ফরাসি
ইন্দো-ইউরোপিয়ান ভাষা পরিবারের অন্তর্গত একটি ভাষা বিশেষ। এর প্রধান নাম ফরাসি,
আর ভাষাটির নিজস্ব নাম
français (ফ্রঁসে)। ইংরেজি:
French
রোমানদের গল অঞ্চল বিজয়ের পর সেখানে প্রচলিত লাতিন ভাষা স্থানীয় কেল্টীয় ভাষা এবং পরে জার্মানিক ফ্রাঙ্ক জাতির ভাষার প্রভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে। এই দীর্ঘ ভাষাবিবর্তনের মধ্য দিয়েই প্রাচীন ফরাসি এবং পরবর্তীকালে আধুনিক ফরাসি ভাষার জন্ম হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ১২৫–১২০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে
রোমানরা দক্ষিণ গলের ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল দখল করে। পরে এই
অঞ্চল রোমান প্রদেশ
Gallia Narbonensis
নামে পরিচিত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ১২১ অব্দে অঞ্চলটি
আনুষ্ঠানিকভাবে রোমান শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই অঞ্চলটি ছিল বর্তমান দক্ষিণ
ফ্রান্সের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ও ইতালি থেকে স্পেনের দিকে
যাওয়ার স্থলপথ নিয়ন্ত্রণের জন্য অঞ্চলটির বিশেষ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ছিল।
ফরাসি ভাষার উৎপত্তিগত ধারা
- খ্রিষ্টপূর্ব ১ম শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টীয়
৩য় শতাব্দীর ভিতর
প্রচলিত গল অঞ্চলের কথ্য লাতিন ভাষা, ফরাসি ভাষার ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৫৮–৫০ অব্দ থেকে
জুলিয়াস সিজারের গল বিজয়ের পর রোমান প্রভাব ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে।
তৎকালীন গল অঞ্চলের অধিবাসীরা প্রধানত বিভিন্ন কেল্টীয় ভাষা ব্যবহার করত।
রোমান শাসনের ফলে সেখানে—
স্থানীয় কেল্টীয় ভাষা ও কথ্য লাতিন
পারস্পরিক সংস্পর্শে আসে।
ক্রমে লাতিন প্রধান ভাষায় পরিণত হলেও স্থানীয় ভাষার কিছু প্রভাব থেকে যায়।
- খ্রিষ্টীয় ৩য়–৫ম শতাব্দীর ভিতর গল অঞ্চলে ব্যবহৃত কথ্য লাতিন ধীরে ধীরে রোমের লাতিন থেকে পৃথক হতে শুরু করে।
এই পরিবর্তিত ভাষাগত রূপকে সাধারণভাবে বলা হয়—
গ্যালো-রোমান। এই পর্যায়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে—
- লাতিনের ব্যাকরণ সরল হতে থাকে।
জটিল বিভক্তির ব্যবহার কমে।
- উচ্চারণে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে।
- স্থানীয় কেল্টীয় প্রভাব যুক্ত হয়।
- খ্রিষ্টীয় ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীর
ভিতর রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিমাংশ দুর্বল হওয়ার পর জার্মানিক জাতিগোষ্ঠীগুলো গল অঞ্চলে প্রবেশ করে। রাইন নদীর নিম্ন ও মধ্যাঞ্চলের বিভিন্ন জার্মানিক গোষ্ঠীর সমষ্টিগত
নাম ছিল ফ্রাঙ্ক। খ্রিষ্টীয় ৩য় শতক থেকে রোমান সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে তাদের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ফ্রাঙ্কদের রাজনৈতিক আধিপত্যের ফলে গল অঞ্চলের নাম ক্রমে—
Francia
হয়ে ওঠে। এই সময় এই অঞ্চলে জার্মানিক ভাষার প্রভাব বৃদ্ধি পায়।
- খ্রিষ্টীয় ৬ষ্ঠ-৯ম শতাব্দীর
ভিতর রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর বিভিন্ন অঞ্চলের কথ্য লাতিন আরও দ্রুত পৃথক পথে বিকশিত হতে থাকে। ৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে
Council of Tours-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে ধর্মোপদেশ সাধারণ মানুষের বোঝার উপযোগী rustica romana lingua-
তে দেওয়ার কথা বলা হয়। এটি লাতিন ও রোমান্স কথ্যভাষার ক্রমবর্ধমান পার্থক্যের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য। ফরাসি ভাষার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলো—
Strasbourg-এর শপথ
(Oaths of Strasbourg)। এটি প্রাচীন ফরাসি বা ফরাসির পূর্ববর্তী গ্যালো-রোমান রূপের অন্যতম প্রাচীন লিখিত নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
এই সময় থেকেই আমরা স্পষ্টভাবে বলতে পারি—
গল অঞ্চলের কথ্য রোমান্স ভাষা লাতিন থেকে পৃথক একটি স্বতন্ত্র ভাষাগত পরিচয় লাভ করছে।
- খ্রিষ্টীয় ৯ম–১০ম শতাব্দীতে প্রাচীন ফরাসি ভাষার উৎপত্তি হয়।
এ সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—
প্রাচীন ফরাসি কোনো একক, অভিন্ন ভাষা ছিল না।
এটি ছিল উত্তর ফ্রান্সের বিভিন্ন রোমান্স উপভাষার একটি বৃহত্তর গোষ্ঠী।
এদের বলা হতো— Langues d'oïl
বাংলায় বলা যায়—
অয়েল ভাষাসমূহ। ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলে ছিল—
Langue d'oc
এই দক্ষিণাঞ্চলীয় ভাষাগত ধারার আধুনিক প্রধান প্রতিনিধি—অক্সিতান
ভাষা। মূলত উত্তর ফ্রান্স Langues d'oïl
থেকে আধুনিক ফরাসির বিকাশ লাভ করে।
- খ্রিষ্টীয় ১০ম-১৪শ শতাব্দীতে প্রাচীন ফরাসি
ভাষার প্যারিসীয় রূপ লাভ করতে থাকে। ৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে হিউ ক্যাপে-এর মাধ্যমে ক্যাপেটীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর প্যারিস ও
Île-de-France অঞ্চলের রাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে।
রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সঙ্গে ওই অঞ্চলের ভাষার মর্যাদাও বৃদ্ধি পায়।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন—
আধুনিক মানক ফরাসি কোনো একদিনে
‘Francien’ নামের একটি ভাষা থেকে হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি।
বরং প্যারিস ও Île-de-France
অঞ্চলের ভাষার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সাহিত্যিক প্রভাব ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে পরবর্তীকালের
প্রমিত ফরাসির ভিত্তি গড়ে তোলে।
- খ্রিষ্টীয় ১৪শ–১৬শ শতক
প্যারিস অঞ্চলের প্রচলিত ভাষারীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ১৫৩৯ খ্রিষ্টাব্দে
ফরাসি ভাষার ইতিহাসে এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বছর।
রাজা Francis I-এর
Ordinance of Villers-Cotterêts-এর মাধ্যমে প্রশাসনিক ও আইনগত দলিলে লাতিনের পরিবর্তে ফরাসির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়।
এর ফলে—
ফরাসি ভাষা প্রশাসনের প্রধান ভাষা হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান লাভ করে।
এটি ফরাসির মান্যরূপ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ ছিল।
এই সময় পুরোনো ব্যাকরণগত বিভক্তির অনেক রূপ বিলুপ্ত হয়।
বাক্যে শব্দক্রম অপেক্ষাকৃত স্থির হয়।
প্যারিসীয় ভাষার মর্যাদা বাড়ে।
সাহিত্যিক ফরাসির বিকাশ ঘটে।
শব্দভাণ্ডারে লাতিন ও গ্রিক উৎসের নতুন শব্দ যুক্ত হয়।
- খ্রিষ্টীয় ১৭শ
শতাব্দীতে আধুনিক ফরাসি ভাষার উৎপত্তি হয়। ১৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দ
কার্ডিনাল রিশেল্যুর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয়—
Académie française।
এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ফরাসি ভাষার—
শব্দভাণ্ডার
ব্যাকরণ
ব্যবহার
সাহিত্যিক মান
নিয়ন্ত্রণ ও মান্যকরণ।
এটি আধুনিক প্রমিত ফরাসির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
- ১৭শ–১৮শ শতক: এই সময়ে ফরাসি ইউরোপের অন্যতম প্রধান—
সাহিত্যিক ভাষা
রাজদরবারের ভাষা
কূটনৈতিক ভাষা
হয়ে ওঠে।
বিশেষত—
১৭শ শতক
ফরাসি সাহিত্য ও ভাষার তথাকথিত ধ্রুপদি যুগ।
১৮শ শতক
ফরাসি ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের অন্যতম প্রধান ভাষায় পরিণত হয়।
১৭৮৯ খ্রিষ্টাব্দ থেকে
ফরাসি বিপ্লবের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা শক্তিশালী হয়—
এক রাষ্ট্র, এক জাতীয় ভাষা।
তখনও ফ্রান্সের বহু মানুষ স্থানীয় ভাষা ব্যবহার করত, যেমন—
অক্সিতান
ব্রেটন
বাস্ক
আলসেশীয়
বিভিন্ন অয়েল ভাষা
কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ও প্রশাসনের মাধ্যমে মানক ফরাসির বিস্তার দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
- ১৮০০–১৯০০
খ্রিষ্টাব্দে গণশিক্ষার বিস্তার ঘটে।
বাধ্যতামূলক শিক্ষা
রাষ্ট্রীয় প্রশাসন
সেনাবাহিনী
সংবাদপত্র
ইত্যাদির মাধ্যমে মানক ফরাসি সমগ্র ফ্রান্সে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
ফলে বহু আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কমতে থাকে।
-
১৯০০–২০০০
ফরাসি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের কারণে—
আফ্রিকা
কানাডা
ক্যারিবীয় অঞ্চল
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল
ইত্যাদিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে থাকে।
এই সময় ফ্রাঙ্কোফোনি ধারণা শক্তিশালী হয়।
ফরাসি বর্ণমালা
ফরাসি ভাষায় মূলত লাতিন বর্ণমালা ব্যবহৃত হয়। ফরাসি বর্ণমালার উৎসের ধারাটি হলো—
ফিনিশীয় লিপি → গ্রিক লিপি → লাতিন লিপি → ফরাসি বর্ণমালা। ফরাসি ভাষার পূর্বপুরুষ লাতিন ভাষা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ফরাসি ভাষা লাতিন বর্ণমালা গ্রহণ করেছে।
আধুনিক ফরাসি বর্ণমালায় ২৬টি মৌলিক বর্ণ আছে। ইংরেজি বর্ণমালার মতোই এই ২৬টি অক্ষর ব্যবহৃত হলেও ফরাসিতে তাদের নাম ও উচ্চারণ ভিন্ন।
ফরাসি বর্ণমালায় সাধারণত ছয়টি স্বরবর্ণধর্মী অক্ষর ধরা হয়—
A, E, I, O, U, Y । অবশিষ্ট
ব্যঞ্জনবরণগুলো হলো- অবশিষ্ট অক্ষরগুলো প্রধানত ব্যঞ্জনবর্ণের কাজ করে—
B, C, D, F, G, H, J, K, L, M, N, P, Q, R, S, T, V, W, X, Z ।
ফরাসি বানানে থাকা সব ব্যঞ্জনবর্ণ সব সময় উচ্চারিত হয় না। যেমন—
petit শব্দে শেষের t সাধারণ অবস্থায় উচ্চারিত হয় না।