াবা জাতীয় নেশা দ্রব্যটি নানা নামে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রাপ্ত বেশরিভাগ ইয়াবা গোলাকার এবং এই ট্যাবলেটের এক পিঠে ইংরেজি WY বর্ণ খোদিত থাকে। এর ভিতরে বর্ণটি দণ্ডটি বেশ লম্বা হয়। বাংলাদেশে প্রাপ্ত ইয়াবার নানা প্রকরণ আছে। রঙ ও গন্ধভেদে এর গুণাগুণ বিচার করা হয়। যেমন-
চিতা: নিম্নমানের ইয়াবাকে এই নামে অভিহিত করা হয়। এর দাম
কম।
রঙের পার্থক্য:
শুরুর দিকে ইয়াবার রঙ ছিল গোলাপি ও সবুজ। ব্যবসায়িক কৌশলে ইয়াবা উৎপাদনকারীরা
নানা রঙের ইয়াবা তৈর করা শুরু করেছে। গোলাপি সবুজের পাশাপাশি লাল রঙের ইয়াবা
বাংলাদেশে অনেকদিন ধরে পাওয়া যাচ্ছিল। পরে এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাদা ও হলুদ রঙের
ইয়াবা। রঙ ও প্রতীকের বিচারে সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫ ধরনের ইয়াবা বাংলাদেশে পাওয়া যায়।
নিচে এর একটি নমুনা দেখানো হলো-