বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: দাও শৌর্য,দাও ধৈর্য,হে উদার নাথ
দাও শৌর্য,দাও ধৈর্য,হে উদার নাথ,
দাও প্রাণ।
দাও অমৃত মৃত জনে,
দাও ভীত-চিত জনে,শক্তি অপরিমাণ।
হে সর্বশক্তিমান॥
দাও স্বাস্থ্য,দাও আয়ু,
স্বচ্ছ আলো,মুক্ত বায়ু,
দাও চিত্ত অ-নিরুদ্ধ,দাও শুদ্ধ জ্ঞান।
হে সর্বশক্তিমান॥
দাও দেহে দিব্য কান্তি,
দাও গেহে নিত্য শান্তি,
দাও পুণ্য প্রেম ভক্তি,মঙ্গল কল্যাণ।
ভীতি নিষেধের ঊর্ধে স্থির,
রহি যেন চির-উন্নত শির
যাহা চাই যেন জয় করে পাই,গ্রহণ না করি দান।
হে সর্বশক্তিমান॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানটি সর্বশক্তিমান পরমসত্তার কাছে মানবজীবনের শারীরিক,
মানসিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার জন্য এক মহৎ প্রার্থনা উপস্থাপন করা হয়েছে।
এটি কবির কেবল ব্যক্তিগত কল্যাণের আবেদন নয়; বরং শারীরিক, মানসিক, নৈতিক ও
আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ ও মর্যাদাপূর্ণ মানবজীবন গড়ে
তোলার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।
গানের সূচনায় কবি পরমসত্তার কাছে শৌর্য,
ধৈর্য ও প্রাণশক্তি প্রার্থনা করেছেন। এখানে 'শৌর্য- হলো মানুষের সাহস ও
সংগ্রামী চেতনার প্রতীক, আর 'ধৈর্য' হলো- প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অবিচল থাকার
শক্তির প্রতীক। কবির মনে করেন, জীবনের নানা বাধা ও সংকট অতিক্রম করার জন্য এই
দুই গুণ অপরিহার্য। পাশাপাশি তিনি মৃতপ্রায় ও হতাশ মানুষের জন্য অমৃতসম
জীবনশক্তি এবং ভীত-সন্ত্রস্ত মানুষের জন্য অপরিমেয় সাহস ও শক্তি কামনা করেছেন।
এর মাধ্যমে মানুষের অন্তর্নিহিত বাসনা ও সম্ভাবনাকে জাগ্রত করার আকাঙ্ক্ষা
প্রকাশ পেয়েছে।
গানটির পরবর্তী অংশে কবি সুস্থ ও সুন্দর
জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি স্বাস্থ্য,
দীর্ঘায়ু, নির্মল আলো ও মুক্ত বায়ু প্রার্থনা করেছেন। এগুলো কেবল শারীরিক
সুস্থতার উপকরণ নয়; বরং একটি সুন্দর ও কল্যাণময় জীবনের ভিত্তি। একই সঙ্গে তিনি
মুক্ত ও অবারিত চিত্ত এবং শুদ্ধ জ্ঞান কামনা করেছেন। এখানে 'অ-নিরুদ্ধ চিত্ত'
বলতে সংকীর্ণতা, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার
ক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে। আর 'শুদ্ধ জ্ঞান' হলো- সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে
চলার আলোকবর্তিকা।
গানের পরবর্তী অংশে কবি ব্যক্তিগত ও
পারিবারিক জীবনের মঙ্গল কামনা করেছেন। তিনি দেহে দিব্য কান্তি, গৃহে স্থায়ী
শান্তি এবং হৃদয়ে পুণ্য, প্রেম ও ভক্তির বিকাশ প্রার্থনা করেছেন। এখানে 'দিব্য
কান্তি' কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়; বরং অন্তরের পবিত্রতা ও চরিত্রের দীপ্তির
প্রতীক। 'নিত্য শান্তি' পারিবারিক সম্প্রীতি ও মানসিক প্রশান্তির প্রতীক, আর
প্রেম ও ভক্তি মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতার ভিত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গানের শেষাংশে কবি আত্মমর্যাদা ও
স্বাধীনচেতা জীবনের আদর্শ তুলে ধরেছেন। তিনি চান, ভয় ও নিষেধের ঊর্ধ্বে উঠে
যেন সর্বদা উন্নত শিরে জীবনযাপন করতে পারেন। এখানে উন্নত শির আত্মবিশ্বাস,
মর্যাদাবোধ ও নৈতিক দৃঢ়তার প্রতীক। তিনি আরও প্রার্থনা করেছেন, জীবনে যা কিছু
অর্জন করবেন, তা যেন নিজের যোগ্যতা, পরিশ্রম ও সাধনার দ্বারা অর্জিত হয়;
অনুগ্রহ বা ভিক্ষারূপে নয়। 'যাহা চাই যেন জয় করে পাই, গ্রহণ না করি দান'- এই
পঙ্ক্তিতে আত্মনির্ভরতা, কর্মপ্রেরণা এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনের আদর্শ প্রকাশ
পেয়েছে।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৩৪১ বঙ্গাব্দের আশ্বিন (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪) মাসে, গানটি
গানের মালা প্রথম সংস্করণে অন্তর্ভুক্ত হয়ে প্রকাশিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৩৫ বৎসর ৪ মাস।
- গ্রন্থ:
- গানের মালা।
প্রথম সংস্করণ [আশ্বিন ১৩৪১ বঙ্গাব্দ (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ)। ভজন। ৮০। ]
- নজরুল রচনাবলী। জন্মশতবর্ষ সংকলন ষষ্ঠ খণ্ড। বাংলা একাডেমী, ঢাকা। জ্যৈষ্ঠ ১৪১৯, জুন ২০১২। গানের মালা ৭৯। ভজন। পৃষ্ঠা ২৩০-২৩১]
- নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা ৬০০]
-
পত্রিকা:
- চিত্রালী [জ্যৈষ্ঠ ১৩৪২ (মে-জুন
১৯৩৫)।
জগৎঘটককৃত স্বরলিপি-সহ মুদ্রিত হয়েছিল।]
- সবুজ বাঙলা [অগ্রহায়ণ ১৩৪১ (নভেম্বর-ডিসেম্বর ১৯৩৪)]
- রেকর্ড:
এইচএমভি [অক্টোবর ১৯৩৪ (আশ্বিন-কার্তিক ১৩৪১)। শিল্পী: আঙ্গুরবালা
ও ধীরেন দাস। এন ৭২৯০]
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
- সুরকার: নজরুল ইসলাম
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সাধারণ। পরমসত্তা। প্রার্থনা
- সুরাঙ্গ: স্বকীয় বৈশিষ্ট্য
- রাগ:
হেমকল্যাণ
- তাল:
দাদরা
- গ্রহস্বর: সগা