সাঁওতাল
ইংরেজি : Santal।

ভারত ও বাংলাদেশে  বসবাসকারী আদিবাসী বিশেষ। প্রায় ৬৫ হাজার বৎসর আগে, আফ্রিকা থেকে নরগোষ্ঠীর একটি বিশাল অংশ ধীরে ধীরে অন্যান্য মহাদেশের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল। এই দলটি প্রোটো-অস্ট্রালয়েড নামে বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন। এদের গায়ের রং কালো, নাক অনুচ্চ, চুল কালো ও কুঞ্চিত, উচ্চতা মাঝারি। প্রোটো-অস্ট্রালয়েড  মানব হিসেবে এদের সাথে বিশেষ নৃতাত্ত্বিক ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে মুণ্ডা ও মালপাহাড়িদের সাথে। আবার দ্রাবিড় সংস্কৃতিরও কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য এদের ভিতরে পাওয়া যায়।

এদের ভাষার নাম সাঁওতালি। উল্লেখ্য এই ভাষাটি অস্ট্রো-এশিয়াটিক ভাষা পরিবার-এর অন্তরর্গত। সাধারণভাবে এদের ভাষাকে অস্ট্রিক ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত ভাষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।  অস্ট্রিক ভাষাভাষী মানুষদের একটি বড় অংশ ভারতবর্ষের প্রবেশ করেছিল খাইবার বোলান গিরিপথ দিয়ে। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডাস-এর বিবরণ থেকে জানা যায়, সিন্ধু ও বেলুচিস্থানের কুটির শিল্পীদের বলা হতো সান্তাল। এই অঞ্চলে কিস্কু এবং মাণ্ডি গোষ্ঠীর লোকের সমভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠার কারণে আধিপত্যের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই সময় চাম্পা অঞ্চল ত্যাগ করে সান্তালরা উত্তর ও পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। সাঁওতালরা ভারত-উপমহাদেশের কৃষির পত্তন ঘটিয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন।

আর্যদের ভারতবর্ষে প্রবেশের পর বিভিন্ন অনার্যগোষ্ঠীর ভিতরে বিবাহাদি হতে থাকে। এই সময় আর্যদের আধিপত্য স্বীকার না করায়, অনেক স্থলে অনার্যদের সাথে আর্যদের সংঘর্ষ হয়। আর্যরা অপেক্ষাকৃত শক্তিশালী হওয়ায়, অনার্যদের অনেকে জঙ্গলে আশ্রয় নেয়। দীর্ঘদিন ধরে নগর সভ্যতার সাথে সম্পর্কীহীন থাকায় এরা অরণ্যচারী আদিবাসীতে পরিণত হয়। একালের সাঁওতালরা হলো সেই বিদ্রোহী অরণ্যচারী সাঁওতালদের উত্তরপুরুষ। পূর্ব-ভারতে পালিয়ে আসা সাঁওতালরা বনে জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় ছোটনাগপুর অঞ্চলে বসতী স্থাপন করে। যতদূর জানা যায়, এই অঞ্চলে মৌর্য সাম্রাজ্যের উত্থানের সময় পর্যন্ত (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০ অব্দ) এরা বেশ শান্তিতেই ছিল। এরপর থেকে সাঁওতালদের সাথে ভারতীয় মিশ্রজাতির লোকদের তিক্ততার সৃষ্টি হতে থাকে। তবে গোড়ার দিকে এই অসন্তোষ বড় হয়ে দেখা দেয় নি। নবাবী আমল পর্যন্ত সাঁওতালরা নিজেদের মতও চলতো। ইষ্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা দখল নেওয়ার পর, স্থানীয় জমিদার এবং পুলিশ প্রশাসনকে কর ও উৎকোচ প্রদানের ভার, ইউরোপীয় নীল-ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের নানাবিধ অত্যাচারে সাঁওতালদের জনজীবনকে দুর্বিসহ হয়ে উঠে। এই সূত্রে ১৮৫৫ খ্রিষ্টাব্দে সাঁওতালরা কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। ইতিহাসে এই বিদ্রোহকে বলা হয় 'সাঁওতাল বিদ্রোহ'।

সাঁওতালরা নিজেদেরকে খেরওয়াল বংশ বলে পরিচয় দেয়। গিবার্সন তাঁর
'Linguistic survey of India' গ্রন্থে লিখেছেন সাঁওতাল, মুণ্ডারি, ভূমিজ, কোড়া হো টুরি, আসুরি এবং কোরওয়া একই ভাষার ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এই সব আদিবাসীদের সকলকে এক সময়ে "খেরওয়ার বা থারওয়া' বলা হতো।

সাঁওতালরা বাংলাদেশের রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর ও বগুড়া জেলায় বসবাস করে। অন্যদিকে ভারতের রাঢ়বঙ্গীয় অঞ্চল, বিহার ও উড়িষ্যার অরণ্যাঞ্চল এবং ছোটনাগপুরে বসবাস করে।

১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারিতে দেখা যায় যে পাবনা, যশোর, খুলনা, এমনকি চট্টগ্রাম জেলায়ও অল্প সংখ্যায় সাঁওতালদের বসতি ছিল। ১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দের জরিপ অনুযায়ী বর্তমান বাংলাদেশ এলাকায় সাঁওতালদের সংখ্যা ছিল প্রায় আট লক্ষ। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পাক-ভারত বিভাগের পর লোকগণনার সময় সাঁওতালদের স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে গণ্য করা হয় নি। ফলে বহুদিন তাদের যথার্থ সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব হয় নি। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী সাঁওতাল জনসংখ্যা দুই লক্ষের বেশি। ২০০১ খ্রিষ্টাব্দের জরিপে এদের মোট সংখ্যা জানা যায় নি।

সাঁওতাল নামের উৎপত্তি
ধারণা করা হয় সংস্কৃত সামান্ত পাল (সীমান্ত রক্ষক) শব্দটি মধ্যযুগে 'সামন্ত আল' শব্দে পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন মেদেনীপুরের একটি অংশের নাম ছিল সাওন্ত বা সামন্তভূমি। এই শব্দই সাঁওতালদের ভিতরে শাওনতার হিসেবে প্রচলিত হয় বেশ আগে থেকে। কালক্রমে সাওন্ত>সাওন্তাল  বা শাওনতার থেকে সাঁওতাল শব্দটির প্রচলন হয়।

সাঁওতালদের গোত্র-উপগোত্র
আফগানিস্তানের অংশবিশেষের নাম ছিল কান্দাহার বা গান্ধার। আর সমগ্র সিন্ধু প্রদেশের নাম ছিল চায় চাম্পা। চাম্পা অঞ্চলে সান্তালদের ছিল ১৪টি গোষ্ঠীর ১৪টি কেল্লা বা গড়। এই গড়গুলো হলো
—

বর্তমানে সাওঁতালদের মোট ১২টি গোত্রের নাম পাওয়া যায়। এই গোত্র গুলো হলো— কিস্কু, হাঁসদা, মুর্মু, হেমব্রম, মাণ্ডি, সরেন, টুডু, বাস্কে, বেশরা, চঁড়ে, পাঁউরিয়া ও বেদেয়া। এদের ভিতরে বর্তমানে বেদেয়া গোত্রের লোক দেখা যায় না। এদের ভিতরে কিছু গোত্র কিছু কিছু বিশেষ কাজে দক্ষ ছিল। এই সকল গোত্রের লোকেরা কাজের সূত্রে বিশেষ নামে অভিহিত হতো।

এছাড়া অন্যান্যরা পৃথক নাম না পেলেও, তারাও বিশেষ কাজে পারদের্শী ছিল। যেম হেমব্রমরা করতো দেওয়ান-এর কাজ, বাস্কেরা করতো  ব্যবসা, হাঁসদা এবং টুডু-রা ছিল লোহার কর্মকার। এই গোত্রের লোকেরা নাকাড়া জাতীয় মাদল বাজনাতেও দক্ষ ছিল। আগে সাঁওতালরা নিজ নিজ গোত্রের জন্য চিহ্ন ব্যবহার করতো। বিশেষ করে গরু মহিষের গায়ে এরা নিজ গোত্রের চিহ্ন ব্যবহার করতো। ফলে তাদের গোত্রের প্রাণী খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল।

প্রতিটি গোত্রের রয়েছে নিজস্ব ধর্মীয় প্রতীক বা টোটেম। প্রতিটি গোত্রের রয়েছে বেশকিছু উপগোত্র। এ সকল উপগোত্রেরও রয়েছে পৃথক টোটেম। এই টোটেম নির্ভর ভাবনা থেকে এদের উপগোত্রে কিছু বিধিনিষেধ বা ট্যাবু মান্য করা হয়। নিচে গোত্র-ভিত্তিক পরিচয় তুলে ধরা হলো।

১. হাঁসদা গোত্র: সমাজে এদের প্রধান পরিচয় লোহার কর্মকার হিসেবে। এদের গোত্রীয় চিহ্ন এবং টোটেম ছিল হাঁস। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– সিঁদুর, সাদা রঙ, বুনো ছত্রাক, বেনা ঘাস ইত্যাদি। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র হাঁসদা। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ হাঁসদা, অবর হাঁসদা, কাঁড়া ওজা হাঁসদা, কাঁহু  হাঁসদা, কুণ্ডা হাঁসদা, কুহি হাঁসদা, কেডওয়ার হাঁসদা, গাড় হাঁসদা,  চিল বিন্দা হাঁসদা, জিহু হাঁসদা, নায়কে থিল হাঁসদা, পিট কাণ্ডা হাঁসদা, মাঝি থিল হাঁসদা, যুগী হাঁসদা, রকলুতুর হাঁসদা, রাতওয়ারা হাঁসদা, সলে হাঁসদা, সাঁক হাঁসদা, সাদা হাঁসদা,

২. কিস্কু: রাজ্য চালনায় সুদক্ষ ছিল। এই কারণে এদেরকে এই নামে অভিহিত করা হতো। কিস্কুদের চিহ্ন  ছিল লাঠি। এদের টোটেম শঙ্খচিল। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– কেয়াফুল, সাদা রঙঁ, শকুন, ঘোড়া, কাঠ বিড়াল এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র কিস্কু। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ কিস্কু, অবর কিস্কু, আড কিস্কু,  আবে কিস্কু, কাডা কিস্কু, কাতওয়ার কিস্কু, গাড় কিস্কু, জিহু কিস্কু, টিকা কিস্কু, নায়কে মিল কিস্কু, পাটি কিস্কু, বাদার কিস্কু, বিটল কিস্কু, মাঝি মিল কিস্কু, লাৎ কিস্কু, রকলুতুর কিস্কু, লাহের কিস্কু,  সন কিস্কু, সাদা কিস্কু।

৩. মুর্মু:  পৌরিহত্য করতো বলে, এদেরকে এই নামে অভিহিত করা হতো। এদের চিহ্ন ছিল লম্বা মই। এদের টোটেম নীলগাই। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– চাঁপাফুল, কুড়চিফুল, পলাশফুল, সাদা রং। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র মুর্মু। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ মুর্মু, অবর মুর্মু, কাডা মুর্মু, কুড়াম মুর্মু, কোলহা মুর্মু, গাজার মুর্মু, চাপোয়ার মুর্মু, জিহু মুর্মু, টিকা বা তিলক মুর্মু, টুটি মুর্মু, টুরকু লুনাম মুর্মু, নায়কে মিল মুর্মু, পোণ্ডু মুর্মু, বাদাড় মুর্মু, পোয়ার মুর্মু, বিটল মুর্মু, বোওয়ারা মুর্মু, মাঝি মিল মুর্মু, যুগি মুর্মু, লাৎ মুর্মু, সাওয়ার মুর্মু, সাং মুর্মু, সাদা মুর্মু, হাণ্ড মুর্মু।

৪. মাণ্ডি: এদের অন্য নাম মাণ্ডি কিসাঁড়া বা কিলিপসাড়। এরা কৃষিকাজ করতো বলে এদেরকে এই নামে অভিহিত করা হতো। এদের চিহ্ন ছিল  তীর। এদের টোটেম খেরদা নামক ঘাস। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– পিয়াল গাছ, ধ গাছ, ঘোড়া, সোনা, মিরুবাহা নামক ফুল। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র মাণ্ডি। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অবর মাণ্ডি, কাডা মাণ্ডি, কুলমি মাণ্ডি, কেদওয়ার মাণ্ডি, গদা মাণ্ডি, জনক মাণ্ডি, টিকা মাণ্ডি, টুরকু লুখাম মাণ্ডি, থাণ্ডা যোগাও মাণ্ডি, থিরু মাণ্ডি, নায়কে মিল মাণ্ডি, পোণ্ড মাণ্ডি, বাবড়ে মাণ্ডি, বিটল মাণ্ডি, বুবু বেরেৎ মাণ্ডি, ভগো মাণ্ডি, মাঝি মিল মাণ্ডি, মাড় মাণ্ডি, যারা মাণ্ডি, যুগী মাণ্ডি, রকলতুর মাণ্ডি, রত মাণ্ডি, রূপা মাণ্ডি, লাকি মাণ্ডি, সাদা মাণ্ডি, সিদুপ মাণ্ডি, হেগেল মাণ্ডি।

৫. হেবব্রম: দেওয়ান-এর কাজ করতো। এদের চিহ্ন ছিল আঁকশি। এদের টোটেম সুপারি। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– আমলকি গাছ, শকুন, তসর, শাঁখা, সাদা রং। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র হেবব্রম। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ হেবব্রম, অবর হেবব্রম, কুওয়ার হেবব্রম,গাড় হেবব্রম, গুয়া হেবব্রম, গুয়া সরেন হেবব্রম, ঠাকুর হেবব্রম, চাষা হেবব্রম, দাতেলা হেবব্রম, নায়কে মিল হেবব্রম, বাদার হেবব্রম,বিটল হেবব্রম, মাঝি মিল হেবব্রম, লাহের হেবব্রম, সলে হেবব্রম, সাৎ হেবব্রম, সাদা হেবব্রম, হাট হেবব্রম, হাণ্ডি হেবব্রম।

৬. সরেন: সরেনরা একসময় সৈনিক হিসেবে কাজ করতো। সেই থেকে সরেন সৈনিক নামে এরা পরিচিতি লাভ করে। এদের গোত্রীয় চিহ্ন ছিল হাঁস। এদের টোটেম সপ্তর্ষিমণ্ডল। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– আমলকি গাছ, শকুন, তসর, শাঁখা, সাদা রং, সিঁদুর। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র সরেন। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ সরেন, অবর সরেন, খাণ্ডা (বাদর) সরেন, গুয়া সরেন, চেহেল সরেন, জিহু সরেন, টুরকু সরেন, দাঁতেলা সরেন, নায়কে মিল সরেন, পেন্ড সরেন, বাজি সরেন, বিটল সরেন, মাও সরেন, মাঝি সরেন, মাণ্ডা সরেন, মাল সরেন, যুগী সরেন, রকতুল সরেন, লুমাম সরেন, সাঁক সরেন, সাজা সরেন, সাদা সিদুপ সরেন, সিদুপ সরেন।

৭. বাস্কে: এদের মূল পেশা ছিল ব্যবসা। এদের চিহ্ন ছিল লাঙ্গল। এদের টোটেম পান্তাভাত। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– কাঠ বিড়াল, সোনা, শকুন। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র বাস্কে। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ বাস্কে, অবর বাস্কে, কুহি বাস্কে, কেদওয়ার বাস্কে, গাড় বাস্কে, জাহের বাস্কে, জিহু বাস্কে, ঠুন্টা বাস্কে, নায়কে মিল বাস্কে, পটম বাস্কে, বিটল বাস্কে, বিন্দার বাস্কে, ভিডি বাস্কে, মাঝি মিল বাস্কে, মুণ্ডা বাস্কে, লাৎ বাস্কে, সাদা বাস্কে, সারুগতা বাস্কে, সুড়ে বাস্কে, হেন্দে বাস্কে।

৮. বেসরা: এদের চিহ্ন ছিল ঢেরা। এদের টোটেম বাজপাখি। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– কাক, শকুন, নিমকাঠি, হাঁড়িয়া। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র বেসরা। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ বেসরা, অবর বেসরা, কাহু বেসরা, কুসি বেসরা, গাড় বেসরা, গুয়া বেসরা, নায়কে মিল বেসরা, বাস্কে বেসরা, বিন্দাড় বেসরা, মন বেসরা, মাঝি বেসরা, রকলুতুর বেসরা, লাৎ বেসরা, সাদা বেসরা।

৯. টুডু: এর ছিল লোহার কর্মকার। এদের চিহ্ন ছিল টুইডুদের 'বৃত্তের ভিতর কাটা'। এদের মূল গোত্রে টোটেম জানা যায় নি। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– সোনা হাঁড়িয়া। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র টুডু। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ টুডু, অবর টুডু, আঙ্গারিয়া টুডু, কুডাম টুডু, খরহারা টুডু, গাড় টুডু, চিমি টুডু, চুরুচ টুডু, তিলক টুডু, দাতেলা টুডু, নায়কে মিল টুডু, বাঁবড়ে টুডু, বাস্কে টুডু, বিটল টুডু, ভক্তা টুডু, মাঝি মিল টুডু, যুগী টুডু, লাৎ টুডু, সাদা টুডু।

১০. চঁড়ে: এদের টোটেম গিরগিটি। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– শকুন ও সাদা রঙ। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র চঁড়ে। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ চঁড়ে, অবর চঁড়ে, কাহু চঁড়ে, গাড় চঁড়ে, চপেয়ার চঁড়ে, চাচারহাৎ চঁড়ে, ঠাকুর চঁড়ে, নায়কে মিল চঁড়ে, নিজ চঁড়ে, বিটল চঁড়ে, বিন্দার চঁড়ে, মাঝি মিল চঁড়ে, লাৎ চঁড়ে, সাদা চঁড়ে, সিঁদুর চঁড়ে।
 

১১. পাউরিয়া: এদের টোটেম পায়রা। এর উপগোত্রগুলোর উল্লেখযোগ্য টোটেম– শকুন কাঠ বিড়াল ও সাদা রঙ। এদের উপগোত্রগুলো হলো–

মূল উপগোত্র পাউড়িয়া। অন্যান্য উপগোত্রগুলো হলো– অক্ পাউড়িয়া, অবর পাউড়িয়া, গাড় পাউড়িয়া, চাউরিয়া পাউড়িয়া, নায়কে মিল পাউড়িয়া, নিজ পাউড়িয়া, পটম পাউড়িয়া, বিটল পাউড়িয়া, ভিতার পাউড়িয়া, মাঝি মিল পাউড়িয়া, মুণ্ডা পাউড়িয়া, লাৎ পাউড়িয়া, সাদা পাউড়িয়া, সিদুপ পাউড়িয়া, সোনা পাউড়িয়া।

১২. বেদেয়া: এই গোত্রের নাম কিছু বই পত্রে পাওয়া যায়। কিন্তু এদের সন্ধান পাওয়া যায় না। সম্ভবত এরা অন্য কোনো গোত্রের সাথে মিশে গেছে।

টোটেম-এর উপর ভিত্তি করে সাঁওতালদের গোত্রে নানা ধরনের প্রাণী হত্যা বা আচরণগত ট্যাবু মান্য করে। যেমন যে সকল গোত্রে সাদা রঙ টোটেম। তাদের মেয়েরা শাঁখা পড়ে না, সাদা মুরগী খায় না। যাদের ঘোড়া টোটেম। তারা ঘোড়া হত্যা করে না, ঘোড়া স্পর্শ করে না। দূর থেকে ঘোড়াকে প্রণাম করে।

সাঁতালদের ধর্ম বিশ্বাস
সাঁওতালরা মূলত ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে সর্বপ্রাণবাদী ও প্রকৃতি উপাসক। তবে মূর্তি পূজার চল নেই।  এদের সৃষ্টিকর্তার নাম 'ঠাকুরজিউ'। তবে সাঁওতাল পৌরাণিক কাহিনীতে একজন পরমস্রষ্টার কথা পাওয়া যায়। 

সাঁওতলাদের সৃষ্টিতত্ত্ব

আদিতে পৃথিবীতে জল ছাড়া আর কিছু ছিল না। পরমস্রষ্টা এই আদিম জল সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি ধীরে ধীরে কাঁকড়া, হাঙ্গর, কুমির, রাঘব-বোয়াল, বড় ইঁচা (চিংড়ি), কেঁচো, কচ্ছপ ইত্যাদি সৃষ্টি করলেন। এরপর তিনি মানুষ সৃষ্টির উদ্যোগ নেন। এরপর তিনি মাটি দিয়ে দুটি মানুষের মূর্তি তৈরি করলেন। সেই মূর্তি দুটিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নিলে আকাশ থেকে দুটি ঘোড়া এসে, তা পদদলিত করে নষ্ট করে দেয়। স্রষ্টা এতে পরম দুঃখে মানুষের পরিবর্তে পাখি তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।

একদিন চাঁদের মেয়ে স্নান করার সময়, তিনি তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে 'হাঁস-হাঁসিল' তৈরি করলেন। তিনি তাদের দেহে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করলে তারা আকাশে  উড়ে গেল।  কিন্তু তারা বসার মতো ডাঙা না পেয়ে হাঁস দুটি অনেকদিন জলে ভেসে বেড়ালো। এই সময় দিব্য ঘোড়া সমুদ্রের জলপান করার জন্য সূক্ষ্ম সুতায় ভর করে নেমে এলো।  এই সূতা সাগরের জলে ফেনার সৃষ্টি করলো। স্রষ্টা 'হাঁস-হাঁসলি'কে ওই ফেনার উপরে বসতে বললো। এই ফেনার উপরে চড়ে এরা সাগরময় ঘুরে বেড়াতে লাগলো- কিন্তু মাটির সন্ধান পেলো না। এরপর সৃষ্টিকর্তা কুমিরকে সাগরের তলা থেকে মাটি তুলে আনার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু কুমির সাগরতল থেকে মাটি তুলে উপরে আসার সময় সব মাটি গলে গেল। এরপর স্রষ্টা একে একে ইঁচা, রাঘব-বোয়াল, পাথর কাঁকড়া-কে এ্কই দায়িত্ব দিলনে। কিন্তু কেইউ এই কাজ করতে পারলো না। এরপর কেঁচো, কচ্ছপ এবং স্রষ্টার প্রচেষ্টায় মাটি তোলার কাজ সম্পন্ন হল। স্রষ্ট কচ্ছপকে সাগরের উপরে স্থির ভাসমান অবস্থায় রাখর জন্য, তার চার পায়ে শিকল বেঁধে দিলনে। এরপর কেঁচো সাগরের তলার মাটি খেয়ে লেজ দিয়ে কচ্ছপের পিঠের উপর মাটির স্তর তৈরি করলেন।  এই মাটির স্তর জমে সাগরের ভিতর থেকে বিশাল ভুখণ্ডের উৎপত্তি হয়েছিল।

সময়
এরা সৃষ্টিকর্তার কাছে খাবার প্রার্থনা করলো। সৃষ্টিকর্তা এই সময় মাটির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করলেন। সমুদ্রের তলদেশ থেকে মাটি তুলে আনার জন্য রাঘব বোয়াল, কাঁকড়া ও কচ্ছপদের দায়িত্ব দেওয়া হলো। এরা ব্যর্থ হলে, এই কাজ সম্পন্ন করলো কেঁচো। কেঁচো জলের উপর ভেসে থাকা কচ্ছপের পিঠের উপর লেজ রেখে, সমুদ্রের তলদেশে গিয়ে মাটি খেতে থাকল এবং তা লেজ দিয়ে বের করে দিতে থাকলো। এই ভাবে বিরাট কচ্ছপের পিঠের উপর সরের মতো মাটি জমে জমে পৃথিবী তৈরি হলো।

এরপর স্রষ্টা মাটির উপরিভাগে পর্বত, সমতলভূমি তৈরি করলেন। এরপর স্রষ্টা বেনাগাছ, দুর্বাঘাস, কড়মগাছ, শালগাছ, আসন গাছ, মউলগাছ সৃষ্টি করলেন। এরপর অন্যান্য গাছ তৈরি করে তিনি অরণ্যের সৃষ্টি করলেন।
এর কিছুদিন পরে হাঁসা দু'টো ডিম পাড়ল, এই ডিম ফুটে জন্ম নিল এক নারী ও পুরুষ। এদের নাম ছিল পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়ি। এরপর  সৃষ্টিকর্তা এই মানবশিশুদের বসবাসের জন্য হিহিড়ি-পিহিড়ি নামক স্থান নির্ধারণ করে দিলেন। হাঁস-দম্পতি এদের পিঠে করে  হিহিড়ি-পিহিড়িতে বসবাস করা শুরু করলো

সাঁওতালদের আদি মানব-মানবী

এরপরের কাহিনি আব্রাহামীয় ধর্মের মতো। সাঁওতালরা উত্তরাধিকারসূত্রে ছিল প্রোটো-অস্ট্রালয়েড গোষ্ঠীর। তাই মধ্যপ্রাচ্যে প্রচলিত মানুষ ও শয়তানের কাহিনি যুক্ত হয়েছে। সাঁওতাল পৌরাণিক কাহিনির আদি মানব-মানবী উলঙ্গ থাকতো।  লিট-এর (শয়তান) কুমন্ত্রণায় মদ তৈরি করা শিখিয়েছিল। একদিন উন্মত্ত অবস্থায় এদের দৈহিক সম্পর্ক  হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় আসার পর, এদের মনে উলঙ্গ অবস্থার জন্য লজ্জিত হয়। এরা বটে পাতা দিয়ে লজ্জাস্থান আবৃত করলো। কালক্রমে এদের মাধ্যমে আদিতে সাত কন্যা ও সাত পুত্রের জন্ম হয়।  পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়ি ঈশ্বরের নির্দেশমতো পুত্র ও কন্যাদের নিয়ে সিংবীর ও মান্বীর নামক দুটি পৃথক স্থানে রাখা হলো।  এদের বড় ছেলের নাম বয়ঃক্রমানুসারে এদের নাম ছিল সান্দ্রা, সান্ধম, চারে, মানে ও আচরে ডেলহু। বাকি দুটি পুত্রের নাম জানা যায় না। বয়ঃক্রমানুসার মেয়েদের নাম ছিল- ছিতা, কাপু, হিসি ও ডিমনি। অন্য দুটি মেয়ের নাম পাওয়া যায় না।

হাড়াম ছেলেদের বারণ করল কখনও মান্বীরে না যেতে। বুড়িও কন্যাদের নিষেধ করল সিংবীরে না যেতে। কিন্তু ঘটনাক্রমে এদের ভিতর দেখা হয়ে যায় এবং এরা বিবাহ করে। এই সূত্রে তৈরি হয় সাত দম্পতি থেকে ৭টি  বংশের সৃষ্টি হয়। এই বংশগুলো হলো- হাঁসদা, মুরমু, কিস্কু, হেমব্রম, মারান ডি, সোরেন ও টুডু৷। এরপর আপন বংশ বা গোত্রের মধ্যে-  আপন ভাইবোনের বিবাহ নিষিদ্ধ করে দেয়।

সাওতাল ধর্মতত্ত্বে মহাপ্লাবন

এরপর এরা খোজকামান দেশে চলে যায়। সেখানে তারা স্রষ্টার বিধি লঙ্ঘন করে অনাচারী হয়ে। পরে স্রষ্টা এদের ধ্বংস করার উদ্যোগ নেন।  স্রষ্টার আদেশ মান্যকারী দুই বুড়োবুড়িকে হারাতা পর্বতের গুহায় আশ্রয় নিতে বলেন। তারপর সাতরাত সাতদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টিতে মহাপ্লাবনের সৃষ্টি হয়। এই প্লাবনে এই পর্বতে আশ্রয়গ্রহণকারী ছাড়া সকল প্রাণীর মৃত্যু হয়। প্লাবন শেষে স্রষ্টা তাঁদের আহার ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দিলেন। এরা হারাত পাহাড় থেকে সাসাংবদে নামক প্রান্তরে আসেন। এখানেই এই দুই বুড়ো-বুড়ি থেকে নতুন মানব-গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছিল। এখানে এঁরা আগের নিয়মে  নতুন করে হাঁসদা, মুরমু, কিস্কু, হেমব্রম, মারান ডি, সোরেন ও টুডু৷গোত্রের সূচনা হয়।

প্লাবনোত্তর নব মানবগোষ্ঠী

সাসাংবেদে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এরা চলে আসে জারপি নামক দেশে। সেখানে অজ্ঞাত কারণে টিকতে না পেরে উঁচু পাহাড়ে আশ্রয় নেয়। সেখান থেকে তার বের হতে না পেরে ওই পর্বতকে দেবতাজ্ঞানে পূজা করা শুরু করে। পরে এই স্থান বের হওয়ার পথ খুঁজে পায়। একে সাঁওতালরা বাইদুয়ার বলে থাকে।  এখান থেকে তারা সূর্যদেবতার পূজা শুরু করেছিল। কারণ সূর্যোদয়ের দিক অনুসরণ করেই তারা এই পর্বত থেকে বেরিয় আসতে সক্ষম হয়েছিল। বর্তমানে পরমস্রষ্টার পরে সাঁতালদের কাছে এদের প্রধান উপাস্য দেবতা সিং বোঙ্গা (সূর্য দেবতা)। এছাড়া পর্বত দেবতা মারাং বুরু এদের ধর্মে বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

চায়-চম্পা
সাঁওতালদের মুখে মুখে প্রচলিত ইতিহাস ও সৃষ্টির আদি লোকগাথা (যেমন প্রখ্যাত কোলেন গুরু বর্ণিত সাঁওতালি পুরাণকথা) অনুযায়ী, প্রাক-ঐতিহাসিক ও মধ্যযুগীয় সময়ে তাদের পূর্বপুরুষরা ভারতের ছোটনাগপুর মালভূমি এবং হাজারীবাগ অঞ্চলের 'চায়-চম্পা'  নামক একটি অঞ্চলে বসবাস করতেন।

বাইদুয়ার দিয়ে এরা ধীরে ধীরে 'আয়রে', 'কায়েন্দে' ও 'চায়চম্পা' অঞ্চলে চলে আসে। সাঁওতাল ঐতিহ্য অনুযায়ী, চায়-চম্পা ছিল তাদের একটি সমৃদ্ধশালী রাজ্য ও স্বর্ণযুগ। সাঁওতালি পৌরাণিক ও লোকগাথা অনুযায়ী, চায়-চম্পা রাজ্যে তাদের বিভিন্ন গোত্র বা বংশের সুরক্ষার জন্য সুরক্ষিত গড় ছিল। তবে সকল গড় ও গোষ্ঠীর বিবরণ পাওয়া যায় না। গবেষকদের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রধান প্রধান গড় ও সেগুলোর সাথে জড়িত গোত্রগুলোর তালিকা নিচে দেওয়া হলো

১. চম্পাগড়। গোত্র: মুরমু। পুরোহিত বা ঠাকুর। এরা মুরমু ঠাকুর নামে পরিচিত
২. কঁয়ড়া বা কোয়েন্দা গড়। গোত্র: কিস্কু। রাজবংশ
৩. গড়ের নাম পাওয়া যায় নি। গোত্র: সরেন। এরা ছিল যোদ্ধা
৪. খায়রি গড়: গোত্র: হেমব্রম। হেমব্রম বংশের লোকেরা ছিল কুমার (মাটির পাত্র তৈরি করতো),
৫. বাদোসি গড়। গোত্র: মারণদি। এই গোত্রের লোকেরা ছিল ধনী মহাজন।
৬. সিম গড়। গোত্র: টুডু। এই গোত্রের লোকেরা এছাড়া এরা ঢাকঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজাতো।
৭. কুটামপুরি। গোত্র: হাঁসদা। সাধারণ গোষ্ঠী
৮. ময়নামতী। গোত্র: হাঁসদা। সাধারণ গোষ্ঠী
৯, বাদোলী গড়। গোত্র: মাণ্ডি। সাধারণ গোষ্ঠী
১০. গড়ের নাম পাওয়া যায় নি। বাসকে গোত্র: কামারের কাজ করত বাণিজ্য করতো

চম্পাদেশের সাঁওতালরা পর্বত দেবতা মারাংবুরু পূজা করতো নিয়মিত। এছাড়া ছিল গ্রামদেবী 'জাহের'। পাঁচ বৎসর অন্তরে সূর্যদেবতাকে বিশেষভাবে পূজা করতো।

বর্তামনে
এই দেবতা সমতলের সাঁতালদের কাছে গ্রামদেবতা হিসেবে পূজিত হয়ে থাকে। আর গৃহদেবতা হিসেবে তাই 'আবে বোঙ্গা'-কে মান্য করা হয়। নতুন গ্রামের পত্তন হলে, গ্রামের ভিতর দিয়ে একটি রাস্তা তৈরি করা হয়। এই রাস্তার মুখে শালকুঞ্জ তৈরি করে, তাতে মারাংবুরুকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। একে বলা হয় জাহের থান। এরূপ আর এজন দেবীকে গ্রামবাসী পূজা করে। এই দেবীর নাম জাহের এরা। অনেক সাঁওতাল শিব ও মনসা পূজা করে।

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনিতে সাঁওতাল
প্রাচীন সাঁওতালি লোককাহিনিতে  পাওয়া যায়- রাবণ রাজাকে পরাজিত করার সময় তারা রামকে সাহায্য করেছিল। যুদ্ধ শেষে এরা নিজেদের অরণ্যবেষ্টিত অঞ্চলে ফিরে এসেছিল।

চম্পা গড়ের পতন
লোকগাথা অনুসারে, পরবর্তী সময়ে একজন হিন্দু ভাবাপন্ন যুবরাজ বা বহিরাগত আক্রমণকারী (যার নাম মান্ধো সিং বা মাধো সিং বলা হয়) চম্পা গড় আক্রমণ করেন। মাধো সিং সাঁওতালদের এক সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করতে চান। কিন্তু সাঁওতালরা তাদের কঠোর সামাজিক প্রথা, বংশীয় শুদ্ধতা ও জাতিগত পবিত্রতা রক্ষার তাগিদে এই বহিরাগত বিয়ের তীব্র বিরোধিতা করেন।

মাধো সিং তখন সৈন্যসামন্ত নিয়ে সাঁওতালদের ওপর আক্রমণ চালান। সাঁওতালরা বুঝতে পারেন যে যুদ্ধ করলে হয়তো তাদের সমাজ ও রক্তের শুদ্ধতা নষ্ট হয়ে যাবে এবং তারা স্বাধীনতা হারাবেন। তাই তারা আত্মসমর্পণ বা প্রথার অমর্যাদা করার চেয়ে রাজ্য ত্যাগ করার কঠিন সিদ্ধান্ত নেন। এক রাতের অন্ধকারে পুরো সাঁওতাল জনগোষ্ঠী তাদের প্রিয় 'চায়-চম্পা' রাজ্য এবং সুরক্ষিত দুর্গগুলো ছেড়ে পূর্ব দিকে পালিয়ে যান। তারা দামোদর নদ পার হয়ে দীর্ঘ পরিভ্রমণের পর বর্তমান ঝাড়খণ্ডের ছোটনাগপুর মালভূমি ও সাঁওতাল পরগনা অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। এই ঘটনাটিকে সাঁওতাল জাতির ইতিহাসে তাদের স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদা রক্ষার অন্যতম বড় প্রতীকী ত্যাগ হিসেবে দেখা হয়।


 ভৌগোলিক দিক থেকে, প্রাচীন ভারতের অঙ্গ মহাজনপদের রাজধানী চম্পা নগরী (বর্তমান বিহারের ভাগলপুর), সাঁওতালদের ঐতিহাসিক বাসস্থান ঝাড়খণ্ডের সাঁওতাল পরগনা ও ছোটনাগপুর অঞ্চলের একেবারেই সংলগ্ন। ফলে ঐতিহাসিকভাবে পরিভ্রমণের সময় সাঁওতাল জনজাতির সাথে এই চম্পা অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক ও ভৌগোলিক সংযোগ তৈরি হয়েছিল।


সাঁওতালদের বিশ্বাস আত্মা অমর এবং সেই অনৈসর্গিক আত্মাই (বোঙ্গা) সব ঐহিক ভালমন্দ নির্ধারণ করে থাকে। তাই দৈনন্দিন পূজা-অর্চনায় বোঙ্গা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। 

সাঁওতালদের উৎসব
সাঁওতালরা খুবই উৎসবপ্রিয় জাতি। বাঙালিদের মতো এদেরও বারো মাসে তেরো পার্বণ। এদের বছর শুরু হয় ফাল্গুন মাসে। প্রায় প্রতিমাসে পরব বা উৎসব। এই উৎসবে নৃত্যগীতবাদ্য সহযোগে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই উৎসবগুলো বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়ে থাকে। যেমন
—

সাঁতালদের সমাজ
সাঁওতাল সমাজ প্রধানত কৃষিজীবী। কিন্তু আর্থ-সামাজিক কারণে দারিদ্র্য তাদের নিত্যসঙ্গী। তাই বাধ্য হয়ে অতি অল্প বিনিময়মূল্যে এরা চা বাগানে বা অন্যত্র শ্রম বিক্রয় করে। এছাড়া এরা মাটি কাটে, মোট বয় বা অনুরূপ দিনমজুরির কাজে নিজেদেরকে নিয়োজিত রাখে। এরা কঠোর পরিশ্রমে অভ্যস্ত। সাঁওতাল নারী-পুরুষ ওরাওঁদের মতো দেহে উল্কিচিহ্ন ধারণ করে। সাঁওতাল সমাজ এখনও ঐতিহ্যবাহী পঞ্চায়েতি ব্যবস্থায় পরিচালিত এবং গ্রামপ্রধান সমাজে বিশেষ মর্যাদা ভোগ করে থাকে। এই পঞ্চায়েত ৭টি পদস্থ ব্যক্তি পরিচালনা করে। এরা হলো- মাঝি, জগমাঝি, পারণিক, জগ-পারণিক, গোডেত, নায়কে ও কুডাম নায়কে।

সাঁওতালদের বিবাহ ও পারিবারিক অবস্থা
সাঁওতাল সমাজে বাল্য বিবাহ এবং বহু বিবাহ নেই। বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তাদের বিবাহের ব্যবস্থা আছে। এদের স্বগোত্রের ভিতর বিবাহ হয় না। সাধারণভাবে পিতামাতা বা অভিভাবকদের পছন্দে এবং অনুমোদনে বিবাহ হয়। তবে জোর করে বিবাহ করার রীতিও সাঁতাল সমাজে আছে। বিবাহ বহির্ভুত যৌন সম্পর্ক অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিবাহের প্রকৃতি অনুসারে, বিবাহ রীতিকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হলো
–

সাঁওতালদের মৃতদেহ সৎকার:
সাধারণত এরা মৃতদেহ দাহ করে। তবে অন্তঃসত্তা নারী এবং শিশুদের কবর দেওয়া হয়। কারো মৃত্যু হলে, গডেথ সেই সংবাদ গ্রামবাসীকে জানায়।  আত্মীয়রা মৃতদেহে তেল হলুদ মাখে এবং কপালে সিঁদুর দেয়। এরপর একটি খাটিয়া করে মৃতদেহকে চৌরাস্তায় এনে কিছুক্ষণ রাখা হয়। অশরীরী আত্মা যাতে মৃত্সৎকারে বাধা না দেয়, সে জন্য তারা তুলাবীজ ও খই ছিটায়।

শ্মশানের চিতায় মৃতদেহকে দক্ষিণ দিকে মাথা রেখে শোয়ানো হয়। এই সময় মুরগির বাচ্চা বলি দেওয়া হয়। এদের বিশ্বাস মুরগির বাচ্চার আত্মা মৃত ব্যক্তির আত্মাকে স্বর্গে নিয়ে যাবে। মুখাগ্নি করে পরিবারের বড় ছেলে। বড় ছেলে না থাকলে আত্মীয়দের ভিতরে কোনো একজন। মুখাগ্নির পরে পরিবারের সবাইও চিতায় আগুন দেয়। চিতাভস্ম কোনো গাছের নিচে পুঁতে রেখে স্নান করে শুদ্ধ হয়। পরবর্তী পাঁচদিন ধরে শ্রাদ্ধ হয়। একে বলা হয় 'তেল নাহান'।


সূত্র :