বলা
ি ত বলা >তবলা
ঊর্ধ্বক্রমবাচকতা {  | আনদ্ধ বাদ্যযন্ত্র | ঘাত বাদ্যযন্ত্র | সঙ্গীতযন্ত্র | যন্ত্র | ডিভাইস | যন্ত্রকরণতা | মানবসৃষ্টি | সমগ্র | দৈহিক লক্ষ্যবস্তু | দৈহিক সত্তা | সত্তা |}

ভারতীয় সঙ্গীতে ব্যবহৃত একপ্রকার তাল রক্ষাকারী  আনদ্ধ বাদ্যযন্ত্র
দুটি খণ্ডের একটি সেট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। উভয়ই আনদ্ধ। এর একটি খণ্ডের নাম তবলা বা ডাইনা। অপর অংশের নাম ডুগি বা বাঁয়া। সম্মিলিত নাম তবলা-বাঁয়া। সংক্ষেপে তবলা। সরাসরি হাতের মণিবন্ধ তালু এবং অঙ্গুলির আঘাতে বাজানো হয়।

তবলা-বাঁয়ার প্রচলন শুরু হয়, ভারতবর্ষের মুসলিম শাসনামলে। এই যন্ত্রটি আরবে প্রচলিত আনদ্ধ বাদ্যযন্ত্রের একটি সংস্কারকৃত যন্ত্র। আদ্য তবলা তৈরি করেছিলেন আরবদেশের জুবলের পুত্র টুবল। আবিষ্কারকের নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছিল তবল। এই যন্ত্রটি আরব-সঙ্গীত শিল্পীদের সূত্রে পারশ্যে প্রবেশ করেছিল। পারশ্যে তবল নামের যে তালযন্ত্রের প্রচলন ছিল, তা ভারাতীয় তবলের মতো ছিল না।

সেকালের পারশ্যের সঙ্গীতশিল্পীরা আদি গজল গানের সাথে তবল ব্যবহার করতেন।
ইতুৎমিশের (১২১১-১২৩৬ খ্রিষ্টাব্দ) আমলে প্রখ্যাত সঙ্গীত সাধক হযরত আমির খসরুর পিতা পারশ্য থেকে ভাগ্যান্বেষে দিল্লিতে আসেন। সেই সময় পারশ্যের সঙ্গীতশিল্পীসহ বহু পেশার মানুষ পারশ্য থেকে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। হযরত আমির খসরু ১২৫৩-৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ভারতের বর্তমান পাতিয়ালা (বর্তমান পাঞ্জাব রাজ্যের একটি জেলার নাম ও জেলা শহর) নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গীতজীবনের শুরু হয়েছিল পারশ্যের গজল গানের ভিতর দিয়ে। আমির খসরুর আগে ভারতবর্ষে তবলা নামক কোনো বাদ্যযন্ত্র ছিল, তা জানা যায় না। অনেকেই মনে করেন, আমির খসরু পারস্যের গজলের সাথে ব্যবহৃত দুই খণ্ডের বাদ্যযন্ত্রকে সংস্কার করে তবলায় রূপ দেন। ১২৮৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে খসরু রচনা করেন 'কিরানুস-স'দাইন' নামক কাব্যবগ্রন্থ। ১২৯০ খ্রিষ্টাব্দে জালালউদ্দীন দিল্লীর রাজদরবারের পুরানো অনেক কর্মীদের বরখাস্ত করলেও, আমির খসরু সমাদরেই থেকে যান এবং দিল্লীর দরবারকে কাব্য ও সঙ্গীতে মুখর করে রাখেন। জালালউদ্দীন খাল্‌জি তাঁর কাব্য ও সঙ্গীতে মুগ্ধ হয়ে "আমারত" উপাধিতে সম্মানিত করেন। তখন থেকেই তিনি 'আমারত খসরু' বা 'আমির খসরু' নামে পরিচিত লাভ করেন। ধারণা করা হয় ১৩০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে দিল্লির সুলতান আলাউদ্দীন-এর শাসনামলে তিনি পারশ্যের তবল যন্ত্রটির সংস্কার করে 'তবলা' নামক যন্ত্রটি দরবারে উপস্থাপন করেন। ধীরে ধীরে এই যন্ত্রটি সঙ্গীতশিল্পীদের চর্চার মধ্য দিয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। হিন্দু সঙ্গীতশিল্পীরা প্রথমদিকে তবলাকে মুসলমানদের বাদ্যযন্ত্র হিসেবে পরিহার করে চলতেন। ১৪-১৫শ শতকের দিকে জৈন সাধক সুধাকলশ তবলাকে উল্লেখ করেছিলেন ম্লেচ্ছযন্ত্র।

সঙ্গীতাচার্য গোপেশ্বর বন্দ্যপাধ্যায়ের মতে সদারঙ্গের শিষ্য দ্বিতীয় আমির খসরু তবলার উদ্ভাবন করেছিলেন। উল্লেখ্য এই আমির খসরু ছিলেন মোগল সম্রাট তৃতীয় মহম্মদ শা'র আমলে (১৭৩৮ খ্রিষ্টাব্দ)।

আবার অনেকে মনে করেন, দিল্লির জনৈক পাখোয়াজ শিল্পীর সাথে দিল্লির সম্রাট আকবরের সঙ্গীত দরবারের পাখোয়াজ বাদক সিধার খাঁর সাথে একটি পাখোয়াজ-বাদনের প্রতিযোগিতা হয়। ওই প্রতিযোগিতায় সিধার খাঁ পরাজিত হয়ে, তাঁর পাখোয়াজকে দুই টুকরো করে ফেলেন। এরপর এই পৃথক দুই টুকরোকে মেরামত করে আলাদা যন্ত্র হিসেব তৈরি করেন এবং তা তবলা নামে পরিচত হয়।

তবলার ঘরনা
বাদনশৈলীর বিচারে তবলাবাদনকে দুটি বাজ-এ ভাগ করা হয়। এই ভাগ দুটি হলো

১. দিল্লী বা পশ্চিমী বাজ : এই বাজের ভিতরে রয়েছে দিল্লি এবং অজারাড়া  অঞ্চলের বাদনশৈলী।
২. পূর্বী বাজ বা পূরব বাজ: এই বাজের ভিতরে রয়েছে লক্ষ্ণৌ, বারনসী এবং ফরুখাবাদ।

তবলা বাদনের এই পাঁচটি বাজের সূত্রে পাঁচটি ঘরানার সৃষ্টি হয়েছিল। দিল্লী ঘরনা থেকে দিল্লী ঘরানা-সহ মোট পাঁচটি ঘরানার সৃষ্টি হয়েছে।  এর বাইরে পৃথকভাবে বিকশিত হয়েছে পাঞ্জাব ঘরানা। সব মিলিয়ে বর্তমানে তবলার ঘরানা ছয়টি। নিচে ক্রমবিবর্তনের ধারায় এই ঘরানাগুলোকে দেখানো হলো।

তবলা পরিচিতি

কানি : এর অন্য নাম চাঁটি
তবলার ছাউনির প্রান্তভাগে একটি পৃথক চামড়ার আচ্ছাদন থাকে। এই অংশকে বলা হয় কানি।
 

ময়দান : এর অন্যান্য নাম লব, সুর।
তবলার খিরন এবং প্রান্তদেশীয় কানি অংশের ভিতরে যে বৃত্তাকার অংশ দেখা যায়, তাকে ময়দান বলে।  

পাগড়ি : এর অন্যান্য নাম গজরা, বেষ্টনী, বেড়।
তবলার মূল চামড়া এবং কানির চামড়াকে একত্রিত করে কাঠের উপরে বসানো হয়। পরে চামড়ার ফিতা দিয়ে তৈরিকৃত
বিনুনি তবলার কানি ও মূল চামড়ার সাথে যুক্ত করে, চামড়ার দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। এই বিনুনি অংশকে পাগড়ি বলা হয়। পাগড়িতে মোট ১৬টি ছিদ্র থাকে। এই ছিদ্র পথে চামড়ার ফিতা তৈরি করে কাঠের নিম্নাংশের গুড়রি অংশের সাথে দৃঢ় করে বাঁধা হয়।

ডোরি : এর অন্যান্য নাম ছোট্, বদ্ধি, দোয়ানী।
পাগড়ির ১৬টি ছিদ্র পথে যে চামড়া ফিতা প্রবেশ করিয়ে, কাঠের নিম্নাংশের গুড়রি অংশের সাথে দৃঢ় করে বাঁধা হয়, তাকে ডোরি বলা হয়।

গুলি : এর অন্যা নাম গট্টা।
তবলার উপরের ছাউনির সটান অবস্থা এবং কাঙ্ক্ষিত সুর পাওয়ার জন্য ডোরি ভিতরে কয়েকটি কাঠের তৈরি লম্বাটে গোলাকার গুলি ব্যবহার করা হয়।  এই ডোরি উপরে নিচে নামিয়ে তবলা সুরকে নিম্ন বা চড়া সুর নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

তবলা বাদকেরা তবলায় উৎপন্ন সঙ্গীতোপযোগী ধ্বনিগুলোকে বোল, বর্ণ বা বাণী বলে থাকে। তবলা এবং ডুগিতে পৃথক পৃথকভাবে বোল তৈরি হয়। আবার যন্ত্রে যুগপৎ আঘাতেও মিশ্র বোল তৈরি হয়। এই বিচারে তবলার বোলকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়।



সূত্র :