নজরুল জীবনী
প্রথম পর্ব
প্রথম ১৩ বছর


১১ জ্যৈষ্ঠ, ১৩০৬ বঙ্গাব্দ। বুধবার ২৪ মে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দ। অবশ্য কুষ্ঠী ও জ্যোতিষি গণনার বিচারে নজরুলের জন্মতারিখ নিয়ে কিছু মতভেদ রয়েছে। কিন্তু নজরুলের সুস্থাবস্থায় উল্লিখিত দিনটিই জন্মদিন হিসেবে পালন করা হয়েছে। খ্রিষ্টাব্দ ও বঙ্গাব্দের বিচারে প্রতি বৎসর ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ২৪শে মে হয় না। নজরুলের সুস্থাবস্থায় তাঁর জন্মদিন পালিত হয়েছে ১১ই জ্যৈষ্ঠ এবং এখনও তা হয়ে আসছে।

তাঁর ১ বৎসর পূর্ণ হয়েছিল ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৭, বুধবার। খ্রিষ্টাব্দের বিচারে সে বছরে এই দিনটি ছিল- ২৩ মে ১৯০০। এক বৎসর অতিক্রান্ত হওয়ার পর, তাঁর ২য় জন্মদিনের তারিখ ছিল ১১ই  জ্যৈষ্ঠ ১৩০৭। বৃহস্পতিবার। ২৪ মে ১৯০০।

আমরা আগের সূচনা পর্বে জেনেছি- নজরুলের জন্মস্থান ভারত প্রজাতন্ত্রের পশ্চিমবঙ্গ নামক প্রদেশের বর্ধমান বিভাগের অন্তর্গত পশ্চিম-বর্ধমান জেলার আসনসোল মহকুমার জামুরিয়া সমষ্টি উন্নয়ন ব্লকের অন্তর্গত চুরুলিয়া নামক গ্রাম। নজরুলের পিতার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মায়ের নাম নাম ছিল জাহেদা খাতুন। নজরুল ছিলেন এই দম্পতির পঞ্চম সন্তান। প্রথম সন্তান কাজী সাহেবজান জীবিত থাকলেও, পরের তিনটি পুত্র সন্তান জন্মের পরপরই মৃত্যুবরণ করেন। এরপর নজরুলের জন্ম হয়। ষষ্ঠ সন্তান কন্যা উম্মে কুলসুম। সর্বশেষ সন্তান কাজী আলী হোসেন। প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় তাঁর 'কাজী নজরুল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- 'পূর্বে নজরুল ইসলাম সাহেবের এক ভাই চুরুলিয়াতে গুণ্ডাদের হাতে মারা যান'।

অনেকে বলে থাকেন সন্তান হারানোর দুঃখের মধ্যে তাঁর জন্ম। সম্ভবতঃ সেই কারণেই নজরুলের ডাক নাম রাখা হয় দুখু মিঞা। ছোট বেলায় কেউ কেউ তাকে তারাক্ষ্যাপা বলে ডাকাতেন। কেউ আদর করে ডাকতেন নজর আলী।

নজরুলের পিতা কাজী ফকির আহমদের মৃত্যু হয়েছিল ১৩১৪ বঙ্গাব্দের ৭ই চৈত্রে (শুক্রবার, ২০ মার্চ ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দ)। তখন নজরুলের বয়স ছিল ৯ বৎসর। এই সময় পরিবারের সদস্য সংখ্যা ছিল-

১.মা জাহেদা খাতুন
২. সৎবোন সাজদন্নেসা
৩. বড় ভাই কাজী সাহেবজান
৪. ছোট বোন উম্মে কুলসুম
৫. ছোটভাই কাজী আলী হোসেন। 

নজরুলের পিতার আয়ের উৎস ছিল কিছু জমি-জমা এবং মসজিদের ইমামতির সূত্রে প্রাপ্ত অর্থ বা খাদ্যপণ্য। সব মিলিয়ে বলা যায়, সে সময়ে এই পরিবারটি ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির। নজরুলের পিতার অবর্তমানে সংসারের দায়িত্ব পড়েছিল বড় ভাই কাজী সাহেবজান এবং মা জাহেদা খাতুনের উপর।

পিতার মৃত্যুর আগে পারিবারিক ধর্মাচারণের সূত্রে তাঁর আরবি, ফার্সি ভাষার সাথে তাঁর পরিচয় ঘটেছিল। মেধাবী ছিলেন তাই এসব পাঠ তিনি স্বচ্ছন্দে আয়ত্ব করতে পরেছিলেন এমনটাই ধারণা করা যায়। পিতার ইচ্ছায় তিনি  চুরুলিয়া বিনোদবিহারী চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় ভর্তি হয়েছিলেন। ১৯০৪ খ্রিষ্টাব্দ (১৩১০-১৩১১ বঙ্গাব্দ) পর্যন্ত তিনি পাঠশালায় লেখাপড়া করেছিলেন। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১১-১৩১২ বঙ্গাব্দ) তিনি স্থানীয় মক্তবে ভর্তি হন। মক্তবের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র থাকাকালেই তাঁর পিতার অকালমৃত্যু হয়েছিল। এরপর তিনি মক্তবের পাঠ অব্যাহত রাখেন এবং ১৯০৯ খ্রিষ্টাব্দে (১৩১৫-১৩১৬ বঙ্গাব্দ) তিনি মক্তব থেকে নিম্ন প্রাথমিক পরীক্ষায় পাশ করেন।

লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি মাজার-শরীফের খিদমদগিরী মসজিদের ইমামতি এবং গ্রাম মোল্লাগিরি মতো কাজ করেছেন। এই কাজের জন্য তাঁকে আরবি ও ফারসি ভাষার পাঠ নিতে হয়েছিল। এই পাঠে তাঁর শিক্ষক ছিলেন ওই মক্তবের শিক্ষক মৌলবী কাজী ফজলে আহম্মদ। পরবর্তী জীবনের সাহিত্য কর্মে তিনি যে আরবি-ফার্সি শব্দের সাবলীল ব্যবহার করার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন, তার পিছনে শৈশবের এই শিক্ষা বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

লেটো পর্ব (১৯১০-১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ [১৩১৭-১৩১৯ বঙ্গাব্দ]
এই সময় চুরুলিয়া অঞ্চলের লোক-গীতিনাট্য 'লেটো' জনপ্রিয় ছিল। এই গানের প্রতি আগ্রহ দেখে তাঁর চাচা কাজী বজলে করিম, তাঁকে লেটো দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। মোটা দাগে বলা যায়, নজরুল এগার বৎসর অতিক্রান্ত বয়সে এসে লেটো দলে সদস্য থেকে বেঙাচি ওস্তাদে পরিণত হয়েছিলেন। নজরুলের জীবনের এই অধ্যায়কে বলা যায় লেটিগানের ওস্তাদ কাজী নজরুল এসলাম।


সূত্র:


এই সময়ে বাংলা কাব্য বা সঙ্গীতের কোনো কোনো নমুনা পাওয়া যায় নি।