মল্লরাজবংশের তালিকা |
|
৬৯৪ খ্রিষ্টাব্দে আদিমল্লের দ্বারা রাজত্বের সূচনা হয়েছিল। তবে আদিমল্লের জন্ম এবং রাজ্যলাভের বিষয় কিংবদন্তি প্রচলিত রয়েছে। যেমন-
মাত্র পনেরো বছর বয়সেই তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী মল্লযোদ্ধা হয়ে ওঠেন। এই কারণে
তিনি আদিমল্ল (আদি বা অদ্বিতীয় মল্লযোদ্ধা) নামে পরিচিত লাভ করেন।
এই সময় প্রদ্যুন্নপুরের রাজা ছিলেন
নৃসিংহদেব। সম্ভবত পঞ্চানন ঘোষালের
সুপারিশে আদিমল্ল নৃসিংহদেবের সেনাবাহিনীতে স্থান
পেয়েছিলেন। আদিমল্লে সাহসিকতা ও বুদ্ধিমত্তা দেখে
নৃসিংহদেব মুগ্ধ হন। এই সময় প্রদ্যুন্নপুরের অধিনস্থ
যোত্বিহারের বিদ্রোহী সামন্তরাজ প্রতাপনারয়ণ বিদ্রোহ করলে,
নৃসিংহদেব প্রতাপনারয়ণকে দমন
করার জন্য আদিমল্লকে সসৈন্যে প্রেরণ করেন। যুদ্ধে
আদিমল্ল প্রতাপনারয়ণকে বন্দী
করেন। রাজা নৃসিংহদেব প্রতাপনারায়ণকে প্রাণদণ্ড
দেন। এর পুরস্কার স্বরূপ ৬৯৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতাপনারয়ণ
লাউগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের শাসনের অধিকার পান। এর কিছুদিন পর, অপুত্রক রাজা নৃসিংহদেব একমাত্র কন্যার সঙ্গে রঘুনাথের বিবাহ দেন।
এরপর তিনি বন-বিষ্ণুপুরে মল্ল রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। কালক্রমে আদিমল্লের
বংশধরেরা রাজ্যসীমা বৃদ্ধি করেন।
মল্লভূমে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার সম্বন্ধে একটি সুন্দর কাহিনী প্রচলিত আছে। শ্রীনিবাস আচাৰ্য্য, শ্যামানন্দ ও নরোত্তম ঠাকুর প্রভৃতি বৈষ্ণৰ মহান্তগণ বৃন্দবন হইতে গোস্বামিগণের গ্রন্থসমূহ পেটিকার মধ্যে করিয়া গো-শকটে মল্লভূমরাজ্যের মধ্য দিয়া গৌড়ে লইয়া আসিতেছিলেন। রাজ জ্যোতিষীর গণনামত পেটিকাগুলির মধ্যে ধনরত্ব আছে মনে করিয়া বীর হাম্বীর তাহার লোকজন দিয়া উহা লুন্ঠন করিয়া আনান । পুথিগুলির উদ্ধারের আশায় শ্রীনিবাস আচাৰ্য্য রাজসভায় গিয়া উপস্থিত হন। তাহার সৌম্যমূৰ্ত্তি দর্শন এবং ভগবস্তুক্তি ও অপূর্বব পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাইয়। রাজা বীর হাম্বীর তাহার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বীর হাম্বীরের বৈষ্ণব ধৰ্ম্মগ্রহণ মল্লভূমের ইতিহাসে এক নূতন অধ্যায়। অনেকেই বোধ হয় জানেন, কলিকাতার বাগবাজারে যে মদনমোহন ঠাকুর আছেন, তিনি বিষ্ণুপুর রাজবংশের কুলদেবতা। মল্লরাজ চৈতন্যসিংহ ইংরেজ আদালতে মোকদ্দমার খরচ সংগ্রহের জন্য এই বিগ্রহটিকে বাগবাজার নিবাসী প্রসিদ্ধ ধনী গোকুলমিত্রের নিকট বন্ধক রাখেন। বিষ্ণুপুররাজ গোপাল সিংহ নিয়ম করিয়াছিলেন যে তাহার রাজ্যবাসী প্রত্যেককেই প্রত্যহ নিদিষ্ট সংখ্যক হরিনাম জপ করিতে হইবে, ইহা যে না করিবে সে শাস্তি পাইবে। এই কাৰ্য্যকে লোকে “ গোপাল সিংহের বেগার " আখ্যা দিয়াছিল । অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে মাহারাটা বা বর্গীর উপযুঁ্যুপরি আক্রমণে ও গৃহবিবাদের ফলে মল্লরাজ্যের পতন হয়। ১৮০৬ খৃষ্টাব্দে মল্লভূম বৰ্দ্ধমানের মহারাজার নিকট বিক্রীত হয়। বিষ্ণুপুরে বহু প্রাচীন কীৰ্ত্তি আছে। উহাদের মধ্যে প্রাচীন দুর্গের গড়খাই, পাথর দরজা ও বীর দরজা নামক প্রস্তর নিৰ্ম্মিত দুৰ্গদ্বার, প্রসিদ্ধ “দলমৰ্দ্দন " বা “দলমাদল ” কামান, মল্লেশ্বর, মদনগোপাল, মদনমোহন, কালুচিাঁদ, শ্যামরায় ও রাধাশ্যামের মন্দির, জোড়বাংলা, রাসমঞ্চ, পঞ্চরত্ন মন্দির ; লালবাঁধ, কৃষ্ণবধ, যমুনাবাঁধ, শ্যামবাধ ও কালিন্দীবাঁধ, প্রভৃতি নামধেয় বাঁধ বা প্রকাও জলাশয় প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। বিষ্ণুপুরের মন্দিরগুলি প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য শিল্পের অপূবর্ব নিদর্শন। বস্তুত: বিষ্ণুপুর প্রাচীন বঙ্গের সংস্কৃতি ও সভ্যতার একটি প্রধান কেন্দ্র। বিষ্ণুপুরের সুবিখ্যাত দলমাদল কামানটির দৈর্ঘ ১২ ফুট ৫ ইঞ্চি ও পরিধি ১১ ইঞ্চি। গঠনে ইহা বিজাপুরের স্বপ্রসিদ্ধ কামান “ মালিক-ই-ময়দান ” এর অনুরূপ। ইহা এরূপ লৌহের দ্বারা প্রস্তুত যে আজ পর্য্যন্ত ইহার কোথাও একটু মরিচ ধরে নাই। ইহাতে স্বতঃই দিল্লীর প্রসিদ্ধ প্রাচীন ও মরিচাবিহীন লৌহস্তম্ভের কথা মনে হয়। বৰ্ত্তমানে এই কামানটি সরকারের রক্ষিত কীৰ্ত্তির অন্তর্গত । ইহার গায়ে ফাসিতে একটি লিপি খোদিত আছে, তাহা হইতে জানা যায় যে এই কামানটি প্রস্তুত করিতে একলক্ষ পচিশ হাজার টাকা লাগিয়াছিল। প্রবাদ যে মাহারাট সর্দার ভাস্কর পণ্ডিত ১৭৪২ খষ্টাব্দে বিষ্ণুপুর আক্রমণ করিলে রাজধানী রক্ষা করিবার জন্য স্বয়ং মদনমোহন দেব দলমাদল কামান দাগিয়া শত্রুসৈন্যকে দূরীভূত করিয়াছিলেন। মদনমোহন ও জোড়বাংলা মন্দিরের গাত্রে ইষ্টকের উপর যে সকল দৃশ্যাবলী উৎকীর্ণ আছে তাহা শিল্পসম্পদে বিশেষ সমৃদ্ধ । জোড়বাংলার গাত্রে একটি স্বন্দর নৌ-যুদ্ধের চিত্র আছে। উহা যবীপের প্রসিদ্ধ বোরোবুদুর মন্দির গাত্রের চিত্রাবলীর কথা সমরণ করাইয়া দেয় । লালীৰ পুষ্করিণী সম্বন্ধে জনশ্রুতি এই যে, রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ বরদার বিদ্রোহী রাজা শোভা সিংহকে যুদ্ধে পরাজিত করিয়া নুষ্ঠিত সামগ্রীর সহিত লালবাঈ নামে একটি অতি স্থলর মুসলমান রমণীকে লইয়া আসেন। লালবাঈএর সৌন্দর্ঘ্যে আকৃষ্ট হইয়া রাজা তাহার জন্য একটি স্বতন্ত্র মহাল
মল্ল রাজবংশের ৪৯তম শাসক বীর হাম্বীর ১৫৮৬ সালে সিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি ছিলেন
মুঘল সম্রাট
আকবরের সমসাময়িক। আফগানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে তিনি আকবরের পক্ষাবলম্বন করেন।
তিনি বাংলার সুবাদারের নিকট বার্ষিক রাজস্ব প্রদান করতেন এবং মুঘল সার্বভৌমত্ব
স্বীকার করে নেন।[১]
বীর হাম্বীর ছিলেন শক্তিশালী ও ধার্মিক রাজা। শ্রীনিবাস আচার্য তাকে
বৈষ্ণবমতে দীক্ষিত করেন। নরোত্তম দাস (ওরফে বলরাম দাস) রচিত প্রেমবিলাস
ও নরহরি চক্রবর্তী রচিত ভক্তিরত্নাকর গ্রন্থ থেকে জানা যায়, শ্রীনিবাস ও
অন্যান্য ভক্তেরা
বৃন্দাবন
থেকে
গৌড় যাত্রাপথে হাম্বীর কর্তৃক লুণ্ঠিত হন। কিন্তু শ্রীনিবাসের ভাগবত পাঠ শুনে
তিনি বৈষ্ণবধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং শ্রীনিবাসকে প্রচুর অর্থ ও
ভূসম্পত্তি দান করেন।[১]
বীর হাম্বীরের পুত্র রঘুনাথ সিংহ বিষ্ণুপুরের প্রথম রাজা যিনি ক্ষত্রিয় সিংহ
উপাধি ব্যবহার করেন। কথিত আছে, এই উপাধি মুর্শিদাবাদের নবাব তাকে প্রদান করেছিলেন।
তার রাজত্বকাল থেকেই বিষ্ণুপুর রাজ্যের স্বর্ণযুগের সূচনা ঘটে। রঘুনাথ সিংহের আমলে
বিষ্ণুপুরে নয়নাভিরাম প্রাসাদ ও মন্দিরাদি নির্মিত হয়। যদিও, রাজনৈতিকভাবে
বিষ্ণুপুর এই সময় তার স্বাধীনতা হারিয়ে অনেকটাই করদ রাজ্যের পর্যায়ে পর্যবসিত
হয়।[১]
১৬৫৬ সালে বীর সিংহ বর্তমান দুর্গ ও লালজি মন্দির নির্মাণ করেন। এছাড়া তিনি
লালবাঁধ, কৃষ্ণবাঁধ, গনতাতবাঁধ, যমুনাবাঁধ, কালিন্দীবাঁধ, শ্যামবাঁধ ও পোকাবাঁধ
নামে সাতটি বড়ো জলাধারও নির্মাণ করেন। ১৬৬৫ সালে তার মহিষী শিরোমণি বা চূড়ামণি
মদনমোহন ও মুরলিমোহন মন্দিরদুটি নির্মাণ করেন।
[১] ১৬৯৪ সালে দুর্জন সিংহ মদনমোহন মন্দির নির্মাণ করেন। পারিবারিক নথি অনুযায়ী,
বিষ্ণুপুরের রাজারা মুসলমান শাসকদের রাজস্ব প্রদান করলেও, অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তারা
স্বাধীনই ছিলেন। মুসলমান ঐতিহাসিকেরাও এই ব্যাপারে একই কথা লিখছেন। বিষ্ণুপুরের
রাজারা করদ রাজা হলেও, মুর্শিদাবাদের দরবারে তাদের উপস্থিত থাকতে হত না। তবে
মুর্শিদাবাদে তাদের একজন রাজপ্রতিনিধি থাকতেন।[১]
গোপাল সিংহ (১৭৩০-১৭৪৫) ছিলেন ধার্মিক রাজা। কিন্তু রাজ্যে সমাগত বিপদের
মোকাবিলা করার শক্তি তার ছিল না। ১৭৪২ সালে ভাস্কর রাওয়ের নেতৃত্বে মারাঠারা
বিষ্ণুপুর আক্রমণ করলে, তার বাহিনী কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তোলে। গোপাল সিংহ
সেনাবাহিনীকে দুর্গের মধ্যে প্রত্যাহার করে নেন ও দুর্গ সুরক্ষিত করেন। তিনি
নগরবাসীকে মদনমোহনের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করতে বলেন। কথিত আছে, মদনমোহন সেই ডাকে
সাড়া দিয়েছিলেন। বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত দলমাদল কামান মানুষের সহায়তা বিনাই নাকি
গর্জে উঠেছিল। সম্ভবত মারাঠারা কঠিন দুর্গপ্রাকার ধ্বংস করতে না পেরে ফিরে
গিয়েছিলেন। মারাঠারা এরপর রাজ্যের অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত অঞ্চলগুলিতে লুটতরাজ
চালায়। ১৭৬০ সালে
দ্বিতীয় শাহ আলমের যুদ্ধাভিযানের কালে মারাঠা সর্দার শেওভাট বিষ্ণুপুরকে সদর
করেছিলেন। মারাঠারা বিষ্ণুপুর ও বীরভূমের সীমান্ত অঞ্চলে এমন ভয়াবহ লুণ্ঠন চালান
যে, এই একদা-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলি জনবিরল হয়ে পড়ে।[১]
চৈতন্য সিংহও ধার্মিক রাজা ছিলেন। কিন্তু তাকেও প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন
হতে হয়। তিনি ধর্মকর্ম নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে, প্রশাসনিক কাজকর্ম কিছুই
দেখতেন না। এরই সুযোগ নিয়ে দামোদর সিংহ নামে তার এক জ্ঞাতিভাই ক্ষমতা দখলের চেষ্টা
করেন। তিনি মুর্শিদাবাদের দরবারে নিজের যোগ্যতা প্রমাণে সমর্থ হন। প্রথমে
সিরাজদ্দৌলা তাকে নিজ বাহিনী ধার দেন। কিন্তু তিনি বিষ্ণুপুর দখলে অসমর্থ হন।
ইংরেজদের হাতে সিরাজের পরাজয়ের পর
মীর জাফর দামোদর সিংহকে আরও শক্তিশালী বাহিনী ধার দেন। এইবার তিনি বিষ্ণুপুর
দখল করতে সমর্থ হন। চৈতন্য সিংহ মদন গোপালের বিগ্রহ নিয়ে কলকাতায় পালিয়ে আসেন।
এরপর রাজ্যের মালিকানা নিয়ে বহুদিন মামলা মোকদ্দমা চলে। এই মামলা চালাতে গিয়ে
বিষ্ণুপুর রাজ পরিবারের পতন সম্পূর্ণ হয়। শেষে ১৮০৬ সালে রাজস্ব বাকি রাখার দায়ে
রাজ্য বিক্রি হয়ে যায় এবং বর্ধমানের রাজা সমগ্র এস্টেটটি কিনে নেন।[১]
সূত্র :
৭১০ থেকে ৭৩৩ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দুজন মল্লরাজ (জয় মল্ল ও বেণু মল্ল ) রাজ্য
বিস্তার করেছিলেন কিনা সে বিষয়ে কিছু জানা যায়।
১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে সিংহাসনে বসেন ও কিনু মল্ল। এই সময় ইন্দ্রহংসের রাজা মল্লরাজ্য
আক্রমণ করে। এই যুদ্ধে ইন্দ্রহংসের রাজা পরাজিত হলে, মল্লভূমের সীমানা বৃদ্ধি
পায়। তবে এই যুদ্ধের পর কোন অঞ্চল মল্লরাজের অধিকারে আসে তা জানায় যায় না।
মল্লভূমের ৭ম রাজা (৭৭৫-৭৯৫ খ্রিষ্টাব্দ) শূর মল্ল, মেদিনীপুরের বাগদি এলাকা জয় করেন এবং এটিকে মল্লভূমের অন্তর্ভুক্ত করেন।
৮৪১ খ্রিষ্টাব্দে দ্বাদশ মল্লরাজ খড়গ মল্ল সিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর সময়
মেদেনীপুরের খড়গপুর মল্লরাজের অধিকারে আসে। কোনো কোনো মতে, এই নগরটির নামকরণ করা
হয়েছিল খড়গ মল্লের নামানুসারে।
মল্লভূমের ২৬তম রাজা (১০৯৭-১১০২ খ্রিষ্টাব্দ) ভীমমল্ল ঢাকেশ্বর নদীর উত্তর-পূর্ব
একটি গ্রাম স্থাপন করেন। তাঁর নামে ওই নদীর তীরে 'প্রকাশ ঘাট' নামক ব্যবসায়ীক
কেন্দ্র স্থাপিত হয়।
মল্লভূমের ৩৫তম রাজা (১২৪০-১২৫৩ খ্রিষ্টাব্দ), দামোদর নদ পর্যন্ত তাঁর রাজ্য
বিস্তার করেন।
মল্লভূমের ৩৭তম রাজা (১২৯৫-১৩১৯ খ্রিষ্টাব্দ) পৃথ্বী মল্ল, বিষ্ণুপুর থেকে ৪
কিলোমিটার দূরে শৈলেশ্বর ও শনরেশ্বর নামক দুটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
এই মল্লরাজ্যের বিস্তৃত ছিল- বাঁকুড়া জেলার কোতুলপুর, হুগলির আরামবাগ, জাহানাবাদ হয়ে হাওড়ার সীমান্ত, পশ্চিমে ছোটনাগপুর, দক্ষিণে মেদিনীপুর জেলার খড়্গপুর, তমলুক ও উত্তরে দামোদর নদ- আসানসোল পর্যন্ত।
আনুমানিক ১৬০০
খ্রিষ্টাব্দের শেষ ভাগে মল্লরাজ হাম্বীর পৃথিবীর সর্ববৃহৎ দলমাদল কামানটি তৈরী করিয়েছিলেন। বর্তমানে এটি রাসমঞ্চের দক্ষিনে সংরক্ষিত। ৬৩টি পেটাই লৌহ বলয়কে পরপর ঝালাই করে বিষ্ণুপুর শাখারি বাজারের জনৈক জগন্নাথ কর্মকার ১২ ফুট্ ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্যের কামানটি তৈরী করেন যার ওজন ২৯৬ মন। কথিত আছে একটি ধর্মশিলার নামানুসারে প্রস্তুতকারক কামানটির নাম রাখেন দলমাদল। ইতিহাসের তথ্য অনুসারে আনুমানিক ১৭৪২ খৃীষ্টাব্দে মারাঠা (বর্গী) সর্দার ভাস্কর বাড্-এর আক্রমনের জবাবে মল্লরাজ গোপাল সিংহ কামানটি ব্যবহার করেন। কথিত আছে বর্গি আক্রমনের সময় বিষ্ণুপুরকে রক্ষার জন্য সয়ং ঁমদনমোহন জীউ নিজে এই কামান দেগেছিলেন। তাই আজও স্থানীয় মানুষ কামান স্পর্শ করে প্রনাম করে। ১৯২৫ খৃীঃ রাখীপূর্ণিমার দিনে এই কামানের গায়ে ঠেস দিয়ে তোলানো কাজী নজরুল ইসলামের ছবিটি বিষ্ণুপুর ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’ ভবনে সংরক্ষিত রয়েছে। (২) শ্যামরায় মন্দির :- ১৬৪৩ খ্রীঃ (মল্লাব্দ ৯৪৯) মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ পঞ্চরত্ন রীতির ‘শ্যামরায় মন্দির’টি বিষ্ণুপুরের গড় ও দরবার এলাকার দক্ষিনে প্রতিষ্ঠা করেন। টেরাকোটার অলঙ্করণে এই মন্দির পশ্চিমবঙ্গে শ্রেষ্ঠ। মন্দির অলঙ্করনে- রাসমন্ডলের ৪০ ভাস্কর্য, শ্রীকৃষ্ণ কখনো গোপী পরিবৃতা নৃ্ত্যরত, কখনোবা রাধার সঙ্গে বংশীবাদনরত, রয়েছে বলরাম, বিষ্ণুর প্রতি কৃষ্ণ-বলরামের যুগ্ম পূজামূর্তি, অনন্ত-শষ্যায় বিষ্ণুমূর্তি, অগ্নিবলয়ের মধ্যে বিষ্ণুর নৃসিংহ অবতারের মূর্তি ও অন্যান্য অবতার মূর্তিগুলি একদিকে যেমন বৈষবধর্মের ভাগবত্ মতবাদের ইঙ্গিত দেয় অন্যদিকে উমা-মহেশ্বরের মূর্তি ও নন্দী-সহ পঞ্চবক্ত্র শিবের মূর্তি পাশুপত্ মাহেশ্বর শাখার ব্যঞ্জনা বহন করে। অর্থাৎ গুপ্তযুগের ধর্মদর্শনে - সুপ্রাচীন ভারতীয় ঐতিহ্যের ভাগবত্ এবং পাশুপত্ ধর্মের সমন্বয় সূচক দার্শনিক বিবর্তনের একটি সুন্দর টেরাকোটা রূপায়ন, যা সে যুগের মন্দিরে টেরাকোটা-অলঙ্করণ-পরিকল্পনা আদলের একটি আভাস পাওয়া যায়। (৩) মৃন্ময়ী মন্দির:- কথিত আছে মল্লরাজ জগৎমল্ল স্বপ্নে মৃন্ময়ী মা’র আদেশ পেয়ে ৯৯৭ খ্রীঃ (৩০৩ মল্লাব্দ, বাংলা ৪০৪ সন) মৃন্ময়ী মন্দির ও গঙ্গামাটির মৃন্ময়ী মূর্তি প্র্রতিষ্ঠা করেন। মল্লরাজাদের আমল থেকে আজও রাজবাড়ির সারদোৎসবে ১৫ দিন মৃন্ময়ী-রূপী দুর্গার পূজা হয়, যার মহাঅষ্টমীর সন্ধিক্ষণ পালিত হয় তোপধ্বনি দিয়ে (ক্ষুদ্রাকৃতি কামান দেগে)। এখনো সমস্ত মল্লভূমে মহাঅষ্টমীর সন্ধিক্ষণের বলিদান হয় রাজবড়ির তোপধ্বনি শুনে । মৃন্ময়ী দর্শনের পরে কোন একসময় শ্রীরামকৃষ্ণ বলেছিলন - “আমি একবার বিষ্ণুপুর গিছিলুম। রাজার বেশ সব ঠাকুরবাড়ি আছে। সেখানে ভগবতীর মূর্তি আছে, নাম মৃন্ময়ী। ঠাকুরবাড়ির কাছে বড় দীঘি। কৃষ্ণবাঁধ। লালবাঁধ। আচ্ছা, দীঘিতে আবাটার (মাথাঘষার) গন্ধ পেলুম কেন বল দেখি? আমি ত জানতুম না যে, মেয়েরা মৃন্ময়ী দর্শনের সময় আবাটা তাঁকে দেয়। আর দীঘির কাছে আমার ভাবসমাধি হ’ল, তখন বিগ্রহ দেখি নাই। আবেগে সেই দীঘির কাছে মৃন্ময়ী দর্শন হ’ল– কোমর পর্যন্ত।” (৪) জোড়বাংলা মন্দির:- ১৬৫৫ খ্রীঃ মল্লরাজ প্রথম রঘুনাথ সিংহ বিষ্ণুপুরের গড় ও দরবার এলাকায় জোড়বাংলা মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরে বিগ্রহ কেষ্টরায় ও গৌরাঙ্গ। ১০.৭ মিটার উচ্চ, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে ১১.৮ মি. ও ১১.৭ মি. মন্দির গাত্রে টেরাকোটার অলঙ্করনে রামায়ন-মহাভারতের কাহিনী, শিকর দৃশ্য ও সামাজিক জীবন যাত্রার খন্ডচিত্র ধরা আছে। স্থানাভাবে মন্দির অলঙ্করণ বর্ণনা আর সম্ভব নয়। (৫) মল্লেশ্বর মন্দির:- ১৬২২ খ্রীঃ মল্লরাজ বীর সিংহ(১ম) একরত্ন রীতির পাথরের মল্লেশ্বর মন্দিরটি বর্তমান মল্লেশ্বর পল্লীতে প্রতিষ্ঠা করেন। (৬) মদনমোহন মন্দির:- ১৬৯৪ খ্রীঃ মল্লরাজ দুর্জন সিংহ একরত্ন রীতির ইটের তৈরী ‘মদনমোহন মন্দির’টি শহরের শাখারী বাজারে প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরগাত্রে রয়েছে রামায়ন, মহাভারত ও পুরান কাহিনীর টেরাকোটার দৃষ্টিনন্দন কাজ। (৭) মুরলীমোহন মন্দির:- ১৬৬৫ খ্রীঃ মল্লরাজ বীরসিংহ (২য়)-র পত্নী শিরোমনি দেবী একরত্ন রীতির মুরলীমোহন মন্দিরটি বর্তমান বিষ্ণুপুরের মহাপাত্র পাড়ায় প্রতিষ্ঠা করেন। (৮) মদনগোপাল মন্দির:- ১৬৬৫ খ্রীঃ মল্লরাজ বীরসিংহ (২য়)-র পত্নী শিরোমনি দেবী পঞ্চরত্ন রীতির মদনগোপাল মন্দিরটি বর্তমান মাধবগঞ্জে প্রতিষ্ঠা করেন। (৯) লালজী মন্দির:- ১৬৫৮ খ্রীঃ মল্লরাজ বীরসিংহ একরত্ন রীতির লালজী মন্দিরটি শহরের গড় ও দরবার এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন। মন্দিরে বিগ্রহ রাধাকৃষ্ণ। (১০) রাধাশ্যাম মন্দির:- ১৭৫৮ খ্রীঃ মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ রাধাশ্যাম মন্দিরটি ও গড় ও দরবার এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন। (১১) কালাচাঁদ মন্দির:- ১৬৫৬ খ্রীঃ মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ ল্যাটেরাইট পাথরের একরত্ন রীতির প্রাচীনতম ‘কালাচাঁদ মন্দির’টি বর্তমান গড় ও দরবার এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন। দৈঘ্য-প্রস্থে ১১.১ মিটার করে এবং ৯.২ মিটার উচ্চতার মন্দিরটির চারিদিকে ফুলকাটা তিন-খিলানযক্ত দালান আছে যার ল্যাটেরাইটের উপর পঙ্খের আস্তরন এখন অনেক স্থানেই খসে পড়েছে। (১২) রাধাগোবিন্দ মন্দির:- ১৭২৯ খ্রীঃ মল্লরাজ কৃষ্ণ সিংহ একরত্ন রীতির ল্যাটেরাইট পাথরের দক্ষিনমুখী ‘রাধাগোবিন্দ মন্দির’টি লাল বাঁধের তীরে প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রি-খিলানযুক্ত দালান শুধু সামনের দিকেই দেখতে পাওয়া যায়। (১৩) রাধামাধব মন্দির:- ১৭৩৭ খ্রীঃ মল্লরাজ গোপাল সিংহ (৩য়)-র পু্ত্র্রবধূ চুড়ামনি দেবী লালবাঁধের দক্ষিনে ইটের একরত্ন রীতির রাধামাধব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। (১৪) কৃষ্ণবলরামের জোড়ামন্দির:- ১৭২৬ খ্রীঃ মল্লরাজ গোপাল সিংহ কৃষ্ণবলরামের জোড়ামন্দিরটি ও লাল বাঁধের তীরে প্রতিষ্ঠা করেন। (১৫) রাধাবিনোদ মন্দির:- ১৬৫৯ খ্রীঃ মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ ইটের তৈরী আটচালা রীতির রাধাবিনোদ মন্দিরটি খড়বাংলা এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন। (১৬) রাসমঞ্চ:- আনুমানিক ১৬০০ খ্রীঃ মল্লরাজ বীরহাম্বির (অনুমান) মিশরের পিরামিডের আদলে ইটের তৈরী রাসমঞ্চটি প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়া দেখ্বেন শ্যামরায় মন্দিরের পূর্বে গুমগড়, বোসপাড়ায় শ্রীধর মন্দির, কৃষ্ণবাঁধের তীরে একটি একরত্ন মন্দির, গড় দরজার উত্তরপূর্বে রঘুনাথ সিংহ তৈরী করিয়েছিলেন একটি পাথরের রথ, গড় দরজার উত্তরে মুণ্ডমালার ঘাট, দলমাদল যাওয়ার রাস্তায় পড়বে ছিন্নমস্তার মন্দির, লালবাঁধের কাছে আচার্য যোগেশ চন্দ্র রায় পুরাকীর্তি ভবনের সংগ্রহশালা ও ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিষ্ণুপুর ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ’-ও । দেখবেন বিষ্ণুপুরের বিখ্যাত বাঁধ গুলি- শহরের পুর্বপ্রান্তে কৃষ্ণ বাঁধ, কৃষ্ণ বাঁধের পশ্চিমে শ্যামবাঁধ, শহরের দক্ষিন প্রান্তে লালবাঈয়ের স্মৃতি বিজড়িত লাল বাঁধ, শহরের কেন্দ্রে পোকা বাঁধ, শহরের পশ্চিম প্রান্তে যমুনা বাঁধ, কালিন্দী বাঁধ, শহরের উত্তরে গাতাইত বাঁধ, শহরের উত্তর-পশ্চিমে রঘুনাথ গঞ্জে রঘুনাথ সায়ের।
বিষ্ণুপুর বেড়ানোর স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে কি কিনবেন? ঘরের আভিজাত্য চিহ্ন ‘বাঁকুড়ার (পাঁচমুড়া গ্রামের) হাতিঘোড়া’ যা কাঠের ও মাটির দুই-ই পাওয়া যায় এবং পুরান কাহিনীর টেরাকোটা টালী। রামায়ন, মহাভারত ও পুরানের কাহিনী তাঁতে মিনেকরা জগৎ-বিখ্যাত ‘বিষ্ণুপুরের বালুচরী’ শাড়ি। কারুকার্য ও দেব-দেবীর মূর্তি খোদিত শঙ্খ, ঝিনুক ও গৃহসজ্জার নানান দৃষ্টিনন্দন উপকরন, পেতল ও ভরনের তৈরী দেব-দেবীর মূর্তি ও অন্যান্য সৌখিন সামগ্রি, ঐতিহ্যবাহী বিষ্ণুপুরী ‘দশাবতার তাস’ এবং অবশ্যই একটি লন্ঠন– যা আজ ঘর অলঙ্করনের একটি বিরল উপাদান। শিল্পটি লুপ্তপ্রায়। এমন দিন আসছে, লন্ঠন দেখতে যেতে হবে মিউজিয়ামে। যেমন বিষ্ণুপুরের অম্বরী তামাকের সুবাসও আজ স্মৃতিমাত্র। হাওড়া থেকে বিষ্ণুপুর ১৩২ কিমি। ২ দিন ১ রাত্রি সময় নিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে বিষ্ণুপুর যওয়ার ট্রেনে চড়ে বসুন। ‘রুপসী বাংলা’ প্রতিদিন সাঁতরাগাছি থেকে সকাল ৬:20 তে ছাড়ে, পৌছায় ৯:৩৭-এ, ফেরার জন্য বিষ্ণুপুর থেকে ছাড়ে বিকেল ৫:২৪-এ এবং প্রতিদিন হাওড়া থেকে বিকেল ৪:৫০শে ‘পুরুলিয়া এক্সপ্রেস’ ছাড়ে, পৌছায় রাত্রি ৮টায়, ফেরার জন্য বিষ্ণুপুর থেকে ছাড়ে সকাল ৭:২৬-এ। তাছাড়া ধর্মতলা থেকে পর্যাপ্ত বাসও রয়েছে। পঃবঃ সরকারের লজ্ পাবেন, পাবেন অনেক বেসরকারি হোটেলও, সঙ্গে অবশ্যই সচিত্র পরিচয়পত্র (ভোটার কার্ড বা পেন্ কার্ড) নিবেন। মল্লভূম আপনাকে সাদর আমন্ত্রন জানাচ্ছে।
জয়মল্ল তার রাজ্যের বিস্তৃতি ঘটিয়ে বিষ্ণুপুরে রাজধানী সরিয়ে আনেন। পরবর্তী রাজারাও রাজ্যবিস্তারে মন দিয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন চতুর্থ রাজা কালুমল্ল, ষষ্ঠ রাজা কাউমল্ল ও সপ্তম রাজা ঝাউমল্ল। অষ্টম রাজা সুরমল্ল উত্তর মেদিনীপুরের বাগড়ির রাজাকে পরাজিত করেছিলেন। তার পরে আরও ৪০ জন বিষ্ণুপুর শাসন করেন। এঁরা সকলেই মল্ল বা মল্লবনিনাথ নামে পরিচিত ছিলেন। এই রাজাদের পারিবারিক নথি থেকে জানা যায়, এঁরা বিদেশি শাসনের অধীনতাপাশ থেকে মুক্ত ছিলেন।
নিৰ্মাণ করাইয়া দেন এবং একটি বৃহৎ পুষ্করিণী খনন করাইয়া তাহার নামানুসারে “লালবাধ’ নাম রাখেন। লালবাঈএর অনুরোধে রাজা ইসলাম ধৰ্ম্মগ্রহণ করিতে মনস্থ করিলে প্রধান মহিষী তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইয়া মন্ত্রী গোপাল সিংহ প্রভূতির সহায়তায় তাহাকে হত্যা করান। লালবাঈকে লালবাধে ডুবাইয়া মারা হয়। অত:পর প্রধান মহিষী রাজার চিতায় আরোহণ করিয়া “সতী” হন । সেই জন্য লোকে তাঁহাকে ‘ পতিঘাতিনী সতী ’ নামে অভিহিত করে । লালবাঈ রাজ্যশুদ্ধ লোক সমেত রাজাকে যে স্থানে মুসলমানী খান খাওয়াইবার আয়োজন করিয়াছিলেন উহা আজিও * ভোজনতলা ’ নামে পরিচিত। . প্রাচীন কাল হইতেই বিষ্ণুপুর সঙ্গীত চচর্চার জন্য বিখ্যাত। “ বিষ্ণুপুরী পদ্ধতি ” নামক গানের ঢঙ্গ ভারতের সবর্বত্র সম্মানিত। সঙ্গীতাচাৰ্য্য যদুভট্ট ও রাধিক প্রসাদ গোস্বামী বিষ্ণুপুরের অধিবাসী ছিলেন। বিষ্ণুপুরের শাখার জিনিস, তুলসীর মালা, রেশমের শাড়ী, পাট ও তসরের কাপড়, পিতল কাসার বাসন এবং তামাক বিশেষ প্রসিদ্ধ। বিষ্ণুপুরের প্রায় ১২ মাইল পূবেৰ্ব অবস্থিত ময়নাপুর নামক গ্রামে রাঢ়ে ধৰ্ম্মপূজার প্রবর্তৃক রমাই পণ্ডিত “যাত্রাসিদ্ধি রায় ” নামে এক ধৰ্ম্মঠাকুর প্রতিষ্ঠা করেন। ময়নাপুরের প্রায় ৭ মাইল উত্তরে দ্বারকেশ্বর নদের ধারে চাপাতলা নামে যে ঘাট দৃষ্ট হয় উহা ধৰ্ম্মমঙ্গল গ্রন্থগুলিতে উল্লিখিত মহামুনি দুবর্বাসা, নারদ, কপিল প্রভৃতির তপস্যার স্থান এবং গুপ্তবারাণসী বলিয়া বর্ণিত “ চাপায়ের ঘাট”। রাজা রঘুনাথ মল্লের রাজত্বকালে কবি রমাই পণ্ডিত ধৰ্ম্ম পূজার মাহাত্ম্যসূচক প্রসিদ্ধ কাব্য “ শূন্যপুরাণ ” রচনা করেন। _ বাঁকুড়া—খড়গপুর জংশন হইতে ৭২ মাইল। জেলার সদর শহর বাঁকুড়ার উত্তরে গন্ধেশ্বরী নদী ও দক্ষিণে দ্বারকেশ্বর নদ প্রবাহিত। বাঁকুড়া পূবেৰ্ব মল্লভূম রাজ্যের অস্তগত ছিল। মল্লরাজগণের পতনের পর ১৮৮১ খৃষ্টাব্দে ইহা স্বতন্ত্র জেলা হইয়াছে। বাঁকুড়া শহরটি অপেক্ষাকৃত উচচ ভূখণ্ডের উপর অবস্থিত ও স্বাস্থ্যকর। এখানে খৃষ্টান মিশনারীগণ কর্তৃক পরিচালিত একটি প্রথম শ্রেণীর কলেজ, একটি মেডিকেল স্কুল ও একটি উচচ ইংরেজী বালিক বিদ্যালয় আছে। অল্পবয়স্ক কয়েদীগণের চরিত্র সংশোধনরে জন্য এখানে একটি “ বরস্টল জেল " আছে। এখান হইতে পিতলের বাসন, সুতা ও তসরের বস্ত্র, শাখার গহনা, হরিতকী ও বহেড়া প্রভৃতি নানা স্থানে রপ্তানি হয়। বাঁকুড়ার এক্তেশ্বর শিব বা মণিমহাদেবের মন্দির একটি দ্রষ্টব্য বস্তু। বাঁকুড়া হইতে “বাঁকুড়া দামোদর নদ রেলপথ ” নামক একটি ছোট মাপের (ন্যারো গেজ) রেলপথে এই জেলার ও বৰ্দ্ধমান জেলার কয়েকটি স্থানে যাওয়া যায়। এখান হইতে অনেকগুলি বাস সাভিসও আছে। সোনামুখী—বঁকুড়া দামোদর নদ রেলপথে বাঁকুড়া হইতে ২৬ মাইল দূরে সোনামুখী একটি প্রসিদ্ধ স্থান। এখানে গালা প্রস্তুত হয় এবং এখানকার তসর কাপড়, লৌহনিৰ্ম্মিত দ্রব্যাদি ও মাটির জিনিস বিশেষ প্রসিদ্ধ। বাংলাদেশের আদি কথক গদাধর চক্রবর্তী, বিখ্যাত বৈষ্ণবসাধক মনোহর দাস ও ঠাকুর হরনাথ সোনামুখীর অধিবাসী ছিলেন। ঠাকুর হরনাথের পুরা নাম হরনাথ
বিষ্ণুপুর একটি মন্দিরনগরী। এখানকার প্রধান দ্রষ্টব্য স্থানগুলির প্রায় সবই মন্দির। বিষ্ণুপুরের অধিকাংশ মন্দিরই মধ্যযুগের শেষভাগে মল্ল রাজাদের শাসনকালে নির্মিত পোড়ামাটির বা ল্যাটেরাইট পাথরের মন্দির। মন্দির ছাড়াও বিষ্ণুপুরে দর্শনীয় কয়েকটি ধর্মীয় ও সাধারণ স্থাপত্য রয়েছে। শহরের মন্দিরগুলি রাসমঞ্চকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এগুলিকে চারটি শ্রেণিভুক্ত করা যায়:
রাসমঞ্চ এবং রাসমঞ্চের উত্তর দিকে অবস্থিত মন্দিরসমূহ
রাসমঞ্চের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত মন্দিরসমূহ
আরও উত্তরে অবস্থিত মন্দিরসমূহ
উত্তর-পশ্চিম দিকে অবস্থিত মন্দিরসমূহ
1 ছিন্নমস্তা মন্দির। সম্পাদনা
2 জোড়বাংলা মন্দির। ১৭ শতকের রাজা রঘুনাথ সিংহ দেব দ্বিতীয় দ্বারা নির্মিত বাংলার স্থাপত্যের ঐতিহ্যশালী শৈলীর ছাদ অলঙ্কৃত করা হয় পোড়ামাটির খোদাই করে। সম্পাদনা
কালচান্দ মন্দির। সম্পাদনা
কৃষ্ণ-বলরাম-জুগোলকিশোর মন্দির। সম্পাদনা
3 মদনমোহন মন্দির। ১৬৯৪ খ্রিস্টাব্দে রাজা দুর্জন সিং দেব দেওয়ায় ইকরতনা শৈলীতে মন্দির নির্মাণ করেন, একটি খিলানবিশিষ্ট একটি বর্গাকার ছাদযুক্ত মন্দির। দেয়ালের উপর চিত্তাকর্ষক খোদাই করে রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণ থেকে দৃশ্য দেখানো হয়েছে। সম্পাদনা
মালেশ্বর মন্দির। সম্পাদনা
4 মৃন্ময়ী মন্দির। সম্পাদনা
নন্দলাল মন্দির। সম্পাদনা
রাধাগোবিন্দ মন্দির। সম্পাদনা
5 রাধালালজী মন্দির। সম্পাদনা
রাধামাধব মন্দির। সম্পাদনা
6 রাধেশ্যাম মন্দির। সম্পাদনা
ষাড়েশ্বর মন্দির। সম্পাদনা
সর্বমঙ্গলা মন্দির। সম্পাদনা
শ্যামরায় মন্দির
7 শ্যামরায় মন্দির (পঞ্চরত্ন মন্দির), রাজদরবার, দলমাদলপাড়া, বিষ্ণুপুর, পশ্চিমবঙ্গ - ৭২২১২২। ১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ কর্তৃক নির্মিত কৃষ্ণমন্দির। মন্দিরটির দেওয়াল পোড়ামাটির অলংকরণে শোভিত। দেওয়ালচিত্রে কৃষ্ণের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এটি বিষ্ণুপুরের বৃহত্তম মন্দিরগুলির অন্যতম। উইকিপিডিয়ায় শ্যামরায় মন্দির সম্পাদনা
হাম্বীর মল্ল
দেব (বীর হাম্বীর)
রঘুনাথ সিংহ
বীর সিংহ
দুর্জন সিংহ
গোপাল সিংহ
চৈতন্য সিংহ