বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম:
নব কিশলয়-রাঙা শয্যা পাতিয়া
নব কিশলয়-রাঙা শয্যা পাতিয়া
বালিকা-কুঁড়ির মালিকা গাঁথিয়া
আমি একেলা জাগি রজনী
বঁধু, এলো না তো কই সজনী,
বিজনে বসিয়া রচিলাম বৃথা
বনফুল দিয়া ব্যজনী।
কৃষ্ণচূড়ার কলিকা অফুট
আমি তুলি আনি' বৃথা রচিনু মুকুট,
মোর হৃদয়ের রাজা এলো না,
আমার হৃদি-সিংহাসন শূন্য রহিল
আমি যাহার লাগিয়া বাসর সাজাই
সে ভাবে মিছে এ খেলনা (সখি)।
সে-যে জীবন লইয়া খেলা করে সখি,
আমি মরণের তীরে ব'সে তা'রে ডাকি
হেসে যায় বঁধু আন্ঘরে
সে-যে জীবন লইয়া খেলা করে।
সে-যে পাষাণের মূরতি বৃথা পূজা-আরতি
নিবেদন করি তার পায়:
সাধে কি গো বলে সবে পাষাণ গলেছে কবে?
তবু মন পাষাণেই ধায় (সখি রে)।
আমি এবার মরিয়া পুরুষ হইব, বঁধু হবে কুলবালা
দিয়ে তারে ব্যথা যাব যথাতথা বুঝিবে সেদিন কালা,
বিরহিনীর কী যে জ্বালা তখনি বুঝিবে কালা।
দিয়ে তারে ব্যথা যাব যথাতথা বুঝিবে সেদিন কালা॥
-
ভাবসন্ধান: এই গানে বৃন্দাবনের বিরহিণী রাধার হৃদয়ের গভীর ব্যাকুলতা, অভিমান
ও প্রেমের আর্তি প্রকাশ পেয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের প্রতীক্ষায় রাধা নব কিশলয়, ফুলের মালা
ও বাসরশয্যা সাজিয়ে রেখেছেন। বালিকা-সখীদের মতো ফুলের মালা গেঁথে, প্রেমের নানা
আয়োজন করে তিনি একাকী রজনী জাগরণ করেন। কিন্তু তাঁর প্রাণের প্রিয় শ্যাম (কৃষ্ণ)
সেই প্রতীক্ষার সময়ে উপস্থিত হন না। ফলে রাধার সমস্ত সাজসজ্জা ও আয়োজন ব্যর্থ হয়ে
যায়।
রাধা কৃষ্ণচূড়ার কুঁড়ি তুলে এনে মুকুট রচনা করেন তাঁর হৃদয়ের রাজা কৃষ্ণের জন্য।
কারণ কৃষ্ণই তাঁর হৃদয়-সিংহাসনের একমাত্র অধিকারী। কিন্তু সেই হৃদয়ের রাজা না আসায়
তাঁর অন্তর শূন্য হয়ে পড়ে। যে প্রেমময় মিলনের আশায় তিনি বাসর সাজিয়েছিলেন, কৃষ্ণের
কাছে তা যেন কেবলই একটি খেলা বলে মনে হয়—এই ভাবনায় রাধার হৃদয়ে গভীর অভিমান জন্ম
নেয়।
রাধার অভিযোগ, কৃষ্ণ তাঁর জীবন নিয়ে যেন খেলা করেন। তিনি কৃষ্ণবিরহে মৃত্যুর মতো
যন্ত্রণা ভোগ করছেন, তবু কৃষ্ণ তাঁর আহ্বানে সাড়া দেন না। কৃষ্ণ হাসতে হাসতে
অন্যত্র চলে যান, আর রাধা বিরহের আগুনে দগ্ধ হন। তাঁর কাছে কৃষ্ণ যেন পাষাণমূর্তি-
যাঁর চরণে প্রেম, অশ্রু ও ভক্তি নিবেদন করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। তবু সেই পাষাণ
কৃষ্ণের প্রতিই তাঁর মন ছুটে যায়, কারণ প্রকৃত প্রেমিক হৃদয় প্রিয়তমকে কখনো ত্যাগ
করতে পারে না।
রাধার এই জীবনে কৃষ্ণ যে ব্যথা দিয়েছেন, রাধা তা কৃষ্ণকে বুঝানোর জন্য জন্মান্তরের
এক কল্পলোকের অবতারণা করেছেন। তিনি ভাবেন পরজনমে রাধা পুরুষ হয়ে জন্মাবেন আর
কৃষ্ণহবেন কুলবালা। সে জনমে রাধা যথাতথা কৃষ্ণকে ব্যথা দিয়ে যাবেন। তখন কৃষ্ণ
বুঝবেন বিরহিণীর জ্বালা।
শেষে রাধার অভিমান চরমে পৌঁছে যায়। তিনি বলেন, এবার তিনি নিজেই কঠোর হবেন—কৃষ্ণকে
সেই বিরহের ব্যথা অনুভব করাবেন, যে ব্যথায় তিনি নিজে প্রতিক্ষণ দগ্ধ হচ্ছেন। তিনি
চান, কৃষ্ণ একদিন বুঝুন বিরহিণীর হৃদয়ের জ্বালা কত অসহনীয়। রাধার এই অভিমান আসলে
বিচ্ছেদের মধ্যেও কৃষ্ণের প্রতি গভীর প্রেমেরই প্রকাশ।
এই গানে রাধা-কৃষ্ণের মধুর প্রেমের বিরহরস ফুটে উঠেছে। কৃষ্ণের অনুপস্থিতিতে রাধার আকুল প্রতীক্ষা, অভিমান, প্রেমের নিবেদন এবং কৃষ্ণবিরহের অসহনীয় যন্ত্রণা এখানে প্রকাশ পেয়েছে। বৈষ্ণব ভাবধারায় রাধার এই বিরহ কেবল মানবিক প্রেমের বেদনা নয়, বরং পরম প্রিয়তমের জন্য আত্মার গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতীক।
-
রচনাকাল ও স্থান: গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে
(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০) এইচএমভি রেকর্ড কোম্পানি থেকে এই গানটির একটি রেকর্ড প্রকাশিত হয়েছিল।
এই সময় নজরুল ইসলামের বয়স ছিল ৩৪ বৎসর ৯ মাস।
- গ্রন্থ: নজরুল-সঙ্গীত সংগ্রহ (নজরুল ইনস্টিটিউট, মাঘ ১৪১৮। ফেব্রুয়ারি
২০১২)। ৭০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ২৩।
রেকর্ড
-
এইচএমভি [মার্চ ১৯৩৪ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০)]।
এন ৭২০২।
শিল্পী: গোপাল সেন।
সুর: নজরুল ইসলাম
-
কলাম্বিয়া [ডিসেম্বর ১৯৪৫ (অগ্রহায়ণ-পৌষ
১৩৫২)]। জিই ২৮৬৬।
শিল্পী: উত্তরা দেবী।
সুর: নিতাই ঘটক।
- কলহ। পালা-কীর্তন
।
কলকাতা-ক। তৃতীয় অধিবেশন। সময়: ৭.৪০-৮.৩৯ [১২ জানুয়ারি ১৯৪১ (রবিবার ২৮ পৌষ ১৩৪৭)।
- সূত্র:
- বেতার জগৎ। ১২শ বর্ষ ১ম সংখ্যা। ১লা জানুয়ারি ১৯৪১, (বুধবার, ১৭ পৌষ ১৩৪৭) পৃষ্ঠা: ৪৮
- The
Indian-listener 1940, Vol VI, No 1. page 79
-
স্বরলিপিকার ও স্বরলিপি:
সুধীন দাশ ।
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি তৃতীয় খণ্ড। প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ
[কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। বৈশাখ ১৪০২। এপ্রিল ১৯৯৬। ২০ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা: ৯৫-৯৯]
[নমুনা]
- সুরকার:
- কাজী নজরুল ইসলাম। [রেকর্ড:
এইচএমভি [মার্চ ১৯৩৪ (ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৪০)।
এন ৭২০২।]
- নিতাই ঘটক। [রেকর্ড:
কলাম্বিয়া [ডিসেম্বর ১৯৪৫ (অগ্রহায়ণ-পৌষ
১৩৫২)। জিই ২৮৬৬।]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ:
ধর্মসঙ্গীত। সনাতন হিন্দুধর্ম, বৈষ্ণব। রাধা-কৃষ্ণ লীলা। রাধা। বিরহ
- সুরাঙ্গ: কীর্ত্তন।