বিষয়: নজরুল সঙ্গীত।
শিরোনাম: পদ্মার ঢেউ রে- মোর শূন্য হৃদয়-পদ্ম নিয়ে যা
পদ্মার ঢেউ রে
─
মোর শূন্য হৃদয়-পদ্ম নিয়ে যা, যা রে।
এই পদ্মে
ছিল রে যার রাঙা পা
আমি
হারায়েছি তারে॥
মোর পরান-বঁধু
নাই, পদ্মে তাই মধু নাই (নাই রে)
বাতাস কাঁদে
বাইরে, সে-সুগন্ধ নাই রে
মোর রূপের সরসীতে আনন্দ-মৌমাছি নাহি ঝঙ্কারে রে॥
ও পদ্মারে
─
ঢেউয়ে তোর ঢেউ উঠায় যেমন চাঁদের আলো
মোর
বঁধুয়ার রূপ তেমনি ঝিল্মিল্ করে কৃষ্ণ-কালো।
সে প্রেমের ঘাটে ঘাটে বাঁশি বাজায়
যদি দেখিস
তারে, দিস এই পদ্ম তার পায়
বলিস, কেন বুকে আশার
দেয়ালি জ্বালিয়ে
ফেলে গেল চির-অন্ধকারে॥
- ভাবসন্ধান: গানটির মূলভাব হলো বিরহ, স্মৃতি, প্রেমের প্রতি অটল আনুগত্য এবং হারানো প্রিয়জনকে ফিরে পাওয়ার আকুল প্রতীক্ষা। পদ্মা নদীর ঢেউ, হৃদয়-পদ্ম, মধু, সুগন্ধ, মৌমাছি, চাঁদের আলো ও প্রদীপ—এই সব প্রতীকের মাধ্যমে কবি দেখিয়েছেন যে, প্রিয়জনের বিচ্ছেদে মানুষের অন্তর্জগৎ কীভাবে শূন্য হয়ে যায়। তবু সেই শূন্যতার মধ্যেও প্রেমিকা আশা ছাড়ে না; সে তার হৃদয়কে প্রিয়জনের কাছে পাঠিয়ে দেয় এবং অন্ধকারের মধ্যেও মিলনের কোনো এক সম্ভাবনার জন্য অপেক্ষা করে থাকে।
গানটিতে বিরহিণী প্রেমিকার হৃদয়ের গভীর শূন্যতা, হারানো প্রিয়জনের জন্য আকুলতা এবং পুনর্মিলনের ক্ষীণ আশাকে অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী রূপকে উপস্থাপন করা হয়েছে। এখানে পদ্মা কেবল একটি নদী নয়; সে যেন বিরহিণীর মনের কথা বহনকারী এক জীবন্ত দূত। আর হৃদয়-পদ্ম হলো তার প্রেমময় অন্তর, যা প্রিয়জনের বিচ্ছেদে আজ শূন্য ও সৌন্দর্যহীন।
কবির কল্পনায় এই হৃদয় একদিন ছিল পূর্ণ প্রস্ফুটিত পদ্মের মতো। সেই পদ্মে ছিল প্রিয়তমের ‘রাঙা পা’—অর্থাৎ প্রিয়জনের সান্নিধ্য ও প্রেমের স্পর্শ। কিন্তু আজ সে প্রিয় মানুষটি হারিয়ে গেছে। তাই প্রেমিকার হৃদয়-পদ্মও তার সমস্ত মাধুর্য হারিয়েছে। সে পদ্মকে পদ্মার ঢেউয়ের হাতে তুলে দিয়ে বলে—তুমি একে নিয়ে যাও, হয়তো তোমার চলার পথে আমার হারানো প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা হবে।
‘মোর পরান-বঁধু নাই, পদ্মে তাই মধু নাই’—এই পঙ্ক্তিতে বিরহের মূল সত্যটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রিয়জনের উপস্থিতিই ছিল তার জীবনের মধু, সৌন্দর্য ও আনন্দের উৎস। সেই প্রিয়জন নেই বলেই চারপাশের প্রকৃতিও আজ তার কাছে প্রাণহীন। বাতাস বইছে, কিন্তু সেই পরিচিত সুগন্ধ নেই; রূপের সরসীতে আনন্দের মৌমাছিও আর গুঞ্জন করে না। অর্থাৎ, বাহ্যজগৎ আগের মতো থাকলেও প্রেমহীন হৃদয়ের কাছে সমস্ত সৌন্দর্যই নিষ্প্রাণ।
গানটির পরবর্তী অংশে প্রিয়তমের রূপস্মৃতি বিরহিণীর হৃদয়ে আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। পদ্মার ঢেউ যেমন চাঁদের আলোয় ঝিলমিল করে, তেমনি তার প্রিয়তমের ‘কৃষ্ণ-কালো’ রূপ স্মৃতির মধ্যে দীপ্ত হয়ে ওঠে। এখানে কৃষ্ণ-কালো ব্রজধামের কৃষ্ণের রূপকে রূপকার্থের ব্যবহার করা হয়েছে। যেন কৃষ্ণের কালো রূপের সাথে রাধার ঝিলমিল আলোর যে মিলন ঘটেছে, তা প্রেমের এক গভীর সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে। অন্ধকার বর্ণও প্রেমিকার চোখে আলোকময়, কারণ প্রিয়জনের রূপই তার হৃদয়ের সৌন্দর্যের উৎস।
প্রিয়তমকে সে কেবল নিজের কাছে ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাই প্রকাশ করে না; পদ্মার ঢেউকে তার কাছে এক দূতের মতো পাঠায়। সে বলে, যদি প্রিয়জনের দেখা পাও, তবে এই হৃদয়-পদ্মটি তার পায়ের কাছে দিয়ে দিও। এই নিবেদন আত্মসমর্পণের প্রতীক—তার হৃদয়, তার প্রেম, তার সমস্ত অনুভূতি এখনও সেই প্রিয়তমেরই।
গানটির শেষের আবেদনটি সবচেয়ে বেদনাময়—প্রিয়জন কেন তার বুকে আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে তাকে চির-অন্ধকারে ফেলে চলে গেল? প্রেম একদিন তাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, মিলনের আশায় হৃদয় আলোকিত করেছিল। কিন্তু বিচ্ছেদের পর সেই আশাই আজ আরও গভীর যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আশার আলো জ্বালিয়ে চলে যাওয়ার ফলে বর্তমানের অন্ধকার আরও অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
- রচনাকাল ও স্থান:
গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না।
১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জুন (শনিবার ৩১ জ্যৈষ্ঠ
১৩৪৮), সন্ধ্যা ৮.০০টা প্রথম
কলকাতা বেতার থেকে প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪২ বৎসর ১ মাস।
- গ্রন্থ:
- নজরুল গীতি, অখণ্ড
- প্রথম সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৬ আশ্বিন ১৩৮৫। ২৩ সেপ্টেম্বর
১৯৭৮]
- দ্বিতীয় সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ১ শ্রাবণ ১৩৮৮। ১৭ জুলাই
১৯৮১]
- তৃতীয় সংস্করণ [ব্রহ্মমোহন ঠাকুর সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। ৮ মাঘ ১৪১০। ২৩ জানুয়ারি ২০০৪। লোকগীতি। ২০৬৯ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ৫৪৭]
§ পরিবর্ধিত সংস্করণ [আব্দুল আজীজ আল-আমান সম্পাদিত। হরফ প্রকাশনী। বৈশাখ শ্রাবণ ১৪১৩। এপ্রিল-মে ২০০৬] ভৈরবী-গজল। ১৮০১ সংখ্যাক গান। পৃষ্ঠা:
৩৫৭।
- নজরুল-সংগীত সংগ্রহ [রশিদুন্ নবী সম্পাদিত। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। তৃতীয় সংস্করণ দ্বিতীয় মুদ্রণ, আষাঢ় ১৪২৫। জুন ২০১৮। গান ৪৭। পৃষ্ঠা
১৬]
-
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
দ্বিতীয় খণ্ড। স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ।
প্রথম প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ [কবি নজরুল ইন্সটিটিউট। পৌষ ১৪০২। ডিসেম্বর ১৯৯৫। ২২ সংখ্যক গান। পৃষ্ঠা ১০৬-১১১]
- বেতার: কলকাতা বেতার।
পদ্মার ঢেউ (গীত চিত্র)। [১৪ জুন
১৯৪১ (শনিবার ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৪৮)] শিল্পী: শৈল দেবী
- রেকর্ড:
হিন্দুস্থান রেকর্ড
[নভেম্বর ১৯৪১ (কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৪৮)। এইচ ৯৬৯। শিল্পী
শচীন দেববর্মণ।
- স্বরলিপি ও স্বরলিপিকার:
সুধীন দাশ।
নজরুল-সঙ্গীত স্বরলিপি,
দ্বিতীয় খণ্ড। কবি নজরুল ইন্সটিটিউট, ঢাকা। ফাল্গুন ১৪১১। ফেব্রুয়ারি ২০০৫। ২২ সংখ্যক গান। [স্বরলিপি:
নমুনা]
- পর্যায়:
- বিষয়াঙ্গ: প্রেম। বিরহ
- সুরাঙ্গ:
ভাটিয়ালি।
- তাল:
দাদরা।
- গ্রহস্বর: সা।