প্যালেস্টাইন অঞ্চলটির নামের উল্লেখ পাওয়া যায় মিশরের হাইরোগ্লিফস লিপিতে 'প্যালেসেট'
হিসেবে। ১১৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশরের রাজা রামসেস তৃতীয়ের সাটে এই অঞ্চলের
মানুষের যুদ্ধের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর সাতটি প্রাচীন লিখায় অঞ্চলিক নাম পালাশটু
এবং পিলিস্টু পাওয়া যায়। এ সব রচনা থেকে প্যালেষ্টাইনের প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে
নিশ্চিত হওয়া যায় না।
পঞ্চদশ শতাব্দীতে রচিত প্রাচীন গ্রিক ভাষায় রচিত গ্রন্থাদি থেকে জানা যায়, ফোনেশিয়া
এবং মিশরের ভিতরে অবস্থিত অঞ্চলটি হলো প্যালেস্টান। হেরোডোটাস-এর মতে প্যালেস্টাইন
ছিল তৎকালীন সিরিয়ার একটি জেলা। এর সাথে যুক্ত ছিল জুডিন পর্বতমালা এং জর্ড রিফ্ট
উপত্যাকা। এ্যারিস্টোটেলের বর্ণানায় এর যুক্ত হয়েছিল মৃত সাগর। এরপর থেকে বহু দিন
প্যালেষ্টাইনের অবস্থান একই ভাবে উল্লেখ করা হয়েছে বিভিন্ন গ্রন্থে। পরে সামান্য
কিছু হেরফের হল- সব মিলিয়ে মোটা দাগে এর অবস্থান দাঁড়িয়েছিল- ভূমধ্যসাগর এবং জর্ডন
নদীর মধ্যবর্তী স্থান হিসেবে।
১৮ লক্ষ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে
আফ্রিকা থেকে আগত
হোমো স্যাপিয়েন্সদের কয়েকটি দল
ব্র্তমান
প্যালেস্টাইন
অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। প্রাচীন
প্যালেস্টাইনের
জর্ডন উপত্যাকায় অবস্থিত
উবেইদিয়া
নামক এরূপ একটি প্রাচীন জনপদে এর নমুনা পাওয়া যায়। প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার সূত্রে
এখানে পাওয়া গেছে ১৭ লক্ষ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মানুষ এবং অন্যান্য কিছু প্রাণীর
জীবাশ্ম। এ সকল জীবাশ্মের পাশাপাশি পাওয়া গেছে
পাথুরে দিয়ে
হস্ত-কুঠার
ও অন্যান্য উপকরণ।
![]() |
প্যালেস্টাইন মানবের করোটি |
বর্তমান
ইস্রায়েলের উচ্চ গ্যালিলিয়ের 'মুঘারেত এল-জুত্তিয়েহ'
গুহায় পাওয়া গেছে আদিম মানুষের করোটি। প্রত্মতাত্ত্বিকরা একে 'প্যালেস্টাইন মানব' নামে অভিহিত করেছেন।
এই করোটির সূত্রে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এই গুহার মানুষ বাস করতো প্রায় ৫ থেকে ২
লক্ষ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। এই সকল করোটির অধিকারী প্রজাতিকে অবশ্য মনে করা হয়
হোমো নিয়ানডার্থালেনসিস ধরনের
হোমো স্যাপিয়েন্স।
ইস্রায়েলের
নাজারথ শহরের দক্ষিণ কাফজেহ পার্বত্য এলাকায় প্রাপ্ত জীবাশ্ম অনুসারে ধারণা করা হয়,
এই অঞ্চলে আধুনিক মানুষ ১ লক্ষ থেকে ৯০ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বসতি গড়ে তুলেছিল।
এরূপ ৬০ থেকে ৪৮ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের জীবাশ্ম পাওয়া গেছে
ইস্রায়েলের
কেবারা গুহায়। এ সকল প্রত্নতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে প্রাপ্ত জীবাশ্ম অনুসরণে ধারণা করা
যায়, ৫ লক্ষ থেকে অন্তত ৪৫ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের ভিতরে প্যালেস্টাইন অঞ্চলে
বিচ্ছিন্নভাবে মনুষ্যবসতি গড়ে উঠেছিল। এরা ছিল মূলত
শিকারী। ১২,৫০০
থেকে ৯,৫০০
খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে ভূমধ্যসাগরের পূর্বাঞ্চলে এরা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে
পড়েছিল। সাধারণভাবে এই অঞ্চলকে বলা হয় লেভান্ট
(Levant)।
এই সময়ের প্যালেস্টাইন অঞ্চলের
মানবগোষ্ঠীর হাতে
নাটুফিয়ান সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল।
নাটুফিয়ান সভ্যতার জনগোষ্ঠী হয়তো আদিম কৃষিকাজ আয়ত্ব করতে
সক্ষম হয়েছিল। এরা রুটি প্রস্তুত করার কৌশল জানতো। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে এই অঞ্চলের
অন্তর্গত উত্তর-পূর্ব জর্ডানের হারেত আল-শ্যাম অঞ্চল থেকে পাওয়া গেছে পৃথিবীর
প্রাচীনতম রুটি।
এই সময় পৃথিবীর শেষ বরফযুগের অন্তিম দশায় ছিল। এর দক্ষিণে ছিল জুদাহ সাম্রাজ্য,
মোয়াব সাম্রাজ্য এবং মৃত সাগর, পূর্বে ছিল আম্মান সাম্রাজ্য। ৯৬০০
খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে বরফযুগ শেষ হয়ে গেলে সেকালের
প্যালেস্ট্যান অঞ্চল বেশ উষ্ণ হয়ে উঠেছিল। ৯০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে জেরিকো
অঞ্চলে কিছু মানুষ স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেছিল। এর ভিতর দিয়ে
জেরিকা সভ্যতা শুরু
হয়েছিল। এরা কৃষিকাজ ছাড়াও পশু শিকারে পারদর্শী ছিল। বিশেষ করে গ্যাজেল জাতীয় পশু শিকার করতো
মাংসের জন্য। সম্ভবত আধুনিক সেমেটিক মানুষের এরা পূর্বপুরুষ ছিল।
এরা
নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ৮০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে ৪০ হাজার বর্গমিটার জুড়ে,
মাটির ইট দিয়ে নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেছিল। এর উচ্চতা ছিল ৩.৬ মিটার (১১.৮ ফুট)।
কোনো গবেষকদের মতে এর উচ্চতা ছিল প্রায় ৪ মিটার (১৩ ফুট)। এর প্রস্থ ছিল ১.৮ মিটার (৫.৯ ফুট। এই প্রাচীরে অভ্যন্তরে একটি পাথরের টাওয়ার
ছিল। এর উচ্চতা ছিল ৮.৫ মিটার (২৮ ফুট) এবং ভিত্তিভূমির প্রস্থ ছিল ৯ মিটার (৩০
ফুট)। এর ভিতরে ছিল ২২টি ধাপের সিঁড়ি। ধারণা করা হয়, এই টাওয়ারটি এরা নির্মাণ
করেছিল বন্যা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য। এছাড়া বিভিন্ন উৎসবে এই টাওয়ারটি ব্যবহৃত
হতো।
এই নগরীর জন্য সংখ্যা ৩ শত থেকে ৩ হাজারের ভিতরে ছিল। প্রথম দিকে এরা শিকারী থাকলেও
পরে ধীরে ধীরে কৃষিকাজ শুরু করেছিল। এদের উৎপাদিত শষ্যের তালিকায় ছিল গম, বার্লি
এবং লেগুম জাতীয় বীজ।
৭০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে এই অঞ্চলে অন্য জাতিগোষ্ঠীর মানুষের আবর্ভাব ঘটে। এর
আদিবাসীদের ঘরবাড়ি দখলের সাথে সাথে- এই অঞ্চলের সংস্কৃতি গ্রহণ করে। সেই সাথে এরা
কৃষিকাজে অভ্যস্থ হয়ে পড়ে। সম্ভবত এই সময় এরা কৃষিকাজের পাশাপাশি প্রয়োজনীয়
বৃক্ষরোপণ করা শুরু করে। শস্য
সংরক্ষণের জন্য এদের শস্যাগার ছিল।
ধারণা করা হয়, এদের সময় মানুষের এরা গৃহপালিত পশুর তালিকায় ভেড়া অন্তর্ভুক্ত হয় এবং
ধীরে ধীরে ভেড়াকে এরা অন্যতম পশুসম্পদে পরিণত করে।
তবে এরা ঐতিহ্যগতভাবে শিকারও করতো।
এরাও আদিবাসীদের মতো রৌদ্রে শুকানো ইটের ঘরের বসবাস করতো। এদের বাড়ির মাঝখানে থাকতো
আঙিনা। একাধিক কক্ষবিশিষ্ট ঘরে ব্যবহার এই সময় থেকে শুরু হয়েছিল।
ধারণা করা হয়, এরা গোড়ার দিকে শস্য এবং পশুর জন্য ঘর
তৈরি করলেও নিজেরা বসবাসের জন্য ঘরের ভিতরে কাটানো পছন্দ করতো না। কারণ এই সভ্যতার
শেষের দিকে তাদের গৃহপালিত পশুর প্রতি যত্ন নিতে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিল। খ্রিষ্টপূর্ব
৮৫০০ অব্দের দিকে এরা বসবাসের জন্য ঘরের ভিতরভাগকে সুরক্ষিত করা শুরু করেছিল।
এরা সাধারণ পাথর, চুন, গ্রানাইড জাতীয় উপাদান মিশিয়ে ঘরের শক্ত মেঝে তৈরি করতো।
দেওয়ালে এরা কাদা ব্যবহার করতো। অন্যান্য ঘরের চেয়ে রান্না-ঘর অপেক্ষাকৃত ছোটো ছিল।
খ্রিষ্টপূর্ব ৭৫০০ অব্দের দিকে এরা পুরোপুরি গৃহীতে পরিণত হয়েছিল। চুনাপাথরের চূর্ণ
দিয়ে থেকে পাত্র তৈরি করা শিখেছিল এই সময়ে। এরা মৃতদেহ কবর দিতো।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এরা বাসগৃহের নিচেই মাটির গভীরে মৃতদেহ কবর দিত। এরা নানা ধরনের পাথরের অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করতো।
![]() |
জেরিকোর ধ্বংসাবশেষ |
বাইবেলের তথ্যসূত্র (জোশুয়া গ্রন্থ) অনুসারে অনুমান করা হয় যে, ১৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে, ইস্রায়েল সাম্রাজ্যের রাজা জোশুয়া জর্ডন নদী অতিক্রম করে কনান অঞ্চলে প্রবেশ করে। এরা জেরিকোর প্রতিরক্ষা দেওয়াল ধ্বংস করে, জেরিকো দখল করে নেয়। অবশ্য ভূমিকম্পের কারণে পরে এর পুরো দেওয়ালই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। মূলত ইস্রায়েলদের দখলের মধ্য দিয়ে জেরিকো সভ্যতার বিলুপ্তি ঘটেছিল।
সূত্র: