বিষয়: নজরুল সঙ্গীত
শিরোনাম:
বাজে মঞ্জুল মঞ্জির রিনিকি ঝিনি
বাজে মঞ্জুল মঞ্জির রিনিকি ঝিনি
নীর ভরণে চলে রাধা বিনোদিনী
তার চঞ্চল নয়ন টলে টলমল
যেন দু'টি ঝিনুকে ভরা সাগর জল॥
ও সে আঁখি না পাখি গো
কার আশে উড়িতে চায় থাকি, থাকি, গো॥
রাই ইতি-উতি চায়
কভু তমাল-বনে কভু কদম-তলায়।
রাই শত ছলে ধীরে পথ চলে কভু কণ্টক বেঁধে
চরণে
তবু যে কাঁটা-লতায় আঁচল জড়ায় বেণী খুলে যায় অকারণে।
গিয়ে যমুনার তীরে চায় ফিরে ফিরে আনমনে ব'সে গণে ঢেউ
চকিতে কলসি ভরি' লয় তার যেই মনে হয় আসে কেউ।
হায় হায় কেউ আসে না
'ভোলো অভিমান রাধারানী' বলি' শ্যাম এসে সম্ভাষে না।
রাই চলিতে পারে না পথ আর,
বিরস বদন অলস চরণ শূণ্য-কলসি লাগে ভার।
বলি, কালা নাহি এলো যমুনা তো ছিল লইয়া শীতল কালো জল।
কেন ডুবিয়া সে-জলে উঠিলি আবার কাঁদায়ে
ভাসাতে ধরাতল॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে রাধার শ্রীকৃষ্ণ-বিরহজনিত আকুল প্রতীক্ষা, প্রেমের ব্যাকুলতা এবং অভিসার-আকাঙ্ক্ষা অত্যন্ত সজীব ও চিত্রময় ভাষায়
উপস্থাপিত হয়েছে।
রাধা মঞ্জিরের মধুর রিনিঝিনি ধ্বনি তুলে যমুনা থেকে জল আনতে যাচ্ছেন। তাঁর চঞ্চল, স্নিগ্ধ ও অশ্রুসজল নয়ন যেন সমুদ্রের জলভরা দুটি ঝিনুক। তাঁর চোখে এক অদম্য প্রতীক্ষা—যেন দুটি পাখি কারও আগমনের আশায় উড়ে যেতে চায়। তিনি কখনও তমালবনের দিকে, কখনও কদমতলার দিকে চেয়ে দেখেন; মনে হয়, এই বুঝি শ্যাম এসে দাঁড়ালেন।
পথে তিনি ধীরে ধীরে চলেন। কখনও কাঁটা পায়ে বিঁধে, কখনও লতার সঙ্গে আঁচল জড়িয়ে যায়, কখনও বা বেণী খুলে পড়ে। কিন্তু এসবই যেন বাহ্যিক ঘটনা নয়; প্রকৃতপক্ষে বিরহের অস্থিরতায় তাঁর মনোসংযোগ ভেঙে পড়েছে। শারীরিক কষ্ট তাঁর অনুভূত হয় না, কারণ হৃদয় সম্পূর্ণভাবে কৃষ্ণ-চিন্তায় নিমগ্ন।
যমুনার তীরে পৌঁছে রাধা বারবার ফিরে তাকান। নদীর ঢেউ গুনতে গুনতে অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকেন। হঠাৎ মনে হয়, বুঝি কৃষ্ণ আসছেন। তড়িঘড়ি করে কলসি ভরে নেন, কিন্তু সেই আশা মুহূর্তেই ভেঙে যায়। কেউ আসে না। কৃষ্ণ এসে তাঁর অভিমান ভাঙিয়ে বলেন না-
'রাধারাণী, অভিমান ভোলো।' এই ব্যর্থ প্রতীক্ষাই তাঁর বিরহকে আরও গভীর করে তোলে।
শেষ পর্যন্ত রাধার পক্ষে আর পথ চলা অসম্ভব হয়ে পড়ে। শূন্য কলসিও তাঁর কাছে ভারী মনে হয়, কারণ তাঁর অন্তর শূন্য হয়ে গেছে। কবি গভীর বেদনার সঙ্গে বলেন- যমুনা তো কৃষ্ণেরই প্রতীক; তার বুকে ছিল শীতল, কালো জল। সেই যমুনায় ডুব দিয়ে ফিরে এসেও কেন রাধার হৃদয়ের জ্বালা নিভল না? কেন তিনি আবার সমগ্র পৃথিবীকে নিজের অশ্রুতে ভাসিয়ে কাঁদতে বাধ্য হলেন?
সমগ্র গানে রাধার বিরহ, প্রতীক্ষা, প্রেমের একনিষ্ঠতা এবং কৃষ্ণ-দর্শনের আকুল আকাঙ্ক্ষা অপূর্ব কাব্যিক সৌন্দর্যে প্রকাশিত হয়েছে। এখানে বাহ্যিক যাত্রার চেয়ে অন্তরের যাত্রাই প্রধান; যমুনায় জল আনতে যাওয়া আসলে প্রিয়তমের সন্ধানে আত্মার চিরন্তন অভিযাত্রার প্রতীক।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির
রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে
(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল।
এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ [নজরুল ইনস্টিটিউট ফেব্রুয়ারি ২০১২। গান সংখ্যা
৬৮]
- রেকর্ড:
-
এইচএমভি
। মার্চ ১৯৩৪ (ফাল্গুন- চৈত্র ১৩৪০)। এন ৭২০৭। শিল্পী: গোপাল সেন।
সুরকার: কাজী নজরুল ইসলাম
- কলম্বিয়া। ডিসেম্বর ১৯৪৫ (অগ্রহায়ণ-পৌষ ১৩৫৩)। জিই
২৮৬৬। শিল্পী: উত্তরা দেবী। সুরকার নিতাই ঘটক
- সুরকার:
-
কাজী নজরুল ইসলাম। [রেকর্ড:
এইচএমভি [মার্চ ১৯৩৪ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০)।
রেকর্ড নং এন ৭২০২।]
- নিতাই ঘটক। [রেকর্ড:
কলাম্বিয়া [ডিসেম্বর ১৯৪৫ (অগ্রহায়ণ-পৌষ
১৩৫২)। রেকর্ড নং-
জিই ২৮৬৬।]
-
স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
সুধীন দাশ ।
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি তৃতীয় খণ্ড। প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ
[কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। বৈশাখ ১৪০২। এপ্রিল ১৯৯৬।১৮ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ৮৬-৯০]
[নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম। বৈষ্ণব। রাধাকৃষ্ণ-লীলা।
বিরহ
- সুরাঙ্গ:
কীর্তন।